শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৫.৭ | যোগযুক্ত বিশুদ্ধাত্মার কর্ম ও কর্মবন্ধন থেকে মুক্তির পথ
যোগযুক্তো বিশুদ্ধাত্মা বিজিতাত্মা জিতেন্দ্রিয়ঃ।
সর্বভুতাত্মভূতাত্মা কুর্বন্নপি ন লিপ্যতে।।৭।।
অনুবাদঃ যোগযুক্ত জ্ঞানী বিশুদ্ধ বুদ্ধি, বিশুদ্ধ চিত্ত ও জিতেন্দ্রিয় এবং তিনি সমস্ত জীবের অনুরাগভাজন হয়ে সমস্ত কর্ম করেও তাতে লিপ্ত হন না।
ভগবদ্গীতার এই শ্লোকটি মানবজীবনের কর্ম, আত্মশুদ্ধি এবং মুক্তির এক গভীর দর্শন প্রকাশ করে। এখানে এমন এক যোগসাধকের পরিচয় দেওয়া হয়েছে যিনি যোগের মাধ্যমে নিজের চিত্তকে স্থির ও পরিশুদ্ধ করেছেন। শ্লোকের যোগাযুক্ত শব্দটি সংস্কৃত যোগ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ সংযোগ স্থাপন করা, একীভূত হওয়া কিংবা ঈশ্বর ও আত্মার সঙ্গে চেতনার মিলন ঘটানো। যুক্ত শব্দের অর্থ সংযুক্ত বা প্রতিষ্ঠিত। এই দুই অংশ মিলিয়ে যোগাযুক্ত অর্থ হয় যিনি যোগে প্রতিষ্ঠিত এবং সর্বদা ঈশ্বরচেতনা ও আত্মজ্ঞান দ্বারা পরিচালিত। এমন ব্যক্তি বাহ্যিক জগতের কর্মের মধ্যে থেকেও অন্তরে স্থির ও শান্ত থাকেন। তাঁর কাছে যোগ কেবল ধ্যান বা আসনের নাম নয় বরং প্রতিটি কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার এক জীবনব্যাপী সাধনা।
বিশুদ্ধাত্মা শব্দটি বিশুদ্ধ এবং আত্মা এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। বিশুদ্ধ অর্থ সম্পূর্ণ নির্মল, কলুষমুক্ত এবং পবিত্র। আত্মা অর্থ অন্তঃসত্তা, চৈতন্য বা প্রকৃত সত্তা। এই শব্দটি এমন একজন মানুষের পরিচয় দেয় যার মন, বুদ্ধি ও হৃদয় কামনা, ক্রোধ, লোভ, হিংসা এবং অহংকার থেকে মুক্ত হয়েছে। তাঁর অন্তর আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে এবং সেই নির্মল হৃদয়ে সত্য ও ঈশ্বরের প্রতিফলন স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। আধ্যাত্মিক দর্শনে এই নির্মলতা কেবল নৈতিক গুণ নয় বরং আত্মজ্ঞান লাভের প্রধান ভিত্তি। অন্তর যত বিশুদ্ধ হয় ততই মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।
বিজিতাত্মা শব্দটির উৎপত্তি বিজি ধাতু থেকে যার অর্থ জয় করা এবং আত্মা শব্দের অর্থ নিজের মন বা অন্তঃকরণ। এই শব্দের প্রকৃত তাৎপর্য হলো যিনি নিজের মনকে জয় করেছেন। সাধারণ মানুষ বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে কিন্তু প্রকৃত যোগী নিজের ভেতরের অস্থিরতা, ভয়, আসক্তি এবং দুর্বলতাকে জয় করেন। আত্মসংযমের এই শক্তিই তাঁকে সত্যিকারের বিজয়ী করে তোলে। মানুষের জীবনে সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে নয় বরং নিজের মন ও প্রবৃত্তির সঙ্গে। যিনি সেই যুদ্ধে জয়ী হন তিনিই প্রকৃত অর্থে বিজিতাত্মা।
জিতেন্দ্রিয় শব্দটি জিত এবং ইন্দ্রিয় এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। এর অর্থ যিনি নিজের ইন্দ্রিয়সমূহকে নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। মানুষের চোখ, কান, জিহ্বা, নাক এবং ত্বক প্রতিনিয়ত বহির্জগতের প্রতি আকৃষ্ট হয়। নিয়ন্ত্রণহীন ইন্দ্রিয় মানুষকে ভোগের দিকে নিয়ে যায় এবং তাকে অস্থির করে তোলে। কিন্তু জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি ইন্দ্রিয়কে দমন করেন না বরং সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তাঁর ইন্দ্রিয় জ্ঞানের উপকরণ হয়ে ওঠে, আসক্তির কারণ নয়। এই শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক আচরণ এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বভূতাত্মভূতাত্মা শব্দটি এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর ও বিস্তৃত ভাব প্রকাশ করে। সর্ব অর্থ সকল, ভূত অর্থ সমস্ত জীব বা সৃষ্ট সত্তা, আত্মা অর্থ অন্তর্নিহিত চৈতন্য। এই যৌগিক শব্দের অর্থ যিনি নিজের আত্মাকে সকল প্রাণীর আত্মার সঙ্গে একাত্মরূপে উপলব্ধি করেন। তিনি আর মানুষ, প্রাণী, জাতি, ধর্ম বা বর্ণের ভেদে বিভক্ত হয়ে থাকেন না। তিনি প্রত্যেক জীবের মধ্যে একই পরম চৈতন্যের প্রকাশ অনুভব করেন। এই উপলব্ধি মানুষকে দয়া, প্রেম, সহমর্মিতা এবং সর্বজনীন মানবতার পথে পরিচালিত করে। দর্শনের ভাষায় এটি অদ্বৈত চেতনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ যেখানে আত্মা ও বিশ্বাত্মার মধ্যে আর কোনো বিভাজন অবশিষ্ট থাকে না।
শ্লোকের শেষ অংশ কুর্বন্নপি ন লিপ্যতে মানবজীবনের কর্মদর্শনের এক অনন্য শিক্ষা বহন করে। কুর্বন অর্থ কর্ম করতে করতে, অপি অর্থ যদিও এবং ন লিপ্যতে অর্থ কর্মের দ্বারা আবদ্ধ বা কলুষিত হন না। এর অর্থ যোগী ব্যক্তি পৃথিবীর সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন, সমাজে কাজ করেন, পরিবারকে রক্ষা করেন, কর্তব্য সম্পাদন করেন, কিন্তু কোনো কর্মের ফলের প্রতি আসক্ত হন না। তাই তাঁর কর্ম তাঁকে বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে না। পদ্মফুল যেমন জলের মধ্যে জন্মেও জলে ভিজে না, তেমনি সত্য যোগী সংসারের মধ্যে থেকেও সংসারের আসক্তিতে আবদ্ধ হন না। এটাই কর্মযোগের সর্বোচ্চ শিক্ষা।
এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ ভাষাগতভাবে সমৃদ্ধ এবং দার্শনিকভাবে অসীম গভীর। যোগ এখানে কেবল শারীরিক অনুশীলন নয় বরং আত্মার সঙ্গে পরম সত্যের মিলন। বিশুদ্ধতা কেবল বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা নয় বরং অন্তরের পবিত্রতা। আত্মজয় মানে নিজের দুর্বলতার উপর বিজয়। ইন্দ্রিয়জয় মানে সংযমের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন। সকল প্রাণীতে নিজের আত্মাকে অনুভব করা মানে বিশ্বমানবতার চেতনা লাভ করা। আর কর্মের মধ্যেও অনাসক্ত থাকা মানে সত্যিকারের মুক্ত জীবন লাভ করা।
আধুনিক সমাজেও এই শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কর্মক্ষেত্রে সৎ থেকে কর্তব্য পালন করা, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতায় অহংকার বা হতাশায় ডুবে না যাওয়া, সকল মানুষের প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা এবং নিজের মনকে নিয়মিত শুদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এই শ্লোকের বাস্তব প্রয়োগ। ইতিহাসে বহু মহাপুরুষ নিজেদের কর্মের মাধ্যমে সমাজকে পরিবর্তন করেছেন কিন্তু ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয় বরং বৃহত্তর কল্যাণের উদ্দেশ্যে। তাঁদের জীবন এই শ্লোকের জীবন্ত উদাহরণ।
সবশেষে বলা যায় এই শ্লোক মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ আদর্শকে একত্রে ধারণ করে। যোগে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, অন্তরকে বিশুদ্ধ করা, মন ও ইন্দ্রিয়কে জয় করা, সকল প্রাণীর মধ্যে একই আত্মাকে উপলব্ধি করা এবং অনাসক্তভাবে কর্তব্য পালন করা এই পাঁচটি গুণ একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে মুক্ত ও পরিপূর্ণ করে তোলে। ভাষার সৌন্দর্য, দর্শনের গভীরতা এবং জীবনের বাস্তব শিক্ষার অনন্য সমন্বয়ে এই শ্লোক আজও মানবসভ্যতার জন্য এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!