সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৫.২০ | প্রিয় ও অপ্রিয়ের ঊর্ধ্বে স্থিরবুদ্ধি জ্ঞানীর পরিচয়

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ন প্রহৃষ্যেৎ প্রিয়ং প্রাপ্য নোদ্বিজেৎ প্রাপ্য চাপ্রিয়ম্।স্থিরবুদ্ধিরসংমূঢ়ো ব্রহ্মবিদ্ ব্রহ্মণি স…
ন প্রহৃষ্যেৎ প্রিয়ং প্রাপ্য নোদ্বিজেৎ প্রাপ্য চাপ্রিয়ম্।
স্থিরবুদ্ধিরসংমূঢ়ো ব্রহ্মবিদ্ ব্রহ্মণি স্থিতঃ।।২০।।

অনুবাদঃ যে ব্যক্তি প্রিয় বস্তুর প্রাপ্তিতে উৎফুল্ল হন না এবং অপ্রিয় বস্তুর প্রাপ্তিতে বিচলিত হন না, যিনি স্থিরবুদ্ধি, মোহশূন্য ও ভগবৎ-তত্ত্ববেত্ত, তিনি ব্রহ্মেই অবস্থিত।

ভগবদ্গীতার পঞ্চম অধ্যায়ের বিংশতম শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের এমন একটি অবস্থার কথা বলে যেখানে বাহ্যিক সুখ ও দুঃখ আর তার বুদ্ধিকে সহজে বিচলিত করতে পারে না। শ্রীকৃষ্ণ এখানে এমন একজন জ্ঞানীর পরিচয় দিচ্ছেন যিনি প্রিয় বস্তু বা পরিস্থিতি লাভ করে অতিরিক্ত উল্লাসে ভেসে যান না এবং অপ্রিয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে অস্থির বা বিচলিতও হন না। শ্লোকটির মূল শিক্ষা কেবল আনন্দ ও দুঃখকে সমানভাবে গ্রহণ করার শিক্ষা নয়। এর গভীরে রয়েছে মানুষের চেতনার এমন এক পরিণত অবস্থা যেখানে ব্যক্তি বাহ্যিক ঘটনার দ্বারা নিজের অন্তরের স্থিরতা নির্ধারণ করতে দেন না।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো ন প্রহৃষ্যেৎ। এখানে ন অর্থ হলো না এবং প্রহৃষ্যেৎ শব্দটি প্রহৃষ ধাতু থেকে এসেছে। প্রহৃষের মধ্যে অত্যন্ত আনন্দিত হওয়া, উল্লসিত হওয়া অথবা প্রবলভাবে উৎফুল্ল হয়ে ওঠার ভাব রয়েছে। অতএব ন প্রহৃষ্যেৎ বলতে বোঝায় প্রিয় কিছু লাভ করে অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত না হওয়া। এখানে কৃষ্ণ আনন্দকে নিষিদ্ধ করছেন না। তিনি মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ অনুভব করার ক্ষমতাকে অস্বীকার করছেন না। বরং তিনি এমন এক মানসিক অবস্থার কথা বলছেন যেখানে আনন্দ মানুষকে নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায় না।

প্রিয়ং শব্দটি প্রিয় শব্দ থেকে এসেছে। প্রিয় অর্থ যা ভালো লাগে, যা আকর্ষণ করে, যা কাম্য, যা হৃদয়কে আনন্দ দেয় অথবা যাকে মানুষ নিজের কাছে মূল্যবান মনে করে। জীবনের ক্ষেত্রে প্রিয় হতে পারে অর্থ, সম্মান, সাফল্য, সম্পর্ক, প্রশংসা, ক্ষমতা, জ্ঞান অথবা কোনো কাঙ্ক্ষিত ফল। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে প্রিয় বস্তু নিজে সমস্যার কারণ নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন যখন মানুষ প্রিয় বস্তুর সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে এমনভাবে যুক্ত করে ফেলে যে সেটি না থাকলে তার অন্তরের শান্তিও নষ্ট হয়ে যায়।

প্রাপ্য শব্দটি প্রাপ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ লাভ করে, অর্জন করে, পেয়ে বা প্রাপ্ত হয়ে। অর্থাৎ এখানে এমন একটি পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে যেখানে মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু বা পরিস্থিতি লাভ করেছে। সাধারণ মানুষ সাধারণত মনে করে প্রিয় বস্তু অর্জন মানেই স্থায়ী আনন্দ। কিন্তু গীতা এই ধারণার গভীরে প্রশ্ন তোলে। কারণ কোনো বাহ্যিক অর্জন যতই আনন্দদায়ক হোক না কেন সেটি পরিবর্তনশীল। আজ যা প্রিয়, কাল তা অপ্রিয় হতে পারে। আজ যে সাফল্য মানুষকে আনন্দ দেয়, আগামীকাল সেই সাফল্যই নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিতে পারে।

এরপর আসে নোদ্বিজেৎ। এটি ন এবং উদ্বিজ্ ভাবের সমন্বিত রূপ। উদ্বিজ্ শব্দের মধ্যে বিচলিত হওয়া, আতঙ্কিত হওয়া, অস্থির হওয়া অথবা অন্তর থেকে কেঁপে ওঠার ধারণা রয়েছে। তাই নোদ্বিজেৎ অর্থ হলো বিচলিত না হওয়া, অস্থির না হওয়া বা মানসিকভাবে ভেঙে না পড়া। এখানে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য রয়েছে। মানুষের জীবনে অপ্রিয় ঘটনা আসবেই। প্রত্যাশা পূরণ হবে না। ব্যর্থতা আসবে। সমালোচনা আসবে। প্রিয় মানুষ দূরে চলে যেতে পারে। সম্পদ কমতে পারে। সামাজিক মর্যাদার পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি এসব পরিবর্তনকে নিজের অন্তরের কেন্দ্র দখল করতে দেন না।

অপ্রিয়ম্ শব্দটি প্রিয়ের বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে। যা পছন্দনীয় নয়, যা কষ্টদায়ক, যা প্রত্যাশার বিরোধী অথবা যা মানুষের কামনা পূরণ করে না তাই অপ্রিয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো কৃষ্ণ বলেননি যে জ্ঞানীর জীবনে অপ্রিয় কিছু ঘটবে না। বরং তিনি বলেছেন অপ্রিয় কিছু প্রাপ্ত হলেও তিনি উদ্বিগ্ন বা বিচলিত হবেন না। অর্থাৎ জ্ঞানীর শ্রেষ্ঠত্ব বাহ্যিক জীবনে সমস্যাহীনতার মধ্যে নয়। বরং সমস্যার মধ্যেও অন্তরের ভারসাম্য ধরে রাখার ক্ষমতার মধ্যে।

শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে আসে স্থিরবুদ্ধি। স্থির অর্থ অচঞ্চল, দৃঢ়, অবিচল এবং স্থিতিশীল। বুদ্ধি অর্থ বিচারশক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সত্য ও অসত্যের মধ্যে পার্থক্য করার অন্তর্দৃষ্টি। স্থিরবুদ্ধি অর্থ এমন একটি বুদ্ধি যা বাহ্যিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের মৌলিক বিচারবোধকে বারবার পরিবর্তন করে না। সুখ এলে একরকম সিদ্ধান্ত এবং দুঃখ এলে সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্ত নেওয়া স্থিরবুদ্ধির লক্ষণ নয়। স্থিরবুদ্ধি ব্যক্তি আনন্দের মধ্যেও বাস্তবতা ভুলে যান না এবং দুঃখের মধ্যেও আশা ও সত্যের উপলব্ধি হারিয়ে ফেলেন না।

অসংমূঢ় শব্দটির অর্থ বিভ্রান্ত নয়, মোহগ্রস্ত নয় এবং সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে পথভ্রষ্ট নয়। সংমূঢ় বলতে গভীরভাবে মোহগ্রস্ত বা বিভ্রান্ত হওয়াকে বোঝায়। তার সঙ্গে নঞর্থক ভাব যুক্ত হয়ে অসংমূঢ় অর্থ দাঁড়ায় যিনি মোহে আচ্ছন্ন নন। এখানে মোহ বলতে কেবল কোনো ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা বোঝায় না। বরং নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে ভুল ধারণা, পরিবর্তনশীল বস্তুকে স্থায়ী মনে করা এবং বাহ্যিক ঘটনাকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করাই গভীরতর মোহ।

এরপর আসে ব্রহ্মবিদ্। ব্রহ্ম অর্থ সর্বব্যাপী পরম সত্য এবং বিদ্ ধাতুর অর্থ জানা বা জ্ঞান লাভ করা। সেই অর্থে ব্রহ্মবিদ্ হলেন যিনি ব্রহ্মকে জানেন অথবা পরম সত্য সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান লাভ করেছেন। তবে এই জ্ঞান কেবল বই পড়ে তথ্য অর্জনের মতো জ্ঞান নয়। এটি অস্তিত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি। ব্যক্তি যখন বুঝতে পারেন যে শরীর পরিবর্তনশীল, পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল, সম্পদ পরিবর্তনশীল, সম্পর্কের রূপ পরিবর্তনশীল এবং সামাজিক পরিচয়ও পরিবর্তনশীল, তখন তিনি ধীরে ধীরে পরিবর্তনের অন্তরালে থাকা স্থায়ী সত্যের সন্ধান করেন।

শেষ পদ হলো ব্রহ্মণি স্থিতঃ। ব্রহ্মণি অর্থ ব্রহ্মে এবং স্থিতঃ অর্থ প্রতিষ্ঠিত, অবস্থানকারী অথবা স্থিত। অর্থাৎ যিনি ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত। এই অবস্থাকে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। এটি এমন একটি চেতনার অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে মানুষের আত্মপরিচয় বাহ্যিক লাভ ও ক্ষতির ওপর নির্ভরশীল থাকে না। তার চেতনার কেন্দ্র থাকে পরম সত্যের উপলব্ধিতে।

শ্লোকটির সামগ্রিক অর্থ তাই দাঁড়ায় যে যিনি প্রিয় বস্তু লাভ করে অতিরিক্ত উল্লাসে আত্মবিস্মৃত হন না এবং অপ্রিয় কিছু লাভ করে বিচলিতও হন না, যার বুদ্ধি স্থির এবং যিনি মোহমুক্ত, তিনিই ব্রহ্মজ্ঞ এবং ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। এখানে আনন্দকে অস্বীকার করা হয়নি এবং দুঃখকেও অস্বীকার করা হয়নি। বরং আনন্দ ও দুঃখ উভয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে পরিবর্তন করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

এই শিক্ষা ভারতীয় দর্শনের একটি মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। মানুষ কি তার অভিজ্ঞতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে, নাকি সে তার অভিজ্ঞতাকে জ্ঞান ও বিবেকের আলোকে গ্রহণ করবে। সাধারণ মানুষ যখন কোনো প্রিয় বস্তু লাভ করে তখন মনে করে এই বস্তুই তার আনন্দের উৎস। আবার অপ্রিয় কিছু ঘটলে মনে করে সেই ঘটনাই তার দুঃখের মূল। কিন্তু গীতা মানুষকে আরও গভীরে যেতে বলে। বাহ্যিক ঘটনা আনন্দ বা দুঃখের উপলক্ষ হতে পারে, কিন্তু মানুষের অন্তরের প্রতিক্রিয়া তার চেতনা, আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি এবং দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

এই কারণে শ্লোকটি আসক্তির প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসক্তি হলো কোনো বস্তু, ব্যক্তি বা পরিস্থিতিকে নিজের সুখের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে ধরে নেওয়া। যত বেশি আসক্তি, তত বেশি ভয়ের সম্ভাবনা। কারণ যে জিনিসকে মানুষ নিজের সুখের একমাত্র উৎস মনে করে, সেটি হারানোর আশঙ্কাও তাকে তত বেশি অস্থির করে। গীতার জ্ঞান সেই নির্ভরশীলতা কমাতে চায়। মানুষ যেন প্রিয়কে ভালোবাসে কিন্তু তার দাস না হয়। সে যেন অপ্রিয়কে প্রত্যাখ্যান করতে পারে কিন্তু তার দ্বারা মানসিকভাবে ধ্বংস না হয়।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শিক্ষার গভীর তাৎপর্য রয়েছে। মানুষের মন সাধারণত বাহ্যিক পরিস্থিতির প্রতি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। প্রশংসা পেলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং সমালোচনা পেলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। সাফল্য পেলে নিজেকে অসাধারণ মনে হয় এবং ব্যর্থতা এলে নিজেকে অযোগ্য মনে হতে পারে। এই ওঠানামার ফলে ব্যক্তির মানসিক স্থিরতা নষ্ট হয়। গীতার স্থিরবুদ্ধির ধারণা এই নির্ভরতা থেকে মুক্তির দিকে নির্দেশ করে। নিজের মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয়কে বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া থেকে পৃথক করতে পারাই এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

সাহিত্যের ভাষায় এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থ আরও সুন্দরভাবে বোঝা যায়। জীবনের নদীতে সুখ ও দুঃখ দুটি ঢেউয়ের মতো। ঢেউ কখনো উঁচু হয় এবং কখনো নিচু হয়। কিন্তু নদীর গভীরতা শুধু তার উপরিভাগের ঢেউ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তেমনি মানুষের জীবনে আনন্দ ও বেদনা আসবে যাবে। স্থিরবুদ্ধি মানুষ ঢেউকে অস্বীকার করেন না। তিনি শুধু জানেন যে তিনি ঢেউ নন। তার অস্তিত্বের গভীরে আরও একটি স্থিরতা রয়েছে।

এই ভাবনাকে একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। একজন ছাত্র পরীক্ষায় ভালো ফল করল। সে আনন্দিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যদি সে মনে করে এই ফলাফলই তার সম্পূর্ণ মূল্য নির্ধারণ করে, তবে পরবর্তী পরীক্ষায় খারাপ ফল করলে তার আত্মপরিচয় সংকটে পড়তে পারে। স্থিরবুদ্ধি ছাত্র সাফল্যকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করবে কিন্তু সেটিকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় বানাবে না। ব্যর্থতা এলেও সে বুঝবে যে একটি ফলাফল তার সম্পূর্ণ সম্ভাবনাকে সংজ্ঞায়িত করে না।

একইভাবে একজন কর্মজীবী মানুষ পদোন্নতি পেলে আনন্দিত হবেন। কিন্তু যদি তার সম্পূর্ণ আত্মসম্মান পদমর্যাদার ওপর নির্ভর করে, তবে পদ হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তার আত্মমর্যাদাও ভেঙে পড়বে। গীতার শিক্ষা হলো কর্ম করো, সাফল্য গ্রহণ করো, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নাও, কিন্তু নিজের অন্তরের কেন্দ্রকে বাহ্যিক ফলাফলের হাতে তুলে দিও না।

এই শ্লোকের সঙ্গে বৃহত্তর গীতাদর্শনেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গীতায় বারবার কর্ম, জ্ঞান, সংযম এবং সমত্বের কথা বলা হয়েছে। এখানে সেই সমত্বের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম রূপ দেখা যায়। সমত্ব মানে অনুভূতিহীন হয়ে যাওয়া নয়। একজন জ্ঞানী মানুষ আনন্দ অনুভব করতে পারেন, দুঃখ অনুভব করতে পারেন, ভালোবাসতে পারেন, কষ্ট পেতে পারেন। কিন্তু তিনি অনুভূতির দ্বারা সম্পূর্ণভাবে অধিকারিত হন না। অনুভূতি তার মধ্যে আসে, কিন্তু তার বিচারবুদ্ধিকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে না।

দার্শনিকভাবে এই অবস্থাকে আত্মপরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। যদি মানুষ মনে করে আমি আমার সম্পদ, আমি আমার পদ, আমি আমার প্রশংসা, আমি আমার সাফল্য অথবা আমি আমার ব্যর্থতা, তাহলে তার অস্তিত্ব সবসময় পরিবর্তনশীল থাকবে। কিন্তু যদি সে উপলব্ধি করে যে এগুলো তার জীবনের অভিজ্ঞতা, তার চূড়ান্ত স্বরূপ নয়, তাহলে তার মধ্যে একটি গভীর স্বাধীনতা জন্ম নিতে পারে। ব্রহ্মণি স্থিত হওয়ার ধারণা সেই গভীর আত্মসচেতনতার দিকেই নির্দেশ করে।

এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে প্রত্যুত্তরের জীবন। সাধারণ মানুষ কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানায়। স্থিরবুদ্ধি ব্যক্তি ঘটনা এবং প্রতিক্রিয়ার মাঝখানে সচেতনতার একটি পরিসর তৈরি করেন। তিনি থামেন, বিচার করেন এবং তারপর সিদ্ধান্ত নেন। এই কারণে স্থিরবুদ্ধি শুধু আধ্যাত্মিক ধারণা নয়। এটি বাস্তব জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত মূল্যবান।

পারিবারিক জীবনে এর প্রয়োগ স্পষ্ট। কেউ প্রশংসা করলে অতিরিক্ত অহংকার না করা এবং কেউ সমালোচনা করলে সঙ্গে সঙ্গে ক্রোধে বিস্ফোরিত না হওয়া স্থিরবুদ্ধির পরিচয়। সামাজিক জীবনে কেউ সম্মান দিলে সেটিকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করা এবং কেউ অপমান করলে নিজের চরিত্র ও সত্যকে ধরে রাখা একই শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ। নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও এই গুণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে নেতা প্রশংসায় নিজের বিচারশক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং সমালোচনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, তিনি দীর্ঘমেয়াদে স্থির সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের স্বাধীনতার একটি গভীর ধারণা প্রকাশ করে। বাহ্যিক পৃথিবী সবসময় মানুষের ইচ্ছামতো চলবে না। কিন্তু নিজের চেতনার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পরিবর্তন করা সম্ভব। যা ঘটছে তার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু যা ঘটছে তার প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, বিচার এবং প্রতিক্রিয়াকে শুদ্ধ করার সাধনা করা সম্ভব। এই জায়গাতেই গীতার আত্মসংযম ও জ্ঞান একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়।

তবে এই শ্লোককে কখনোই অনুভূতিহীনতার শিক্ষা হিসেবে দেখা উচিত নয়। স্থিরবুদ্ধি মানে হৃদয়হীন হওয়া নয়। ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তি মানুষের দুঃখে সহানুভূতিশীল হতে পারেন এবং আনন্দে আনন্দিতও হতে পারেন। পার্থক্য হলো তিনি নিজের সুখের জন্য অন্যের সুখের ওপর নির্ভর করেন না এবং নিজের দুঃখের জন্য বাহ্যিক জগতকে চূড়ান্তভাবে দোষারোপ করেন না। তার মধ্যে অনুভূতি আছে, কিন্তু অনুভূতির সঙ্গে জ্ঞানও আছে।

সমগ্র শ্লোকটি তাই মানুষের জীবনে একটি বিশেষ ধরনের স্বাধীনতার কথা বলে। এই স্বাধীনতা বাহ্যিক স্বাধীনতা নয়। এটি অন্তরের স্বাধীনতা। এমন স্বাধীনতা যেখানে সাফল্য মানুষকে অহংকারী করে না এবং ব্যর্থতা তাকে আত্মবিস্মৃত করে না। প্রশংসা তাকে নিজের সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না এবং নিন্দা তাকে নিজের মূল্য ভুলিয়ে দেয় না। লাভ তাকে অন্ধ করে না এবং ক্ষতি তাকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেয় না।

শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্যের গভীরে তাই একটি অসাধারণ মানবিক শিক্ষা রয়েছে। জীবনে প্রিয় আসবে এবং অপ্রিয়ও আসবে। সাফল্য আসবে এবং ব্যর্থতাও আসবে। সম্মান আসবে এবং কখনো অপমানও আসতে পারে। অর্জন হবে এবং কিছু হারাতেও হবে। কিন্তু মানুষের প্রকৃত পরিণতি নির্ধারিত হয় সে এসব ঘটনার মধ্যে নিজের অন্তরের অবস্থান কীভাবে ধরে রাখে তার দ্বারা।

এই শ্লোকের সারমর্ম হলো প্রিয়কে গ্রহণ করো কিন্তু তার প্রতি অন্ধ আসক্ত হয়ো না। অপ্রিয়কে মোকাবিলা করো কিন্তু তার দ্বারা নিজের চেতনাকে পরাজিত হতে দিও না। আনন্দকে অনুভব করো কিন্তু আনন্দে নিজের বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলো না। দুঃখকে অনুভব করো কিন্তু দুঃখকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় বানিয়ো না। বুদ্ধিকে স্থির করো, মোহ থেকে মুক্ত হও এবং পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার অন্তরালে যে স্থায়ী সত্য রয়েছে তার সন্ধান করো।

ভগবদ্গীতার এই শ্লোক শেষ পর্যন্ত আমাদের এমন একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি দেখায় যিনি পৃথিবী থেকে পালিয়ে যাননি, বরং পৃথিবীর মধ্যেই থেকেও নিজের অন্তরের স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। তিনি প্রিয় ও অপ্রিয় উভয়কেই দেখেন, কিন্তু তাদের দ্বারা নিজের অস্তিত্বের কেন্দ্রকে নির্ধারিত হতে দেন না। তার বুদ্ধি স্থির, তার চেতনা মোহমুক্ত এবং তার আত্মপরিচয় বাহ্যিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত। এই কারণেই তিনি ব্রহ্মবিদ্ এবং ব্রহ্মণি স্থিতঃ। অর্থাৎ তিনি পরম সত্যকে উপলব্ধি করেছেন এবং সেই সত্যের মধ্যে নিজের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মানুষের জীবনে এই উপলব্ধিই স্থিরতা, সমত্ব এবং প্রকৃত অন্তর্মুক্তির অন্যতম গভীর পথ।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 11, 2026 August 11, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি