শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৫.১৮ | বিদ্যাবিনয়সম্পন্ন জ্ঞানীর সমদর্শিতা ও সকল জীবের মধ্যে এক আত্মতত্ত্ব
বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি।
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পন্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ।।১৮।।
অনুবাদঃ জ্ঞানবান পন্ডিতেরা বিদ্যা-বিনয়সম্পন্ন ব্রাহ্মণ, গাভী, হস্তী, কুকুর ও চন্ডাল সকলের প্রতি সমদর্শী হন।
এই শ্লোকের মধ্যে বাহ্যিক পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা, জন্ম, দেহের আকৃতি, জীবের প্রজাতি এবং সামাজিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে সমস্ত জীবের মধ্যে এক অভিন্ন সত্যকে উপলব্ধি করার শিক্ষা রয়েছে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ এমন একজন জ্ঞানীর কথা বলছেন যিনি বিদ্যা ও বিনয়ে সমৃদ্ধ ব্রাহ্মণ, গরু, হাতি, কুকুর এবং শ্বপাক বা সমাজের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিম্ন অবস্থানে থাকা মানুষের মধ্যেও একই আত্মতত্ত্ব উপলব্ধি করেন। এই দৃষ্টি বাহ্যিক সাম্য প্রতিষ্ঠার সাধারণ ধারণার চেয়েও গভীর। এটি অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত ঐক্যকে উপলব্ধি করার দৃষ্টি।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে। বিদ্যা শব্দটি সংস্কৃত বিদ্ ধাতু থেকে এসেছে। বিদ্ ধাতুর অর্থ জানা, উপলব্ধি করা বা জ্ঞান লাভ করা। বিদ্যা বলতে তাই কেবল বই পড়ে অর্জিত তথ্যকে বোঝায় না। প্রকৃত বিদ্যা হলো এমন জ্ঞান যা মানুষকে সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। এই বিদ্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিনয়। বিনয় শব্দের মধ্যে নম্রতা, শিষ্টতা, আত্মসংযম এবং অহংকার থেকে মুক্ত থাকার ভাব রয়েছে। ফলে বিদ্যাবিনয়সম্পন্ন ব্যক্তি হলেন এমন একজন মানুষ যিনি জ্ঞানী এবং একই সঙ্গে বিনয়ী। এখানে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। জ্ঞান যদি অহংকার বাড়ায় তবে সেই জ্ঞান এখনো পূর্ণ জ্ঞান হয়ে ওঠেনি। প্রকৃত জ্ঞান মানুষের অন্তরে নম্রতা সৃষ্টি করে। সে যত বেশি সত্যকে উপলব্ধি করে, তত বেশি বুঝতে পারে যে নিজের জ্ঞান সীমিত এবং অস্তিত্বের রহস্য অসীম।
এরপর এসেছে ব্রাহ্মণে শব্দটি। ব্রাহ্মণ শব্দের মূল ভাব ব্রহ্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্রহ্ম বলতে সেই সর্বব্যাপী চৈতন্য বা পরম সত্যকে বোঝানো হয় যা সমগ্র অস্তিত্বের ভিত্তি। শ্লোকে ব্রাহ্মণ বলতে বিদ্যা ও বিনয়ে সমৃদ্ধ জ্ঞানী ব্রাহ্মণকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে তার জ্ঞান ও চরিত্রের দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীকৃষ্ণ এখানে কোনো বাহ্যিক পরিচয়কে অস্বীকার করছেন না। বরং তিনি দেখাচ্ছেন যে একজন জ্ঞানী মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার জন্মপরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার জ্ঞান, বিনয় এবং আত্মদর্শনের মধ্যেই তার প্রকৃত মর্যাদা প্রকাশিত হয়।
গবি শব্দের অর্থ গরুর মধ্যে বা গরুকে দেখার ক্ষেত্রে। সংস্কৃত গো শব্দটি গরুকে বোঝায় এবং গবি তার একটি বিভক্তিরূপ। হস্তিনি শব্দটি হস্তী বা হাতির মধ্যে অর্থ প্রকাশ করে। শ্লোকে ব্রাহ্মণ এবং গরু ও হাতিকে পাশাপাশি আনার উদ্দেশ্য অত্যন্ত গভীর। মানুষ সাধারণত বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করে। মানুষের কাছে মানুষ, পশু, শিক্ষিত ব্যক্তি, অশিক্ষিত ব্যক্তি, ধনী ব্যক্তি এবং দরিদ্র ব্যক্তি আলাদা আলাদা পরিচয় বহন করে। কিন্তু জ্ঞানীর দৃষ্টিতে এই পার্থক্যের আড়ালে একটি অভিন্ন অস্তিত্ব বিরাজ করে।
শুনি শব্দটি শ্বন শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ কুকুরের মধ্যে। চণ্ডাল বা শ্বপাকের সঙ্গে এর উল্লেখ শ্লোকটির সামাজিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে আরও গভীর করে। শ্বপাক শব্দের আক্ষরিক অর্থ এমন ব্যক্তি যে কুকুর রান্না করে বা কুকুরের মাংস রান্নার সঙ্গে যুক্ত। প্রাচীন সমাজের দৃষ্টিতে এই ধরনের মানুষ অত্যন্ত নিম্ন সামাজিক অবস্থানে বিবেচিত হতো। শ্রীকৃষ্ণ সেই সামাজিক ব্যবধানের মধ্যেই জ্ঞানের দৃষ্টিকে স্থাপন করেছেন। একদিকে বিদ্যাবিনয়সম্পন্ন ব্রাহ্মণ এবং অন্যদিকে সমাজের চোখে অবহেলিত শ্বপাক। বাহ্যিক বিচারে তাদের মধ্যে বিপুল পার্থক্য। কিন্তু আত্মতত্ত্বের দৃষ্টিতে জ্ঞানী তাদের মধ্যে একই পরম সত্তার উপস্থিতি উপলব্ধি করেন।
এখানেই আসে পণ্ডিতাঃ শব্দটি। সাধারণ ভাষায় পণ্ডিত বলতে শিক্ষিত বা বিদ্বান ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। কিন্তু গীতার দর্শনে পণ্ডিত শব্দের অর্থ আরও গভীর। যিনি শুধু শাস্ত্রের কথা জানেন তিনি পণ্ডিত নন। যিনি সেই জ্ঞানকে নিজের অস্তিত্বের মধ্যে উপলব্ধি করেছেন এবং যার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়েছে তিনিই প্রকৃত পণ্ডিত। তার জ্ঞান শুধু স্মৃতিতে থাকে না। তার আচরণে প্রকাশ পায়। তার দৃষ্টিতে প্রকাশ পায়। তার বিচারবোধে প্রকাশ পায়। তার মধ্যে অহংকারের পরিবর্তে বিনয় এবং বিভেদের পরিবর্তে ঐক্যের অনুভূতি জন্ম নেয়।
শ্লোকটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো সমদর্শিনঃ। সম শব্দের অর্থ সমান বা অভিন্ন এবং দর্শিন শব্দটি দৃশ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর অর্থ যিনি দেখেন বা উপলব্ধি করেন। সমদর্শী তাই এমন একজন যিনি সবকিছুকে বাহ্যিকভাবে একই রকম মনে করেন এমন নয়। বরং যিনি বিভিন্ন বাহ্যিক রূপের মধ্যে নিহিত অভিন্ন আত্মতত্ত্বকে উপলব্ধি করেন। গরু ও মানুষকে বাহ্যিকভাবে একই বলা এই শ্লোকের বক্তব্য নয়। ব্রাহ্মণ এবং শ্বপাকের সামাজিক ভূমিকা একই এমন কথাও বলা হচ্ছে না। বরং তাদের অন্তর্নিহিত আত্মসত্তার মূল প্রকৃতি এক এই সত্য উপলব্ধিই সমদর্শিতা।
এই পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। সমদর্শিতা মানে বাস্তব জীবনের সব পার্থক্য অস্বীকার করা নয়। একজন শিক্ষক এবং একজন শিক্ষার্থীর ভূমিকা এক নয়। একজন চিকিৎসক এবং একজন রোগীর ভূমিকা এক নয়। একজন মানুষের সঙ্গে একটি পশুর আচরণগত বৈশিষ্ট্যও এক নয়। কিন্তু এই সমস্ত পার্থক্যের অন্তরালে জীবন এবং চৈতন্যের যে মৌলিক সত্য রয়েছে তা উপলব্ধি করা সমদর্শনের মূল কথা। বাহ্যিক পার্থক্যকে স্বীকার করেও অন্তরের ঐক্যকে উপলব্ধি করা হলো প্রকৃত সমদৃষ্টি।
এই শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তি আত্মতত্ত্বের মধ্যে নিহিত। উপনিষদীয় চিন্তায় আত্মা দেহের সীমাবদ্ধ পরিচয় নয়। দেহ পরিবর্তনশীল, পরিচয় পরিবর্তনশীল এবং সামাজিক অবস্থানও পরিবর্তনশীল। কিন্তু আত্মাকে চিরন্তন চৈতন্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গীতার দৃষ্টিতে মানুষ যখন নিজেকে শুধু দেহ, নাম, পদ, সম্পদ, জাতি বা সামাজিক পরিচয় হিসেবে দেখে তখন তার মধ্যে বিভেদের অনুভূতি শক্তিশালী হয়। কিন্তু যখন সে নিজের গভীরতর সত্তাকে উপলব্ধি করতে শুরু করে তখন অন্যের মধ্যেও সেই একই চৈতন্যের উপস্থিতি দেখতে শেখে। তখন অন্যকে অবজ্ঞা করা কঠিন হয়ে যায়।
সমদর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অহংকারের বিলোপ। মানুষ সাধারণত নিজের পরিচয়কে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে। আমি বেশি শিক্ষিত, আমি বেশি ধনী, আমি বেশি ক্ষমতাবান, আমি উচ্চ বংশের, আমি অন্যের চেয়ে যোগ্য এই ধরনের চিন্তা থেকে অহংকার জন্ম নেয়। কিন্তু সমদর্শী ব্যক্তি বোঝেন যে বাহ্যিক পরিচয় সাময়িক। আজ যে মানুষ ক্ষমতাবান, কাল সে ক্ষমতাহীন হতে পারে। আজ যে ব্যক্তি ধনী, কাল তার সম্পদ হারিয়ে যেতে পারে। দেহও চিরস্থায়ী নয়। তাই বাহ্যিক পরিচয়ের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা গভীর জ্ঞানের লক্ষণ নয়।
এই শ্লোকের মধ্যে মানবিক মর্যাদার একটি শক্তিশালী ধারণাও রয়েছে। যদি প্রত্যেক জীবের মধ্যে একই পরম চৈতন্যের প্রকাশ থাকে, তাহলে কোনো মানুষকে কেবল জন্ম বা সামাজিক অবস্থানের কারণে ঘৃণা করা বা অবজ্ঞা করা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সমদর্শিতা মানুষকে অন্যের প্রতি সম্মান করতে শেখায়। এটি সামাজিক বৈষম্যের সমস্ত বাস্তব সমস্যার সরাসরি রাজনৈতিক সমাধান নয়, কিন্তু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ভিতরে এমন একটি পরিবর্তন ঘটায় যা ন্যায়বোধ ও সহমর্মিতার ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানের দিক থেকেও এই শ্লোক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মন স্বাভাবিকভাবেই শ্রেণিবিভাগ তৈরি করে। কে আমার মতো, কে আমার থেকে আলাদা, কে শক্তিশালী, কে দুর্বল, কে সম্মানের যোগ্য এবং কে অবহেলার যোগ্য এই ধরনের বিচার মানুষের মধ্যে খুব সহজেই তৈরি হয়। এই মানসিক প্রবণতা থেকে পক্ষপাত, অহংকার এবং বিদ্বেষ জন্ম নিতে পারে। সমদর্শনের শিক্ষা সেই মানসিক অভ্যাসকে প্রশ্ন করে। এটি মানুষকে বাহ্যিক পরিচয়ের পরিবর্তে গভীর মানবিক সত্তার দিকে তাকাতে শেখায়।
আধুনিক সমাজে এই শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক। আজ মানুষের পরিচয় নানা স্তরে বিভক্ত। ধর্ম, ভাষা, জাতি, অর্থনৈতিক অবস্থান, শিক্ষা, পেশা, রাজনৈতিক মত, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা মানুষের মধ্যে নানা ধরনের দূরত্ব তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও অনেক সময় মানুষকে নিজের মতের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। ফলে ভিন্ন মতের মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। সমদর্শনের শিক্ষা এখানে মনে করিয়ে দেয় যে মতের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সেই পার্থক্য যেন মানুষের প্রতি মৌলিক সম্মানকে ধ্বংস না করে।
একজন প্রকৃত জ্ঞানীর উদাহরণ কল্পনা করা যেতে পারে। তিনি একজন শিক্ষিত মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন এবং একই আন্তরিকতায় একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কথাও শুনছেন। তিনি একটি প্রাণীর প্রতি করুণা অনুভব করছেন এবং মানুষের প্রতিও দায়িত্ববোধ রাখছেন। তিনি কাউকে তার পোশাক, সম্পদ বা সামাজিক পরিচয় দিয়ে বিচার করছেন না। তার বিচার বাহ্যিক পরিচয়ের পরিবর্তে মানুষের চরিত্র, আচরণ এবং অন্তর্নিহিত সত্তার দিকে। এই আচরণই সমদর্শনের বাস্তব প্রকাশ।
সাহিত্যের ভাষায় সমদর্শিতা হলো এমন এক দৃষ্টি যা মুখোশের ওপারে মানুষকে দেখতে শেখে। রাজা ও ভিখারি, জ্ঞানী ও অজ্ঞ, ধনী ও দরিদ্র, শক্তিশালী ও দুর্বল, মানুষ ও পশু এই সমস্ত বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে জীবনের একটি অভিন্ন প্রবাহ রয়েছে। একজন কবি যেমন একই আকাশের নিচে সব মানুষকে দেখতে পারেন, তেমনই সমদর্শী ব্যক্তি অস্তিত্বের গভীরে একটি অভিন্ন সত্যকে অনুভব করেন।
তবে সমদর্শিতা কখনোই অন্যায়কে সমর্থন করে না। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি সকলের মধ্যে একই আত্মতত্ত্ব দেখতে পারেন, কিন্তু তাই বলে অন্যায় ও ন্যায়কে একই বলে গ্রহণ করেন না। বরং সমদর্শী দৃষ্টি বিচারকে আরও নির্মোহ করতে পারে। কারণ সে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে বিচার না করে সত্য ও কর্তব্যের ভিত্তিতে বিচার করতে পারে। গীতার বৃহত্তর দর্শনে এই কারণেই জ্ঞান, কর্ম এবং সমত্ব একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
শ্লোকটির আধ্যাত্মিক প্রতীকও অত্যন্ত শক্তিশালী। ব্রাহ্মণ এখানে জ্ঞান ও সংস্কারের প্রতীক হিসেবে দেখা যেতে পারে। গরু কোমলতা ও পোষণশীলতার প্রতীক হতে পারে। হাতি শক্তির প্রতীক। কুকুর সাধারণ ও প্রাত্যহিক জীবনের প্রতীক। শ্বপাক সামাজিকভাবে অবহেলিত মানুষের প্রতীক। এই বিভিন্ন প্রতীকের মধ্যেও জ্ঞানী একই অন্তর্নিহিত চৈতন্য দেখতে পান। অর্থাৎ সত্যকে উপলব্ধি করতে হলে বাহ্যিক রূপের বৈচিত্র্যের মধ্যে থাকা ঐক্যকে দেখতে হবে।
এই শ্লোক আমাদের আরও একটি গভীর শিক্ষা দেয়। মানুষ অন্যকে যেভাবে দেখে, ধীরে ধীরে নিজের মনও সেভাবেই গড়ে ওঠে। যদি সে সর্বত্র শত্রু দেখতে থাকে তবে তার নিজের মন অশান্ত হয়। যদি সে সর্বত্র প্রতিযোগিতা দেখতে থাকে তবে তার মনে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে। কিন্তু যদি সে সকল জীবের মধ্যে একটি অভিন্ন অস্তিত্বের অনুভূতি তৈরি করতে পারে তবে তার মধ্যে সহমর্মিতা, শান্তি এবং স্থিরতা জন্মায়। তাই সমদর্শিতা শুধু অন্যকে দেখার পদ্ধতি নয়। এটি নিজের মনকে পরিশুদ্ধ করার একটি পথ।
শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষের দৃষ্টির পরিবর্তনের শিক্ষা। আমরা সাধারণত চোখ দিয়ে রূপ দেখি, বুদ্ধি দিয়ে পরিচয় বিচার করি এবং অহংকার দিয়ে মূল্য নির্ধারণ করি। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি এর গভীরে প্রবেশ করেন। তিনি রূপের পরিবর্তে সত্তাকে দেখেন। পরিচয়ের পরিবর্তে অস্তিত্বকে অনুভব করেন। বাহ্যিক শ্রেণির পরিবর্তে অন্তর্নিহিত ঐক্য উপলব্ধি করেন। এই কারণেই তিনি সমদর্শী।
ভগবদ্গীতার এই শ্লোকের সারকথা হলো জ্ঞান মানুষের দৃষ্টিকে পরিবর্তন করে। যে জ্ঞান মানুষকে অহংকারী করে তা এখনো পূর্ণ জ্ঞান নয়। যে জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে, অন্যের মধ্যে নিজের মতোই জীবনের উপস্থিতি অনুভব করায় এবং বাহ্যিক পার্থক্যের অন্তরালে থাকা ঐক্যকে উপলব্ধি করায়, সেই জ্ঞানই গভীর জ্ঞান। বিদ্যা যখন বিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন মানুষ পণ্ডিত হয়। আর সেই পাণ্ডিত্য যখন সমদর্শনের জন্ম দেয় তখন মানুষ আত্মতত্ত্বের গভীরতার দিকে অগ্রসর হয়।
এই শ্লোক তাই কেবল প্রাচীন ভারতের একটি আধ্যাত্মিক শিক্ষা নয়। এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির একটি চিরন্তন পরীক্ষা। আমরা একজন মানুষকে কী দিয়ে বিচার করি, তার জন্ম দিয়ে, সম্পদ দিয়ে, শিক্ষার স্তর দিয়ে, পেশা দিয়ে, বাহ্যিক পরিচয় দিয়ে, নাকি তার অন্তর্নিহিত মানবিক সত্তা দিয়ে। আমরা ভিন্ন মানুষকে কতটা সম্মান করতে পারি, দুর্বল জীবের প্রতি কতটা সহমর্মী হতে পারি এবং নিজের অহংকারকে কতটা অতিক্রম করতে পারি, তার মধ্যেই আমাদের জ্ঞানের প্রকৃত গভীরতা প্রকাশ পায়।
সুতরাং বিদ্যাবিনয়সম্পন্ন ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে গরু, হাতি, কুকুর এবং শ্বপাক পর্যন্ত সকলের মধ্যে সমদৃষ্টি স্থাপন করার শিক্ষা আসলে মানুষের চেতনার এক উচ্চতর বিকাশের কথা বলে। বাহ্যিক জগতে বৈচিত্র্য আছে এবং সেই বৈচিত্র্য থাকবে। কিন্তু বৈচিত্র্যের অন্তরালে যে এক অভিন্ন জীবনসত্তা প্রবাহিত, তাকে উপলব্ধি করাই সমদর্শনের মূল সত্য। যে চোখে এই সত্য ধরা পড়ে, সেই চোখ আর কেবল মানুষকে দেখে না। সে অস্তিত্বকে দেখতে শেখে। আর এই দেখাই জ্ঞানকে তথ্য থেকে উপলব্ধিতে, বিদ্যাকে প্রজ্ঞায় এবং মানুষকে সত্যিকার অর্থে পণ্ডিতের মর্যাদায় উন্নীত করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!