সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৫.১০ | ব্রহ্মে কর্মসমর্পণ ও পদ্মপাতার মতো অনাসক্ত থাকার শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ব্রহ্মণ্যাধায় কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা করোতি যঃ। লিপ্যতে ন স পাপেন পদ্মপত্রমিবাম্ভসা।।১০।।
ব্রহ্মণ্যাধায় কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা করোতি যঃ। 
লিপ্যতে ন স পাপেন পদ্মপত্রমিবাম্ভসা।।১০।।

অনুবাদঃ যিনি সমস্ত কর্মের ফল পরমেশ্বর ভগবানকে অর্পণ করে অনাসক্ত হয়ে কর্ম করেন, কোন পাপ তাঁকে কখনও স্পর্শ করতে পারে না, ঠিক যেমন জল পদ্মপাতাকে স্পর্শ করতে পারে না। 

ভগবদ্গীতার পঞ্চম অধ্যায়ের দশম শ্লোক মানুষের কর্মজীবন এবং আধ্যাত্মিক জীবনের মধ্যে এক অসাধারণ সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে এমন একটি জীবনদর্শনের কথা বলেছেন যেখানে মানুষ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়, বরং পৃথিবীর মধ্যেই থেকে অন্তরের স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে। শ্লোকটি হলো

এই শ্লোকের সরল অর্থ হলো, যে ব্যক্তি তার সমস্ত কর্ম ব্রহ্মের উদ্দেশ্যে সমর্পণ করে এবং কর্মের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে নিজের কর্তব্য পালন করে, সে পাপ দ্বারা আবদ্ধ হয় না। যেমন জলের মধ্যে অবস্থান করেও পদ্মপাতা জলে লিপ্ত হয় না, তেমনি অনাসক্ত কর্মীও কর্মের মধ্যেই থেকেও কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয় না। কিন্তু এই বক্তব্যের গভীরতা কেবল অনুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে মানুষের কর্ম, মন, অহংকার, কর্তব্য, আত্মসমর্পণ এবং মুক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন নিহিত রয়েছে।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো ব্রহ্মণ্যাধায়। ব্রহ্মণ্যাধায় শব্দের মধ্যে ব্রহ্ম এবং আধায় এই দুই ভাব নিহিত রয়েছে। ব্রহ্ম বলতে এখানে পরম সত্য, সর্বব্যাপী চৈতন্য অথবা অস্তিত্বের চূড়ান্ত ভিত্তিকে বোঝানো যায়। আধায়ের অর্থ স্থাপন করা, ধারণ করা বা সমর্পণ করা। তাই ব্রহ্মণ্যাধায় বলতে বোঝায় কর্মকে ব্রহ্মে স্থাপন করে, কর্মকে পরম সত্যের উদ্দেশ্যে সমর্পণ করে অথবা নিজের কর্মকে বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত করে কাজ করা। এই শব্দটি গীতার কর্মযোগের একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ করে। মানুষ কাজ করবে, কিন্তু তার কাজকে কেবল নিজের ব্যক্তিগত অহংকারের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখবে না। সে উপলব্ধি করবে যে তার জীবন, শক্তি, প্রতিভা এবং কর্ম সবই একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের অংশ।

এরপর এসেছে কর্মাণি শব্দটি। কর্মাণি হলো কর্ম শব্দের বহুবচন রূপ। কর্ম বলতে কাজ, কর্তব্য, কার্যকলাপ বা মানুষের দ্বারা সম্পাদিত কার্যকে বোঝানো হয়। গীতার দর্শনে কর্মের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। মানুষ শুধু হাতে কাজ করলেই কর্ম করে না। তার চিন্তা, কথা, সিদ্ধান্ত এবং আচরণও কর্মের অংশ। মানুষের জীবন তাই কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যতক্ষণ জীবন আছে ততক্ষণ কোনো না কোনোভাবে কর্ম চলতেই থাকে। এই কারণেই গীতা কর্ম ত্যাগের চেয়ে কর্মের প্রকৃতি পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেয়। কাজ থাকবে, কিন্তু কাজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি বদলাতে হবে।

শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সঙ্গং ত্যক্ত্বা। সঙ্গ অর্থ আসক্তি, আকর্ষণ, মানসিক বন্ধন বা কোনো কিছুর সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়া যার ফলে নিজের অন্তরের স্বাধীনতা হারিয়ে যায়। ত্যক্ত্বা অর্থ ত্যাগ করে। ফলে সঙ্গং ত্যক্ত্বা অর্থ হলো আসক্তি ত্যাগ করে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য করেছেন। তিনি কর্ম ত্যাগ করতে বলেননি। তিনি কর্মের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করতে বলেছেন। এই পার্থক্যটি না বুঝলে গীতার কর্মযোগের প্রকৃত অর্থ বোঝা যায় না।

মানুষ কাজ করবে এবং নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে কাজ করবে। কিন্তু সেই কাজের ফল তার মানসিক অস্তিত্বের একমাত্র ভিত্তি হয়ে উঠবে না। একজন মানুষ সাফল্য চাইতে পারে, কিন্তু সাফল্যের ওপর নিজের আত্মমর্যাদা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করাবে না। সে ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু ব্যর্থতাকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করবে না। সে প্রশংসা পেতে পারে, কিন্তু প্রশংসার নেশায় নিজের স্বাধীনতা হারাবে না। সে সমালোচনার মুখোমুখি হতে পারে, কিন্তু সমালোচনার কারণে নিজের কর্তব্য থেকে সরে যাবে না। এই মানসিক ভারসাম্যই অনাসক্তির প্রকৃত রূপ।

অনাসক্তি মানে উদাসীনতা নয়। অনাসক্ত মানুষ দায়িত্বহীন নয়। বরং প্রকৃত অনাসক্ত মানুষ অনেক সময় আরও বেশি দায়িত্বশীল হয়। কারণ সে নিজের কাজকে ব্যক্তিগত অহংকারের বিষয় না করে কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করে। একজন শিক্ষক যদি শিক্ষাদানকে নিজের ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রদর্শন না করে জ্ঞান প্রদানের কর্তব্য হিসেবে দেখেন, তাহলে তার কাজের মধ্যে এক ধরনের পবিত্রতা আসে। একজন চিকিৎসক যদি রোগীর সেবাকে কেবল পেশাগত সাফল্যের উপায় না ভেবে মানবিক কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে তার কর্মের অর্থ গভীর হয়। একজন কৃষক যদি নিষ্ঠার সঙ্গে জমিতে কাজ করেন এবং ফলের জন্য নিজের সমস্ত মানসিক শান্তি বন্ধক না রাখেন, তাহলেও তিনি এই কর্মযোগের একটি সাধারণ রূপ প্রকাশ করেন।

করোতি যঃ অর্থ যে ব্যক্তি এইভাবে কাজ করে। অর্থাৎ গীতার আদর্শ কোনো কর্মবিমুখ মানুষের আদর্শ নয়। এখানে সক্রিয় মানুষের কথা বলা হয়েছে। যে ব্যক্তি সমাজের মধ্যে থাকে, সংসারের মধ্যে থাকে, দায়িত্ব পালন করে এবং নিজের কর্তব্য থেকে পালিয়ে যায় না, সেই মানুষও আধ্যাত্মিক জীবনের পথে এগিয়ে যেতে পারে। গীতার অন্যতম বড় শিক্ষা এখানেই। আধ্যাত্মিকতার জন্য পৃথিবী থেকে পালিয়ে যাওয়া অপরিহার্য নয়। বরং পৃথিবীর মধ্যেই থেকে নিজের চেতনাকে পরিশুদ্ধ করা সম্ভব।

এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেন লিপ্যতে ন স পাপেন। লিপ্যতে শব্দের মধ্যে লেপিত হওয়া বা আবদ্ধ হওয়ার ভাব রয়েছে। পাপেন অর্থ পাপ দ্বারা। অর্থাৎ যে ব্যক্তি এইভাবে কর্ম করে, সে পাপ দ্বারা লিপ্ত হয় না। এই বক্তব্যকে শুধু বাহ্যিক ধর্মীয় বিধিনিষেধের অর্থে দেখলে এর গভীরতা কমে যায়। পাপের একটি মনস্তাত্ত্বিক অর্থও রয়েছে। যখন মানুষ লোভ, অহংকার, হিংসা, প্রতারণা, স্বার্থপরতা এবং অন্ধ আকাঙ্ক্ষার দ্বারা চালিত হয়ে কাজ করে, তখন সেই কর্ম তার অন্তরে একটি ছাপ তৈরি করে। কর্মের স্মৃতি তার চিন্তা এবং আচরণকে প্রভাবিত করে। ফলে কর্মের বন্ধন শুধু বাইরের ফলাফলে নয়, মানুষের চেতনার মধ্যেও তৈরি হয়।

এই কারণেই গীতা কর্মকে বন্ধনের মূল কারণ হিসেবে দেখছে না। বরং কর্মের পেছনে থাকা মানসিকতা এবং আসক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে। একই কাজ দুই ব্যক্তি করতে পারে, কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ভিন্ন হলে সেই কর্মের মানসিক ফলও ভিন্ন হতে পারে। একজন মানুষ কর্তব্যবোধ থেকে কাজ করতে পারে। অন্যজন একই কাজ করতে পারে কেবল ব্যক্তিগত লাভ, অহংকার বা প্রতিশোধের জন্য। বাহ্যিক কাজ একই হলেও অন্তরের অবস্থান এক নয়।

শ্লোকটির সবচেয়ে সুন্দর অংশ হলো পদ্মপত্রমিবাম্ভসা। এর অর্থ হলো জলের মধ্যে থাকা পদ্মপাতার মতো। ভারতীয় চিন্তায় পদ্ম একটি গভীর প্রতীক। কাদামাটির মধ্যে জন্ম নিয়েও পদ্ম তার সৌন্দর্য এবং স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ করে। জলের মধ্যে থেকেও পদ্মপাতা জলে সম্পূর্ণভাবে লিপ্ত হয় না। এই প্রাকৃতিক দৃশ্যকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের আধ্যাত্মিক অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

মানুষও জীবনের জলের মধ্যে অবস্থান করে। তার চারপাশে আছে অর্থ, সম্পর্ক, সাফল্য, ব্যর্থতা, সম্মান, অপমান, আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ, আনন্দ এবং প্রতিযোগিতা। মানুষ এগুলো থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না। কিন্তু সে চাইলে এগুলোর দ্বারা নিজের অন্তরকে সম্পূর্ণভাবে অধিকার হতে না দেওয়ার শিক্ষা অর্জন করতে পারে। পদ্মপাতা জলকে অস্বীকার করে না। সে জলের মধ্যেই থাকে। কিন্তু জল তার অস্তিত্বকে গ্রাস করে না। একইভাবে কর্মযোগী মানুষও সংসার থেকে পালিয়ে যায় না। সে সংসারের মধ্যেই থাকে। কিন্তু সংসারের সাফল্য বা ব্যর্থতা তার অন্তরের সম্পূর্ণ পরিচয় হয়ে ওঠে না।

এই উপমার মধ্যে গীতার এক গভীর দার্শনিক সত্য রয়েছে। বাহ্যিক সম্পর্ক এবং অন্তরের বন্ধন এক জিনিস নয়। একজন মানুষ সম্পদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেই পারে, কিন্তু সম্পদের দাস না হয়েও থাকতে পারে। সে সম্মান পেতে পারে, কিন্তু সম্মানের প্রতি অন্ধ আসক্ত না হয়েও থাকতে পারে। সে ভালোবাসতে পারে, কিন্তু নিজের সমস্ত অস্তিত্বকে কোনো একটি সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল না করেও থাকতে পারে। সে সাফল্যের জন্য চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু সাফল্যকে নিজের আত্মমূল্যের একমাত্র প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ না করেও থাকতে পারে।

আধুনিক জীবনে এই শিক্ষার গুরুত্ব আরও বেশি। আজ মানুষ ক্রমাগত ফলের চাপে বাস করে। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়। একজন কর্মী পদোন্নতি নিয়ে চিন্তা করে। একজন ব্যবসায়ী লাভ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। একজন শিল্পী দর্শকের প্রশংসার ওপর নিজের সৃষ্টির মূল্য নির্ভর করাতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগের যুগে মানুষের আত্মপরিচয়ও অনেক সময় অন্যের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ফলে কাজের আনন্দ হারিয়ে গিয়ে ফলের উদ্বেগ সামনে চলে আসে।

গীতার অনাসক্তির শিক্ষা এখানে একটি গভীর মানসিক ভারসাম্য দিতে পারে। এর অর্থ লক্ষ্যহীন হয়ে যাওয়া নয়। বরং নিজের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকা বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। প্রস্তুতি, সততা, শ্রম, দক্ষতা এবং কর্তব্য মানুষের হাতে থাকে। কিন্তু ফলাফল সবসময় সম্পূর্ণভাবে মানুষের হাতে থাকে না। তাই মানুষকে নিজের কর্মের মান উন্নত করতে হবে এবং ফলাফলের অনিশ্চয়তার সঙ্গে শান্তভাবে বসবাসের ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

এই শিক্ষার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মনোবৈজ্ঞানিক সত্যও রয়েছে। অতিরিক্ত ফলকেন্দ্রিকতা মানুষকে ভয়ের মধ্যে আটকে দিতে পারে। যখন মানুষ ভাবে একটি নির্দিষ্ট ফল না পেলে আমি ব্যর্থ, তখন তার মন কাজের ওপর নয়, ফলের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। কিন্তু যখন সে ভাবে আমার কর্তব্য হলো সর্বোচ্চ সততা এবং সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করা, তখন কাজের প্রতি তার মনোযোগ বাড়ে। ফলের অনিশ্চয়তা তাকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিতে পারে না।

ব্রহ্মণ্যাধায়ের সঙ্গে সঙ্গং ত্যক্ত্বা যুক্ত হওয়ার কারণে শ্লোকটির আধ্যাত্মিক অর্থ আরও গভীর হয়। শুধু ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করাই যথেষ্ট নয়। কর্মকে বৃহত্তর সত্যের কাছে সমর্পণ করার অনুভূতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন নিজের কর্মকে পরম সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে, তখন তার কর্মের কেন্দ্র ধীরে ধীরে নিজের ক্ষুদ্র অহংকার থেকে সরে বৃহত্তর কল্যাণের দিকে যায়।

এই আত্মসমর্পণ দুর্বলতার পরিচয় নয়। বরং এটি অহংকারের সীমা উপলব্ধি করার একটি পরিণত অবস্থা। মানুষ বুঝতে শেখে যে সে জীবনের সমস্ত পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক নয়। তার জন্ম, পরিবেশ, সুযোগ, প্রতিভা, সম্পর্ক এবং কর্মফল সবকিছু বহু বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে মুক্ত করতে পারে এবং একই সঙ্গে তাকে আরও বিনয়ী ও দায়িত্বশীল করতে পারে।

মহাভারতের প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। অর্জুনের সামনে ছিল গভীর কর্তব্যসংকট। তার ব্যক্তিগত অনুভূতি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক দায়িত্ব একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে এসেছিল। শ্রীকৃষ্ণ তাকে কেবল যুদ্ধ করতে বলেননি। তিনি তাকে কর্মের প্রকৃতি এবং কর্মের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের সম্পর্ক বুঝিয়েছেন। কর্তব্য পালন করতে হবে, কিন্তু কর্তব্যের ফল এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এমনভাবে আবদ্ধ হওয়া যাবে না যাতে সত্য ও ন্যায়ের বিচার হারিয়ে যায়।

এই দৃষ্টিতে ব্রহ্মণ্যাধায় কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা করোতি যঃ শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়। এটি মানুষের কর্মজীবনের একটি গভীর নৈতিক দর্শন। একজন মানুষ তার কাজকে বৃহত্তর সত্য, ন্যায় এবং কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করলে কর্মের চরিত্র বদলে যায়। তখন কর্ম শুধু জীবিকা অর্জনের উপায় থাকে না। কর্ম আত্মশুদ্ধির পথও হতে পারে।

শ্লোকটির গভীরতম শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে মানুষকে পৃথিবী থেকে পালাতে হবে না। তাকে নিজের কর্তব্য ত্যাগ করতে হবে না। তাকে সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে না। তাকে কাজ বন্ধ করতে হবে না। বরং তাকে নিজের কর্মের সঙ্গে সম্পর্কটি পরিবর্তন করতে হবে। কাজ থাকবে, কিন্তু অহংকার কমবে। চেষ্টা থাকবে, কিন্তু ফলের প্রতি অন্ধ নির্ভরতা থাকবে না। দায়িত্ব থাকবে, কিন্তু স্বার্থপরতা তার একমাত্র চালিকাশক্তি হবে না। সংসারের মধ্যে থাকা থাকবে, কিন্তু সংসার অন্তরের স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করতে পারবে না।

পদ্মপাতার উপমাটি তাই এই সমগ্র দর্শনের এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি। পদ্মপাতা জলের মধ্যে থেকেও জলের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ হয় না। মানুষও জীবনের মধ্যে থেকেও জীবনের বাহ্যিক উত্থান পতনের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে অধিকার না হয়ে থাকতে পারে। এটাই অনাসক্তির সৌন্দর্য। এটাই কর্মযোগের শক্তি।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে মুক্তি কর্মহীনতার মধ্যে নয়, বরং কর্মের মধ্যেই অন্তরের স্বাধীনতা খুঁজে পাওয়ার মধ্যে। কর্ম করো, কিন্তু কর্মের অহংকারে নিজেকে হারিয়ে ফেলো না। নিজের কর্তব্য পালন করো, কিন্তু ফলকে নিজের আত্মমূল্যের একমাত্র বিচারক বানিয়ো না। পৃথিবীর মধ্যে থেকো, কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের অন্তরকে দুলিয়ে দিও না। নিজের কর্মকে পরম সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করো এবং আসক্তির বন্ধন থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হও। তখন মানুষের জীবনও পদ্মপাতার মতো হয়ে উঠতে পারে। চারপাশে জলের স্পর্শ থাকবে, জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাকে স্পর্শ করবে, কিন্তু তার অন্তরের নির্মলতা এবং স্বাধীনতা সেই অভিজ্ঞতার দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হবে না। এই অবস্থাই গীতার কর্মযোগের গভীর সৌন্দর্য এবং মানবজীবনের এক মহান আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 11, 2026 August 11, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি