সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৫.২৪ | অন্তঃসুখ, অন্তরারাম ও অন্তর্জ্যোতিতে ব্রহ্মনির্বাণ লাভ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
 যোহন্তঃসুখোহন্তরারামস্তথান্তর্জ্যোতিরেব যঃ।স যোগী ব্রহ্মনির্বাণং ব্রহ্মভূতোহধিগচ্ছতি।।২৪।।
 যোহন্তঃসুখোহন্তরারামস্তথান্তর্জ্যোতিরেব যঃ।
স যোগী ব্রহ্মনির্বাণং ব্রহ্মভূতোহধিগচ্ছতি।।২৪।।

অনুবাদঃ যিনি আত্মাতেই সুখ অনুভব করেন, যিনি আত্মাতেই ক্রীড়াযুক্ত এবং আত্মাই যাঁর লক্ষ্য, তিনিই যোগী। তিনি ব্রহ্মে অবস্থিত হয়ে ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করেন।

ভগবদ্গীতার পঞ্চম অধ্যায়ের চব্বিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ এমন এক যোগীর পরিচয় দিয়েছেন, যার আনন্দ বাহ্যিক জগতের কোনো বস্তু, প্রশংসা, ক্ষমতা, সম্পদ কিংবা ইন্দ্রিয়সুখের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাঁর সুখ নিজের অন্তরের মধ্যে। তাঁর বিশ্রাম নিজের অন্তরের মধ্যে। তাঁর আলোও নিজের অন্তরের মধ্যে। এই কারণেই তিনি ধীরে ধীরে এমন এক চেতনার অবস্থায় পৌঁছান, যাকে শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মনির্বাণ নামে অভিহিত করেছেন। শ্লোকটির মূল বক্তব্য তাই বাহ্যিক জগতকে অস্বীকার করা নয়। বরং মানুষের সুখের প্রকৃত উৎস কোথায়, তার একটি গভীর অনুসন্ধান।

এর সহজ ভাবার্থ হলো, যিনি অন্তরে সুখ অনুভব করেন, যিনি অন্তরের মধ্যেই আনন্দ ও বিশ্রাম লাভ করেন এবং যাঁর অন্তরেই জ্ঞানের আলো প্রকাশিত হয়, সেই যোগী ব্রহ্মস্বরূপ হয়ে ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করেন।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর মধ্যে রয়েছে অন্তঃসুখ, অন্তরারাম এবং অন্তর্জ্যোতি। তিনটি শব্দই মানুষের চেতনার তিনটি গভীর স্তরকে নির্দেশ করে। অন্তঃসুখ বোঝায় অন্তর থেকে উদ্ভূত আনন্দ। অন্তরারাম বোঝায় নিজের অন্তরের মধ্যেই শান্তি ও আনন্দের আশ্রয় খুঁজে পাওয়া। আর অন্তর্জ্যোতি বোঝায় সেই অন্তর্লোকের জ্ঞানপ্রদীপ, যার আলোয় মানুষ নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে শুরু করে।

অন্তঃসুখ শব্দটি সংস্কৃত অন্তঃ এবং সুখ এই দুই অংশ নিয়ে গঠিত। অন্তঃ অর্থ ভিতর, অন্তর, হৃদয়ের গভীর অংশ কিংবা বাহ্যিকতার অন্তর্গত নয় এমন স্থান। সুখ শব্দটি সংস্কৃত সু এবং খ এই ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করা হয়। সু অর্থ শুভ, সুন্দর বা অনুকূল এবং খ প্রাচীন ব্যাখ্যায় স্থান বা অবকাশের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। বিপরীতভাবে দুঃখের মধ্যে অস্বস্তিকর বা সংকীর্ণ অবস্থার ধারণা প্রকাশ পায়। তবে গীতার প্রসঙ্গে সুখকে কেবল ইন্দ্রিয়তৃপ্তি হিসেবে বোঝা যায় না। এখানে সুখ হলো এমন এক অন্তর্গত প্রশান্তি, যা বাহ্যিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে না।

মানুষ সাধারণত সুখকে বাইরে খোঁজে। অর্থ, সাফল্য, সামাজিক সম্মান, সম্পর্ক, প্রশংসা, ভোগ এবং নিজের ইচ্ছাপূরণের মধ্যে সে আনন্দ খুঁজে পায়। কিন্তু বাহ্যিক আনন্দের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো তার অস্থায়িত্ব। যে বস্তু আজ আনন্দ দেয়, কাল তা অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। যে প্রশংসা আজ মনকে আনন্দিত করে, কিছুদিন পরে তা আর একই অনুভূতি সৃষ্টি করে না। যে অর্জন একসময় জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে হয়, পরবর্তী সময়ে তার থেকেও বড় অর্জনের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। ফলে বাহ্যিক সুখের সঙ্গে আকাঙ্ক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি হয়।

শ্রীকৃষ্ণের অন্তঃসুখের ধারণা এই চক্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে সুখের জন্য বাইরে কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর প্রয়োজন নেই। কারণ সুখের উৎস ধীরে ধীরে নিজের চেতনার গভীরে আবিষ্কৃত হয়। এর অর্থ এই নয় যে পৃথিবীর বস্তু বা সম্পর্ক মূল্যহীন। বরং এর অর্থ হলো মানুষ যেন নিজের অস্তিত্বের কেন্দ্রকে বাহ্যিক বস্তুর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না করে।

এরপর আসে অন্তরারাম শব্দটি। অন্তরারাম গঠিত হয়েছে অন্তর এবং আরাম ধারণার সমন্বয়ে। এখানে আরাম বলতে শুধু শারীরিক বিশ্রাম বোঝানো হয় না। এর মধ্যে আনন্দ, প্রশান্তি, অবস্থান এবং আত্মতৃপ্তির ভাব রয়েছে। অন্তরারাম তাই এমন একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি, যিনি নিজের অন্তরের মধ্যেই শান্তির আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন।

এই ধারণাটি অত্যন্ত গভীর। সাধারণ মানুষ যখন একা থাকে তখন অনেক সময় নিজের চিন্তা, উদ্বেগ, ভয়, অপূর্ণতা এবং আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি হয়। ফলে সে নিজেকে এড়িয়ে চলতে চায়। বিনোদন, ব্যস্ততা, সামাজিক যোগাযোগ, বাহ্যিক সাফল্য কিংবা নানা ধরনের আকর্ষণের মাধ্যমে সে নিজের অন্তরের নীরবতাকে পূর্ণ করতে চায়। কিন্তু যোগীর পথ ভিন্ন। যোগী নিজের অন্তর থেকে পালিয়ে যান না। তিনি নিজের অন্তরের দিকে ফিরে তাকান।

অন্তরারামের মধ্যে তাই আত্মসম্মুখীনতার একটি ধারণা রয়েছে। মানুষ যখন নিজের মনকে বুঝতে শেখে, নিজের আকাঙ্ক্ষাকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে এবং নিজের ভেতরের অস্থিরতার কারণ উপলব্ধি করতে শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে বাহ্যিক নির্ভরতা কমে আসে। অন্তরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত গভীর হয়, ততই নিঃসঙ্গতা এবং একাকিত্বের পার্থক্য স্পষ্ট হয়। একাকিত্বে মানুষ নিজেকে পরিত্যক্ত মনে করতে পারে। কিন্তু অন্তরারামে মানুষ নিজের অন্তরসত্তার সঙ্গে সংযোগ অনুভব করে।

এরপর শ্লোকে এসেছে অন্তর্জ্যোতি। অন্তর্জ্যোতি শব্দটি অন্তর এবং জ্যোতি এই দুই ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। জ্যোতি অর্থ আলো, দীপ্তি, উজ্জ্বলতা বা আলোকপ্রাপ্তি। কিন্তু এখানে আলো কোনো বাহ্যিক প্রদীপের আলো নয়। এটি জ্ঞানের আলো। এটি আত্মসচেতনতার আলো। এটি এমন এক অন্তর্দৃষ্টি, যার মাধ্যমে মানুষ নিজের প্রকৃতি এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে উপলব্ধি করতে শুরু করে।

ভারতীয় দর্শনে আলো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীক। অন্ধকার সাধারণত অজ্ঞানতা, বিভ্রান্তি এবং অচেতনতার প্রতীক। আলো জ্ঞান, সত্য এবং চেতনার প্রতীক। তাই অন্তর্জ্যোতি বলতে এমন এক জ্ঞানকে বোঝানো যায়, যা বাইরে থেকে ধার করা তথ্যের মতো নয়। এটি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়।

এই তিনটি ধারণাকে একত্রে দেখলে শ্লোকটির অন্তর্নিহিত কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়। প্রথমে আছে অন্তঃসুখ। মানুষ নিজের অন্তরে আনন্দের সম্ভাবনা আবিষ্কার করে। তারপর আছে অন্তরারাম। সে নিজের অন্তরের মধ্যেই শান্তির আশ্রয় খুঁজে পায়। এরপর আছে অন্তর্জ্যোতি। সে নিজের চেতনার মধ্যে জ্ঞানের আলো অনুভব করে। অর্থাৎ সুখ থেকে প্রশান্তি এবং প্রশান্তি থেকে জ্ঞানের দিকে একটি অন্তর্গত যাত্রা এখানে প্রকাশিত হয়েছে।

শ্লোকে এরপর বলা হয়েছে স যোগী। অর্থাৎ সেই ব্যক্তিই প্রকৃত যোগী। যোগ শব্দের মূল অর্থ সংযোগ বা যুক্ত হওয়া। যোগী সেই ব্যক্তি যিনি বিচ্ছিন্ন চেতনা থেকে সংযুক্ত চেতনার দিকে অগ্রসর হন। বাহ্যিক জগতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তাঁর অন্তর আর বাহ্যিক বস্তু দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত হয় না।

এখানে যোগীকে কেবল নির্জনে বসে থাকা একজন সাধক হিসেবে বোঝা উচিত নয়। গীতার সামগ্রিক শিক্ষায় যোগী এমন একজন মানুষ, যিনি কর্মের মধ্যে থেকেও অন্তরের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন। তিনি কাজ করেন, কিন্তু কাজের ফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র পরিচয় বানান না। তিনি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন, কিন্তু সম্পর্কের মাধ্যমে নিজের পূর্ণতা নির্ধারণ করেন না। তিনি জগতে থাকেন, কিন্তু জগতকে নিজের অন্তরের একমাত্র আশ্রয় বানান না।

এরপর শ্লোকে এসেছে ব্রহ্মনির্বাণ। এই শব্দটি অত্যন্ত গভীর দার্শনিক অর্থ বহন করে। ব্রহ্ম অর্থ সর্বব্যাপী পরম সত্য বা পরম বাস্তবতা। নির্বাণ শব্দের মধ্যে নিভে যাওয়া, প্রশমিত হওয়া এবং বন্ধনের অবসানের ধারণা রয়েছে। তাই ব্রহ্মনির্বাণকে এমন এক অবস্থারূপে বোঝানো যায় যেখানে ব্যক্তি নিজের সীমাবদ্ধ অহংকেন্দ্রিক পরিচয়ের বন্ধন অতিক্রম করে ব্রহ্মসত্তার উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হয়।

এখানে নির্বাণকে কেবল অস্তিত্বের ধ্বংস হিসেবে বোঝা ভুল হবে। গীতার দৃষ্টিতে এটি কামনা, অহংকার, অজ্ঞতা এবং অন্তরের অশান্তির প্রশমন। যেমন একটি প্রদীপের শিখা বাতাসের তীব্রতায় অস্থির হয়ে ওঠে, তেমনি আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তির দ্বারা মানুষের মনও অস্থির হয়। যখন সেই অস্থিরতার কারণগুলো প্রশমিত হয়, তখন চেতনা তার স্বাভাবিক স্বচ্ছতা ফিরে পায়।

ব্রহ্মভূত শব্দটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রহ্মভূত অর্থ ব্রহ্মস্বরূপ হওয়া বা ব্রহ্মসত্তায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এর মধ্যে একটি গভীর রূপান্তরের ধারণা রয়েছে। মানুষ তখন নিজেকে শুধু শরীর, সামাজিক পরিচয়, পেশা, সম্পদ, সাফল্য বা ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সমষ্টি হিসেবে দেখতে থাকে না। তার আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়।

শেষে এসেছে অধিগচ্ছতি। এর অর্থ লাভ করে, অর্জন করে, পৌঁছে যায় বা উপলব্ধি করে। কিন্তু এখানে লাভ বলতে বাইরের কোনো বস্তু অর্জনের কথা বলা হয় না। ব্রহ্মনির্বাণ কোনো বাহ্যিক পুরস্কার নয়। এটি চেতনার একটি উপলব্ধি। অর্থাৎ যোগী নিজের অন্তরের পরিশুদ্ধির মাধ্যমে এমন একটি সত্য উপলব্ধি করেন, যা আগে থেকেই তাঁর অস্তিত্বের গভীরে উপস্থিত ছিল।

এই কারণে শ্লোকটির দার্শনিক তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় সাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মানুষের মানসিক অস্থিরতার একটি বড় কারণ হলো নিজের মূল্যকে বাইরের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল করে তোলা। অন্যের প্রশংসা পেলে নিজেকে মূল্যবান মনে করা এবং সমালোচনা পেলে নিজের মূল্য নিয়ে সন্দেহ করা মানুষকে ক্রমাগত বাহ্যিক স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। অন্তঃসুখের ধারণা এই নির্ভরতার বিপরীতে আত্মসচেতনতার শিক্ষা দেয়।

অন্তরারামের শিক্ষা হলো নিজের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করা। একজন মানুষ যখন নিজের চিন্তা এবং অনুভূতিকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে, তখন সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে প্রতিটি চিন্তা সত্য নয় এবং প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা অপরিহার্য নয়। মনের মধ্যে কোনো চিন্তা উদিত হলেই তার অনুসরণ করতে হবে এমন নয়। এই পর্যবেক্ষণশক্তিই অন্তরের শান্তির পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অন্তর্জ্যোতির প্রতীকী অর্থও এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অন্ধকার ঘরে বাইরে থেকে আলো না এলে যেমন কিছু দেখা যায় না, তেমনি আত্মজ্ঞান ছাড়া মানুষ নিজের আচরণের প্রকৃত কারণও অনেক সময় বুঝতে পারে না। নিজের লোভ, ভয়, অহংকার, আকাঙ্ক্ষা এবং আসক্তিকে চিনতে পারা মানে অন্তরের অন্ধকারে আলো জ্বালানো।

বাস্তব জীবনে এর একটি সহজ উদাহরণ হতে পারে একজন মানুষ, যিনি কোনো কাজের সাফল্যের জন্য চেষ্টা করছেন। যদি তার সমস্ত আত্মমূল্য সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে ব্যর্থতা তাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু যদি তার অন্তরের স্থিরতা সাফল্য এবং ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে কিছুতে প্রতিষ্ঠিত থাকে, তাহলে ব্যর্থতার মধ্যেও সে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তার কর্মের মূল্য থাকে, কিন্তু কর্মফল তার সম্পূর্ণ পরিচয় হয়ে ওঠে না।

ইতিহাস ও সাহিত্যের অসংখ্য সাধক এবং দার্শনিকের জীবনে এই অন্তর্মুখী চেতনার প্রকাশ দেখা যায়। ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে জ্ঞানী ব্যক্তির পরিচয় প্রায়ই বাহ্যিক ক্ষমতা দিয়ে নয়, তাঁর অন্তরের স্থিরতা দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে। উপনিষদীয় আত্মজিজ্ঞাসা থেকে শুরু করে গীতার কর্মযোগ এবং ধ্যানযোগ পর্যন্ত একই প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। মানুষ আসলে কে এবং তার স্থায়ী শান্তির উৎস কোথায়।

এই শ্লোকের প্রতীকী সৌন্দর্য এখানেই যে এটি মানুষের বাহ্যিক জীবনকে ধ্বংস করতে বলে না। এটি জীবনের কেন্দ্র পরিবর্তনের কথা বলে। বাহির থেকে ভিতরে। নির্ভরতা থেকে আত্মনির্ভরতার দিকে। অস্থিরতা থেকে প্রশান্তির দিকে। অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে। সীমাবদ্ধ অহং থেকে বৃহত্তর অস্তিত্ববোধের দিকে।

অন্তঃসুখ তাই শুধু আনন্দ নয়। এটি এমন আনন্দ যা কোনো নির্দিষ্ট বস্তু হারিয়ে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। অন্তরারাম শুধু বিশ্রাম নয়। এটি নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে এমন সম্পর্ক, যেখানে মানুষ নিজের কাছেই আশ্রয় খুঁজে পায়। অন্তর্জ্যোতি শুধু আলো নয়। এটি এমন চেতনা, যা মানুষকে নিজের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীরতর সত্যের দিকে নিয়ে যায়।

শ্লোকটির শেষ অংশ তাই পূর্ববর্তী সব ধারণাকে একত্র করে। যে মানুষ নিজের মধ্যে সুখ খুঁজে পায়, নিজের মধ্যে শান্তির আশ্রয় আবিষ্কার করে এবং নিজের অন্তরে জ্ঞানের আলো জ্বালাতে সক্ষম হয়, সেই মানুষই প্রকৃত যোগের পথে এগিয়ে যায়। তার কাছে ব্রহ্মনির্বাণ কোনো দূরবর্তী স্বর্গীয় পুরস্কার নয়। এটি অন্তরের অজ্ঞতা, আসক্তি এবং অহংকেন্দ্রিক অস্থিরতা অতিক্রম করে পরম সত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একটি গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।

সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক মানুষের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে। আমরা কি সুখের জন্য পৃথিবীর কাছে ক্রমাগত কিছু চাইছি, নাকি নিজের অন্তরের প্রকৃত উৎসকে আবিষ্কার করছি। আমরা কি নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি, নাকি নিজের অন্তরের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। আমরা কি বাহ্যিক আলোয় পথ খুঁজছি, নাকি অন্তর্জ্যোতির সন্ধান করছি।

শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল বাহ্যিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের মধ্যে নেই। প্রকৃত স্বাধীনতা আসে যখন মানুষের অন্তর বাহ্যিক পরিস্থিতির দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত থাকে না। তখন সুখ আর কেবল পাওয়ার বিষয় থাকে না। শান্তি আর কেবল কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ফল থাকে না। জ্ঞান আর কেবল বইয়ের তথ্য থাকে না। এগুলো মানুষের চেতনার অন্তর্গত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।

এই অর্থে অন্তঃসুখ, অন্তরারাম এবং অন্তর্জ্যোতি একই আধ্যাত্মিক যাত্রার তিনটি প্রকাশ। অন্তরে সুখের সন্ধান মানুষকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনে। অন্তরে বিশ্রামের অভিজ্ঞতা তাকে স্থির করে। অন্তরের জ্যোতি তাকে সত্যকে চিনতে সাহায্য করে। আর সেই সত্যের উপলব্ধিই তাকে ব্রহ্মভূত অবস্থার দিকে নিয়ে যায়। এই অন্তর্জাগরণই শ্রীকৃষ্ণের ভাষায় ব্রহ্মনির্বাণের পথে মানুষের গভীরতম অগ্রযাত্রা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 11, 2026 August 11, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি