শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.৩৫ | পরম জ্ঞানের মাহাত্ম্য, মোহমুক্তি ও আত্মদর্শনের চূড়ান্ত রহস্য
যজজ্ঞাত্বা ন পুনর্মোহমেবং যাস্যসি পান্ডব।
যেন ভূতান্যশেষাণি দ্রক্ষ্যস্যাত্মন্যথো ময়ি।।৩৫।।
অনুবাদঃ হে পান্ডব! এভাবে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে তুমি আর মোহগ্রস্ত হবে না, কেন না এই জ্ঞানের দ্বারা তুমি দর্শন করবে যে, সমস্ত জীবই আমার বিভিন্ন অংশ অর্থাৎ তারা সকলেই আমার এবং তারা আমাতে অবস্থিত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের পঁয়ত্রিশতম শ্লোক জ্ঞানের সর্বোচ্চ মাহাত্ম্য এবং আত্মদর্শনের চূড়ান্ত ফলকে অত্যন্ত গভীরভাবে প্রকাশ করে। শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আশ্বস্ত করে বলেন যে এই পরম জ্ঞান একবার যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পারলে সে আর কখনও মোহগ্রস্ত হবে না। তখন সে সমস্ত জীবকে নিজের আত্মার মধ্যে এবং পরিশেষে সেই আত্মাকে পরমেশ্বরের মধ্যেই প্রত্যক্ষ করবে। এই শ্লোক কেবল একটি ধর্মীয় উপদেশ নয় বরং মানবজীবনের আধ্যাত্মিক বিবর্তনের এক অনন্ত সত্যকে প্রকাশ করে।
এই শ্লোকের কেন্দ্রবিন্দু হলো জ্ঞান। সংস্কৃত জ্ঞা ধাতু থেকে জ্ঞান শব্দের উৎপত্তি যার অর্থ জানা উপলব্ধি করা বা প্রত্যক্ষভাবে সত্যকে অনুধাবন করা। এখানে জ্ঞান বলতে সাধারণ তথ্য বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্যাকে বোঝানো হয়নি। বরং সেই জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে যা মানুষের অন্তরের অজ্ঞান দূর করে আত্মার প্রকৃত স্বরূপকে প্রকাশ করে। জ্ঞাত্বা শব্দের অর্থ জেনে বা উপলব্ধি করে। এটি বোঝায় যে সত্যকে কেবল শুনে বা পড়ে নয় বরং নিজের জীবনে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। এই উপলব্ধিই মানুষের চেতনাকে রূপান্তরিত করে।
শ্লোকে মোহ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। মোহের অর্থ বিভ্রান্তি ভ্রান্ত ধারণা আসক্তি বা সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা। মানুষ যখন দেহ মন ইন্দ্রিয় সম্পদ কিংবা সম্পর্ককেই নিজের প্রকৃত পরিচয় বলে মনে করে তখন সে মোহে আবদ্ধ হয়। এই মোহ থেকেই জন্ম নেয় ভয় লোভ হিংসা ক্রোধ এবং অসংখ্য দুঃখ। শ্রীকৃষ্ণ বলেন যে সত্য জ্ঞান অর্জনের পর এই মোহ আর ফিরে আসে না কারণ তখন মানুষ উপলব্ধি করে যে আত্মা নিত্য অবিনশ্বর এবং সমস্ত জীবের অন্তরে একই পরম চেতনার প্রকাশ বিদ্যমান।
ভূতানি শব্দের অর্থ সমস্ত জীব বা সমস্ত সৃষ্ট সত্তা। অশেষাণি শব্দটি বোঝায় কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া সমগ্র সৃষ্টিজগতকে। আত্মনি অর্থ নিজের আত্মার মধ্যে এবং ময়ি অর্থ আমার মধ্যে অর্থাৎ পরমেশ্বরের মধ্যে। এই শব্দগুলোর সম্মিলিত অর্থ হলো জ্ঞানপ্রাপ্ত ব্যক্তি সমস্ত জীবকে নিজের সঙ্গে একাত্মভাবে অনুভব করে এবং উপলব্ধি করে যে সকল আত্মাই পরমাত্মার অবিচ্ছেদ্য প্রকাশ। এখানে পৃথকত্বের অনুভূতি বিলীন হয়ে যায় এবং ঐক্যের অনুভব প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ অত্যন্ত সহজ হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অসীম। বাহ্যিকভাবে মানুষ একে অপরের থেকে ভিন্ন হলেও আধ্যাত্মিক সত্যে সকলেই একই চৈতন্যের অংশ। জ্ঞান লাভের আগে মানুষ নিজেকে সীমাবদ্ধ ব্যক্তি হিসেবে দেখে কিন্তু জ্ঞান লাভের পর সে উপলব্ধি করে যে সমগ্র বিশ্বজগৎ একই পরম সত্যের বহুমাত্রিক প্রকাশ। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে মুক্ত করে এবং সকল প্রাণীর প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অদ্বৈত ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রকাশ। এখানে আত্মা ও পরমাত্মার ঐক্যের কথা বলা হয়েছে। মানুষের অজ্ঞতা তাকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিতে আবদ্ধ রাখে কিন্তু জ্ঞান সেই বিভেদ দূর করে একত্বের উপলব্ধি এনে দেয়। আবার ভক্তি দর্শনের আলোকে এই শ্লোকের অর্থ হলো ভগবানের কৃপায় এমন এক উপলব্ধি জন্মায় যেখানে ভক্ত সর্বত্র ভগবানের উপস্থিতি অনুভব করেন। সাংখ্য দর্শনের আলোকে এটি পুরুষের প্রকৃত স্বরূপকে জানার আহ্বান এবং যোগ দর্শনের আলোকে এটি সমাধির মাধ্যমে সর্বব্যাপী চেতনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।
প্রতীকী অর্থে মোহ হলো অন্ধকার এবং জ্ঞান হলো আলো। অন্ধকারে মানুষ যেমন পথ হারিয়ে ফেলে তেমনি অজ্ঞতায় আবদ্ধ মানুষ জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যায়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে যেমন অন্ধকার নিজে থেকেই দূর হয়ে যায় তেমনি সত্য জ্ঞান উদিত হলে মোহও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিলীন হয়ে যায়। সমস্ত জীবকে নিজের মধ্যে দেখা প্রতীকীভাবে সর্বজনীন ভালোবাসা সহমর্মিতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধের প্রকাশ। আর সকলকে ভগবানের মধ্যে দেখা বোঝায় যে সমগ্র সৃষ্টি একই পরম উৎসের সন্তান।
বাস্তব জীবনে একজন সত্যিকারের জ্ঞানী মানুষ জাতি ধর্ম বর্ণ ভাষা বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে কাউকে ছোট বা বড় মনে করেন না। তিনি প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একই আত্মার উপস্থিতি অনুভব করেন। একজন মায়ের যেমন তার সব সন্তানকে সমানভাবে ভালোবাসতে ইচ্ছা হয় তেমনি জ্ঞানী ব্যক্তি সমগ্র জীবজগতের প্রতি সমান মমতা ও করুণা অনুভব করেন। ইতিহাসে বহু মহাপুরুষ এই উপলব্ধির মাধ্যমে মানবকল্যাণে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন কারণ তারা সকলের মধ্যে একই চেতনাকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো সত্য জ্ঞান মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দেয়। তখন মানুষ আর বাহ্যিক পার্থক্যে বিভ্রান্ত হয় না বরং সর্বত্র এক চিরন্তন ঐক্যের সত্তাকে উপলব্ধি করে। এই উপলব্ধিই মোহের অবসান ঘটায় অহংকার দূর করে এবং প্রেম করুণা শান্তি ও সমদৃষ্টির ভিত্তিতে জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করে। ভাষাগতভাবে এই শ্লোক জ্ঞানের শক্তিকে প্রকাশ করে দার্শনিকভাবে আত্মা ও পরমাত্মার ঐক্যকে ব্যাখ্যা করে এবং প্রতীকীভাবে অন্ধকার থেকে আলোর পথে মানবচেতনার অভিযাত্রাকে তুলে ধরে। তাই এই শ্লোক কেবল ধর্মীয় শিক্ষাই নয় বরং মানবজাতির জন্য চিরন্তন আত্মজাগরণ ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের এক অনন্য আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!