শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৫.১৫ | পাপ-পুণ্যের দায়িত্ব, অজ্ঞানতা ও আত্মজ্ঞান লাভের গভীর তত্ত্ব
নাদত্তে কস্যচিৎ পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভুঃ।
অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ।।১৫।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান জীবের পাপ অথবা পুণ্য কিছুই গ্রহণ করেন না। অজ্ঞানের দ্বারা প্রকৃত জ্ঞান আবৃত হওয়ার ফলে জীবসমূহ মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
এই শ্লোকের মূল বক্তব্য হলো সর্বব্যাপী পরম সত্তা কারও পাপ নিজের উপর গ্রহণ করেন না এবং কারও সুকর্মও নিজের বলে গ্রহণ করেন না। মানুষের অন্তর্নিহিত জ্ঞান অজ্ঞানের দ্বারা আবৃত হয়ে থাকার কারণেই জীবসমূহ মোহগ্রস্ত হয়। এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যে মানুষের নৈতিক দায়িত্ব, কর্মফল, আত্মপরিচয়, অজ্ঞানতা এবং আত্মজ্ঞান সম্পর্কে গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত রয়েছে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো নাদত্তে। সংস্কৃত আদত্তে শব্দের সঙ্গে নিষেধবাচক ন যুক্ত হয়ে নাদত্তে রূপটি গঠিত হয়েছে। এর অর্থ গ্রহণ করেন না বা নিজের উপর নেন না। এখানে গ্রহণ করার অর্থ কেবল কোনো বস্তু গ্রহণ করা নয়। মানুষের পাপ ও পুণ্যের দায়িত্ব ঈশ্বর নিজের উপর নেন না, এই ভাবটি এর মধ্যে নিহিত। অর্থাৎ মানুষ যে কর্ম করে তার নৈতিক দায়িত্ব তার নিজের। ঈশ্বর মানুষের কর্মের অস্তিত্ব মুছে দিয়ে তার ফল নিজের উপর গ্রহণ করেন না।
এরপর এসেছে কস্যচিৎ শব্দটি। কস্য অর্থ কার এবং চিৎ যোগে অর্থ দাঁড়ায় কারও বা কোনো ব্যক্তির। পাপং শব্দের অর্থ পাপ বা অধর্ম এবং সুকৃতং শব্দের অর্থ সুকর্ম বা শুভকর্ম। সুকৃত শব্দটি সু এবং কৃত এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। সু অর্থ উত্তম বা শুভ এবং কৃত অর্থ করা হয়েছে। তাই সুকৃতের আক্ষরিক অর্থ উত্তমভাবে করা কর্ম এবং প্রাসঙ্গিক অর্থে এটি শুভকর্ম, পুণ্য বা নৈতিকভাবে কল্যাণকর কাজকে বোঝায়। অন্যদিকে পাপ এমন কর্মকে নির্দেশ করে যা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে অবনতির দিকে নিয়ে যায়।
শ্লোকের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো বিভুঃ। সংস্কৃত বিভু শব্দটি ব্যাপকতা, সর্বব্যাপিতা এবং সীমাহীন অস্তিত্বের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। বিভুঃ অর্থ সর্বব্যাপী, সর্বত্র বিরাজমান এবং সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে অবস্থানকারী। এখানে বিভুঃ দ্বারা পরম সত্তা বা ঈশ্বরকে বোঝানো হয়েছে। এই শব্দটি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে চেয়েছেন যে পরম সত্তা মানুষের সীমাবদ্ধ কর্মের মতো সীমাবদ্ধ কোনো ব্যক্তিগত কর্মের কর্তা হিসেবে আবদ্ধ নন।
এই পর্যায়ে শ্লোকটি একটি গভীর নৈতিক প্রশ্নের সামনে মানুষকে দাঁড় করায়। যদি ঈশ্বর সর্বব্যাপী হন, তাহলে মানুষের পাপের জন্য ঈশ্বরকে দায়ী করা যাবে কি। গীতার এই বক্তব্য অনুযায়ী উত্তর হলো না। মানুষ নিজের কর্মের জন্য নিজেই দায়ী। ঈশ্বর মানুষের অন্তরে উপস্থিত হলেও মানুষের প্রত্যেকটি ইচ্ছা, সিদ্ধান্ত ও কর্মকে জোর করে পরিচালনা করেন না। মানুষের অজ্ঞানতা, আসক্তি, অহংকার এবং ভুল বিচার তার কর্মজগতকে প্রভাবিত করে। তাই নিজের কর্মের দায়িত্ব অন্য কারও উপর চাপিয়ে দেওয়া আত্মজ্ঞান নয়।
শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে আসে অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং। এখানে অজ্ঞান শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অজ্ঞান শব্দটি অ এবং জ্ঞান এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। অ অর্থ অনুপস্থিতি বা অভাব এবং জ্ঞান অর্থ জানা বা সত্যকে উপলব্ধি করা। তবে গীতার দর্শনে অজ্ঞান বলতে শুধু কোনো বিষয় না জানা বোঝায় না। এটি মানুষের প্রকৃত আত্মস্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতাকে নির্দেশ করে। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে দেহ, মন, ইন্দ্রিয়, সম্পদ, ক্ষমতা, সামাজিক অবস্থান এবং অহংকারকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করে, তখন সেই অবস্থাই আধ্যাত্মিক অজ্ঞানের প্রকাশ।
আবৃত শব্দটি এসেছে এমন একটি সংস্কৃত ধাতু থেকে যার সঙ্গে ঢেকে রাখা বা আচ্ছাদিত করার ধারণা যুক্ত। অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং অর্থ অজ্ঞানের দ্বারা জ্ঞান আবৃত হয়েছে। এখানে একটি অত্যন্ত সুন্দর প্রতীকী ভাব প্রকাশ পেয়েছে। জ্ঞান সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়নি। বরং তা আবৃত হয়েছে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন মেঘ সূর্যকে ঢেকে রাখলেও সূর্যকে ধ্বংস করতে পারে না, তেমনি অজ্ঞান মানুষের অন্তর্নিহিত জ্ঞানকে ধ্বংস করে না। কেবল তার প্রকাশকে আড়াল করে রাখে।
এই কারণেই জ্ঞানকে সূর্যের সঙ্গে এবং অজ্ঞানকে মেঘের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আকাশে মেঘ জমলে মানুষের চোখে সূর্যের আলো কমে যায়। কিন্তু সূর্য নিজে নিভে যায় না। মেঘ সরে গেলে আলো আবার প্রকাশিত হয়। মানুষের ক্ষেত্রেও আত্মজ্ঞান কোনো নতুন বস্তু হিসেবে বাইরে থেকে এসে সৃষ্টি হয় না। বরং অজ্ঞানতার আবরণ দূর হলে অন্তর্নিহিত সত্যের উপলব্ধি জেগে ওঠে। এই দৃষ্টিতে আধ্যাত্মিক সাধনা মূলত জ্ঞান সৃষ্টি করার চেয়ে অজ্ঞান দূর করার প্রক্রিয়া।
এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ। তেন অর্থ সেই কারণে এবং মুহ্যন্তি এসেছে মুহ্ ধাতু থেকে, যার মধ্যে মোহগ্রস্ত হওয়া বা বিভ্রান্ত হওয়ার ভাব রয়েছে। জন্তবঃ শব্দটি জন্মগ্রহণকারী জীব বা সকল জীবকে বোঝায়। অর্থাৎ অজ্ঞানের কারণে জীবসমূহ মোহগ্রস্ত হয়। মানুষ যখন বাস্তব এবং অবাস্তবের পার্থক্য বুঝতে পারে না, তখন সে নিজের প্রকৃত স্বরূপ ভুলে যায়। তখন সাময়িক বিষয়কে স্থায়ী মনে করে, দেহকে আত্মা মনে করে, সম্পদকে নিরাপত্তা মনে করে এবং অহংকারকে নিজের প্রকৃত পরিচয় মনে করে। এই ভুল পরিচয় থেকেই আসক্তি, ভয়, ক্রোধ, লোভ এবং দুঃখের জন্ম হয়।
এই শ্লোকের দার্শনিক গভীরতা এখানেই যে এটি মানুষের দুঃখের মূল কারণ হিসেবে বাইরের জগতকে নয়, বরং অন্তরের অজ্ঞানতাকে নির্দেশ করে। মানুষ প্রায়ই মনে করে বাইরের পরিস্থিতিই তার দুঃখের একমাত্র কারণ। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে একই পরিস্থিতিতে দুই ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। কারণ তাদের অভ্যন্তরীণ জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আত্মপরিচয় এক নয়। বাহ্যিক ঘটনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই ঘটনাকে আমরা কীভাবে উপলব্ধি করছি।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের জ্ঞান ও অজ্ঞান ধারণা আরও গভীর অর্থ বহন করে। এখানে অজ্ঞানকে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অবিদ্যা হিসেবে দেখা হয়। মানুষ নিজের চৈতন্যস্বরূপকে না জেনে দেহ ও মনকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করে। জ্ঞান উদিত হলে এই ভুল পরিচয় দূর হয়। তখন মানুষ উপলব্ধি করে যে তার গভীরতম সত্তা কেবল পরিবর্তনশীল দেহ, অনুভূতি বা চিন্তার সমষ্টি নয়।
অন্যদিকে ভক্তিমূলক দর্শনে ঈশ্বর সর্বশক্তিমান ও সর্বব্যাপী হলেও জীবের কর্ম ও নৈতিক দায়িত্বকে অস্বীকার করা হয় না। ঈশ্বর ন্যায়ের বিধান প্রতিষ্ঠা করেন, কিন্তু মানুষের পাপকে ঈশ্বরের নিজের কর্ম হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের মধ্যে আত্মসংযম এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে। মানুষ বুঝতে শেখে যে ঈশ্বরের উপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিজের কর্মের ফল থেকে মুক্ত হওয়া যায় না।
শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। পাপ এখানে অন্ধকারের প্রতীক এবং সুকৃত আলো বা শুভ প্রবণতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিভুঃ সর্বব্যাপী চৈতন্যের প্রতীক। অজ্ঞান হলো এমন একটি আবরণ যা মানুষের দৃষ্টিকে সংকুচিত করে এবং জ্ঞান হলো সেই অন্তর্দৃষ্টি যা বাস্তবতাকে পরিষ্কারভাবে দেখতে সাহায্য করে। জন্তবঃ হলো সেই মানুষ বা জীবসমষ্টি যারা এই অজ্ঞানের কারণে নিজেদের প্রকৃত পরিচয় ভুলে সংসারের মোহে আবদ্ধ থাকে।
বাস্তব জীবনে এর একটি সহজ উদাহরণ হলো আয়না। আয়নার উপর ধুলো জমলে মুখের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট দেখা যায় না। তখন কেউ যদি বলে যে আয়নার মধ্যে কোনো প্রতিচ্ছবি নেই, তার বক্তব্য সত্য হবে না। প্রতিচ্ছবি আছে, কিন্তু ধুলোর কারণে তা স্পষ্ট নয়। মানুষের অন্তরের জ্ঞানও তেমনি। অজ্ঞানতা, অহংকার, আসক্তি এবং ভুল ধারণা সেই ধুলোর মতো যা সত্যকে আড়াল করে রাখে। আত্মজ্ঞান সেই ধুলো সরিয়ে দেয়।
আরেকটি উদাহরণ সূর্য ও মেঘের। মেঘে আকাশ ঢেকে গেলে মনে হয় সূর্যের আলো কমে গেছে। কিন্তু বাস্তবে সূর্যের অস্তিত্ব বা দীপ্তি কমে যায়নি। মানুষের চৈতন্যও তেমন। অজ্ঞানের আবরণ যত ঘন হয়, মানুষ তত বেশি নিজের অন্তর্নিহিত জ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করে। কিন্তু আবরণ সরে গেলে সত্যের উপলব্ধি আবার প্রকাশিত হয়।
এই শ্লোক আধুনিক মানুষের জীবনেও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আজ মানুষ অসংখ্য তথ্যের মধ্যে বাস করেও প্রকৃত জ্ঞানের অভাবে ভুগতে পারে। তথ্য জানা এবং আত্মজ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। পৃথিবী সম্পর্কে অনেক কিছু জানা সম্ভব, কিন্তু নিজের রাগ, লোভ, ভয়, অহংকার এবং আসক্তির প্রকৃতি না বুঝলে মানুষের অন্তর্দৃষ্টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই গীতার জ্ঞান কেবল বই পড়ার জ্ঞান নয়। এটি নিজের অস্তিত্বকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার জ্ঞান।
শ্লোকটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মানুষকে নিজের কর্মের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে এবং নিজের অজ্ঞানের প্রকৃতি বুঝতে হবে। অন্যকে দোষারোপ করা সহজ, পরিস্থিতিকে দোষ দেওয়া সহজ এবং ভাগ্যের উপর সবকিছু ছেড়ে দেওয়াও সহজ। কিন্তু আত্মজ্ঞান মানুষকে নিজের ভিতরের কারণ অনুসন্ধান করতে শেখায়। সে প্রশ্ন করতে শেখে কেন সে ক্রুদ্ধ হয়, কেন সে আসক্ত হয়, কেন সে ভয় পায় এবং কেন সে এমন সিদ্ধান্ত নেয় যা পরে তাকে অনুতপ্ত করে। এই আত্মঅনুসন্ধান থেকেই জ্ঞানের সূচনা হতে পারে।
অতএব এই শ্লোক কেবল ঈশ্বর পাপ বা পুণ্য গ্রহণ করেন না এই বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা আরও গভীর। মানুষ নিজের কর্মের জন্য দায়ী, কিন্তু তার প্রকৃত জ্ঞান অজ্ঞানের দ্বারা আচ্ছন্ন। তাই মুক্তির পথ অন্যের উপর দোষ চাপানো নয়। নিজের অজ্ঞানের আবরণকে চিনে তা দূর করা। যখন জ্ঞান অজ্ঞানের আবরণ ভেদ করে প্রকাশিত হয়, তখন মানুষ নিজের কর্ম, নিজের মন এবং নিজের অস্তিত্বকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। তখন পাপ ও পুণ্যের বাহ্যিক বিচার অতিক্রম করে আত্মস্বরূপের উপলব্ধির দিকে যাত্রা শুরু হয়।
এই কারণেই শ্লোকটির সারকথা একটি সূর্যের উপমায় ধরা যায়। সূর্য কখনও অন্ধকারের কাছে পরাজিত হয় না। অন্ধকার কেবল সূর্যালোকের অনুপস্থিতির অনুভূতি। তেমনি জ্ঞান কখনও সত্যিকার অর্থে ধ্বংস হয় না। অজ্ঞান কেবল তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। মানুষের সাধনা হলো সেই আবরণ সরিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করা। আর সেই উপলব্ধির সঙ্গে আসে কর্মের দায়িত্ব, আত্মপরিচয়ের স্পষ্টতা, মোহ থেকে মুক্তি এবং জীবনের গভীরতর অর্থের সন্ধান। এইভাবেই ভগবদ্গীতার এই শ্লোক মানুষকে বাহ্যিক জগতের পরিবর্তনের আগে নিজের অন্তর্জগতকে দেখার আহ্বান জানায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!