শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.৯ — কৃষ্ণের বিশ্বরূপ প্রকাশ
সঞ্জয় উবাচ
এবমুক্ত্বা ততো রাজন্ মহাযোগেশ্বরো হরিঃ।
দর্শয়ামাস পার্থায় পরমং রয়পমৈশ্বরম্।।৯।।
অনুবাদঃ সঞ্জয় বললেন- হে রাজন্! এভাবেই বলে, মহান যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর বিশ্বরূপ দেখালেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের নবম শ্লোকটি এমন একটি মুহূর্তকে ধারণ করে, যখন কথার জগৎ থেকে দর্শনের জগতে প্রবেশ ঘটতে চলেছে। এতক্ষণ অর্জুন কৃষ্ণের মুখ থেকে আত্মা, কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি, ঈশ্বর এবং সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে শুনেছেন। তিনি কৃষ্ণের ঐশ্বরিক মহিমা সম্পর্কে জেনেছেন, কিন্তু জ্ঞান এখনও তাঁর কাছে মূলত শ্রুত এবং বুদ্ধিগত। এবার তিনি সেই সত্যকে প্রত্যক্ষভাবে দেখতে চান। তাই তিনি কৃষ্ণের কাছে তাঁর বিশ্বব্যাপী ঐশ্বরিক রূপ দর্শনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন। কৃষ্ণ তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষা গ্রহণ করেন এবং দিব্যদৃষ্টি প্রদান করার পর বলেন যে সাধারণ চক্ষু দিয়ে তাঁর সেই রূপ দেখা সম্ভব নয়। এই প্রস্তুতির পরেই আসে একাদশ অধ্যায়ের নবম শ্লোক। সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে জানাচ্ছেন যে এইভাবে কথা বলার পর মহাযোগেশ্বর হরি পার্থের সামনে তাঁর পরম ঐশ্বরিক রূপ প্রকাশ করলেন।
শ্লোকটির শুদ্ধ সংস্কৃত পাঠ হলো “এবমুক্ত্বা ততো রাজন্ মহাযোগেশ্বরো হরিঃ। দর্শয়ামাস পার্থায় পরমং রূপমৈশ্বরম্।” এখানে প্রথম শব্দ “এবমুক্ত্বা” অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। “এবম্” অর্থ এইভাবে বা এরূপে এবং “উক্ত্বা” অর্থ বলে বা বলার পর। “উক্ত্বা” শব্দটি সংস্কৃত √বচ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কথন বা বলার অর্থ বহন করে। ক্ত্বা প্রত্যয়ের মাধ্যমে এমন একটি ক্রিয়ার ভাব প্রকাশিত হয় যা সম্পন্ন হওয়ার পর অন্য একটি ক্রিয়া সংঘটিত হয়। ফলে “এবমুক্ত্বা” বলতে বোঝায় এইভাবে বলে বা এই কথা বলার পর। শ্লোকের শুরুতেই তাই একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়। কৃষ্ণ প্রথমে কথা বলেছেন, জ্ঞান দিয়েছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর সেই জ্ঞানের বাস্তব ও প্রত্যক্ষ প্রকাশ ঘটতে চলেছে। এখানে ভাষা যেন দর্শনের দরজা খুলে দেয়।
এরপর রয়েছে “ততো রাজন্”। “ততঃ” অর্থ তারপর বা অতঃপর। “রাজন্” অর্থ হে রাজা। সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধন করছেন। এই সম্বোধনের মধ্যেও মহাভারতের বর্ণনাশৈলীর একটি বিশেষ সৌন্দর্য রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে বসে থাকা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে সঞ্জয় যেন একের পর এক দৃশ্যকে জীবন্ত করে তুলছেন। তিনি শুধু ঘটনা জানাচ্ছেন না, তিনি এমনভাবে বর্ণনা করছেন যেন ধৃতরাষ্ট্রের সামনে কুরুক্ষেত্রের প্রতিটি মুহূর্ত উপস্থিত হয়ে উঠছে। ফলে “ততো রাজন্” শুধু একটি বাক্যাংশ নয়। এটি শ্রোতা ও ঘটনার মধ্যে একটি জীবন্ত সংযোগ তৈরি করে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর একটি হলো “মহাযোগেশ্বর”। শব্দটি গঠিত হয়েছে “মহা”, “যোগ” এবং “ঈশ্বর” এই তিনটি ধারণার সমন্বয়ে। “মহা” অর্থ মহান বা সর্বোচ্চ। “যোগ” শব্দটি সংস্কৃত √যুজ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ধাতুর মধ্যে যুক্ত হওয়া, সংযুক্ত করা, নিয়ন্ত্রণ করা এবং একাগ্র হওয়ার অর্থ রয়েছে। “ঈশ্বর” অর্থ প্রভু, অধীশ্বর বা নিয়ন্তা। সুতরাং যোগেশ্বর হলেন যোগের অধীশ্বর এবং মহাযোগেশ্বর হলেন সেই মহান সত্তা যাঁর মধ্যে যোগের সর্বোচ্চ শক্তি প্রকাশিত। এখানে যোগ বলতে কেবল শরীরচর্চা বোঝানো হয়নি। গীতার ভাষায় যোগ হলো বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ঐক্য উপলব্ধি করা, নিজের চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ব্যক্তি ও বিশ্বসত্তার গভীর সম্পর্ক উপলব্ধি করা। কৃষ্ণকে মহাযোগেশ্বর বলা হচ্ছে কারণ তিনি এমন এক বাস্তবতার অধিকারী যেখানে ব্যক্তিগত ও মহাজাগতিক, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, সৃষ্টি ও বিনাশ এক বৃহৎ ঐক্যের মধ্যে অবস্থান করে।
এরপর আসে “হরি” শব্দটি। কৃষ্ণের বহু নামের মধ্যে হরি একটি অত্যন্ত অর্থবহ নাম। হরি শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃত √হৃ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার অর্থ হরণ করা বা নিয়ে যাওয়া। আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় হরি সেই সত্তা যিনি মানুষের অজ্ঞান, ভয়, দুঃখ, অহংকার এবং বন্ধন হরণ করেন। অর্জুনের ক্ষেত্রেও এই অর্থ বিশেষভাবে প্রযোজ্য। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর প্রধান সংকট ছিল বাহ্যিক যুদ্ধের চেয়ে গভীর অন্তর্দ্বন্দ্ব। তিনি কর্তব্য ও মমতার মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কৃষ্ণ ধীরে ধীরে তাঁর অজ্ঞান দূর করেছেন। এখন বিশ্বরূপদর্শনের মাধ্যমে অর্জুনের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতাও দূর হতে চলেছে। তাই “হরি” নামটি এখানে কেবল একটি ঈশ্বরীয় নাম নয়। এটি অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, সীমাবদ্ধতা থেকে অসীমের দিকে এবং অজ্ঞতা থেকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির দিকে যাত্রার প্রতীক।
“দর্শয়ামাস” শব্দটি শ্লোকটির কেন্দ্রীয় ক্রিয়া। এর অর্থ দেখালেন, দর্শন করালেন বা প্রকাশ করলেন। এর মূল সম্পর্ক সংস্কৃত √দৃশ্ ধাতুর সঙ্গে, যার অর্থ দেখা। কিন্তু এখানে কৃষ্ণ নিজে শুধু দেখছেন না। তিনি অর্জুনকে দেখাচ্ছেন। এই পার্থক্যটি গভীর। সাধারণ দেখা আমাদের ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু দর্শন একটি বৃহত্তর উপলব্ধি। গীতার এই প্রসঙ্গে অর্জুন শুধু নিজের চোখ দিয়ে একটি দৃশ্য দেখতে যাচ্ছেন না। তাঁকে এমন এক বাস্তবতা দেখানো হচ্ছে যা সাধারণ মানবদৃষ্টির সীমার বাইরে। তাই পূর্ববর্তী শ্লোকে কৃষ্ণ দিব্যচক্ষু দিয়েছেন এবং এই শ্লোকে সেই দিব্যদর্শনের বাস্তব প্রকাশ ঘটছে। এর মধ্যে একটি আধ্যাত্মিক সত্য নিহিত আছে। সত্যকে জানার জন্য শুধু ইচ্ছা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রস্তুতি, উপযুক্ত দৃষ্টি এবং কখনও কখনও অনুগ্রহ।
“পার্থায়” শব্দটি অর্জুনকে নির্দেশ করে। পার্থ অর্থ পৃথার পুত্র। পৃথা ছিলেন কুন্তীর আরেক নাম। তাই অর্জুনকে পার্থ বলা হচ্ছে তাঁর মাতৃপরিচয়ের মাধ্যমে। এই নামের ব্যবহারও অর্থবহ। বিশ্বরূপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি কোনো বিমূর্ত দর্শক নন। তিনি একজন মানুষ। তিনি পৃথার সন্তান। তাঁর ভালোবাসা আছে, ভয় আছে, সংশয় আছে এবং কর্তব্য নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে। এই মানবিক অর্জুনের সামনে এখন প্রকাশিত হতে চলেছে অসীম ঈশ্বরীয় বাস্তবতা। ফলে “পার্থায়” শব্দটি সীমিত মানবসত্তা এবং অসীম মহাসত্তার মধ্যকার সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে।
“পরমম্” শব্দের অর্থ সর্বোচ্চ, শ্রেষ্ঠ, চূড়ান্ত এবং অতুলনীয়। গীতার দর্শনে পরম বলতে এমন বাস্তবতাকে বোঝানো হয় যার ওপরে আর কোনো তুলনামূলক স্তর নেই। কৃষ্ণ অর্জুনকে কোনো সাধারণ রূপ দেখাতে যাচ্ছেন না। তিনি তাঁর “পরম রূপ” প্রকাশ করছেন। এই পরমত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে “রূপ” শব্দটি। সাধারণভাবে রূপ বলতে আকার, আকৃতি বা দৃশ্যমান অবয়ব বোঝায়। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে রূপের অর্থ আরও গভীর। রূপ শুধু বাহ্যিক আকৃতি নয়। কোনো সত্তা কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করে সেটিও রূপের অন্তর্ভুক্ত। তাই কৃষ্ণের বিশ্বরূপ মানে কেবল একটি বিশাল আকৃতির দর্শন নয়। এর অর্থ হলো সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ঈশ্বরীয় সত্তার প্রকাশকে প্রত্যক্ষ করা।
শেষের গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “ঐশ্বরম্”। এটি ঈশ্বর শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ঈশ্বরীয়, প্রভুত্বপূর্ণ বা ঐশ্বর্যময় অর্থ বহন করে। এখানে ঐশ্বর্য বলতে কেবল ধনসম্পদ বা পার্থিব সমৃদ্ধি বোঝানো হলে শ্লোকটির গভীরতা নষ্ট হয়ে যায়। গীতার ঐশ্বর্য হলো অসীম শক্তি, অসীম জ্ঞান, সর্বব্যাপী উপস্থিতি, সৃষ্টি করার ক্ষমতা, ধারণ করার ক্ষমতা এবং প্রয়োজন হলে সংহারের ক্ষমতা। তাই “পরমং রূপমৈশ্বরম্” বলতে বোঝায় কৃষ্ণের সেই সর্বোচ্চ ঈশ্বরীয় রূপ, যেখানে তাঁর মহাজাগতিক শক্তি ও সর্বব্যাপী স্বরূপ প্রকাশিত।
এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ হলো, “এইভাবে বলে, হে রাজন্, মহাযোগেশ্বর হরি পার্থকে তাঁর পরম ঐশ্বরিক রূপ দর্শন করালেন।” কিন্তু এই সরল অর্থের অন্তরালে যে দর্শন রয়েছে তা অনেক বিস্তৃত। অর্জুন এতক্ষণ কৃষ্ণকে একজন বন্ধু, আত্মীয়, উপদেষ্টা এবং সারথি হিসেবে দেখেছেন। এখন সেই পরিচয়ের অন্তরালে থাকা অসীম সত্তার প্রকাশ ঘটতে চলেছে। অর্থাৎ একই ব্যক্তি সম্পর্কে অর্জুনের উপলব্ধি সম্পূর্ণ নতুন স্তরে উন্নীত হতে যাচ্ছে। এখানে ব্যক্তির মধ্যে বিশ্ব এবং সীমিতের মধ্যে অসীমকে দেখার শিক্ষা রয়েছে।
বিশ্বরূপের দার্শনিক তাৎপর্য বোঝার জন্য একটি মৌলিক প্রশ্ন করা যায়। মানুষ কি বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ দেখতে পারে। গীতার উত্তর হলো মানুষের সাধারণ দৃষ্টি সীমাবদ্ধ। আমাদের ইন্দ্রিয় সীমিত, আমাদের অভিজ্ঞতা সীমিত এবং আমাদের চিন্তার পরিসরও সীমিত। আমরা বাস্তবতার একটি অংশকে দেখে সেটিকেই সমগ্র সত্য বলে ধরে নিতে পারি। অর্জুনও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং আবেগের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি কেবল দেখছিলেন তাঁর আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক এবং প্রিয়জনদের। কৃষ্ণ তাঁকে এমন এক বৃহত্তর দৃষ্টি দিতে যাচ্ছেন যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি সময়, ইতিহাস, সৃষ্টি, মৃত্যু এবং বিশ্বব্যবস্থার বৃহত্তর সত্য একসঙ্গে প্রকাশিত হবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বরূপকে একটি মহাজাগতিক আয়নার সঙ্গে তুলনা করা যায়। সাধারণ আয়নায় মানুষ নিজের মুখ দেখে। কিন্তু বিশ্বরূপের আয়নায় মানুষ নিজেকে সমগ্র অস্তিত্বের মধ্যে দেখতে পারে। তখন সে বুঝতে পারে যে সে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়। তার জীবন বৃহত্তর একটি ব্যবস্থার অংশ। তার কর্মের সঙ্গে অন্যের জীবন যুক্ত। তার বর্তমানের সঙ্গে অতীত ও ভবিষ্যৎ যুক্ত। তার ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সঙ্গে প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই উপলব্ধিই বিশ্বরূপদর্শনের অন্যতম গভীর প্রতীকী অর্থ।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ প্রায়ই নিজের ব্যক্তিগত সমস্যাকে সমগ্র পৃথিবীর সমস্যা মনে করে। একটি ব্যর্থতা তাকে মনে করাতে পারে যে তার জীবন শেষ হয়ে গেছে। একটি সম্পর্কের সংকট তার কাছে পুরো অস্তিত্বের সংকট হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যখন মানুষ বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ অর্জন করে তখন সে বুঝতে শেখে যে তার সমস্যা বাস্তব হলেও তা সমগ্র বাস্তবতা নয়। জীবন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক বৃহৎ। বিশ্বরূপ সেই বৃহত্তর চেতনার প্রতীক, যেখানে ব্যক্তি নিজের সীমাবদ্ধ অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে অস্তিত্বকে একটি বৃহৎ সমগ্র হিসেবে দেখতে শেখে।
সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটির নির্মাণ অত্যন্ত সুন্দর। প্রথমে বলা হচ্ছে “এবমুক্ত্বা”, অর্থাৎ এইভাবে বলে। তারপর “ততো”, অর্থাৎ তারপর। এরপর আসে “মহাযোগেশ্বরো হরিঃ”। তারপর “দর্শয়ামাস” এবং শেষে “পরমং রূপমৈশ্বরম্”। মনে হয় যেন কবি ধীরে ধীরে পাঠককে একটি মহাদৃশ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রথমে কথা, তারপর প্রস্তুতি, তারপর প্রকাশ এবং শেষে সেই প্রকাশের বিষয় হিসেবে পরম ঐশ্বরিক রূপ। শ্লোকের এই গঠন বিশ্বরূপদর্শনের নাটকীয় উত্তেজনাকে আরও গভীর করে তোলে।
বাস্তব জীবনের একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একজন মানুষ যদি একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানের শুধু নিজের বিভাগের কাজ দেখেন, তাহলে তিনি হয়তো ভাবতে পারেন তাঁর বিভাগই পুরো প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র। কিন্তু একদিন যদি তিনি পুরো প্রতিষ্ঠানটি দেখতে পান, তখন বুঝতে পারেন তাঁর কাজ বৃহত্তর একটি ব্যবস্থার ক্ষুদ্র অংশ। তাঁর কাজের সঙ্গে অন্য শত শত মানুষের কাজ যুক্ত। একইভাবে অর্জুন এতক্ষণ নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সংকটকে কেন্দ্র করে যুদ্ধকে দেখছিলেন। কৃষ্ণ তাঁকে এমন একটি দৃষ্টি দিতে যাচ্ছেন যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত সংকট সমগ্র বিশ্বব্যবস্থার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত হবে।
এই কারণে একাদশ অধ্যায়ের নবম শ্লোক গীতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এখানে কথিত জ্ঞান প্রত্যক্ষ দর্শনের দিকে অগ্রসর হয়। কৃষ্ণের শিক্ষা আর শুধু শ্রুত জ্ঞান হিসেবে থাকবে না। তা অর্জুনের সামনে এক মহাজাগতিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে। এই মুহূর্তে কৃষ্ণ আর কেবল অর্জুনের সারথি নন। তিনি মহাযোগেশ্বর। তিনি হরি। তিনি সেই সত্তা যিনি সীমিত দৃষ্টিকে অতিক্রম করার পথ খুলে দেন এবং তাঁর পরম ঐশ্বরিক রূপ প্রকাশ করেন।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা গভীর। আমরা প্রায়ই জীবনের একটি ঘটনা, একটি সম্পর্ক, একটি ব্যর্থতা বা একটি সাফল্যকে পুরো বাস্তবতা বলে ধরে নিই। কিন্তু বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় যে কোনো একটি ঘটনা সমগ্র জীবন নয়। যেমন অর্জুনকে তাঁর ব্যক্তিগত সংকটের বাইরে বৃহত্তর বিশ্বব্যবস্থা দেখতে শেখানো হয়েছিল, তেমনি মানুষকেও নিজের ছোট পরিসরের বাইরে তাকাতে হয়। নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে হয়। প্রশ্ন করতে হয়। জ্ঞান গ্রহণ করতে হয়। তারপর ধীরে ধীরে এমন এক দৃষ্টি অর্জন করতে হয় যা জীবনের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর মধ্যে বৃহত্তর সম্পর্ক দেখতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, “এবমুক্ত্বা ততো রাজন্ মহাযোগেশ্বরো হরিঃ। দর্শয়ামাস পার্থায় পরমং রূপমৈশ্বরম্” শ্লোকটি কেবল কৃষ্ণের বিশ্বরূপ প্রকাশের ঘোষণা নয়। এটি মানুষের সীমিত দৃষ্টি থেকে অসীম সত্যের দিকে যাত্রার এক গভীর প্রতীক। “এবমুক্ত্বা” আমাদের জানায় যে সত্য প্রথমে জ্ঞানের ভাষায় প্রকাশিত হয়। “মহাযোগেশ্বর” জানায় যে সমস্ত বিচ্ছিন্নতার অন্তরালে একটি বৃহত্তর ঐক্য রয়েছে। “হরি” স্মরণ করিয়ে দেয় যে ঈশ্বরীয় উপলব্ধি মানুষের অজ্ঞান ও বন্ধন দূর করতে পারে। “দর্শয়ামাস” শেখায় যে সত্য কেবল শোনা বা চিন্তা করার বিষয় নয়, তা উপলব্ধির বিষয়ও। “পার্থায়” আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এই মহাসত্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে একজন অনুসন্ধিৎসু মানুষ। আর “পরমং রূপমৈশ্বরম্” ঘোষণা করে যে দৃশ্যমান বিশ্বের অন্তরালে এমন এক অসীম বাস্তবতা রয়েছে যা সাধারণ দৃষ্টির সীমা অতিক্রম করে।
অতএব এই শ্লোকের সারকথা হলো, মানুষ যখন নিজের সীমিত দৃষ্টিকে অতিক্রম করে বৃহত্তর সত্যকে দেখতে প্রস্তুত হয়, তখন তার কাছে জগতের অর্থও পরিবর্তিত হতে শুরু করে। অর্জুনের সামনে যে বিশ্বরূপ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, তা শুধু কৃষ্ণের বিশাল রূপ নয়। এটি সমগ্র অস্তিত্বকে একটি অবিচ্ছিন্ন ঐক্য হিসেবে দেখার মহাদর্শন। এখানেই গীতার বিশ্বরূপদর্শনের প্রকৃত সূচনা এবং এখান থেকেই অর্জুনের চেতনা প্রবেশ করতে চলেছে এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!