Related

Share

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.২৪ | ব্রহ্মার্পণং ও ব্রহ্মজ্ঞানের মাধ্যমে কর্মকে যজ্ঞে রূপান্তরের রহস্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on August 10, 2026
ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবিব্র্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্।ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্মসমাধিনা।।২৪।…
ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবিব্র্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্।
ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্মসমাধিনা।।২৪।।

অনুবাদঃ যিনি কৃষ্ণভাবনায় সম্পূর্ণ মগ্ন তিনি অবশ্যই চিৎজগতে উন্নীত হবেন, কারণ তাঁর সমস্ত কার্যকলাপ চিন্ময়। তাঁর কর্মের উদ্দেশ্য চিন্ময় এবং সেই উদ্দেশ্যে তিনি যা নিবেদন করেন, তাও চিন্ময়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের চব্বিশতম শ্লোক কর্মযোগ ও ব্রহ্মজ্ঞানের এক অপূর্ব সমন্বয়। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ ব্রহ্মতত্ত্বের এক একটি স্তর উন্মোচন করে এবং শেষ পর্যন্ত এমন এক দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা দেয় যেখানে জগতের সমস্ত কর্ম, কর্মের উপকরণ, কর্মসম্পাদক এবং কর্মের ফল এক পরম সত্যের মধ্যেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। শ্লোকের মূল বক্তব্য হলো যিনি প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করেছেন তিনি আর কোনো কিছুকে পৃথক সত্তা হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে যজ্ঞে নিবেদিত অর্ঘ্য ব্রহ্ম, সেই অর্ঘ্যরূপ হবিও ব্রহ্ম, যে অগ্নিতে তা অর্পিত হচ্ছে সেই অগ্নিও ব্রহ্ম, যিনি আহুতি দিচ্ছেন তিনিও ব্রহ্ম এবং যে ফল লাভ হবে সেটিও ব্রহ্ম। এই উপলব্ধিই কর্মকে মুক্তির উপায়ে পরিণত করে।

ব্রহ্মার্পণং শব্দটি দুটি সংস্কৃত শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ব্রহ্ম অর্থ সর্বব্যাপী পরম সত্য এবং অর্পণ অর্থ নিবেদন বা উৎসর্গ। আক্ষরিক অর্থে ব্রহ্মার্পণং বলতে বোঝায় ব্রহ্মকে নিবেদিত অর্ঘ্য অথবা সেই উপকরণ যার মাধ্যমে নিবেদন সম্পন্ন হয়। এর গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের প্রতিটি কর্ম যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে পরম সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয় তবে সেই কর্ম আর সাধারণ কর্ম থাকে না বরং তা যজ্ঞে রূপান্তরিত হয়। এখানে অর্পণ কেবল বাহ্যিক আচার নয় বরং হৃদয়ের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক।

ব্রহ্ম শব্দটি সংস্কৃত বৃহ্ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ বিস্তৃত হওয়া বৃদ্ধি পাওয়া অথবা সীমাহীনভাবে প্রসারিত হওয়া। এই ব্যুৎপত্তিগত অর্থ থেকেই ব্রহ্মকে এমন এক পরম সত্তা হিসেবে বোঝানো হয় যিনি সর্বত্র বিরাজমান এবং যাঁর বাইরে কিছুই নেই। বাংলা অর্থে ব্রহ্ম বলতে পরমাত্মা সর্বোচ্চ সত্য অথবা বিশ্বচেতনাকে বোঝায়। দর্শনের ভাষায় ব্রহ্ম নিরাকার নির্গুণ চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয়। আবার ভক্তি দর্শনে এই একই ব্রহ্ম ব্যক্ত ঈশ্বর রূপেও উপলব্ধ হতে পারেন। তাই ব্রহ্ম কেবল একটি ধর্মীয় ধারণা নয় বরং সমগ্র অস্তিত্বের মৌলিক ভিত্তির প্রতীক।

হবিঃ শব্দের অর্থ যজ্ঞে নিবেদিত আহুতি। এটি হু ধাতু থেকে উৎপন্ন যার অর্থ অগ্নিতে নিবেদন করা। সাধারণ অর্থে ঘৃত তিল শস্য অথবা অন্যান্য নিবেদনযোগ্য দ্রব্যকে হবিঃ বলা হয়। কিন্তু এই শ্লোকে হবিঃ কেবল বাহ্যিক উপাদান নয় বরং মানুষের চিন্তা ইচ্ছা কর্ম এবং অহংকারেরও প্রতীক। যখন মানুষ নিজের স্বার্থপরতা ত্যাগ করে সৎ উদ্দেশ্যে জীবনকে উৎসর্গ করে তখন তার সমগ্র জীবনই এক পবিত্র আহুতিতে পরিণত হয়।

ব্রহ্মাগ্নৌ শব্দের অর্থ ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে। এখানে অগ্নি কেবল দৃশ্যমান আগুন নয় বরং জ্ঞান চেতনা এবং অন্তরের শুদ্ধির প্রতীক। যেমন অগ্নি সমস্ত অপবিত্রতা দগ্ধ করে তেমনি ব্রহ্মজ্ঞান মানুষের অজ্ঞানতা অহংকার এবং আসক্তিকে দহন করে। ফলে কর্মের বন্ধন দূর হয় এবং অন্তর নির্মল হয়ে ওঠে।

ব্রহ্মণা হুতম্ অংশটির অর্থ ব্রহ্মরূপ কর্তার দ্বারা আহুতি প্রদান করা হয়েছে। এখানে কর্তা এবং কর্মের মধ্যে কোনো ভেদ রাখা হয়নি। সাধারণ মানুষ মনে করে সে নিজেই কর্মের কর্তা। কিন্তু জ্ঞানী উপলব্ধি করেন যে ব্যক্তি কেবল একটি মাধ্যম। প্রকৃত কর্তা সেই সর্বব্যাপী ব্রহ্ম। এই উপলব্ধি অহংকারকে বিলুপ্ত করে এবং কর্মকে নিষ্কাম করে তোলে।

ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যম্ অংশের অর্থ সেই জ্ঞানীর চূড়ান্ত গন্তব্যও ব্রহ্ম। যে ব্যক্তি কর্মের প্রতিটি স্তরে ব্রহ্মকে অনুভব করেন তাঁর জন্য মুক্তি কোনো দূরবর্তী লক্ষ্য নয় বরং বর্তমান জীবনেরই একটি উপলব্ধ বাস্তবতা। তাঁর সমস্ত যাত্রা শেষ পর্যন্ত সেই একক পরম সত্যের মধ্যেই সমাপ্ত হয়। এখানে গন্তব্য বলতে কেবল মৃত্যুর পরের অবস্থা বোঝানো হয় না বরং জীবন্মুক্ত অবস্থায় চেতনার সর্বোচ্চ বিকাশকেও বোঝায়।

ব্রহ্মকর্মসমাধিনা শব্দটি অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। এটি ব্রহ্ম কর্ম এবং সমাধি এই তিনটি ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ এমন একাগ্র চিত্ত যেখানে সমস্ত কর্ম ব্রহ্মরূপে উপলব্ধ হয় এবং কর্মের মধ্যেই ঈশ্বরচেতনার প্রকাশ ঘটে। সমাধি এখানে নিছক ধ্যানের অবস্থা নয় বরং এমন এক স্থিতি যেখানে কর্ম এবং জ্ঞান পরস্পরের বিরোধী নয় বরং একে অপরের পরিপূরক। ব্যক্তি তখন প্রতিটি কাজকে উপাসনা হিসেবে সম্পাদন করেন এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আধ্যাত্মিক সাধনায় রূপান্তরিত করেন।

এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য অত্যন্ত বিস্তৃত। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এটি ঘোষণা করে যে জগতে সত্যিকার অর্থে কোনো দ্বৈততা নেই। কর্তা কর্ম এবং কর্মফল সবই একই ব্রহ্মের বহিঃপ্রকাশ। বিশিষ্টাদ্বৈত মতে সমস্ত কর্ম ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হলে জীব ঈশ্বরের কৃপা লাভ করে। দ্বৈত দর্শনে যদিও জীব এবং ঈশ্বর পৃথক সত্তা তবুও কর্মকে ঈশ্বরার্পণ করার আদর্শকে এই শ্লোক সমানভাবে সমর্থন করে। যোগদর্শনের আলোকে এটি নিষ্কাম কর্মযোগের পরম শিক্ষা যেখানে কর্মের মাধ্যমে মন শুদ্ধ হয় এবং জ্ঞানের উদয় ঘটে।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোক মানুষের সমগ্র জীবনকে একটি মহাযজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করে। অগ্নি মানুষের অন্তরের জ্ঞান। আহুতি মানুষের কামনা বাসনা এবং অহংকার। যজ্ঞের উপকরণ মানুষের কর্মশক্তি। আর যজ্ঞের ফল আত্মশুদ্ধি এবং ব্রহ্মোপলব্ধি। সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে যজ্ঞ সর্বদা ত্যাগ সহযোগিতা এবং মহত্ত্বের প্রতীক। এই শ্লোক সেই প্রতীককে বহুগুণ গভীর করে জানায় যে সত্যিকারের যজ্ঞ বাহ্যিক আচার নয় বরং অন্তরের রূপান্তর।

বাস্তব জীবনে একজন শিক্ষক যখন নিঃস্বার্থভাবে শিক্ষাদান করেন একজন চিকিৎসক যখন মানবসেবাকে ঈশ্বরসেবা মনে করেন একজন কৃষক যখন নিষ্ঠার সঙ্গে ভূমি চাষ করেন অথবা একজন সাধারণ মানুষ যখন সততার সঙ্গে নিজের কর্তব্য পালন করেন তখন তাঁদের কর্মও এই শ্লোকের শিক্ষানুসারে ব্রহ্মার্পণ হয়ে ওঠে। সেখানে কর্ম আর ব্যক্তিগত লাভের উপায় নয় বরং সত্য ন্যায় এবং কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিবেদিত এক পবিত্র সাধনা।

সারসংক্ষেপে বলা যায় এই শ্লোক কেবল যজ্ঞের ব্যাখ্যা নয় বরং সমগ্র জীবনের একটি সর্বজনীন দর্শন। ভাষাগত দিক থেকে প্রতিটি শব্দ ব্রহ্মতত্ত্বের বিভিন্ন মাত্রাকে প্রকাশ করে। দার্শনিক দৃষ্টিতে এটি অদ্বৈত ঐক্যের ঘোষণা। আধ্যাত্মিক অর্থে এটি অহংকারমুক্ত নিষ্কাম কর্মের পথ নির্দেশ করে। প্রতীকী অর্থে এটি শেখায় যে মানুষের প্রতিটি চিন্তা প্রতিটি কর্ম এবং প্রতিটি নিঃশ্বাস যদি পরম সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয় তবে সমগ্র জীবনই এক অনন্ত যজ্ঞে পরিণত হয় এবং সেই যজ্ঞের পরিণতিতে মানুষ উপলব্ধি করে যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবই ব্রহ্ম এবং ব্রহ্ম ছাড়া অন্য কোনো চূড়ান্ত বাস্তবতা নেই।

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: August 10, 2026 August 10, 2026

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.২৪ | ব্রহ্মার্পণং ও ব্রহ্মজ্ঞানের মাধ্যমে কর্মকে যজ্ঞে রূপান্তরের রহস্য

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.২৪ | ব্রহ্মার্পণং ও ব্রহ্মজ্ঞানের মাধ্যমে কর্মকে যজ্ঞে রূপান্তরের রহস্য