শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.২৩ | অনাসক্ত কর্ম, জ্ঞান ও যজ্ঞের মাধ্যমে কর্মবন্ধন থেকে মুক্তি
গতসঙ্গস্য মুক্তস্য জ্ঞানাবস্থিতচেতসঃ।
যজ্ঞায়াচরতঃ কর্ম সমগ্রং প্রবিলীয়তে।।২৩।।
অনুবাদঃ জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে, চিন্ময় জ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তি যজ্ঞের উদ্দেশ্যে যে কর্ম সম্পাদন করেন, সেই সকল কর্ম সম্পূর্ণরূপে লয় প্রাপ্ত হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের তেইশতম শ্লোকে এমন এক আদর্শ মানুষের পরিচয় দেওয়া হয়েছে যিনি আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত চিত্ত নিয়ে সমস্ত কর্মকে যজ্ঞরূপে সম্পাদন করেন। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক তাৎপর্য বহন করে এবং সম্মিলিতভাবে কর্মযোগের সর্বোচ্চ আদর্শকে প্রকাশ করে। এখানে গতসঙ্গস্য মুক্তস্য জ্ঞানাবস্থিতচেতসঃ যজ্ঞায় আচরতঃ কর্ম সমগ্রং প্রবিলীয়তে এই শব্দসমষ্টি মানুষের অন্তরজীবনের এক পরিপূর্ণ রূপান্তরের চিত্র তুলে ধরে যেখানে কর্ম আর বন্ধনের কারণ থাকে না বরং মুক্তির উপায়ে পরিণত হয়।
গতসঙ্গস্য শব্দটি সংস্কৃত গত এবং সঙ্গ এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। গত শব্দের উৎস গম ধাতু যার অর্থ যাওয়া বা অতিক্রম করা এবং সঙ্গ অর্থ আসক্তি সংযোগ বা মোহ। এই দুইয়ের সমন্বয়ে গতসঙ্গস্য অর্থ দাঁড়ায় যার সমস্ত আসক্তি দূর হয়ে গেছে। এর বাংলা অর্থ অনাসক্ত নির্লিপ্ত বা মোহমুক্ত। আক্ষরিক অর্থে এটি এমন একজন ব্যক্তিকে নির্দেশ করে যিনি জগতের বস্তু ব্যক্তি বা ফলের প্রতি আকর্ষণের বন্ধন অতিক্রম করেছেন। গীতার প্রেক্ষাপটে এর অর্থ সংসার ত্যাগ নয় বরং সংসারের মধ্যেই থেকে ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করা। এই শব্দের গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের প্রকৃত দুঃখের কারণ বস্তু নয় বরং সেই বস্তুর প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ। যখন আসক্তি বিলীন হয় তখন মানুষ স্বাধীনচিত্তে কর্তব্য পালন করতে পারে। দার্শনিকভাবে অদ্বৈত বেদান্তে এটি মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তির প্রতীক যোগদর্শনে বৈরাগ্যের প্রকাশ এবং ভক্তি দর্শনে ঈশ্বর ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর প্রতি চূড়ান্ত নির্ভরতা না থাকার শিক্ষা। প্রতীকী অর্থে এটি পদ্মফুলের মতো যা জলের মধ্যে থেকেও জলে ভিজে না। যেমন একজন দক্ষ চিকিৎসক নিষ্ঠার সঙ্গে রোগীর সেবা করেন কিন্তু ব্যক্তিগত আসক্তির কারণে কর্তব্যে বিচ্যুত হন না তেমনি অনাসক্ত ব্যক্তি কর্মের মধ্যেই স্বাধীন থাকেন।
মুক্তস্য শব্দটি মুচ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ মুক্ত করা বা বন্ধন থেকে ছেড়ে দেওয়া। এর বাংলা অর্থ মুক্ত স্বাধীন বা বন্ধনহীন। আক্ষরিক অর্থে এটি এমন ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি শৃঙ্খলমুক্ত। কিন্তু গীতার আলোচনায় মুক্তি কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয় বরং একটি চেতনার অবস্থা। বাহ্যিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন অন্তরে যিনি ভয় লোভ অহংকার এবং আসক্তির বন্ধন অতিক্রম করেছেন তিনিই প্রকৃত মুক্ত। অদ্বৈত দর্শনে এই মুক্তি আত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠা সাংখ্য দর্শনে পুরুষের প্রকৃতি থেকে স্বাতন্ত্র্য এবং ভক্তি দর্শনে ঈশ্বরের শরণাগতির মাধ্যমে অর্জিত পরম স্বাধীনতা। প্রতীকীভাবে এটি খাঁচা থেকে উড়ে যাওয়া পাখির মতো যার সামনে অসীম আকাশ উন্মুক্ত। বাস্তব জীবনে যিনি ধন সম্পদ বা ক্ষমতার অধিকারী হয়েও সেগুলোর দাস নন তিনিই প্রকৃত অর্থে মুক্ত।
জ্ঞানাবস্থিতচেতসঃ শব্দটি জ্ঞান অবস্থিত এবং চেতস এই তিনটি অংশে গঠিত। জ্ঞান অর্থ সত্য উপলব্ধি অবস্থিত অর্থ প্রতিষ্ঠিত এবং চেতস অর্থ মন বা চেতনা। ফলে এর অর্থ হয় যার চেতনা জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত। এর বাংলা অর্থ জ্ঞানস্থিতচিত্ত জ্ঞাননিষ্ঠ বা স্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি। আক্ষরিক অর্থে এটি এমন মনকে নির্দেশ করে যা সত্যের ভিতের ওপর স্থির হয়ে আছে। এখানে জ্ঞান বলতে কেবল তথ্য বা পাণ্ডিত্য বোঝানো হয় না বরং আত্মজ্ঞান এবং জীবনের চরম সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধিকে বোঝানো হয়। গভীর তাৎপর্যের দিক থেকে এই শব্দটি শিক্ষা দেয় যে জ্ঞান তখনই পূর্ণতা লাভ করে যখন তা মানুষের চিন্তা আচরণ এবং সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়। দার্শনিকভাবে এটি ব্রহ্মজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত অবস্থার পরিচায়ক। প্রতীকীভাবে এটি ঝড়ের মধ্যেও অচঞ্চল পর্বতের মতো যার ভিত নড়ে না। যেমন একজন সত্যজ্ঞানী মানুষ প্রশংসা কিংবা নিন্দা উভয় অবস্থাতেই সমভাবে স্থির থাকতে পারেন কারণ তাঁর চেতনা বাহ্যিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
যজ্ঞায় শব্দটি যজ ধাতু থেকে এসেছে যার মূল অর্থ পূজা করা উপাসনা করা বা উৎসর্গ করা। এর বাংলা অর্থ যজ্ঞের জন্য ঈশ্বরার্থে বা উৎসর্গস্বরূপ। আক্ষরিক অর্থে এটি যজ্ঞের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত কর্মকে নির্দেশ করে। গীতার ব্যাখ্যায় যজ্ঞ কেবল অগ্নিতে আহুতি প্রদান নয় বরং প্রতিটি নিঃস্বার্থ কর্মই যজ্ঞ। যখন মানুষ নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয় বরং বৃহত্তর কল্যাণ এবং ঈশ্বরচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করে তখন সেই কর্ম যজ্ঞে রূপান্তরিত হয়। এর গভীর তাৎপর্য হলো আত্মকেন্দ্রিক ভোগবৃত্তিকে অতিক্রম করে সেবার আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। প্রতীকীভাবে যজ্ঞ হলো অন্তরের অহংকারকে আত্মসমর্পণের অগ্নিতে নিবেদন করা। যেমন একজন মা নিঃস্বার্থভাবে সন্তানের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেন সেখানে তাঁর কর্মই এক মহান যজ্ঞ।
আচরতঃ শব্দটি চর ধাতুর সঙ্গে আ উপসর্গ যোগে গঠিত হয়েছে যার অর্থ আচরণ করা অনুশীলন করা বা কার্যকরভাবে সম্পাদন করা। এর বাংলা অর্থ পালন করা সম্পাদন করা বা নিয়মিত অনুশীলন করা। এই শব্দটি বোঝায় যে সত্যিকারের জ্ঞান কেবল চিন্তায় সীমাবদ্ধ নয় বরং কর্মের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। একজন মানুষ যতক্ষণ না তাঁর আদর্শকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করছেন ততক্ষণ সেই আদর্শ অসম্পূর্ণ। প্রতীকীভাবে এটি অবিরাম প্রবাহমান নদীর মতো যা চলমান বলেই জীবনকে পুষ্ট করে।
কর্ম শব্দটি কৃ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ করা সৃষ্টি করা বা সম্পাদন করা। বাংলা অর্থ কাজ কর্তব্য বা কার্য। আক্ষরিক অর্থে যা করা হয় তাই কর্ম। গীতার আলোচনায় শরীর বাক্য এবং মন দ্বারা সম্পাদিত প্রতিটি কার্যই কর্মের অন্তর্ভুক্ত। মানুষের জীবন কর্মবিহীন হতে পারে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো সেই কর্মের উদ্দেশ্য কী এবং তার অন্তর্নিহিত মানসিকতা কেমন। যখন কর্ম স্বার্থপরতার জন্য হয় তখন তা বন্ধনের কারণ হয় কিন্তু যখন কর্ম অনাসক্তভাবে ঈশ্বরার্পণ করে সম্পাদিত হয় তখন তা মুক্তির পথ হয়ে ওঠে। প্রতীকীভাবে কর্ম একটি বীজের মতো যার মধ্যেই ভবিষ্যতের ফল নিহিত থাকে।
সমগ্রং শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ সর্বাংশে বা সর্বতোভাবে। এখানে এই শব্দটি বোঝায় যে কর্মের বন্ধন আংশিক নয় বরং সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যায়। এটি পূর্ণতার ধারণাকে প্রকাশ করে যেখানে কোনো অবশিষ্ট বন্ধন বা আসক্তি থাকে না। প্রতীকীভাবে এটি পূর্ণিমার চাঁদের মতো যার আলো সর্বত্র সমানভাবে বিস্তৃত।
প্রবিলীয়তে শব্দটি লী ধাতুর সঙ্গে প্র উপসর্গ যোগে গঠিত হয়েছে যার অর্থ সম্পূর্ণভাবে বিলীন হওয়া বা লয়প্রাপ্ত হওয়া। এর বাংলা অর্থ বিলীন হয় লয়প্রাপ্ত হয় বা সম্পূর্ণরূপে মিশে যায়। গীতার এই প্রসঙ্গে কর্ম নিজে ধ্বংস হয় না বরং কর্মের বন্ধন এবং কর্মফলের আসক্তি বিলীন হয়ে যায়। দার্শনিকভাবে জ্ঞানাগ্নিতে কর্মফলের বীজ দগ্ধ হয়ে যাওয়ার ভাব এখানে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতীকীভাবে এটি সূর্যের আলোয় কুয়াশা মিলিয়ে যাওয়ার মতো। যেমন ভাজা বীজ আর অঙ্কুরিত হতে পারে না তেমনি জ্ঞানীর কর্ম আর নতুন বন্ধনের সৃষ্টি করে না।
এই সমগ্র শ্লোকটি ভাষাগত সৌন্দর্য দার্শনিক গভীরতা এবং আধ্যাত্মিক সত্যের এক অনন্য সমন্বয়। এখানে অনাসক্তি মুক্তি জ্ঞান যজ্ঞ এবং কর্মকে একটি অবিচ্ছিন্ন ধারায় উপস্থাপন করা হয়েছে। শ্লোকটি শিক্ষা দেয় যে মানুষকে কর্ম ত্যাগ করতে হবে না বরং কর্মের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আসক্তি অহংকার এবং ফলকামনাকে ত্যাগ করতে হবে। তখন প্রতিটি কর্তব্য উপাসনায় রূপান্তরিত হবে প্রতিটি কর্ম যজ্ঞ হয়ে উঠবে এবং কর্মফলের সমস্ত বন্ধন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিলীন হবে। এই শিক্ষা কেবল ধর্মীয় আদর্শ নয় বরং মানবজীবনের সর্বজনীন নীতি যা ব্যক্তি সমাজ এবং সমগ্র মানবসভ্যতাকে শান্তি স্বাধীনতা এবং আত্মউন্নতির পথে পরিচালিত করতে সক্ষম।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!