শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৫.১৯ | সমদর্শিতায় সংসারজয় ও ব্রহ্মস্থিতির গভীর তত্ত্ব
ইহৈব তৈর্জিতঃ সর্গো যেষাং সাম্যে স্তিতং মনঃ।
নির্দোষং হি সমং ব্রজ তস্মাদ্ ব্রহ্মণি তে স্থিতাঃ।।১৯।।
অনুবাদঃ যাঁদের মন সাম্যে অবস্থিত হয়েছে, তাঁরা ইহলোকেই জন্ম ও মৃত্যুর সংসার জয় করেছেন। তাঁরা ব্রহ্মের মতো নির্দোষ, তাই তাঁরা ব্রহ্মেই অবস্থিত হয়ে আছেন।
এই শ্লোকের মধ্যে কয়েকটি অত্যন্ত গভীর ধারণা একত্রিত হয়েছে। এখানে রয়েছে মন, সমতা, ব্রহ্ম, সংসার এবং মুক্তির সম্পর্ক। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যাদের মন সমদর্শিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তারা এই জীবনেই সৃষ্টির বন্ধন বা সংসারকে জয় করেছে। কারণ ব্রহ্ম নির্দোষ এবং সমদর্শী। তাই যারা সত্যিকার অর্থে সমদৃষ্টির অধিকারী হয়েছে তারা ব্রহ্মের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ইহৈব। ইহ অর্থ এখানে এবং এব অর্থই বা এই স্থানেই। দুটি শব্দ মিলিয়ে ইহৈব অর্থ দাঁড়ায় এই জীবনেই বা এখানেই। এই একটি শব্দের মধ্যেই গীতার মুক্তি দর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পেয়েছে। মানুষকে মুক্তির জন্য কেবল মৃত্যুর পরের কোনো অজানা জগতের অপেক্ষা করতে হবে এমন কথা এখানে বলা হচ্ছে না। মানুষের চেতনা যদি সত্যের উপলব্ধিতে প্রতিষ্ঠিত হয় তবে জীবিত অবস্থাতেই সে মুক্তির স্বাদ লাভ করতে পারে। অর্থাৎ মুক্তি কেবল মৃত্যুর পরের কোনো ঘটনা নয়। মুক্তি মানুষের চেতনার একটি রূপান্তর।
এরপর এসেছে তৈর্জিতঃ সর্গঃ। তৈঃ অর্থ তাদের দ্বারা এবং জিতঃ অর্থ জয় করা হয়েছে। সর্গ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত সৃজ্ ধাতু থেকে। সৃজ্ ধাতুর মূল অর্থ সৃষ্টি করা, প্রকাশ করা বা প্রবাহিত করা। সেই সূত্রে সর্গ শব্দের অর্থ সৃষ্টি। কিন্তু এই শ্লোকে সর্গকে শুধু বাহ্যিক সৃষ্টি হিসেবে গ্রহণ করলে শ্লোকটির গভীরতা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। এখানে সর্গ বলতে জন্ম, মৃত্যু, কর্মফল এবং সংসারের ধারাবাহিক বন্ধনকেও বোঝানো হয়েছে। তাই তৈর্জিতঃ সর্গঃ বলতে বোঝানো হয়েছে যে সমদর্শী ব্যক্তি সংসারের বন্ধনকে অতিক্রম করেছে।
এখানে জয় শব্দটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ জীবনে জয় বলতে আমরা অন্য কাউকে পরাজিত করাকে বুঝি। কিন্তু গীতার আধ্যাত্মিক দর্শনে প্রকৃত জয় অন্যকে পরাজিত করা নয়। প্রকৃত জয় হলো নিজের অজ্ঞতা, অহংকার, আসক্তি, রাগ, দ্বেষ এবং ভেদবুদ্ধিকে অতিক্রম করা। বাইরের পৃথিবীকে জয় করেও মানুষ নিজের মনকে জয় করতে না পারলে তার মধ্যে প্রকৃত শান্তি আসে না। আবার যে ব্যক্তি নিজের মনকে জয় করেছে তার কাছে বাইরের বহু প্রতিকূলতাও তার অন্তরের শান্তিকে সহজে নষ্ট করতে পারে না।
শ্লোকটির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো যেষাং সাম্যে স্থিতং মনঃ। যেষাং অর্থ যাদের এবং মনঃ অর্থ মন। সাম্য শব্দের অর্থ সমতা, ভারসাম্য বা পক্ষপাতহীনতা। স্থিতং অর্থ প্রতিষ্ঠিত বা স্থির। অর্থাৎ যাদের মন সমতার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে সমতা বলতে বাহ্যিকভাবে প্রত্যেক মানুষকে একই রকম মনে করাকে বোঝানো হয়নি। বরং এর অর্থ হলো বাহ্যিক পার্থক্যের মধ্যেও অন্তর্নিহিত একত্বকে উপলব্ধি করা।
মানুষের বাহ্যিক পরিচয় অসংখ্য রকম। কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র। কেউ শিক্ষিত, কেউ অশিক্ষিত। কেউ ক্ষমতাবান, কেউ সাধারণ। কেউ প্রশংসা পায়, কেউ অবহেলিত হয়। কিন্তু এই বাহ্যিক পার্থক্যের আড়ালে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে যে চৈতন্যের উপস্থিতি রয়েছে তার প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও উপলব্ধিই হলো সমদর্শিতা। তাই সমদর্শিতা মানে বাস্তব পার্থক্য অস্বীকার করা নয়। বরং পার্থক্যের মধ্যেও গভীর একত্বকে দেখা।
এই সমদর্শিতা মানুষের মানসিক জীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি প্রশংসা পেলে অতিরিক্ত অহংকারী হয়ে যায় এবং নিন্দা পেলে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে তার মন এখনো বাইরের পরিস্থিতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যে ব্যক্তি লাভে অত্যন্ত আনন্দিত এবং ক্ষতিতে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তার মন এখনো দ্বন্দ্বের মধ্যে আবদ্ধ। গীতার সমদর্শিতা মানুষকে অনুভূতিহীন হতে বলে না। বরং অনুভূতির দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়ে নিজের চেতনার গভীরে স্থির থাকতে শেখায়।
এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেন নির্দোষং হি সমং ব্রহ্ম। নির্দোষ অর্থ দোষহীন এবং সমং অর্থ সম বা পক্ষপাতহীন। ব্রহ্ম শব্দটির সঙ্গে বৃহ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। বৃহ্ অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, বিস্তৃত হওয়া বা ব্যাপ্ত হওয়া। সেই অর্থের ধারাবাহিকতায় ব্রহ্ম হলো সেই পরম সত্য যা সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এবং সর্বত্র ব্যাপ্ত। ব্রহ্ম কোনো সংকীর্ণ ব্যক্তি সত্তা নয়। এটি এমন এক সর্বব্যাপী চৈতন্যের ধারণা যা সমস্ত অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত সত্য হিসেবে বেদান্তে বিবেচিত হয়েছে।
ব্রহ্মকে নির্দোষ ও সম বলা হয়েছে। কারণ পরম সত্যের মধ্যে মানুষের মতো পক্ষপাত বা ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ নেই। সূর্য যেমন ধনী ও দরিদ্র উভয়ের ওপর সমানভাবে আলো দেয়, তেমনি ব্রহ্মও সমস্ত অস্তিত্বের মধ্যে সমভাবে বর্তমান। একটি আয়না যেমন সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তির সামাজিক পরিচয় বিচার না করে তাকে প্রতিফলিত করে, তেমনি পরম সত্যের দৃষ্টিতে বাহ্যিক পরিচয়ের ভেদ মূল সত্যকে পরিবর্তন করে না।
এই ধারণা থেকেই শ্লোকটির শেষ অংশ এসেছে তস্মাদ্ ব্রহ্মণি তে স্থিতাঃ। তস্মাৎ অর্থ সেই কারণে। ব্রহ্মণি অর্থ ব্রহ্মে এবং স্থিতাঃ অর্থ প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ যারা সমদৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠিত তারা ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত। এখানে একটি গভীর সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। সমদর্শিতা কেবল নৈতিক গুণ নয়। এটি আত্মজ্ঞান লাভের একটি লক্ষণ। যে ব্যক্তি সত্যিই উপলব্ধি করেছে যে সমস্ত জীবনের গভীরে এক পরম সত্য বিদ্যমান, তার পক্ষে অন্যের প্রতি অকারণ ঘৃণা, অহংকার বা অবজ্ঞা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। অদ্বৈত দর্শনে ব্রহ্মই পরম সত্য এবং আত্মা সেই ব্রহ্ম থেকে পৃথক কোনো চূড়ান্ত সত্তা নয়। মানুষের অজ্ঞতা তাকে নানা ভেদে আবদ্ধ করে। আমি এবং তুমি, আপন এবং পর, লাভ এবং ক্ষতি, সুখ এবং দুঃখের মধ্যে সে ক্রমাগত বিভাজন তৈরি করে। জ্ঞান উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিভাজনের অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায়। তখন মানুষ বাহ্যিক ভিন্নতার মধ্যেও অস্তিত্বের গভীর ঐক্য অনুভব করতে শুরু করে।
বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের আলোকে এই শ্লোকের অর্থ কিছুটা ভিন্নভাবে উপলব্ধি করা যায়। সেখানে জীব ও জগত ঈশ্বরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে সমদর্শিতা মানে প্রত্যেক জীবের মধ্যে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত মর্যাদা উপলব্ধি করা। অন্যদিকে দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের মধ্যে পার্থক্য স্বীকার করা হলেও সকল জীবের প্রতি ন্যায়, দয়া ও পক্ষপাতহীনতার গুরুত্ব অস্বীকার করা হয় না। ফলে বিভিন্ন দার্শনিক ব্যাখ্যার মধ্যেও সমদর্শিতার একটি সাধারণ মানবিক ও আধ্যাত্মিক মূল্য রয়েছে।
এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হলো দাঁড়িপাল্লা। দাঁড়িপাল্লা কোনো পক্ষকে ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে বেশি গুরুত্ব দেয় না। তার কাজ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। মানুষের মনও যদি তেমন ভারসাম্য অর্জন করতে পারে তবে বাহ্যিক পরিস্থিতির ওঠানামা তাকে সহজে বিচলিত করতে পারে না। তবে গীতার সমতা কোনো নিষ্প্রাণ নির্লিপ্ততা নয়। এটি সচেতন ভারসাম্য। মানুষ অন্যায় দেখলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু ঘৃণা ও প্রতিহিংসার দ্বারা নিজের বিচারবুদ্ধিকে অন্ধ না করেও তা করতে পারে।
এই শিক্ষা আধুনিক জীবনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের মতামত মুহূর্তে প্রশংসা ও নিন্দার মধ্যে দোল খায়। কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি ও ব্যর্থতা মানুষের আত্মমূল্যায়নকে প্রভাবিত করে। অর্থনৈতিক জীবনে লাভ ও ক্ষতি মানসিক স্থিরতাকে নষ্ট করতে পারে। ব্যক্তিগত জীবনে সম্পর্কের সাফল্য ও ব্যর্থতা মানুষকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। এই পরিস্থিতিগুলোর মধ্যে গীতার সমদর্শিতার শিক্ষা মানুষকে নিজের অন্তরের কেন্দ্রটি খুঁজে নিতে সাহায্য করতে পারে।
একজন শিক্ষককে যদি আমরা উদাহরণ হিসেবে ধরি তবে তিনি ছাত্রের সামাজিক অবস্থান দেখে নয় বরং তার শেখার আগ্রহ ও মানবিক সম্ভাবনা দেখে তাকে মূল্যায়ন করবেন। একজন বিচারকের ক্ষেত্রে সমদর্শিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিচারক যদি ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দের দ্বারা প্রভাবিত হন তবে ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে একজন অভিভাবক যদি সন্তানের সাফল্য বা ব্যর্থতার ভিত্তিতে তার প্রতি ভালোবাসার মাত্রা পরিবর্তন করেন তবে সম্পর্কের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়। সমদর্শিতা এসব ক্ষেত্রেই ন্যায় ও ভারসাম্যের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শিক্ষা গভীর। মানুষের মন সাধারণত বাহ্যিক ঘটনার সঙ্গে নিজের পরিচয়কে জড়িয়ে ফেলে। প্রশংসা পেলে মনে হয় আমি ভালো। সমালোচনা পেলে মনে হয় আমি খারাপ। সাফল্য পেলে নিজের মূল্য বাড়ে বলে মনে হয়। ব্যর্থতা এলে নিজের মূল্য কমে গেছে বলে মনে হয়। কিন্তু সমদর্শিতা মানুষকে শেখায় যে কোনো একটি ঘটনা মানুষের সম্পূর্ণ সত্তার পরিচয় নয়। পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে, অনুভূতি পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু আত্মসচেতনতার গভীর ভিত্তি আরও স্থির হতে পারে।
এই কারণেই শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো অন্তর্জয়। বাহ্যিক জয় সাময়িক। আজ যে মানুষ ক্ষমতাবান কাল সে ক্ষমতাহীন হতে পারে। আজ যে ব্যক্তি প্রশংসিত কাল সে সমালোচিত হতে পারে। আজ যে সম্পদ আছে কাল তা নাও থাকতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের মনকে সমত্বে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে তার অর্জন বাহ্যিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়। তার প্রকৃত শক্তি তার অন্তরের স্থিরতায়।
জীবন্মুক্তির ধারণার সঙ্গেও এই শ্লোকের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জীবন্মুক্ত বলতে এমন মানুষকে বোঝানো হয় যিনি জীবিত অবস্থাতেই বন্ধনমুক্ত চেতনা লাভ করেছেন। তিনি সংসার থেকে পালিয়ে যাননি। বরং সংসারের মধ্যেই থেকে তার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করেছেন। তাই ইহৈব শব্দটি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্তির জন্য জীবন শেষ হওয়ার অপেক্ষা নয়। জীবন চলমান অবস্থাতেই মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হতে পারে। একই পৃথিবী, একই মানুষ এবং একই পরিস্থিতি থেকেও একজন অজ্ঞ ব্যক্তি বন্ধন অনুভব করতে পারেন এবং জ্ঞানী ব্যক্তি স্বাধীনতা অনুভব করতে পারেন।
এই শ্লোক তাই মানুষের বাহ্যিক জীবনকে অস্বীকার করে না। বরং বাহ্যিক জীবনের মধ্যে থেকেই অন্তরের পরিবর্তনের কথা বলে। একজন মানুষ সংসারে থাকবে, দায়িত্ব পালন করবে, কাজ করবে, সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। কিন্তু তার মন যদি আসক্তি ও ভেদবুদ্ধির দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত না হয় তবে সে ধীরে ধীরে অন্তরের স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন রাখে। আমরা কি মানুষকে তার বাহ্যিক পরিচয় দিয়ে দেখি, নাকি তার অন্তর্নিহিত সত্তাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। আমরা কি প্রশংসা ও নিন্দার সঙ্গে নিজেদের মূল্য নির্ধারণ করি, নাকি নিজের মধ্যে এমন একটি স্থির কেন্দ্র তৈরি করতে পারি যা বাহ্যিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থাকে। আমরা কি অন্যকে পরাজিত করাকে জয় মনে করি, নাকি নিজের রাগ, অহংকার, দ্বেষ ও অজ্ঞতাকে জয় করাকে প্রকৃত বিজয় হিসেবে গ্রহণ করি।
ভগবদ্গীতার এই শ্লোকের সারকথা তাই অত্যন্ত গভীর। প্রকৃত সমতা বাহ্যিক পরিস্থিতির সমান হয়ে যাওয়া নয়। প্রকৃত সমতা হলো দৃষ্টির পরিবর্তন। যখন মানুষের মন ভেদবুদ্ধির পরিবর্তে একত্বকে উপলব্ধি করতে শেখে, তখন তার জীবনেও এক নতুন স্বাধীনতা জন্ম নেয়। সে বুঝতে পারে যে প্রকৃত শত্রু সবসময় বাইরে নয় এবং প্রকৃত জয়ও সবসময় বাইরে অর্জিত হয় না। মানুষের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম নিজের অজ্ঞতা ও অহংকারের সঙ্গে। সেই সংগ্রামে যে জয়ী হতে পারে, সে জীবনের মধ্যেই মুক্তির স্বাদ পেতে শুরু করে।
এই অর্থে ইহৈব তৈর্জিতঃ সর্গো যেষাং সাম্যে স্থিতং মনঃ কেবল একটি ধর্মীয় বাক্য নয়। এটি মানুষের মানসিক পরিপক্বতা, নৈতিক ন্যায়বোধ এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের একটি গভীর ঘোষণা। আর নির্দোষং হি সমং ব্রহ্ম তস্মাদ্ ব্রহ্মণি তে স্থিতাঃ অংশটি সেই ঘোষণার চূড়ান্ত ভিত্তি। ব্রহ্ম যেহেতু সম এবং নির্দোষ, তাই যে ব্যক্তি সত্যকে উপলব্ধি করতে চায় তাকেও ধীরে ধীরে সমদর্শিতার পথে এগোতে হবে। বাহ্যিক জগতের অসংখ্য ভেদের মধ্যেও যে এক চেতনার উপস্থিতি অনুভব করতে পারে, তার মনেই সত্যিকার শান্তি জন্ম নেয়। সেই শান্তিই শেষ পর্যন্ত মানুষকে অন্তরের স্বাধীনতা, আত্মজ্ঞান এবং জীবন্মুক্তির দিকে নিয়ে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!