শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৫.৬ | যোগ ছাড়া সন্ন্যাস কঠিন ও কর্মযোগে ব্রহ্মপ্রাপ্তির পথ
সন্ন্যাসস্ত মহাবাহো দুঃখমাপ্তুমযোগতঃ।
যোগযুক্তো মুনির্ব্রহ্ম ন চিরেণাধিগচ্ছতি।।৬।।
অনুবাদঃ হে মহাবাহো! কর্মযোগ ব্যতীত কেবল কর্মত্যাগরূপ সন্ন্যাস দুঃখজনক। কিন্তু যোগযুক্ত মুনি অচিরেই ব্রহ্মকে লাভ করেন।
ভগবদ্গীতার এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কর্মযোগ ও সন্ন্যাসের গভীর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন যে হে মহাবাহু অর্জুন যোগের আশ্রয় ব্যতীত প্রকৃত সন্ন্যাস লাভ করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু যিনি যোগে প্রতিষ্ঠিত এবং কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে জীবন পরিচালনা করেন সেই মুনি অল্প সময়ের মধ্যেই ব্রহ্মস্বরূপ পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ একত্রে এমন একটি জীবনদর্শনের পরিচয় দেয় যেখানে বাহ্যিক ত্যাগের চেয়ে অন্তরের শুদ্ধি এবং কর্মের মধ্যেই মুক্তির পথকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সন্ন্যাস শব্দটির মূল উৎস সংস্কৃত সম্ এবং ন্যাস শব্দের সমন্বয়। সম্ অর্থ সম্পূর্ণ বা সম্যক এবং ন্যাস অর্থ স্থাপন করা ত্যাগ করা অথবা সমর্পণ করা। এই দুটি অংশ একত্রে সন্ন্যাস শব্দের জন্ম দিয়েছে যার প্রকৃত অর্থ সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করা অথবা অহংকার আসক্তি ও স্বার্থপরতার পরিত্যাগ। সাধারণ অর্থে মানুষ সন্ন্যাস বলতে সংসার ত্যাগকে বুঝলেও গীতার আলোকে প্রকৃত সন্ন্যাস হলো অন্তরের কামনা বাসনা এবং ফলের আকাঙ্ক্ষাকে ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করা। এখানে তু শব্দটি পূর্বোক্ত বক্তব্যের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য নির্দেশ করে। এটি বোঝায় যে শুধুমাত্র বাহ্যিক ত্যাগ নয় বরং যোগের সহায়তায় সম্পন্ন সন্ন্যাসই সত্যিকার অর্থে সফল হয়।
মহাবাহো সম্বোধনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কেবল শক্তিশালী যোদ্ধা হিসেবে নয় বরং বিশাল দায়িত্ব বহন করার যোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণ করিয়ে দেন। মহা অর্থ মহান এবং বাহু অর্থ শক্তির প্রতীক। এখানে বাহুর শক্তি কেবল শারীরিক বলকে নির্দেশ করে না বরং মানসিক দৃঢ়তা নৈতিক সাহস এবং আত্মসংযমের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। এই সম্বোধনের মাধ্যমে কৃষ্ণ যেন অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে প্রকৃত বীরত্ব যুদ্ধক্ষেত্রে নয় বরং নিজের মনকে জয় করার মধ্যেই নিহিত।
দুঃখমাপ্তুমযোগতঃ অংশটি বোঝায় যে যোগবিহীন অবস্থায় সন্ন্যাস অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন এবং কষ্টসাধ্য। দুঃখম অর্থ কঠিন কষ্টকর অথবা যন্ত্রণাদায়ক। আপ্তুম অর্থ অর্জন করা বা লাভ করা। অযোগতঃ অর্থ যোগহীন অবস্থায় অথবা যোগের অভাবে। এখানে যোগ বলতে কেবল ধ্যান বা আসন নয় বরং ঈশ্বরচেতনা আত্মনিয়ন্ত্রণ নিষ্কাম কর্ম এবং অন্তরের সমতা বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যিনি নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি তিনি যদি বাহ্যিকভাবে সংসার ত্যাগও করেন তবে অন্তরের আসক্তি তাঁকে আবার বন্ধনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
যোগযুক্তো মুনির্ব্রহ্ম ন চিরেণাধিগচ্ছতি অংশটি এই শ্লোকের মূল উপসংহার। যোগযুক্ত অর্থ যোগে প্রতিষ্ঠিত বা আত্মসংযমে অবিচল। মুনি বলতে কেবল বনবাসী ঋষিকে বোঝায় না বরং যিনি গভীর চিন্তাশীল আত্মজিজ্ঞাসু এবং সত্য অনুসন্ধানী তিনিই প্রকৃত মুনি। ব্রহ্ম এখানে সর্বোচ্চ পরম সত্য চিরন্তন চেতনা এবং অসীম অস্তিত্বের প্রতীক। ন চিরেণ অর্থ অধিক সময় নয় বা অল্প সময়ের মধ্যেই। অধিগচ্ছতি অর্থ উপলব্ধি করে অর্জন করে অথবা প্রাপ্ত হয়। এই অংশের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করছেন যে যোগে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি ধীরে ধীরে নিজের অন্তরের অজ্ঞতা দূর করে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন এবং সেই জ্ঞান তাঁকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়।
এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের মুক্তি বাহ্যিক পরিবেশ পরিবর্তনের মাধ্যমে নয় বরং অন্তরের পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্জিত হয়। কেউ সংসারে থেকেও মুক্ত হতে পারেন আবার কেউ সংসার ত্যাগ করেও আসক্ত থাকতে পারেন। তাই গীতা শিক্ষা দেয় যে কর্ম পরিত্যাগের চেয়ে কর্মের মধ্যে অনাসক্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত সন্ন্যাস মানে দায়িত্ব থেকে পলায়ন নয় বরং দায়িত্ব পালন করতে করতে নিজের অহংকার লোভ এবং স্বার্থপরতাকে ত্যাগ করা।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক কর্মযোগ জ্ঞানযোগ এবং সন্ন্যাসযোগের এক অনন্য সমন্বয়। বেদান্ত মতে ব্রহ্মই একমাত্র সত্য এবং সেই সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য মনকে বিশুদ্ধ করা অপরিহার্য। সাংখ্য দর্শন আত্মা ও প্রকৃতির পার্থক্য উপলব্ধির কথা বলে আর যোগদর্শন মনকে সংযত করে সেই উপলব্ধিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ নির্দেশ করে। গীতা এই দুই ধারাকে একত্রিত করে জানায় যে যোগহীন সন্ন্যাস অসম্পূর্ণ এবং নিষ্কাম কর্মই প্রকৃত সন্ন্যাসের ভিত্তি।
প্রতীকী অর্থে সন্ন্যাস মানুষের অন্তরের অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার প্রতীক। মহাবাহু প্রতীক আত্মশক্তি ও সাহসের। যোগ প্রতীক ভারসাম্য ঐক্য এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের। মুনি প্রতীক প্রজ্ঞা ও আত্মজাগরণের। ব্রহ্ম প্রতীক অসীম সত্য ও সর্বব্যাপী চেতনার। এই প্রতীকগুলো একত্রে মানুষের আধ্যাত্মিক বিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে যেখানে বাহ্যিক জীবন ও অন্তরের সাধনা একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন চিকিৎসক যদি রোগীর সেবাকে মানবকল্যাণের উপাসনা হিসেবে গ্রহণ করেন একজন শিক্ষক যদি নিঃস্বার্থভাবে জ্ঞান বিতরণ করেন একজন বিচারক যদি পক্ষপাতহীনভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন অথবা একজন সাধারণ মানুষ যদি নিজের পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন তবে তিনিও কর্মযোগের পথে অগ্রসর হন। ইতিহাসে রাজর্ষি জনক এর উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি রাজ্য শাসন করেও অন্তরে অনাসক্ত ছিলেন এবং জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয়ে মুক্তির আদর্শ স্থাপন করেছিলেন।
সবশেষে বলা যায় এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে প্রকৃত সন্ন্যাস কোনো পোশাক কোনো নির্জন আশ্রম কিংবা বাহ্যিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের অন্তরের এক গভীর রূপান্তর যেখানে কর্ম থাকে কিন্তু কর্মের অহংকার থাকে না দায়িত্ব থাকে কিন্তু আসক্তি থাকে না এবং জীবন থাকে কিন্তু স্বার্থপরতা থাকে না। যোগের মাধ্যমে মনকে শুদ্ধ করে নিষ্কাম কর্মে প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ খুব দ্রুতই ব্রহ্মজ্ঞান এবং আত্মমুক্তির পথে অগ্রসর হতে পারে। এই কারণেই গীতার এই শ্লোক কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার নির্দেশনা নয় বরং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য এক চিরন্তন জীবনদর্শন।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!