শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.১৯ | কামনা ও সংকল্পমুক্ত কর্মের মাধ্যমে প্রকৃত জ্ঞান
যস্য সর্বে সমারম্ভাঃ কামসংকল্পবর্জিতাঃ।
জ্ঞানাগ্নিদগ্ধকর্মাণং তমাহুঃ পন্ডিতং বুধাঃ।।১৯।।
অনুবাদঃ যাঁরা সমস্ত কর্ম প্রচেষ্টা কাম ও সংকল্প রহিত, তিনি পূর্ণ জ্ঞানে অধিষ্ঠিত। জ্ঞানীগণ বলেন যে, তাঁর সমস্ত কর্মের প্রতিক্রিয়া পরিশুদ্ধ জ্ঞানাগ্নি দ্বারা দগ্ধ হয়েছে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোকটি কর্মযোগের অন্যতম গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এমন এক সত্যিকারের জ্ঞানীর পরিচয় দিয়েছেন যার প্রতিটি কর্ম ব্যক্তিগত কামনা এবং মানসিক সংকল্পের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। শ্লোকটির মূল বক্তব্য হলো যে মানুষের প্রকৃত প্রজ্ঞা তার বাহ্যিক কর্মে নয় বরং কর্মের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য এবং চেতনার মধ্যে নিহিত। যে ব্যক্তি নিজের প্রতিটি উদ্যোগকে আত্মকেন্দ্রিক ইচ্ছা, লাভের আকাঙ্ক্ষা এবং অহংকার থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হন তিনিই প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী এবং পণ্ডিত।
শ্লোকের প্রথম অংশে বলা হয়েছে যস্য সর্ব্বে সমারম্ভাঃ কামসঙ্কল্পবর্জ্জিতাঃ। এখানে সমারম্ভ শব্দটি মানুষের সকল উদ্যোগ, কর্মপ্রচেষ্টা এবং জীবনের প্রতিটি সচেতন কার্যকলাপকে নির্দেশ করে। কাম শব্দের অর্থ ইন্দ্রিয়সুখ বা ব্যক্তিগত ভোগের আকাঙ্ক্ষা এবং সংকল্প বলতে বোঝায় সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মানসিক পরিকল্পনা বা দৃঢ় ইচ্ছা। বর্জ্জিত অর্থ সম্পূর্ণরূপে মুক্ত বা পরিত্যক্ত। অর্থাৎ যে ব্যক্তির সকল কর্ম ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভোগের বাসনা এবং আত্মকেন্দ্রিক পরিকল্পনা থেকে মুক্ত সেই ব্যক্তির কর্মই প্রকৃত কর্মযোগের আদর্শ রূপ।
ভাষাগতভাবে সমারম্ভ শব্দটি সংস্কৃত সম উপসর্গ এবং আরম্ভ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। সম উপসর্গ সম্পূর্ণতা, যথাযথতা এবং সমন্বয়ের ভাব প্রকাশ করে। আরম্ভ শব্দের অর্থ শুরু করা বা উদ্যোগ গ্রহণ করা। ফলে সমারম্ভ বলতে বোঝায় এমন কর্ম যা সচেতনভাবে, সুপরিকল্পিতভাবে এবং দায়িত্ববোধের সঙ্গে সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে কামসঙ্কল্প একটি যৌগিক শব্দ যেখানে কাম ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে এবং সংকল্প সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নের দৃঢ় মানসিক সিদ্ধান্তকে প্রকাশ করে। এই দুইয়ের সমন্বয় মানুষের অন্তরের আসক্তির মূল ভিত্তিকে নির্দেশ করে। বর্জ্জিত শব্দটি জানিয়ে দেয় যে প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি এই সমস্ত অন্তরায় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে জ্ঞানাগ্নিদগ্ধকর্ম্মাণং তমাহুঃ পণ্ডিতং বুধাঃ। এখানে জ্ঞানাগ্নি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীক। জ্ঞান এবং অগ্নি এই দুই শব্দের সমন্বয়ে জ্ঞানাগ্নি গঠিত হয়েছে। অগ্নি যেমন অশুদ্ধ বস্তু দগ্ধ করে তাকে বিশুদ্ধ করে তেমনি আত্মজ্ঞান মানুষের অজ্ঞানতা, অহংকার, আসক্তি এবং কর্মফলের প্রতি আকর্ষণকে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করে। দগ্ধকর্ম্মাণম অর্থ যার কর্ম জ্ঞানের অগ্নিতে দগ্ধ হয়েছে। এর অর্থ কর্ম ধ্বংস হয়ে গেছে নয় বরং কর্মের বন্ধন নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি কর্ম করেন কিন্তু সেই কর্ম আর তাকে জন্ম মৃত্যু এবং দুঃখের বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে না।
পণ্ডিত শব্দটি এখানে কেবল বিদ্যাশিক্ষায় পারদর্শী ব্যক্তিকে বোঝায় না। প্রকৃত পণ্ডিত তিনি যিনি আত্মসত্য উপলব্ধি করেছেন এবং সেই উপলব্ধির আলোকে জীবন পরিচালনা করেন। বুধাঃ শব্দটি জ্ঞানী এবং বিবেকবান ব্যক্তিদের নির্দেশ করে। তারা এমন ব্যক্তিকেই প্রকৃত পণ্ডিত বলে স্বীকার করেন যার জীবন জ্ঞান, নিঃস্বার্থতা এবং অনাসক্ত কর্মের দ্বারা আলোকিত।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক কর্ম এবং জ্ঞানের গভীর ঐক্যের শিক্ষা প্রদান করে। এখানে কর্ম ত্যাগের কথা বলা হয়নি বরং কর্মের মধ্যে থাকা আসক্তি ত্যাগের কথা বলা হয়েছে। মানুষের মুক্তি কর্ম পরিত্যাগে নয় বরং কর্মের অন্তরে থাকা স্বার্থপরতা এবং ফললিপ্সা ত্যাগের মধ্যেই নিহিত। আত্মজ্ঞান মানুষকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায় যেখানে কর্ম আর ব্যক্তিগত লাভের উপায় থাকে না বরং তা হয়ে ওঠে কর্তব্য, সেবা এবং ধর্মপালনের স্বাভাবিক প্রকাশ।
প্রতীকী অর্থে জ্ঞানাগ্নি মানুষের অন্তরের আলোকপ্রাপ্তি এবং চেতনার জাগরণের প্রতীক। কামসঙ্কল্প মানুষের মনের অস্থিরতা, লোভ এবং অহংকারের প্রতীক। দগ্ধকর্ম মানুষের সেই অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে কর্ম থাকে কিন্তু কর্মের শৃঙ্খল থাকে না। পণ্ডিত প্রতীক হয়ে ওঠেন সেই মানুষের যিনি বাহ্যিক সাফল্যের চেয়ে অন্তরের মুক্তিকে অধিক মূল্য দেন এবং জীবনের প্রতিটি কাজে সত্য, ন্যায় এবং কল্যাণকে অনুসরণ করেন।
বাস্তব জীবনে একজন সৎ চিকিৎসক যদি কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য নয় বরং রোগীর কল্যাণের উদ্দেশ্যে চিকিৎসা করেন তবে তাঁর কর্ম কামসঙ্কল্পবর্জ্জিত কর্মের নিকটবর্তী হয়। একজন শিক্ষক যদি খ্যাতি বা পুরস্কারের জন্য নয় বরং জ্ঞান বিতরণের আনন্দে শিক্ষাদান করেন তবে তাঁর কর্মও জ্ঞান দ্বারা আলোকিত হয়। একইভাবে ইতিহাসে বহু মহাপুরুষ ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ ও মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেছেন এবং তাঁদের কর্ম আজও মানবজাতির জন্য আদর্শ হয়ে আছে।
এই শ্লোকের সারমর্ম হলো মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার কর্মের পরিমাণে নয় বরং কর্মের পবিত্রতায়। যে ব্যক্তি কামনা, অহংকার এবং ফলের আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত হয়ে জ্ঞানের আলোকে নিজের কর্তব্য পালন করেন তিনিই প্রকৃত পণ্ডিত। তাঁর কর্ম আর বন্ধনের কারণ হয় না বরং আত্মমুক্তি এবং বিশ্বকল্যাণের পথ হয়ে ওঠে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শিক্ষা মানবজীবনের জন্য এক চিরন্তন আদর্শ যেখানে জ্ঞান, অনাসক্তি এবং নিঃস্বার্থ কর্ম একত্রিত হয়ে মানুষের অন্তরকে মুক্তি, শান্তি এবং পরিপূর্ণতার দিকে পরিচালিত করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!