শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৫.২ | কর্মসন্ন্যাস ও কর্মযোগের শ্রেষ্ঠত্বের চিরন্তন শিক্ষা
সন্ন্যাসঃ কর্মযোগশ্চ নিঃশ্রেয়সকরাবুভৌ।
তয়োস্ত কর্মসন্ন্যাসাৎ কর্মযোগো বিশিষ্যতে।।২।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- কর্মত্যাগ কর্মযোগ উভয়ই মুক্তিদায়ক। কিন্তু, এই দুটির মধ্যে কর্মযোগ কর্ম সন্ন্যাস থেকে শ্রেয়।
ভগবদ্গীতার পঞ্চম অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোকে শ্রীভগবান শ্রীকৃষ্ণ কর্ম এবং সন্ন্যাসের মধ্যে আপাত দ্বন্দ্বের একটি চিরন্তন সমাধান উপস্থাপন করেছেন। তিনি ঘোষণা করেন যে সন্ন্যাস এবং কর্মযোগ উভয় পথই মানুষের পরম কল্যাণ ও মুক্তিলাভের উপযোগী। তবে এই দুইয়ের মধ্যে কর্মযোগ অধিক শ্রেষ্ঠ। এই সংক্ষিপ্ত ঘোষণার মধ্যেই মানবজীবনের কর্তব্যবোধ, আত্মশুদ্ধি এবং মুক্তির এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।
শ্রীভগবান উবাচ কথাটির অর্থ হলো পরম ঐশ্বর্যসম্পন্ন ভগবান বললেন। শ্রী শব্দটি সৌন্দর্য, মঙ্গল, সমৃদ্ধি এবং ঐশ্বরিক মহিমার প্রতীক। ভগবান শব্দটি সংস্কৃত ভগ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ ঐশ্বর্য, জ্ঞান, শক্তি, যশ, বৈরাগ্য এবং ধর্মসহ সকল পূর্ণ গুণের অধিকারী সত্তা। উবাচ শব্দটি বচ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ বলা বা উচ্চারণ করা। ফলে শ্রীভগবান উবাচ কেবল একটি বক্তার পরিচয় নয় বরং এটি সত্য, জ্ঞান এবং চূড়ান্ত কর্তৃত্বের ঘোষণা। এখানে উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য মানবজীবনের চিরন্তন সত্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
সন্ন্যাস শব্দটি সম উপসর্গ এবং ন্যাস শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর আক্ষরিক অর্থ সম্পূর্ণরূপে স্থাপন করা অথবা সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা। সাধারণ অর্থে সন্ন্যাস বলতে সংসার ত্যাগকে বোঝানো হলেও গীতার আলোচনায় এর প্রকৃত অর্থ হলো কামনা, অহংকার এবং ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করা। বাহ্যিক ত্যাগের চেয়ে অন্তরের ত্যাগই এখানে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তি সংসারে অবস্থান করেও প্রকৃত সন্ন্যাসী হতে পারেন যদি তিনি স্বার্থপর আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত থেকে জীবনযাপন করেন।
কর্মযোগ শব্দটি কর্ম এবং যোগ এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। কর্ম অর্থ কর্তব্য, কাজ অথবা জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল কার্য। যোগ অর্থ সংযোগ, ঐক্য অথবা ঈশ্বরের সঙ্গে আত্মার মিলন। তাই কর্মযোগ বলতে এমন কর্মকে বোঝায় যা নিঃস্বার্থভাবে কর্তব্যবোধ থেকে সম্পাদিত হয় এবং যার উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত লাভ নয় বরং আত্মশুদ্ধি ও ঈশ্বরপ্রাপ্তি। কর্মযোগ মানুষকে শেখায় যে কাজ থেকে পালিয়ে নয় বরং সঠিক মনোভাব নিয়ে কাজের মধ্য দিয়েই মুক্তি অর্জন সম্ভব।
নিঃশ্রেয়সকর শব্দটির অর্থ পরম কল্যাণ সাধনকারী। নিঃশ্রেয়স বলতে সর্বোচ্চ মঙ্গল, চূড়ান্ত কল্যাণ অথবা মোক্ষকে বোঝায় এবং কর অর্থ সম্পাদনকারী বা দানকারী। এই শব্দটি বোঝায় যে সন্ন্যাস এবং কর্মযোগ উভয় পথই মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি ও মুক্তির জন্য কার্যকর। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে কর্মসন্ন্যাস অপেক্ষা কর্মযোগ অধিক শ্রেষ্ঠ। কারণ অধিকাংশ মানুষের পক্ষে কর্ম পরিত্যাগ করা সহজ নয়। বরং কর্তব্য পালন করতে করতে নিজের মনকে পরিশুদ্ধ করা এবং কর্মফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করাই অধিক বাস্তব ও কার্যকর পথ।
কর্মসন্ন্যাস বলতে কর্মকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করাকে বোঝায়। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃত কর্মসন্ন্যাস মানে কর্ম নয় বরং কর্মফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষার পরিত্যাগ। বিশিষ্যতে শব্দটির অর্থ শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয় অথবা অধিক উৎকৃষ্ট। এই শব্দের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করেন যে নিঃস্বার্থ কর্মই মানুষের আধ্যাত্মিক অগ্রগতির জন্য অধিক ফলপ্রসূ। কারণ কর্ম মানুষের চরিত্র গঠন করে, সমাজকে উন্নত করে এবং হৃদয়কে পবিত্র করে।
এই শ্লোকের গভীর দার্শনিক তাৎপর্য হলো মানুষের মুক্তি বাহ্যিক জীবনধারার পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে না বরং অন্তরের পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে। কেউ সংসার ত্যাগ করেও যদি অহংকার, লোভ কিংবা আসক্তি ত্যাগ করতে না পারেন তবে তিনি প্রকৃত সন্ন্যাসী নন। আবার কেউ সংসারে থেকে পরিবার, সমাজ এবং দেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কর্তব্য পালন করলে তিনিই প্রকৃত কর্মযোগী। এই শিক্ষা মানুষকে কর্মবিমুখ না হয়ে কর্মের মধ্যেই আত্মোন্নয়নের পথ অনুসন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করে।
প্রতীকী অর্থে সন্ন্যাস মানুষের অন্তর্জগতের অশুদ্ধ প্রবৃত্তি পরিত্যাগের প্রতীক এবং কর্মযোগ জীবনের প্রতি ইতিবাচক দায়িত্ববোধের প্রতীক। একদিকে সন্ন্যাস আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়, অন্যদিকে কর্মযোগ সমাজকল্যাণ, মানবসেবা এবং ন্যায়নিষ্ঠ কর্মের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি পরিপূর্ণ মানবজীবন যেখানে আত্মিক উন্নতি এবং সামাজিক দায়িত্ব একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।
বাস্তব জীবনে একজন সৎ চিকিৎসক যিনি ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে রোগীর সেবাকে অগ্রাধিকার দেন, একজন আদর্শ শিক্ষক যিনি নিষ্ঠার সঙ্গে জ্ঞান বিতরণ করেন, অথবা একজন সৎ প্রশাসক যিনি ন্যায় ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন তারা সকলেই কর্মযোগের আদর্শ উদাহরণ। তারা কর্ম ত্যাগ করেন না বরং কর্মকে উপাসনায় রূপান্তরিত করেন। এই আদর্শই মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং ব্যক্তিকে আত্মিক উন্নতির পথে পরিচালিত করে।
এই শ্লোকের সারমর্ম হলো সন্ন্যাস এবং কর্মযোগ উভয়ই মুক্তির পথ হলেও অধিকাংশ মানুষের জন্য কর্মযোগই সর্বোত্তম পথ। কারণ প্রকৃত মুক্তি কর্ম থেকে পালিয়ে নয় বরং কর্মের মধ্যেই আসক্তি, অহংকার এবং স্বার্থপরতা ত্যাগ করার মাধ্যমে অর্জিত হয়। শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এটি মানুষকে শেখায় যে নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করাই প্রকৃত সাধনা এবং নিঃস্বার্থ কর্মই মানুষের জীবনকে অর্থবহ, কল্যাণময় ও পরম সত্যের দিকে পরিচালিত করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!