সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.২২ | প্রাপ্তিতে সন্তুষ্টি, দ্বন্দ্বাতীত জীবন ও কর্মবন্ধন থেকে মুক্তি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্টো দন্দ্বাতীতো বিমঃসরঃ।সমঃ সিদ্ধাবসিদ্ধৌ চ কৃত্বাপি ন নিবধ্যতে।।২২।।
যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্টো দন্দ্বাতীতো বিমঃসরঃ।
সমঃ সিদ্ধাবসিদ্ধৌ চ কৃত্বাপি ন নিবধ্যতে।।২২।।

অনুবাদঃ যিনি অনায়াসে যা লাভ করেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, যিনি সুখ-দুঃখ, রাগ-দ্বেষ আদি দ্বন্দ্বের বশীভুত হন না এবং মাৎসর্যশূন্য যিনি কার্যের সাফল্য ও অসাফল্যে অবিচলিত থাকেন, তিনি কর্ম সম্পাদন করলেও কর্মফলের দ্বারা কখনও আবদ্ধ হন না।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের এই শ্লোকে এমন এক আদর্শ মানুষের পরিচয় দেওয়া হয়েছে যিনি জীবনের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করেছেন এবং কর্মের মধ্যেই মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছেন। যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্টো দ্বন্দ্বাতীতো বিমৎসরঃ সমঃ সিদ্ধাবসিদ্ধৌ চ কৃত্বাপি ন নিবধ্যতে এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে এমন এক গভীর জীবনদর্শন নিহিত রয়েছে যা মানুষকে বাহ্যিক অর্জনের সীমা অতিক্রম করে অন্তরের স্বাধীনতা ও প্রশান্তির দিকে পরিচালিত করে। শ্লোকটি মূলত এমন একজন জ্ঞানী কর্মযোগীর চরিত্রচিত্রণ যিনি প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট থাকেন সুখ দুঃখের দ্বন্দ্ব অতিক্রম করেন ঈর্ষামুক্ত থাকেন সাফল্য ও ব্যর্থতাকে সমানভাবে গ্রহণ করেন এবং কর্ম করেও কর্মফলের বন্ধনে আবদ্ধ হন না।

যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্ট শব্দটি সংস্কৃত যদৃচ্ছা লাভ এবং সন্তুষ্ট এই তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। যদৃচ্ছা অর্থ স্বাভাবিকভাবে বা ভাগ্যের নিয়মে যা আসে লাভ অর্থ প্রাপ্তি এবং সন্তুষ্ট অর্থ তাতে তৃপ্ত থাকা। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো অনায়াসে যা প্রাপ্ত হয় তাতেই সন্তুষ্ট থাকা। এর গভীর অর্থ কেবল অল্পে তুষ্ট হওয়া নয় বরং অযথা লোভ আকাঙ্ক্ষা এবং সীমাহীন ভোগের মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে ঈশ্বরপ্রদত্ত বা কর্মফল হিসেবে যা আসে তা শান্তচিত্তে গ্রহণ করা। এখানে অলসতা বা কর্মবিমুখতার শিক্ষা দেওয়া হয়নি বরং ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করে কর্তব্য পালন করার আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে। এই সন্তুষ্টি মানুষের অন্তরে স্থায়ী শান্তি সৃষ্টি করে এবং অস্থিরতার পরিবর্তে আত্মবিশ্বাস ও কৃতজ্ঞতার জন্ম দেয়।

দ্বন্দ্বাতীত শব্দটি দ্বন্দ্ব এবং অতীত এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। দ্বন্দ্ব বলতে সুখ দুঃখ লাভ ক্ষতি জয় পরাজয় মান অপমান শীত উষ্ণতা প্রভৃতি বিপরীত অভিজ্ঞতাকে বোঝায় এবং অতীত অর্থ অতিক্রমকারী। আক্ষরিক অর্থে দ্বন্দ্বাতীত সেই ব্যক্তি যিনি জীবনের বিপরীতমুখী পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। এর দার্শনিক তাৎপর্য হলো বাহ্যিক পরিবর্তন মানুষের অন্তরের স্থিতিশীলতাকে যেন নষ্ট করতে না পারে। প্রকৃত জ্ঞানী জানেন যে পৃথিবীর সব অভিজ্ঞতাই পরিবর্তনশীল। তাই তিনি সাময়িক সুখে উল্লসিত হন না আবার সাময়িক দুঃখেও ভেঙে পড়েন না। এই সমদর্শিতা মানুষকে মানসিক দৃঢ়তা এবং আত্মিক স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যায়।

বিমৎসর শব্দটি বি উপসর্গ এবং মৎসর শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। মৎসর অর্থ ঈর্ষা বা হিংসা এবং বি উপসর্গের অর্থ অভাব বা মুক্তি। ফলে বিমৎসর অর্থ ঈর্ষাহীন ব্যক্তি। এই শব্দটি মানুষের চরিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ গুণকে নির্দেশ করে। অন্যের সাফল্যে কষ্ট পাওয়া কিংবা অন্যকে নিচে নামিয়ে নিজেকে বড় করার প্রবণতা মানুষের মনকে অশান্ত করে। কিন্তু যিনি বিমৎসর তিনি অন্যের উন্নতিতে আনন্দিত হন এবং প্রত্যেক মানুষের সাফল্যকে নিজ নিজ কর্মফলের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে গ্রহণ করেন। এই গুণ সমাজে সৌহার্দ্য সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে ঈর্ষামুক্ত হৃদয়ই সত্যিকার ভক্তি এবং জ্ঞানের উপযুক্ত ভিত্তি।

সম শব্দটির অর্থ সমান স্থির এবং পক্ষপাতহীন। সিদ্ধি এবং অসিদ্ধি অর্থাৎ সাফল্য ও ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সমদৃষ্টি বজায় রাখা এই শ্লোকের অন্যতম শিক্ষা। মানুষের অধিকাংশ দুঃখের মূল কারণ হলো সে সাফল্যকে নিজের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে এবং ব্যর্থতাকে নিজের অস্তিত্বের অপমান বলে মনে করে। কিন্তু গীতা শেখায় যে মানুষের অধিকার কর্মে ফলের উপর নয়। তাই সাফল্যে অহংকার এবং ব্যর্থতায় হতাশা উভয়ই পরিত্যাজ্য। এই সমভাবই প্রকৃত মানসিক স্বাধীনতার পরিচয়।

কৃত্বাপি ন নিবধ্যতে অংশটির অর্থ হলো কর্ম সম্পাদন করেও তিনি কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হন না। এখানে কর্ম ত্যাগ নয় বরং আসক্তি ত্যাগের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কর্ম মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম। কিন্তু যখন কর্মের সঙ্গে অহংকার লোভ ব্যক্তিগত লাভ এবং ফলের প্রতি অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা যুক্ত হয় তখন সেই কর্মই বন্ধনের কারণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে যখন কর্ম ঈশ্বরার্পণ বোধে কর্তব্যবোধে এবং নিঃস্বার্থ মানসিকতায় সম্পাদিত হয় তখন সেই কর্ম মুক্তির পথ হয়ে দাঁড়ায়। এই শিক্ষা কর্মযোগের মূল ভিত্তি।

এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থ অত্যন্ত গভীর। যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্ট ব্যক্তি প্রতীক হয়ে ওঠেন সরলতা ও কৃতজ্ঞতার। দ্বন্দ্বাতীত ব্যক্তি প্রতীক হয়ে ওঠেন অবিচল পর্বতের যাকে ঝড় স্পর্শ করলেও নাড়াতে পারে না। বিমৎসর ব্যক্তি নির্মল হৃদয়ের প্রতীক যার মধ্যে হিংসা বিদ্বেষের অন্ধকার নেই। সম ব্যক্তি ভারসাম্যপূর্ণ চিত্তের প্রতীক যিনি জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিকে সমভাবে গ্রহণ করেন। আর কর্ম করেও বন্ধনে আবদ্ধ না হওয়া প্রবাহমান নদীর মতো যা নিরন্তর চলমান কিন্তু কোনো স্থানে আটকে থাকে না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে উচ্চমাত্রার আত্মনিয়ন্ত্রণ মানসিক পরিপক্বতা এবং আবেগীয় ভারসাম্যের প্রকাশ বলা যায়। সাহিত্য ও আধ্যাত্মিকতার দৃষ্টিতেও এই গুণাবলি আদর্শ মানবচরিত্রের পরিচায়ক।

বাস্তব জীবনেও এই শিক্ষার অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক আন্তরিকভাবে শিক্ষাদান করেন কিন্তু প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ফলাফল নিয়ে অহংকার বা হতাশায় ভেঙে পড়েন না। একজন সৎ চিকিৎসক সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন কিন্তু প্রতিটি ফল নিজের নিয়ন্ত্রণে নয় তা উপলব্ধি করেন। একজন কৃষক পরিশ্রম করে জমি চাষ করেন কিন্তু প্রকৃতির অনিশ্চয়তাকে শান্তভাবে মেনে নেন। আবার ইতিহাসে বহু সাধক ও মহাপুরুষ অল্প সম্পদে সন্তুষ্ট থেকে ঈর্ষাহীন জীবনযাপন করেছেন এবং মানবকল্যাণে কর্ম করে গেছেন কোনো ব্যক্তিগত প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়াই।

এই শ্লোকের সামগ্রিক শিক্ষা মানুষের অন্তর্জীবনের এক মহৎ আদর্শ নির্মাণ করে। ভাষাগতভাবে প্রতিটি শব্দ গভীর অর্থবহ এবং সুসংগঠিত সংস্কৃত সমাসের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। দার্শনিকভাবে এটি কর্মযোগ সমত্ববোধ বৈরাগ্য এবং আত্মমুক্তির পথ নির্দেশ করে। প্রতীকীভাবে এটি এমন এক আলোকিত মানুষের প্রতিচ্ছবি অঙ্কন করে যিনি সন্তুষ্টি সমতা ঈর্ষামুক্তি এবং নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমে জীবনের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। তাই এই শ্লোক কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয় বরং মানবজীবনের জন্য এক সর্বজনীন নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনদর্শন যা ব্যক্তি সমাজ এবং সমগ্র মানবসভ্যতার জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 10, 2026 August 10, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি