শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.১৮ | কর্মের মধ্যে অকর্ম ও অকর্মের মধ্যে কর্মের রহস্য
কর্মণ্যকর্ম যঃ পশ্যেদকর্মণি চ কর্ম যঃ।
স বুদ্ধিমানন্মনুষ্যেষু স যুক্তঃ কৃৎস্নকর্মকৃৎ।।১৮।।
অনুবাদঃ যিনি কর্মে অকর্ম দর্শন করেন এবং অকর্মে কর্ম দর্শন করেন, তিনীই মানুষের মধ্যে বুদ্ধিমান। সব রকম কর্মে লিপ্ত থাকা সেত্ত্বেও তিনি চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোক কর্মতত্ত্বের অন্যতম গভীর এবং রহস্যময় শিক্ষা বহন করে। শ্লোকে বলা হয়েছে যে যিনি কর্মের মধ্যে অকর্ম এবং অকর্মের মধ্যে কর্ম উপলব্ধি করতে পারেন তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী। প্রথম দর্শনে এই বক্তব্য পরস্পরবিরোধী বলে মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এখানে কর্ম বলতে কেবল বাহ্যিক কাজকে বোঝানো হয়নি বরং মানুষের উদ্দেশ্য চেতনা আসক্তি এবং আত্মস্বরূপের সঙ্গে তার সম্পর্ককে বোঝানো হয়েছে। এই শ্লোক মানুষকে বাহ্যিক কার্যকলাপের সীমা অতিক্রম করে কর্মের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করার আহ্বান জানায়।
কর্ম শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ করা সৃষ্টি করা সম্পাদন করা অথবা কার্য সম্পন্ন করা। এই ধাতু থেকে কর্ম শব্দের উৎপত্তি হয়েছে যার অর্থ কাজ কর্তব্য আচরণ অথবা সম্পাদিত কার্য। অপরদিকে অকর্ম শব্দে অ উপসর্গটি নিষেধ বা অভাব নির্দেশ করে। ফলে অকর্মের আক্ষরিক অর্থ হয় কর্মের অনুপস্থিতি। কিন্তু গীতার আলোচনায় অকর্ম কেবল নিষ্ক্রিয়তা নয় বরং এমন এক অন্তর্দশা যেখানে কর্ম সম্পাদিত হলেও তার সঙ্গে অহংকার আসক্তি বা ফলের আকাঙ্ক্ষা যুক্ত থাকে না। এইভাবে কর্ম এবং অকর্ম উভয়ই ভাষাগত অর্থের বাইরে এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ধারণ করে।
শ্লোকটির আক্ষরিক অর্থ হলো যে ব্যক্তি কর্মের মধ্যেও অকর্ম দেখতে পান এবং অকর্মের মধ্যেও কর্ম দেখতে পান তিনিই মানুষের মধ্যে প্রকৃত জ্ঞানী এবং তিনিই সমস্ত কর্ম সম্পাদনকারী হয়েও যোগে প্রতিষ্ঠিত। এই অর্থের মধ্যে একটি গভীর সত্য নিহিত রয়েছে। বাহ্যিকভাবে একজন মানুষ সারাদিন নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে পারেন কিন্তু যদি তাঁর অন্তরে কর্তার অহংকার না থাকে তবে সেই কর্ম প্রকৃত অর্থে তাঁকে বেঁধে রাখে না। আবার অন্যদিকে বাহ্যিকভাবে কেউ নিশ্চুপ বসে থাকলেও যদি তাঁর মন কামনা বাসনা পরিকল্পনা হিংসা অথবা অহংকারে নিমগ্ন থাকে তবে তিনি বাস্তবে কর্মহীন নন বরং অন্তরে অবিরাম কর্ম করে চলেছেন।
এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিক অর্থ মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একজন চিকিৎসক যদি রোগীর সেবাকে ঈশ্বরসেবার অংশ মনে করে নিঃস্বার্থভাবে কর্তব্য পালন করেন তবে তাঁর কর্ম মুক্তির পথ হয়ে ওঠে। একজন শিক্ষক যদি কেবল বেতন বা সম্মানের জন্য নয় বরং জ্ঞান বিতরণের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শিক্ষা দেন তবে তাঁর কর্মও যোগের রূপ লাভ করে। আবার কোনো ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে কর্ম ত্যাগ করে নির্জনে অবস্থান করলেও যদি তাঁর মন ভোগলালসা বা আত্মগৌরবের চিন্তায় আবদ্ধ থাকে তবে তিনি প্রকৃত অর্থে কর্মত্যাগী নন। এইভাবে গীতা মানুষের অন্তর্জগতকে বাহ্যিক আচরণের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিষ্ঠা করে।
এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের বন্ধন কর্মের দ্বারা নয় বরং কর্মের প্রতি আসক্তির দ্বারা সৃষ্টি হয়। কর্ম নিজে কখনো শত্রু নয়। শত্রু হলো নিজের সঙ্গে কর্মের মিথ্যা পরিচয় স্থাপন করা। মানুষ যখন মনে করে আমিই কর্তা এবং আমিই ফলের অধিকারী তখন কর্ম তাকে বন্ধনে আবদ্ধ করে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে সে কেবল কর্তব্যের একজন মাধ্যম এবং পরম সত্যই সকল কর্মের চূড়ান্ত নিয়ন্তা তখন একই কর্ম মুক্তির সোপানে পরিণত হয়। এই উপলব্ধি মানুষের মনকে অহংকার থেকে বিনয়ে এবং অস্থিরতা থেকে শান্তিতে উন্নীত করে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অদ্বৈত বেদান্ত সাংখ্য এবং কর্মযোগের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন রচনা করেছে। অদ্বৈত বেদান্তের মতে আত্মা চিরকাল নিষ্ক্রিয় সাক্ষীমাত্র। সমস্ত কর্ম প্রকৃতির গুণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তাই জ্ঞানী ব্যক্তি জানেন যে আত্মা কখনো কর্তা নয়। সাংখ্য দর্শনও পুরুষকে নিষ্ক্রিয় এবং প্রকৃতিকে সক্রিয় বলে ব্যাখ্যা করে। কর্মযোগের শিক্ষা অনুযায়ী মানুষকে কর্ম ত্যাগ করতে বলা হয় না বরং কর্মের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করতে বলা হয়। এই তিনটি দৃষ্টিভঙ্গিই শেষ পর্যন্ত একই সত্য প্রতিষ্ঠা করে যে মুক্তি বাহ্যিক কর্মবিরতি নয় বরং অন্তরের স্বাধীনতায় নিহিত।
প্রতীকী অর্থে কর্ম মানুষের বাহ্যিক জীবনযাত্রার প্রতীক এবং অকর্ম মানুষের অন্তর্নিহিত চৈতন্যের প্রতীক। কর্ম চলমান নদীর মতো যা নিরন্তর প্রবাহিত হয় আর অকর্ম গভীর সমুদ্রের ন্যায় যার অন্তরে অচঞ্চল শান্তি বিরাজ করে। একজন সিদ্ধ ব্যক্তি নদীর মতো কর্মময় জীবন যাপন করলেও তাঁর অন্তর সমুদ্রের মতো স্থির ও প্রশান্ত থাকে। সাহিত্য সংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিকতার জগতে এই শিক্ষা আত্মসংযম আত্মজ্ঞান এবং নিঃস্বার্থ সেবার এক চিরন্তন প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
বাস্তব জীবনে এই শ্লোকের অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন মা সারাদিন সন্তান ও পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন কিন্তু প্রতিদানের আশা করেন না। তাঁর কর্ম ভালোবাসার প্রকাশ হয়ে ওঠে। একজন সৎ বিচারক ব্যক্তিগত লাভক্ষতির কথা না ভেবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন। একজন সমাজসেবক মানুষের কল্যাণে কাজ করেন কিন্তু নিজের খ্যাতি অর্জনের জন্য নয়। এদের প্রত্যেকের কর্ম বাহ্যিকভাবে সক্রিয় হলেও অন্তরে নিঃস্বার্থ হওয়ায় তা মুক্তির পথে সহায়ক হয়। বিপরীতভাবে কোনো ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে বিশ্রামে থাকলেও যদি ঈর্ষা লোভ প্রতিহিংসা এবং ভোগের কল্পনায় নিমগ্ন থাকেন তবে তাঁর মন অবিরাম কর্মের জালে আবদ্ধ থাকে।
এই শ্লোকের সারমর্ম হলো প্রকৃত জ্ঞান বাহ্যিক কর্ম অথবা কর্মবিরতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং কর্মের অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধির মধ্যে নিহিত। যিনি জানেন যে নিঃস্বার্থ কর্তব্যই প্রকৃত কর্ম এবং অহংকারহীন চেতনার মধ্যেই প্রকৃত অকর্মের অবস্থান তিনি মানুষের মধ্যে সত্যিকার অর্থে বুদ্ধিমান। তাঁর প্রতিটি কাজ মুক্তির উপায় হয়ে ওঠে এবং তিনি কর্মের মধ্যেই স্বাধীনতা লাভ করেন। এই শিক্ষা মানুষকে কর্মত্যাগ নয় বরং কর্মকে পবিত্র করার পথ দেখায়। এর মাধ্যমে ব্যক্তি উপলব্ধি করেন যে জীবন থেকে কর্মকে দূরে সরিয়ে নয় বরং কর্মের মধ্যেই আত্মজ্ঞান এবং ঈশ্বরচেতনা প্রতিষ্ঠা করেই পরিপূর্ণতা অর্জন সম্ভব।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!