শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.৮ — দিব্যচক্ষুতে বিশ্বরূপ দর্শন
ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুমনেনৈব স্বচক্ষুষা।
দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্।।৮।।
অনুবাদঃ কিন্তু তুমি তোমার বর্তমান চক্ষুর দ্বারা আমাকে দর্শন করতে সক্ষম হবে না। তাই, আমি তোমাকে দিব্যচক্ষু প্রদান করছি। তুমি আমার অচিন্ত্য যোগৈশ্বর্য দর্শন কর।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোকটি বিশ্বরূপ দর্শনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে সামনে নিয়ে আসে। অর্জুন কৃষ্ণের ঐশ্বরিক স্বরূপ প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছেন। তিনি কেবল কৃষ্ণের কথা শুনে সন্তুষ্ট নন। তিনি সেই পরম সত্যকে নিজের চোখে দেখতে চান। কিন্তু কৃষ্ণ তাঁকে জানান যে সাধারণ মানবিক চোখ দিয়ে সেই অসীম রূপ দেখা সম্ভব নয়। তাই তিনি অর্জুনকে দিব্যচক্ষু প্রদান করবেন এবং সেই বিশেষ দৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর ঐশ্বরিক যোগশক্তি প্রত্যক্ষ করতে বললেন। শ্লোকটি হল
সহজ বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায়, কিন্তু তোমার এই সাধারণ চোখ দিয়ে আমাকে দেখতে তুমি সক্ষম নও। আমি তোমাকে দিব্য চক্ষু দিচ্ছি। সেই চক্ষুর দ্বারা আমার ঐশ্বরিক যোগশক্তি দর্শন করো।
এই শ্লোকের প্রথম শব্দ ন। সংস্কৃত ন শব্দটি একটি নেতিবাচক অব্যয়। এর অর্থ না বা নয়। এর পরেই এসেছে তু। তু অর্থ কিন্তু বা তবে। ফলে শুরুতেই কৃষ্ণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা তৈরি করছেন। অর্জুন দেখতে চান, কিন্তু যে চোখ দিয়ে তিনি সাধারণ জগতকে দেখেন, সেই চোখ দিয়ে ঈশ্বরের অসীম স্বরূপ দেখা সম্ভব নয়। এখানে মানুষের অক্ষমতাকে অপমান হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং মানুষের ইন্দ্রিয়ের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে।
মাং শব্দটির অর্থ আমাকে। এটি অহম্ অর্থাৎ আমি শব্দের দ্বিতীয়া একবচন রূপ। এখানে কৃষ্ণ নিজেকেই দর্শনের বিষয় হিসেবে স্থাপন করছেন। তবে এই আমি কেবল একজন মানবীয় ব্যক্তি কৃষ্ণকে নির্দেশ করছে না। একাদশ অধ্যায়ের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়ে যায় যে অর্জুন যে রূপ দেখতে যাচ্ছেন তা ব্যক্তিগত কৃষ্ণের সীমিত রূপ নয়। তিনি দেখতে যাচ্ছেন সমগ্র বিশ্বকে ধারণকারী এক অসীম ঐশ্বরিক প্রকাশ।
শক্যসে শব্দটির মূল সম্পর্ক সংস্কৃত শক্ ধাতুর সঙ্গে। শক্ অর্থ সক্ষম হওয়া বা পারা। শক্যসে অর্থ তুমি সক্ষম বা তুমি পারো। কিন্তু তার আগে ন বসেছে বলে ন শক্যসে অর্থ দাঁড়ায় তুমি সক্ষম নও। এর পরেই দ্রষ্টুম্ এসেছে। দ্রষ্টুম্ শব্দটির মূল ধাতু দৃশ্। এর অর্থ দেখা, দর্শন করা বা প্রত্যক্ষ করা। তাই ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুম্ এর মধ্যে শুধু শারীরিকভাবে দেখতে না পারার কথা নেই। এর মধ্যে রয়েছে ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপকে প্রত্যক্ষ করার জন্য সাধারণ মানুষের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা।
এরপর এসেছে অনেনৈব স্বচক্ষুষা। অনেনৈব মূলত অনেন এবং এব এর সন্ধিবদ্ধ রূপ। অনেন অর্থ এই দ্বারা এবং এব অর্থ এই দিয়েই বা কেবল এই দ্বারা। স্বচক্ষুষা শব্দটি গঠিত হয়েছে স্ব এবং চক্ষুষা থেকে। স্ব অর্থ নিজের এবং চক্ষুষা অর্থ চোখ দিয়ে বা দৃষ্টির দ্বারা। ফলে অনেনৈব স্বচক্ষুষা বলতে বোঝায় এই নিজের সাধারণ চোখ দিয়েই। কৃষ্ণ যেন অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে তোমার বর্তমান দৃষ্টির সীমা অতিক্রম না করলে তুমি যে সত্য দেখতে চাও তা উপলব্ধি করতে পারবে না।
এখানেই শ্লোকটির অন্যতম গভীর দর্শন প্রকাশিত হয়েছে। মানুষের চোখ পৃথিবীকে দেখতে পারে, কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত সত্যকে দেখতে পারে না। চোখ রং দেখে, আকার দেখে, গতি দেখে এবং বাহ্যিক রূপ দেখে। কিন্তু চোখ কি একটি মানুষের অন্তরের সমস্ত অনুভূতি দেখতে পারে। চোখ কি একটি কর্মের সুদূর ভবিষ্যৎ দেখতে পারে। চোখ কি সৃষ্টি ও বিলয়ের সম্পূর্ণ রহস্য দেখতে পারে। চোখ কি বহুত্বের অন্তর্নিহিত ঐক্যকে সরাসরি উপলব্ধি করতে পারে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের বুঝিয়ে দেয় কেন কৃষ্ণ সাধারণ চোখের সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন।
এরপর আসে দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ। দিব্য শব্দটির উৎস সংস্কৃত দিব্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে আলো, উজ্জ্বলতা, দেবীয়তা এবং সাধারণ সীমার ঊর্ধ্বে থাকার ভাব রয়েছে। দিব্য অর্থ দেবীয়, স্বর্গীয়, অসাধারণ বা অতিমানবীয়। কিন্তু এই শ্লোকে দিব্য শব্দটিকে শুধু অলৌকিক অর্থে গ্রহণ করলে এর গভীরতা কমে যায়। দিব্যচক্ষু এমন এক উচ্চতর দৃষ্টির প্রতীক, যা সাধারণ ইন্দ্রিয়ের সীমা অতিক্রম করে বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম।
দদামি শব্দটির মূল ধাতু দা। এর অর্থ দেওয়া বা প্রদান করা। দদামি অর্থ আমি দিই বা আমি প্রদান করছি। তে অর্থ তোমাকে। চক্ষুঃ অর্থ চোখ বা দর্শনশক্তি। ফলে দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ এর সরল অর্থ দাঁড়ায় আমি তোমাকে একটি দিব্য চক্ষু প্রদান করছি। এই বাক্যের মধ্যে ঈশ্বরের কৃপা ও মানুষের প্রস্তুতির একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অর্জুন নিজে জানতে চেয়েছেন, তিনি দর্শনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন এবং কৃষ্ণের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিশেষ দর্শনের ক্ষমতা কৃষ্ণই প্রদান করছেন।
দিব্যচক্ষুর ধারণাটি তাই ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু একটি অতিপ্রাকৃত চোখ নয়। এটি এমন একটি দৃষ্টির প্রতীক যা বাহ্যিক রূপের আড়ালে থাকা গভীর সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে। সাধারণ চোখ বস্তু দেখে। উচ্চতর দৃষ্টি সেই বস্তুর অন্তর্নিহিত সম্পর্ক ও তাৎপর্য উপলব্ধি করে। সাধারণ চোখ বহুত্ব দেখে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টি সেই বহুত্বের মধ্যে ঐক্য অনুসন্ধান করে। সাধারণ চোখ ঘটনাকে দেখে। জ্ঞানদৃষ্টি ঘটনার কারণ, পরিণতি এবং বৃহত্তর অর্থ বোঝার চেষ্টা করে।
শেষ অংশে কৃষ্ণ বলেন পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্। পশ্য অর্থ দেখো বা দর্শন করো। মে অর্থ আমার। যোগম্ শব্দটি এসেছে যুজ্ ধাতু থেকে। যুজ্ এর মধ্যে যুক্ত হওয়া, সংযুক্ত করা এবং সম্পর্ক স্থাপনের ভাব রয়েছে। কিন্তু এই শ্লোকে যোগ শব্দটি কেবল সাধনা বা যোগব্যায়াম বোঝায় না। এখানে যোগ বলতে কৃষ্ণের সেই ঐশ্বরিক শক্তিকে বোঝানো হয়েছে যার মাধ্যমে অসীম বিশ্ব তাঁর মধ্যে প্রকাশিত হতে পারে। ঐশ্বরম্ শব্দটি ঈশ্বর শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর অর্থ ঈশ্বরীয়, প্রভুত্বময়, মহাশক্তিশালী বা ঐশ্বরিক।
যোগমৈশ্বরম্ তাই কেবল একটি সাধারণ যোগশক্তি নয়। এটি ঈশ্বরের সেই অসীম শক্তি যার দ্বারা তিনি একই সঙ্গে বহু রূপে প্রকাশিত হয়েও নিজের ঐক্য বজায় রাখেন। সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয়ের যে বিশাল রহস্য মানুষের সীমিত বুদ্ধির কাছে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয়, ঐশ্বরিক দৃষ্টিতে তা এক বৃহৎ সামগ্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়।
এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য এখানেই অত্যন্ত গভীর। মানুষ সাধারণত মনে করে যা দেখা যায় সেটিই সত্য। কিন্তু গীতা সেই ধারণাকে প্রশ্ন করে। দৃশ্যমান জগত সত্যের একটি স্তর মাত্র। মানুষের ইন্দ্রিয় সীমিত হওয়ায় তার উপলব্ধিও সীমিত। একটি ছোট শিশু যখন আকাশের দিকে তাকায় তখন সে কিছু তারা দেখে। একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী সেই একই আকাশের দিকে তাকিয়ে অসংখ্য নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং মহাজাগতিক সম্পর্কের কথা চিন্তা করেন। আকাশ বদলায়নি। বদলেছে দেখার ক্ষমতা। দিব্যচক্ষুর ধারণাটিও এই গভীর সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
মানুষের জীবনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমরা অনেক সময় কোনো একটি ঘটনা দেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই। কারও একটি আচরণ দেখে তার সম্পূর্ণ চরিত্র সম্পর্কে বিচার করি। একটি ব্যর্থতা দেখে মনে করি সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। একটি সমস্যাকে এত বড় করে দেখি যে তার বাইরে থাকা সম্ভাবনাগুলো আমাদের চোখে পড়ে না। কারণ আমাদের দৃষ্টি অনেক সময় পরিস্থিতির দ্বারা নয়, আমাদের নিজস্ব ধারণা, ভয়, অভ্যাস এবং অহংকার দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হলে একই বাস্তবতা নতুন অর্থ ধারণ করতে পারে।
এই অর্থে দিব্যচক্ষু একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রতীকও বটে। এটি চেতনার পরিণতিকে নির্দেশ করে। একজন অপরিণত মানুষ নিজের অভিজ্ঞতাকে সমগ্র সত্য মনে করতে পারে। কিন্তু একজন জ্ঞানী ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে তাঁর জ্ঞানও সীমিত। নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে এই সচেতনতা থেকেই প্রকৃত জ্ঞানের সূচনা হয়। গীতার এই শ্লোক তাই মানুষকে বিনয় শেখায়। সত্যকে জানতে হলে প্রথমে স্বীকার করতে হয় যে নিজের বর্তমান দৃষ্টি সম্পূর্ণ নয়।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে দিব্যচক্ষুকে উচ্চতর জ্ঞানদৃষ্টির প্রতীক হিসেবে দেখা যেতে পারে। সাধারণ দৃষ্টি নাম ও রূপের বহুত্ব দেখে। কিন্তু জ্ঞানদৃষ্টি সেই বহুত্বের অন্তর্নিহিত একত্ব অনুসন্ধান করে। জগতের অসংখ্য নাম, রূপ ও পরিচয়ের আড়ালে যে পরম সত্য বিরাজমান তাকে উপলব্ধি করার পথই এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের আলোকে এই দর্শন ঈশ্বরের অসীম মহিমার উপলব্ধি। জগত ও জীব ঈশ্বরের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করে। তাই বিশ্বরূপ দর্শন হলো ঈশ্বরের সর্বব্যাপী মহিমাকে প্রত্যক্ষ করা। দ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে আবার জীব ও ঈশ্বরের পার্থক্য বজায় থাকে। দিব্যচক্ষু অর্জুনকে ঈশ্বর হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দেয় না। বরং ঈশ্বরের প্রকৃত মহিমা দেখার জন্য বিশেষ কৃপা প্রদান করে। বিভিন্ন দর্শনের ব্যাখ্যা আলাদা হলেও একটি বিষয়ের দিকে তারা ইঙ্গিত করে। ঈশ্বরীয় সত্য সাধারণ ইন্দ্রিয়ের সীমিত ক্ষমতার চেয়ে বৃহত্তর।
ভক্তির দৃষ্টিতেও এই শ্লোক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ সাধনা করতে পারে, জ্ঞান অর্জন করতে পারে, ধ্যান করতে পারে এবং সত্যের সন্ধান করতে পারে। কিন্তু ঈশ্বরের প্রকৃত উপলব্ধি কেবল অহংকারের শক্তিতে অর্জন করা যায় না। সেখানে কৃপা ও অনুগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কৃষ্ণের দদামি তে চক্ষুঃ বাক্যটি সেই ঈশ্বরীয় অনুগ্রহের প্রতীক। অর্জুনের আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু দর্শনের ক্ষমতা কৃষ্ণ প্রদান করলেন।
সাহিত্যিক দিক থেকেও এই শ্লোক অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। একাদশ অধ্যায়ের পূর্ববর্তী অংশে কৃষ্ণ ও অর্জুনের মধ্যে গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক, বন্ধু ও বন্ধুর সম্পর্ক এবং ঈশ্বর ও ভক্তের সম্পর্ক পাশাপাশি উপস্থিত। কিন্তু এই শ্লোকের পর সেই সম্পর্ক নতুন এক মাত্রা লাভ করে। কৃষ্ণ আর শুধু অর্জুনের রথী বা সখা নন। তিনি এমন এক বিশ্বব্যাপী সত্তা হিসেবে প্রকাশিত হতে চলেছেন যার মধ্যে সমগ্র সৃষ্টি অবস্থান করছে। দিব্যচক্ষু তাই মানবীয় কৃষ্ণ থেকে বিশ্বরূপ কৃষ্ণের দিকে যাওয়ার এক আধ্যাত্মিক সেতু।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থ আরও বিস্তৃত। চোখ এখানে জ্ঞানের প্রতীক। নিজের চোখ মানুষের সীমিত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতীক। দিব্যচক্ষু উচ্চতর চেতনার প্রতীক। কৃষ্ণের প্রদান ঈশ্বরীয় কৃপাকে নির্দেশ করে। আর বিশ্বরূপ সমগ্র অস্তিত্বের ঐক্যকে নির্দেশ করে। এইভাবে পুরো শ্লোকটি মানুষের সীমাবদ্ধতা থেকে অসীম উপলব্ধির দিকে একটি যাত্রার প্রতীক হয়ে ওঠে।
একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একজন মানুষ একটি বিশাল বইয়ের মাত্র একটি পৃষ্ঠা পড়ে যদি মনে করেন তিনি পুরো বইটি বুঝে ফেলেছেন, তাহলে তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ থাকবে। একইভাবে মানুষ জীবনের একটি ক্ষুদ্র অংশ দেখে সমগ্র বাস্তবতাকে বিচার করতে পারে না। আবার একটি দূরবীক্ষণ যন্ত্র আকাশ সৃষ্টি করে না। এটি শুধু মানুষের সীমিত দেখার ক্ষমতাকে প্রসারিত করে। দিব্যচক্ষুর ধারণাকেও প্রতীকীভাবে এমন একটি উচ্চতর দর্শনক্ষমতা হিসেবে বোঝা যায় যা আগে থেকে বিদ্যমান বৃহত্তর সত্যকে উপলব্ধির উপযোগী করে তোলে।
এই কারণেই ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুম্ দিয়ে শুরু হওয়া শ্লোকটি শুধু অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শনের প্রস্তুতি নয়। এটি মানুষের জ্ঞানতত্ত্ব সম্পর্কেও একটি গভীর বক্তব্য। আমরা যা দেখতে পাই তা বাস্তবতার সবটুকু নয়। আমরা যা বুঝতে পারি তা সত্যের সম্পূর্ণ সীমা নয়। আমাদের বর্তমান দৃষ্টির বাইরে আরও বৃহত্তর বাস্তবতা থাকতে পারে। সেই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে নিয়ে যায়।
শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এই যে সত্য সবসময় আমাদের চোখের সামনে থাকলেও সত্যকে দেখার মতো দৃষ্টি আমাদের সবসময় থাকে না। অর্জুনের সামনে কৃষ্ণ ছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণের বিশ্বরূপ তখনও তাঁর সাধারণ চোখে প্রকাশিত হয়নি। কৃষ্ণকে দেখার জন্য তাঁর চোখের পরিবর্তন নয় শুধু, তাঁর উপলব্ধির স্তরের পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। সেই পরিবর্তনের নামই দিব্যচক্ষু।
অতএব শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.৮ এর মূল শিক্ষা হলো মানুষের সীমিত ইন্দ্রিয়দৃষ্টি দিয়ে অসীম সত্যকে সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। সাধারণ চোখ বাহ্যিক জগতকে দেখে, কিন্তু দিব্য দৃষ্টি সেই জগতের অন্তর্নিহিত ঐক্য, অসীমতা এবং ঈশ্বরীয় তাৎপর্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। দিব্যচক্ষু তাই কেবল অলৌকিক দর্শনের উপকরণ নয়। এটি জাগ্রত চেতনা, উচ্চতর জ্ঞান, বিনয়, আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং ঈশ্বরীয় কৃপাশক্তির এক গভীর প্রতীক।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক যেন মানুষকে একটি চিরন্তন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কি সত্যিই যা আছে তা দেখতে পাচ্ছি, নাকি আমাদের সীমিত দৃষ্টি আমাদের সামনে থাকা সত্যের কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশই দেখাচ্ছে। কৃষ্ণের দিব্যচক্ষুর শিক্ষা হলো সত্যকে জানার জন্য শুধু চোখ খোলা যথেষ্ট নয়। দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে হয়, চেতনাকে পরিশুদ্ধ করতে হয় এবং নিজের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে তাকাতে হয়। তখনই সাধারণ দর্শন ধীরে ধীরে সত্যদর্শনে পরিণত হয় এবং সীমিত মানবদৃষ্টি অসীমের দিকে যাত্রা শুরু করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!