সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৫.১২ | কর্মফল ত্যাগে পরম শান্তি ও আসক্তিতে কর্মবন্ধনের রহস্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
যুক্তঃ কর্মফলং ত্যক্ত্বা শান্তিমাপ্নোতি নৈষ্ঠিকীম্।অযুক্তঃ কামকারেণ ফলে সক্তো নিবধ্যতে।।১২।।
যুক্তঃ কর্মফলং ত্যক্ত্বা শান্তিমাপ্নোতি নৈষ্ঠিকীম্।
অযুক্তঃ কামকারেণ ফলে সক্তো নিবধ্যতে।।১২।।

অনুবাদঃ যোগী কর্মফল ত্যাগ করে নৈষ্ঠিকী শান্তি লাভ করেন; কিন্তু সকাম কর্মী কর্মফলের প্রতি আসক্ত হয়ে কর্ম করার ফলে কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। 

ভগবদ্গীতার দ্বাদশ শ্লোকটি কর্ম, কর্মফল, কামনা, আসক্তি, শান্তি এবং বন্ধনের মধ্যে মানুষের অন্তর্জগতের যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে তা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করেছে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে মানুষের জীবনের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিক অবস্থার কথা বলেছেন। একদিকে রয়েছেন সেই ব্যক্তি যিনি যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের কর্তব্য সম্পাদন করেন এবং কর্মের ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করেন। অন্যদিকে রয়েছেন সেই ব্যক্তি যিনি কামনার দ্বারা পরিচালিত হয়ে কর্মের ফলকে আঁকড়ে ধরেন। প্রথমজন লাভ করেন স্থায়ী শান্তি, আর দ্বিতীয়জন কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই শ্লোকের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই যে এটি বাহ্যিক কর্মকে বিচার করছে না, বরং কর্মের পেছনে থাকা মানুষের মানসিক অবস্থাকে বিচার করছে।

শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো যুক্তঃ। এই শব্দের মূল সংস্কৃত ধাতু যুজ্, যার মধ্যে যুক্ত হওয়া, সংযুক্ত হওয়া, নিয়ন্ত্রণ করা এবং একাগ্র হওয়ার ধারণা নিহিত রয়েছে। যুজ্ ধাতু থেকেই যোগ এবং যুক্ত শব্দের উৎপত্তি। তাই যুক্ত ব্যক্তি কেবল এমন একজন মানুষ নন যিনি কোনো কাজ করছেন। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি নিজের মন, বুদ্ধি এবং কর্মকে একটি উচ্চতর সত্যের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। গীতার প্রেক্ষাপটে যুক্ত হওয়া মানে নিজের কর্মকে ব্যক্তিগত স্বার্থের সংকীর্ণ সীমা থেকে মুক্ত করে কর্তব্য, ধর্ম এবং বৃহত্তর কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা। যে ব্যক্তি নিজের কাজের প্রতিটি মুহূর্তে শুধু আমি কী পাব এই প্রশ্নটি না করে আমার কর্তব্য কী এই প্রশ্নটি করেন, তিনি ধীরে ধীরে যুক্ত অবস্থার দিকে এগিয়ে যান।

এরপর এসেছে কর্মফলং শব্দটি। কর্ম এবং ফল এই দুটি ধারণার সমন্বয়ে কর্মফল শব্দটি গঠিত হয়েছে। কর্ম হলো মানুষের সম্পাদিত কাজ এবং ফল হলো সেই কাজের প্রত্যাশিত পরিণতি। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কর্মফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একজন ছাত্র পড়াশোনা করে ভালো ফলের আশায়। একজন ব্যবসায়ী পরিশ্রম করেন লাভের আশায়। একজন কর্মী কাজ করেন পদোন্নতির আশায়। একজন মানুষ ভালো ব্যবহার করেন সম্মান পাওয়ার আশায়। প্রত্যাশা মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রবণতা। কিন্তু গীতা যে প্রশ্নটি সামনে আনে তা হলো প্রত্যাশা যখন মানুষের কর্মের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে তখন কী ঘটে। তখন মানুষ কর্মের স্বাধীনতা হারিয়ে ফলের দাস হয়ে পড়ে।

এই কারণেই শ্লোকে এসেছে ত্যক্ত্বা শব্দটি। ত্যজ্ ধাতু থেকে ত্যক্ত্বা শব্দের উৎপত্তি এবং এর অর্থ ত্যাগ করে। তবে এখানে ত্যাগ বলতে কর্ম পরিত্যাগ বোঝানো হয়নি। শ্রীকৃষ্ণ মানুষকে কর্ম ছেড়ে দিতে বলছেন না। বরং কর্মের ফলের প্রতি মানসিক আসক্তি ত্যাগ করতে বলছেন। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজ করা মানুষের কর্তব্য হতে পারে, কিন্তু কাজের ফল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সবসময় সম্ভব নয়। একজন কৃষক জমিতে বীজ বপন করতে পারেন, জমি প্রস্তুত করতে পারেন এবং যত্ন নিতে পারেন। কিন্তু বৃষ্টি হবে কি না, ঝড় আসবে কি না অথবা শেষ পর্যন্ত কতটা ফসল হবে তা সম্পূর্ণভাবে তার হাতে থাকে না। তাই কর্ম মানুষের হাতে থাকলেও কর্মফল সম্পূর্ণভাবে মানুষের হাতে থাকে না। এই সত্য উপলব্ধি করাই কর্মযোগের একটি মৌলিক ভিত্তি।

শ্লোকে কর্মফল ত্যাগের পর যে ফলের কথা বলা হয়েছে তা হলো শান্তি। শান্তি শব্দটি এখানে সাময়িক স্বস্তি বোঝায় না। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন শান্তিমাপ্নোতি নৈষ্ঠিকীম্। অর্থাৎ যোগযুক্ত ব্যক্তি এমন এক শান্তি লাভ করেন যা দৃঢ়, স্থায়ী এবং অন্তর্গত। নৈষ্ঠিকী শব্দটি নিষ্ঠা ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে দৃঢ়তা, স্থিরতা এবং অবিচলতার ভাব রয়েছে। ফলে নৈষ্ঠিকী শান্তি বলতে এমন একটি অন্তঃশান্তিকে বোঝায় যা বাইরের পরিস্থিতির ওঠানামায় সহজে নষ্ট হয় না। বাহ্যিক সাফল্য এলে যে আনন্দ হয় এবং ব্যর্থতা এলে যে দুঃখ হয়, তার ঊর্ধ্বে যে মানসিক স্থিরতা গড়ে ওঠে সেটিই এই শান্তির গভীর অর্থ।

এই শান্তির প্রকৃতি বোঝার জন্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দেখা যায়। একজন ছাত্র যদি নিজের সমস্ত মনোযোগ শুধু পরীক্ষার ফলের ওপর স্থাপন করে, তবে পরীক্ষার আগেই তার মধ্যে ভয়, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। সে হয়তো পড়াশোনা করছে, কিন্তু তার মন ভবিষ্যতের ফলাফলের মধ্যে আটকে আছে। অন্যদিকে আরেকজন ছাত্র যদি নিজের কর্তব্য হিসেবে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে এবং নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার দিকে গুরুত্ব দেয়, তবে তার মানসিক স্থিরতা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। ফলাফল তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি তার সমগ্র অস্তিত্বের মূল্য নির্ধারণ করে না। গীতার ভাষায় দ্বিতীয় অবস্থাটি যুক্ত অবস্থার কাছাকাছি।

এর বিপরীত অবস্থাকে বোঝাতে শ্রীকৃষ্ণ ব্যবহার করেছেন অযুক্তঃ শব্দটি। অযুক্ত শব্দটি যুক্ত শব্দের বিপরীত ভাব প্রকাশ করে। এখানে অযুক্ত ব্যক্তি এমন একজন মানুষ যিনি নিজের মন ও কর্মকে উচ্চতর উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেননি। তিনি নিজের কামনা, প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত হন। তার কর্মের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে আমি কী পাব। ফলে তার মানসিক স্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত হয়। যে ফল পাওয়ার জন্য তিনি কাজ করেন, সেই ফলের ওপর তার সুখ নির্ভর করতে শুরু করে।

এরপর এসেছে কামকারেণ শব্দটি। কাম শব্দের অর্থ ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা বা বাসনা। কামকারেণ বলতে কামনা দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ভাব বোঝায়। মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা থাকা স্বাভাবিক। আকাঙ্ক্ষা মানুষকে এগিয়েও নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যখন আকাঙ্ক্ষা বুদ্ধি ও কর্তব্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে তখন তা বন্ধনের কারণ হতে পারে। একজন মানুষ যদি মনে করেন আমাকে অবশ্যই জিততে হবে, আমাকে অবশ্যই অন্যদের চেয়ে বড় হতে হবে অথবা আমাকে অবশ্যই নির্দিষ্ট একটি ফল পেতে হবে, তখন তার কর্মের স্বাধীনতা কমে যায়। সে ফলের সঙ্গে নিজের আত্মমূল্যকে যুক্ত করে ফেলে।

এই অবস্থার পরিণতি বোঝাতে শ্লোকে এসেছে ফলে সক্তঃ। সক্ত শব্দের মধ্যে আসক্ত হওয়া এবং কোনো কিছুর সঙ্গে গভীরভাবে লেগে থাকার অর্থ রয়েছে। ফলে সক্তঃ অর্থ হলো কর্মের ফলের সঙ্গে আসক্ত ব্যক্তি। এখানে আসক্তি শুধু কোনো কিছু পছন্দ করা নয়। আসক্তি হলো এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে কোনো নির্দিষ্ট ফল ছাড়া নিজের শান্তি, সুখ বা আত্মপরিচয়কে কল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ফল পাওয়া মানে আনন্দ এবং ফল না পাওয়া মানে নিজের পরাজয় বলে মনে হয়। মানুষ ফলের সঙ্গে যত বেশি নিজের অস্তিত্বকে যুক্ত করে, তত বেশি সে সেই ফলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

শ্লোকের শেষ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো নিবধ্যতে। এর অর্থ আবদ্ধ হয় বা বন্ধনে পড়ে। সংস্কৃত নিধাতু বন্ধনের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে কর্মবন্ধন কোনো দৃশ্যমান দড়ি নয়। এটি মানুষের নিজের মন দ্বারা নির্মিত বন্ধন। মানুষ যখন কর্মের ফলকে নিজের সুখের একমাত্র ভিত্তি বানিয়ে ফেলে, তখন সেই ফলের অনিশ্চয়তা তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। সাফল্যের ভয়, ব্যর্থতার ভয়, হারানোর ভয়, অন্যের সঙ্গে তুলনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তখন তার মানসিক জীবনের অংশ হয়ে যায়। এই কারণেই গীতা বাহ্যিক বন্ধনের চেয়ে অভ্যন্তরীণ বন্ধনকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখায়।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকটি মানুষের স্বাধীনতার একটি গভীর তত্ত্ব প্রকাশ করে। মানুষ কাজ করবে, কিন্তু কাজের ফল সবসময় তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। এই বাস্তবতার সঙ্গে যে ব্যক্তি শান্তভাবে মানিয়ে নিতে পারেন তিনি ধীরে ধীরে অন্তর্গত স্বাধীনতা লাভ করেন। আর যে ব্যক্তি নিজের সুখকে বাহ্যিক ফলের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল করে তোলেন তিনি বাহ্যিকভাবে স্বাধীন হলেও মানসিকভাবে পরাধীন হয়ে পড়েন। তাই গীতার কর্মযোগ আসলে কর্ম থেকে পালানোর দর্শন নয়। এটি কর্মের মধ্যেই স্বাধীনতা আবিষ্কারের দর্শন।

বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শিক্ষার আরও গভীর অর্থ রয়েছে। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত সত্তাকে শুধুমাত্র কর্মের ফল, সামাজিক পরিচয়, সাফল্য বা ব্যর্থতার সঙ্গে এক করে দেখে তখন তার মধ্যে অহংকার এবং ভয়ের সৃষ্টি হয়। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে কর্ম তার কর্তব্য এবং ফল বৃহত্তর নিয়তির অংশ, তখন তার মধ্যে একটি বিচ্ছিন্ন অথচ দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নেয়। সে কাজ থেকে পালায় না, বরং কাজের মধ্যেই নিজের আসক্তিকে অতিক্রম করতে শেখে।

যোগদর্শনের দৃষ্টিতেও এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। মন যখন প্রত্যাশা, আকাঙ্ক্ষা এবং ফলের চিন্তায় ক্রমাগত বিচলিত থাকে তখন একাগ্রতা নষ্ট হয়। কিন্তু যখন মানুষ নিজের কর্মের প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ দেয় এবং ফলের উদ্বেগকে ক্রমশ পিছনে সরিয়ে দেয় তখন মন অধিক স্থির হতে পারে। এই স্থিরতাই ধীরে ধীরে অন্তরের শান্তির পথ তৈরি করে।

সাহিত্যিক ও প্রতীকী অর্থে কর্মফলকে একটি বীজের সঙ্গে তুলনা করা যায়। মানুষ বীজ বপন করতে পারে, মাটিকে প্রস্তুত করতে পারে এবং জল দিতে পারে। কিন্তু বীজ থেকে ঠিক কতটা ফল আসবে তা তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। কর্ম হলো বীজ বপন করা এবং ফল হলো প্রকৃতির হাতে তার পরিণতি। মানুষ যদি প্রতিদিন মাটি খুঁড়ে দেখতে থাকে বীজ থেকে গাছ বের হয়েছে কি না, তবে তার নিজের কাজই বাধাগ্রস্ত হবে। একইভাবে মানুষ যদি প্রতিটি কর্মের পর সঙ্গে সঙ্গে ফলের হিসাব করতে থাকে তবে তার মন কর্মের সৌন্দর্য ও কর্তব্যবোধ থেকে দূরে সরে যেতে পারে।

আধুনিক জীবনে এই শ্লোকের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট। কর্মক্ষেত্রে মানুষ পদোন্নতি, বেতন, প্রশংসা এবং সামাজিক মর্যাদার প্রত্যাশায় কাজ করে। ব্যবসায়ী লাভের প্রত্যাশায় কাজ করেন। শিক্ষার্থী নম্বরের প্রত্যাশায় পড়ে। শিল্পী দর্শকের প্রশংসার প্রত্যাশায় সৃষ্টি করেন। সামাজিক জীবনে মানুষ অন্যের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্যও অনেক কাজ করে। প্রত্যাশা যখন সীমা অতিক্রম করে তখন মানুষ নিজের কাজের মূল্য ভুলে যায়। তখন সাফল্য তাকে সাময়িক আনন্দ দেয় এবং ব্যর্থতা গভীর অস্থিরতা সৃষ্টি করে। গীতার শিক্ষা এই মানসিক নির্ভরতার পরিবর্তে কর্তব্য, নিষ্ঠা এবং অন্তর্গত স্থিরতার দিকে আহ্বান জানায়।

তবে কর্মফল ত্যাগের অর্থ কোনোভাবেই উদাসীনতা নয়। ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করা মানে নিজের কাজকে অবহেলা করা নয়। বরং এর অর্থ হলো কাজকে আরও সততা, দক্ষতা এবং মনোযোগের সঙ্গে সম্পন্ন করা। একজন সত্যিকারের কর্মযোগী নিজের কাজের মানের প্রতি যত্নবান থাকেন, কিন্তু ফলাফলকে নিজের অহংকারের মাপকাঠি বানান না। তিনি সফল হলে অহংকারে ভেসে যান না এবং ব্যর্থ হলে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েন না। তার কাছে কর্ম একটি সাধনা এবং ফল একটি পরিণতি।

এই কারণে শ্লোকটির কেন্দ্রীয় শিক্ষা কেবল ধর্মীয় জীবনের জন্য নয়। এটি ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, নেতৃত্ব, সমাজ এবং মানবসম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মানুষ যখন নিজের কর্তব্যকে গুরুত্ব দেয় এবং ফলের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আনে তখন তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আরও স্বাধীন হতে পারে। সে ভয়ের পরিবর্তে বিবেচনা দিয়ে কাজ করতে শেখে। অন্যের প্রশংসা বা নিন্দার পরিবর্তে নিজের নৈতিক বোধকে গুরুত্ব দিতে শেখে। এভাবেই কর্মযোগ একটি আধ্যাত্মিক ধারণা থেকে জীবনযাপনের একটি গভীর নীতিতে পরিণত হয়।

এই শ্লোকের ভাষাগত সৌন্দর্যও লক্ষণীয়। যুক্তঃ এবং অযুক্তঃ শব্দ দুটি একে অপরের বিপরীত। কর্মফল ত্যক্ত্বা এবং ফলে সক্তঃ একদিকে ত্যাগের কথা বলে, অন্যদিকে আসক্তির কথা বলে। শান্তিমাপ্নোতি এবং নিবধ্যতে একদিকে মুক্তির অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে বন্ধনের পরিণতি নির্দেশ করে। অর্থাৎ শ্লোকটির সম্পূর্ণ কাঠামোর মধ্যে একটি গভীর মানসিক যাত্রা রয়েছে। মানুষ কোন পথে যাবে তা নির্ভর করছে তার কর্মের চেয়ে তার কর্মের প্রতি মনোভাবের ওপর।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের এমন একটি সত্যের সামনে দাঁড় করায় যা মানবজীবনের বহু দুশ্চিন্তার মূল কারণকে স্পর্শ করে। আমরা অনেক সময় কাজের চেয়ে ফল নিয়ে বেশি চিন্তা করি। ভবিষ্যৎ কী হবে, মানুষ কী বলবে, আমি সফল হব কি না, আমার প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না এসব প্রশ্ন আমাদের বর্তমান কর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো বর্তমান কর্তব্যের প্রতি সম্পূর্ণ নিষ্ঠা এবং ফলের প্রতি অনাসক্তি। কারণ ফলের ওপর সম্পূর্ণ অধিকার না থাকলেও কর্মের ক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা, সততা এবং নিষ্ঠার সুযোগ থাকে।

অতএব এই শ্লোকের গভীর সারমর্ম হলো মানুষকে কর্ম থেকে মুক্ত হতে হবে না, বরং কর্মের ফলের প্রতি অন্ধ আসক্তি থেকে মুক্ত হতে হবে। যুক্ত ব্যক্তি কর্ম করেন কিন্তু কর্মফলের দাস হন না। অযুক্ত ব্যক্তি কর্ম করেন এবং ফলের আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত হন। প্রথম অবস্থায় কর্ম সাধনায় পরিণত হয় এবং দ্বিতীয় অবস্থায় কর্ম বন্ধনে পরিণত হয়। কর্মফল ত্যাগের মধ্য দিয়ে যে শান্তি আসে তা বাইরের কোনো বস্তু থেকে পাওয়া শান্তি নয়। এটি আসে নিজের কর্তব্য পালন করে নিজের মনকে ফলের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার মাধ্যমে। এই কারণেই শ্লোকটি আজও মানুষের কাছে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। এর শিক্ষা এক কথায় বলা যায়, মানুষ তার কর্মকে যত্ন দিয়ে সম্পন্ন করবে, কিন্তু নিজের শান্তিকে কর্মফলের হাতে সমর্পণ করবে না। এখানেই কর্মযোগের স্বাধীনতা, এখানেই অন্তরের শান্তি এবং এখানেই কর্মের মধ্য দিয়ে মুক্তির পথ।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 11, 2026 August 11, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি