শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.২১ | নিরাশী ও অপরিগ্রহের মাধ্যমে নিষ্কাম কর্মের আদর্শ
নিরাশীর্যতচিত্তাত্মা ত্যক্তসর্বপরিগ্রহঃ।
শারীরং কেবলং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্।।২১।।
অনুবাদঃ এই প্রকার জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁর মন ও বুদ্ধিকে সর্বতোভাবে সংযত করে কার্য করেন। তিনি প্রভুত্ব করার প্রবৃত্তিপরিত্যাগ করে কেবল জীবন ধারণের জন্য কর্ম করেন। এভাবেই কর্ম করার ফলে কোন রকম পাপ তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের একবিংশ শ্লোকে কর্মযোগের এমন এক অনন্য আদর্শ উপস্থাপিত হয়েছে যেখানে মানুষকে বাহ্যিক কর্মের মধ্যেই অন্তরের মুক্তি লাভের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। শ্লোকটিতে বলা হয়েছে যে যিনি নিরাশী অর্থাৎ কর্মফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষাহীন যিনি নিজের চিত্ত ও আত্মাকে সংযত রেখেছেন যিনি সকল প্রকার পরিগ্রহ বা অপ্রয়োজনীয় অধিকারবোধ ও সঞ্চয়ের মনোভাব ত্যাগ করেছেন এবং যিনি কেবল শরীর রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কর্ম সম্পাদন করেন তিনি কোনো পাপ বা কিল্বিষ লাভ করেন না। এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই মানবজীবনের নৈতিক শুদ্ধতা আত্মসংযম বৈরাগ্য এবং নিষ্কাম কর্মের এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।
নিরাশী শব্দটি সংস্কৃত নির উপসর্গ এবং আশা শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ হলো যিনি প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষার দ্বারা আবদ্ধ নন। এখানে আশা বলতে জীবনের স্বাভাবিক ইতিবাচক প্রত্যাশাকে বোঝানো হয়নি বরং কর্মের ফল লাভের প্রতি আসক্তিকে বোঝানো হয়েছে। মানুষ যখন নিজের প্রতিটি কাজের বিনিময়ে লাভ সম্মান সুখ অথবা প্রশংসার প্রত্যাশা করে তখন তার মন ফলের সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু নিরাশী ব্যক্তি কর্মকে কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ফলকে ঈশ্বর বা নিয়তির হাতে সমর্পণ করেন। এই অবস্থাই কর্মকে পবিত্র করে এবং মানুষকে মানসিক স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করে।
যতচিত্তাত্মা শব্দটি যত চিত্ত এবং আত্মা এই তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। যত অর্থ সংযত চিত্ত অর্থ মন এবং আত্মা অর্থ ব্যক্তি সত্তা বা অন্তঃকরণ। অর্থাৎ যিনি নিজের মন ইন্দ্রিয় বুদ্ধি ও ব্যক্তিসত্তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম তিনিই যতচিত্তাত্মা। এই সংযম বাহ্যিক দমন নয় বরং অন্তরের এমন এক শৃঙ্খলা যেখানে ইচ্ছা আবেগ ক্রোধ লোভ এবং মোহ মানুষের উপর কর্তৃত্ব করতে পারে না। সংযত মন মানুষকে স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে এবং জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাকে বিচলিত হতে দেয় না। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই প্রকৃত স্বাধীনতার ভিত্তি।
ত্যক্তসর্বপরিগ্রহঃ শব্দটির অর্থ যিনি সকল প্রকার পরিগ্রহ ত্যাগ করেছেন। পরিগ্রহ বলতে কেবল বস্তুগত সম্পদ সংগ্রহ নয় বরং অধিকারবোধ মালিকানার অহংকার অতিরিক্ত ভোগের আকাঙ্ক্ষা এবং অপ্রয়োজনীয় সঞ্চয়ের মানসিকতাকেও বোঝায়। মানুষ যখন নিজের পরিচয়কে সম্পদ পদমর্যাদা বা বাহ্যিক অর্জনের সঙ্গে একাত্ম করে ফেলে তখন সে পরিগ্রহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু যিনি উপলব্ধি করেন যে পৃথিবীর সবকিছুই সাময়িক এবং মানুষ কেবল কিছু সময়ের জন্য সেগুলোর ব্যবহারকারী তখন তার মধ্যে ত্যাগের মনোভাব জন্ম নেয়। এই ত্যাগ দারিদ্র্য নয় বরং আসক্তিমুক্ত সমৃদ্ধির প্রতীক।
শারীরং কেবলং কর্ম শব্দগুচ্ছের অর্থ হলো কেবল শরীর ধারণ ও জীবনযাত্রা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় কর্ম। এখানে কর্ম ত্যাগের কথা বলা হয়নি বরং কর্মের উদ্দেশ্যকে শুদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। মানুষকে অলস হয়ে বসে থাকতে বলা হয়নি বরং এমনভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে যাতে সেই কাজ অহংকার লোভ বা ভোগবিলাসের উপায় না হয়ে কর্তব্যপালনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। শরীর রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কর্ম মানুষকে সমাজ ও পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল রাখে আবার একই সঙ্গে তাকে অতিরিক্ত ভোগ ও প্রতিযোগিতার অন্ধ দৌড় থেকেও রক্ষা করে।
কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্ অংশটির অর্থ হলো এমন ব্যক্তি কর্ম করতে করতে কোনো পাপ বা কিল্বিষ অর্জন করেন না। কিল্বিষ বলতে নৈতিক কলুষতা মানসিক অশান্তি অপরাধবোধ এবং কর্মফলের বন্ধনকে বোঝায়। সাধারণত মানুষ মনে করে কর্মই বন্ধনের কারণ। কিন্তু গীতা শিক্ষা দেয় যে কর্ম নয় বরং কর্মের প্রতি আসক্তিই বন্ধনের মূল কারণ। যখন কর্ম নিঃস্বার্থভাবে কর্তব্যবোধ থেকে সম্পাদিত হয় তখন সেই কর্ম আত্মাকে আবদ্ধ করে না বরং শুদ্ধ করে।
এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের মুক্তি কর্মত্যাগে নয় বরং কর্মের মধ্যেই নিহিত। সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়া নয় বরং সংসারের মধ্যেই অনাসক্ত থেকে কর্তব্য পালন করাই প্রকৃত যোগ। একজন চিকিৎসক যদি কেবল অর্থের জন্য চিকিৎসা করেন তবে তার কর্ম তাকে মানসিকভাবে বেঁধে রাখে। কিন্তু যদি তিনি মানুষের সেবাকে নিজের কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন তবে একই কর্ম আত্মশুদ্ধির উপায় হয়ে ওঠে। একজন শিক্ষক যদি কেবল বেতনের জন্য শিক্ষা দেন তবে তার কর্ম সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যদি তিনি জ্ঞানদানকে মানবকল্যাণের সাধনা মনে করেন তবে সেই কর্মই যোগে পরিণত হয়।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক কর্মযোগের অন্যতম ভিত্তি। এখানে আত্মাকে এমন এক স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখা হয়েছে যা আসক্তি ও অহংকারের কারণে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে মানুষ ধীরে ধীরে সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে। উপনিষদীয় দর্শনে আত্মজ্ঞান যেমন মুক্তির পথ তেমনি গীতার এই শিক্ষায় নিষ্কাম কর্ম আত্মজ্ঞান অর্জনের প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করে। কর্ম এবং জ্ঞান এখানে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং একে অপরের পরিপূরক।
প্রতীকী অর্থে নিরাশী মানুষের অন্তরের আকাশের প্রতীক যেখানে আকাঙ্ক্ষার মেঘ জমে না। যতচিত্তাত্মা একটি সুসংযত রথের প্রতীক যেখানে মন ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধি একই লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত হয়। ত্যক্তসর্বপরিগ্রহঃ একটি মুক্ত পাখির প্রতীক যার উড়ে চলার জন্য অতিরিক্ত বোঝার প্রয়োজন হয় না। শারীরং কেবলং কর্ম এমন একটি নদীর মতো যা নিজের স্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হয় কিন্তু কখনো নিজের জন্য কিছু সঞ্চয় করে না। আর কিল্বিষম্ থেকে মুক্ত থাকা নির্মল আয়নার মতো যেখানে কোনো কলুষতার দাগ জমতে পারে না।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন কৃষক নিষ্ঠার সঙ্গে জমি চাষ করেন কিন্তু তিনি নিশ্চিত নন যে প্রকৃতি কেমন ফল দেবে। তবুও তিনি নিজের কর্তব্য পালন করেন। একজন মা সন্তানের জন্য নিরন্তর পরিশ্রম করেন কিন্তু বিনিময়ে কিছু দাবি করেন না। একজন সত্যনিষ্ঠ সমাজসেবক মানুষের কল্যাণে কাজ করেন অথচ ব্যক্তিগত খ্যাতির প্রতি আকৃষ্ট হন না। এই মানুষগুলোর জীবনেই শ্লোকটির বাস্তব রূপ প্রকাশিত হয়।
এই শ্লোকের সারমর্ম হলো মানুষের প্রকৃত মুক্তি বাহ্যিক কর্ম পরিত্যাগে নয় বরং অন্তরের আসক্তি ত্যাগে। নিরাশা এখানে হতাশা নয় বরং ফলের প্রতি অনাসক্তি। সংযম এখানে দমন নয় বরং আত্মনিয়ন্ত্রণ। ত্যাগ এখানে দারিদ্র্য নয় বরং আসক্তিমুক্ত স্বাধীনতা। কর্ম এখানে বোঝা নয় বরং সাধনা। আর পাপমুক্তি কোনো অলৌকিক পুরস্কার নয় বরং শুদ্ধ চিত্তে কর্তব্য পালন করার স্বাভাবিক ফল। এই শিক্ষা মানুষকে এমন এক জীবনদর্শনের দিকে আহ্বান জানায় যেখানে কর্তব্য নিষ্ঠা সংযম ত্যাগ এবং অনাসক্তি একত্রিত হয়ে ব্যক্তিকে অন্তরের শান্তি নৈতিক মহত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির পথে অগ্রসর করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!