শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.৩৯ | শ্রদ্ধা, সাধনা ও ইন্দ্রিয়সংযমে জ্ঞানলাভের পথ
শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ।
জ্ঞানং লব্ধা পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি।।৩৯।।
অনুবাদঃ সংযতেন্দ্রিয় ও তৎপর হয়ে চিন্ময় তত্ত্বজ্ঞানে প্রদ্ধাবান ব্যক্তি এই জ্ঞান লাভ করেন। সেই দিব্য জ্ঞান লাভ করে তিনি অচিরেই পরা শান্তি প্রাপ্ত হন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের ঊনচল্লিশতম শ্লোক মানবজীবনে জ্ঞান লাভের প্রকৃত পথ এবং সেই জ্ঞানের চূড়ান্ত ফল সম্পর্কে এক অনন্য শিক্ষা প্রদান করে। শ্লোকে বলা হয়েছে যে শ্রদ্ধাবান তৎপর এবং সংযতেন্দ্রিয় ব্যক্তি জ্ঞান লাভ করেন এবং সেই জ্ঞান অর্জনের পর অতি শীঘ্রই পরম শান্তি লাভ করেন। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা আধ্যাত্মিক সাধনার ভিত্তি এবং মুক্ত জীবনের পরিণতি অত্যন্ত গভীরভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
এই শ্লোকে শ্রদ্ধাবান শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শব্দটি সংস্কৃত শ্রদ্ধা এবং বান প্রত্যয়ের সমন্বয়ে গঠিত। শ্রদ্ধা শব্দের মূল অর্থ সত্যের প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস আস্থা এবং হৃদয়ের গভীর গ্রহণযোগ্যতা। বান প্রত্যয় দ্বারা বোঝানো হয় যিনি কোনো বিশেষ গুণের অধিকারী। ফলে শ্রদ্ধাবান অর্থ এমন ব্যক্তি যিনি সত্য শাস্ত্র গুরু এবং ঈশ্বরের প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস ধারণ করেন। এখানে শ্রদ্ধা অন্ধ বিশ্বাস নয় বরং এমন এক নির্মল আস্থা যা অনুসন্ধানকে শক্তিশালী করে এবং জ্ঞান অর্জনের পথে মানুষকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই শ্রদ্ধাই মানুষের অন্তরে শিক্ষাগ্রহণের যোগ্যতা সৃষ্টি করে এবং তাকে অহংকার ও সংশয়ের অন্ধকার থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে।
লভতে শব্দটি সংস্কৃত লভ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ লাভ করা অর্জন করা বা প্রাপ্ত হওয়া। এই লাভ কেবল বাহ্যিক কোনো বস্তু প্রাপ্তি নয় বরং আত্মজ্ঞান এবং সত্য উপলব্ধির মতো এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি অর্জনের প্রতীক। একইভাবে জ্ঞান শব্দটি জ্ঞা ধাতু থেকে উৎপন্ন যার অর্থ জানা উপলব্ধি করা এবং সত্যকে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করা। গীতার ভাষায় জ্ঞান মানে কেবল তথ্য বা পুস্তকবিদ্যা নয় বরং আত্মা পরমাত্মা এবং জীবনের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি। এই জ্ঞান মানুষের চেতনার পরিবর্তন ঘটায় এবং তাকে অজ্ঞানতার বন্ধন থেকে মুক্ত করে।
তৎপর শব্দটি তৎ এবং পর এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। তৎ অর্থ সেই পরম সত্য বা ঈশ্বর এবং পর অর্থ নিবেদিত বা সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশকারী। ফলে তৎপর অর্থ এমন ব্যক্তি যিনি জীবনের সর্বশক্তি ও মনোযোগ পরম লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিবেদন করেছেন। এটি নিষ্ঠা অধ্যবসায় এবং একাগ্রতার প্রতীক। যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য আন্তরিকভাবে সাধনা করেন এবং মাঝপথে নিরুৎসাহিত হন না তিনিই প্রকৃত তৎপর।
সংযতেন্দ্রিয় শব্দটি সংযত এবং ইন্দ্রিয় এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। সংযত অর্থ নিয়ন্ত্রিত এবং ইন্দ্রিয় অর্থ মানুষের জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়। তাই সংযতেন্দ্রিয় বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি নিজের ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম। মানুষের মন সাধারণত ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণে বহির্মুখী হয়ে পড়ে। কিন্তু আত্মসংযম মানুষকে বাহ্যিক ভোগের সীমা অতিক্রম করে অন্তরের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই প্রকৃত জ্ঞান লাভের অন্যতম প্রধান শর্ত।
শ্লোকে আরও বলা হয়েছে যে জ্ঞান লাভ করার পর মানুষ পরম শান্তি অর্জন করে। এখানে পরম শান্তি বলতে সাময়িক মানসিক স্বস্তি বোঝানো হয়নি। এটি এমন এক চিরস্থায়ী প্রশান্তির অবস্থা যেখানে ভয় দুঃখ উদ্বেগ লোভ এবং মোহের কোনো স্থান থাকে না। অচিরেণ শব্দটি নির্দেশ করে যে সত্য জ্ঞান লাভের পর এই শান্তি খুব দ্রুতই মানুষের অন্তরে প্রকাশিত হয়। কারণ জ্ঞান অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে এবং মানুষের প্রকৃত স্বরূপকে উদ্ভাসিত করে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। অদ্বৈত বেদান্তের মতে জ্ঞান হলো আত্মা ও ব্রহ্মের অভিন্নতা উপলব্ধি করা। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে এই জ্ঞান ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও ভক্তির মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করে। দ্বৈত দর্শন জ্ঞানকে ঈশ্বরের কৃপা এবং বিশ্বাসের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে। যোগদর্শনে বলা হয়েছে যে ইন্দ্রিয়সংযম ছাড়া মনকে স্থির করা যায় না এবং মন স্থির না হলে জ্ঞানও লাভ করা যায় না। বৌদ্ধ দর্শনেও শ্রদ্ধা সাধনা এবং প্রজ্ঞার ধারাবাহিক অগ্রগতির মাধ্যমে নির্বাণ লাভের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ফলে বিভিন্ন দর্শনের মধ্যে এই শ্লোকের মূল বক্তব্যের গভীর সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়।
প্রতীকী অর্থে শ্রদ্ধা মানুষের অন্তরের আলোর প্রতীক। তৎপরতা জীবনের অবিচল যাত্রার প্রতীক। সংযম হলো আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি যা মানুষকে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে। জ্ঞান সূর্যের মতো অন্ধকার দূর করে সত্যকে প্রকাশ করে এবং পরম শান্তি নির্মল আকাশের মতো এক সীমাহীন প্রশান্তির প্রতীক যেখানে কোনো অস্থিরতা বা দ্বন্দ্ব নেই। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও শ্রদ্ধা ইতিবাচক মানসিক প্রস্তুতি তৎপরতা অভ্যন্তরীণ প্রেরণা সংযম আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং জ্ঞান গভীর আত্মসচেতনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাস্তব জীবনের বহু উদাহরণ এই শ্লোকের সত্যতাকে স্পষ্ট করে। একজন কৃষক যদি বীজের ওপর বিশ্বাস না রাখেন তবে তিনি কখনো চাষ করবেন না। যদি নিয়মিত পরিচর্যা না করেন তবে ফসল ফলবে না। আবার ধৈর্য না থাকলে তিনি ফসল ঘরে তুলতে পারবেন না। একইভাবে একজন ছাত্র যদি শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হন নিয়মিত অধ্যবসায় না করেন এবং নিজের মনকে বিভ্রান্তি থেকে সংযত রাখতে না পারেন তবে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়। একজন সাধকও গুরুর প্রতি বিশ্বাস নিয়মিত সাধনা এবং ইন্দ্রিয়সংযমের মাধ্যমে আত্মজ্ঞান লাভ করেন এবং অন্তরে চিরস্থায়ী শান্তির অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
সার্বিকভাবে এই শ্লোক মানবজীবনের আধ্যাত্মিক বিকাশের একটি চিরন্তন সূত্র উপস্থাপন করে। শ্রদ্ধা মানুষের হৃদয়ে জ্ঞানের বীজ রোপণ করে। তৎপরতা সেই বীজকে পরিচর্যা করে শক্তিশালী বৃক্ষে পরিণত করে। সংযম তাকে দৃঢ় ভিত্তি প্রদান করে। এরপর সেই বৃক্ষ থেকে জ্ঞানের ফল জন্মায় এবং সেই ফলের স্বাদই হলো পরম শান্তি। অতএব এই শ্লোক আমাদের শিক্ষা দেয় যে প্রকৃত জ্ঞান কখনো কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক তথ্য নয় বরং বিশ্বাস সাধনা আত্মসংযম এবং আত্মউপলব্ধির মাধ্যমে অর্জিত এক জীবন্ত সত্য যা মানুষের সমগ্র জীবনকে আলোকিত করে এবং তাকে স্থায়ী শান্তি ও মুক্তির পথে পরিচালিত করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!