সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.২০ | কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ ও কর্মবন্ধন থেকে মুক্তির রহস্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ত্যক্তা কর্মফলাসঙ্গং নিত্যতৃপ্তো নিরাশ্রয়ঃ।কর্মণ্যভিপ্রবৃত্তোহপি নৈব কিঞ্চিৎ করোতি সঃ।।২০।।
ত্যক্তা কর্মফলাসঙ্গং নিত্যতৃপ্তো নিরাশ্রয়ঃ।
কর্মণ্যভিপ্রবৃত্তোহপি নৈব কিঞ্চিৎ করোতি সঃ।।২০।।

অনুবাদঃ যিনি কর্মফলের আসক্তি সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে সর্বদা তৃপ্ত এবং কোন রকম আশ্রয়ের অপেক্ষা করেন না, তিনি সব রকম কর্মে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও কর্মফলের আশায় কোন কিছুই করেন না।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোকটি কর্মযোগের এক গভীর ও চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে। এখানে এমন এক জ্ঞানী মানুষের পরিচয় দেওয়া হয়েছে যিনি কর্মের ফলের প্রতি সমস্ত আসক্তি ত্যাগ করেছেন। তিনি সর্বদা নিজের অন্তরে পরিপূর্ণ তৃপ্তি অনুভব করেন এবং বাহ্যিক কোনো ব্যক্তি বস্তু বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে নিজের সুখ বা শান্তি খোঁজেন না। তিনি কর্মে সর্বদা নিয়োজিত থাকলেও প্রকৃত অর্থে কোনো কর্মের দ্বারা আবদ্ধ হন না। এই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মানুষের অন্তরে এমন এক চেতনার জন্ম দেওয়া যেখানে কর্ম থাকবে কিন্তু কর্মের বন্ধন থাকবে না। প্রচেষ্টা থাকবে কিন্তু অহংকার থাকবে না। সাফল্য আসবে কিন্তু তার প্রতি আসক্তি থাকবে না।

শ্লোকের প্রথম শব্দ ত্যক্ত্বা এসেছে সংস্কৃত ত্যজ্ ধাতু থেকে যার অর্থ ত্যাগ করা পরিত্যাগ করা বা ছেড়ে দেওয়া। এখানে ত্যাগ বলতে কর্ম ত্যাগকে বোঝানো হয়নি বরং কর্মফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তিকে ত্যাগ করাকে বোঝানো হয়েছে। কর্মফলাসঙ্গ শব্দটি কর্ম ফল এবং আসঙ্গ এই তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। কর্ম অর্থ কাজ বা কর্তব্য। ফল অর্থ সেই কাজের পরিণাম। আসঙ্গ অর্থ আসক্তি বা মানসিক জড়িয়ে পড়া। ফলে কর্মফলাসঙ্গ বলতে বোঝায় নিজের কর্মের ফল লাভের প্রতি মানসিক আকর্ষণ ও প্রত্যাশা। গীতা শিক্ষা দেয় যে মানুষ কর্ম করবে কিন্তু সেই কর্মের ফলের সঙ্গে নিজের সুখ দুঃখকে বেঁধে ফেলবে না। কারণ ফল মানুষের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নয় কিন্তু কর্ম করার অধিকার মানুষের নিজের হাতে রয়েছে।

নিত্যতৃপ্ত শব্দটির অর্থ যিনি সর্বদা তৃপ্ত। এই তৃপ্তি কোনো বাহ্যিক সম্পদ সম্মান বা ভোগ থেকে আসে না। এটি আত্মজ্ঞান থেকে উদ্ভূত এক অন্তর্নিহিত প্রশান্তি। যে ব্যক্তি নিজের প্রকৃত সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে তার কাছে বাইরের লাভ ক্ষতি প্রশংসা নিন্দা কিংবা সাফল্য ব্যর্থতা জীবনের চূড়ান্ত সত্য হয়ে ওঠে না। তার আনন্দ নির্ভর করে না পরিবর্তনশীল জগতের ওপর। নিরাশ্রয় শব্দটির অর্থ যিনি বাহ্যিক কোনো আশ্রয়ের ওপর নির্ভরশীল নন। এর অর্থ এই নয় যে তিনি সমাজ পরিবার বা সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন। বরং তিনি মানসিকভাবে স্বাধীন। তিনি জানেন যে প্রকৃত আশ্রয় বাহিরে নয় অন্তরের আত্মস্বরূপে।

পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে যে এমন ব্যক্তি সর্বদা কর্মে প্রবৃত্ত থাকলেও প্রকৃত অর্থে কিছুই করেন না। এই উক্তির মধ্যে গভীর দার্শনিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। বাহ্যিকভাবে তিনি কাজ করছেন সমাজের দায়িত্ব পালন করছেন পরিবারকে রক্ষা করছেন মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। কিন্তু অন্তরে তিনি নিজেকে কর্মের একমাত্র কর্তা মনে করেন না। তিনি উপলব্ধি করেন যে প্রকৃতির গুণসমূহই সমস্ত কর্ম সম্পাদন করছে এবং তিনি কেবল সেই মহাজাগতিক ব্যবস্থার এক সচেতন অংশ। তাই কর্ম তার মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করে না এবং কর্মফল তার মনকে বিচলিত করতে পারে না।

এই শ্লোকের দর্শন ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তার অন্যতম ভিত্তি। বেদান্ত দর্শনের আলোকে আত্মা চিরন্তন অক্ষয় এবং কর্মের প্রকৃত কর্তা নয়। কর্ম সম্পাদিত হয় দেহ মন ও ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে। যখন মানুষ নিজেকে দেহ বা মনের সঙ্গে একাকার মনে করে তখন সে কর্মের কর্তা বলে ভাবতে শুরু করে এবং ফলের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু আত্মজ্ঞান লাভের পর সে উপলব্ধি করে যে তার প্রকৃত পরিচয় কর্মের ঊর্ধ্বে। তখন কর্ম আর বন্ধনের কারণ থাকে না বরং মুক্তির পথ হয়ে ওঠে। এই উপলব্ধিই কর্মযোগের মূল ভিত্তি।

প্রতীকী অর্থেও এই শ্লোক অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কর্ম এখানে মানুষের সমগ্র জীবনযাত্রার প্রতীক। কর্মফলাসক্তি প্রতীক মানুষের অহংকার লোভ ভয় ও প্রত্যাশার। নিত্যতৃপ্তি প্রতীক অন্তরের শান্তি ও আত্মিক পূর্ণতার। নিরাশ্রয় প্রতীক মানসিক স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরতার। আর কর্ম করেও অকর্তা থাকা প্রতীক সেই উচ্চতর চেতনার যেখানে মানুষ নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।

বাস্তব জীবনেও এই শিক্ষার গভীর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। একজন শিক্ষক যদি কেবল নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন এবং ছাত্রদের প্রশংসা বা সমালোচনার ওপর নিজের মানসিক শান্তিকে নির্ভরশীল না করেন তবে তিনি এই শিক্ষার বাস্তব রূপ ধারণ করেন। একজন চিকিৎসক যদি রোগীর সেবাকে নিজের কর্তব্য মনে করেন কিন্তু প্রতিটি ফলাফলকে নিজের ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতা হিসেবে না দেখেন তবে তিনি কর্মযোগের আদর্শ অনুসরণ করেন। একজন কৃষক বীজ বপন করেন পরিচর্যা করেন কিন্তু তিনি জানেন ফল সম্পূর্ণ তার নিয়ন্ত্রণে নয়। তাই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন এবং ফলকে গ্রহণ করেন সমবুদ্ধিতে। এভাবেই এই শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

সাহিত্য ও ইতিহাসেও এই আদর্শের বহু দৃষ্টান্ত দেখা যায়। বহু মহাপুরুষ নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সমাজ ও মানবকল্যাণে জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের কর্মের মূল প্রেরণা ছিল কর্তব্যবোধ এবং মানবপ্রেম। ব্যক্তিগত লাভ বা খ্যাতি তাদের লক্ষ্য ছিল না। এই কারণেই তাদের কর্ম যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে প্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

এই শ্লোকের সারমর্ম হলো মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা কর্ম ত্যাগে নয় বরং কর্মফলের আসক্তি ত্যাগে। যে ব্যক্তি অন্তরে সর্বদা তৃপ্ত বাহ্যিক আশ্রয়ের প্রতি নির্ভরশীল নয় এবং নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেও নিজেকে কর্মের একমাত্র কর্তা মনে করে না সে কর্মের মধ্যেই মুক্তি লাভ করে। এই শিক্ষা মানুষকে নিষ্ক্রিয়তার দিকে নয় বরং দায়িত্বশীল সক্রিয় জীবনের দিকে আহ্বান জানায় যেখানে কর্ম হয় উপাসনা কর্তব্য হয় সাধনা এবং আত্মজ্ঞান হয়ে ওঠে জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 10, 2026 August 10, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি