সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৫.৯ | ইন্দ্রিয়ের কর্ম ও আত্মার সাক্ষীস্বরূপ অবস্থানের গভীর তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


প্রলপন্ বিসৃজন্ গৃহ্নন্নুন্মিষন্নিমিষন্নপি।ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেষু বর্তন্ত ইতি ধারয়ন্।।৯।।
প্রলপন্ বিসৃজন্ গৃহ্নন্নুন্মিষন্নিমিষন্নপি।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেষু বর্তন্ত ইতি ধারয়ন্।।৯।।

অনুবাদঃ চিন্ময় চেতনায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তি দর্শন, শ্রবণ, স্পর্শ, ঘ্রাণ, ভোজন, গমন, নিদ্রা ও নিঃশ্বাস আদি ক্রিয়া করেও সর্বদা জানেন যে, প্রকৃতপক্ষে তিনি কিছুই করছেন না। কারণ প্রলাপ, ত্যাগ, গ্রহণ, চক্ষুর উন্মেষ ও নিমেষ করার সময় তিনি সব সময় জানেন যে, জড় ইন্দ্রিয়গুলিই কেবল ইন্দ্রিয়ের বিষয়ে প্রবৃত্ত হয়েছে, তিনি নিজে কিছুেই করছেন না। 

ভগবদ্গীতার পঞ্চম অধ্যায়ের নবম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত সাধারণ কয়েকটি কাজের মধ্য দিয়ে এক গভীর আত্মতত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। মানুষ কথা বলে, কিছু গ্রহণ করে, কিছু ত্যাগ করে, চোখ খোলে, চোখ বন্ধ করে, দেখে, শোনে এবং নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে। সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা এসব কাজকে নিজের কাজ বলে মনে করি। আমরা বলি আমি কথা বলছি, আমি দেখছি, আমি গ্রহণ করছি, আমি কাজ করছি। কিন্তু গীতার জ্ঞানদৃষ্টিতে এই আমি ধারণাটিই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। শ্রীকৃষ্ণ দেখাচ্ছেন যে দেহ ও ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপকে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ বলে মনে করা অজ্ঞতার লক্ষণ। জ্ঞানী ব্যক্তি উপলব্ধি করেন যে ইন্দ্রিয়সমূহ তাদের নিজ নিজ বিষয়ের সঙ্গে স্বাভাবিক নিয়মে ক্রিয়া করছে এবং আত্মা সেই সমস্ত ক্রিয়ার অন্তরালে অবস্থানকারী নীরব সাক্ষী।

শ্লোকটির সূচনা হয়েছে প্রলপন্ শব্দ দিয়ে। সংস্কৃত প্রলপন্ শব্দটি প্র এবং লপ্ ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। লপ্ ধাতুর অর্থ কথা বলা বা উচ্চারণ করা। প্র উপসর্গ যুক্ত হওয়ার ফলে কথনের প্রকাশ আরও স্পষ্ট হয়। এখানে প্রলপন্ বলতে কথা বলতে থাকা বা কথোপকথনে নিযুক্ত হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। মানুষের জীবনে কথা বলা একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক কর্ম। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে কথা বলা মানেই আত্মা কথা বলছে এমন নয়। বাক্ ইন্দ্রিয়, জিহ্বা, মস্তিষ্ক এবং মন তাদের নিজ নিজ ভূমিকা পালন করে বলেই কথার প্রকাশ ঘটে। আত্মা সেই কার্যকলাপের দ্বারা প্রকৃত অর্থে পরিবর্তিত হয় না। ফলে জ্ঞানী ব্যক্তি কথা বললেও নিজের অন্তরে কর্তার অহংকার পোষণ করেন না।

এরপর এসেছে বিসৃজন্ শব্দটি। বিসৃজন্ শব্দটি বি উপসর্গ এবং সৃজ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। সৃজ্ ধাতুর মধ্যে ছেড়ে দেওয়া, নির্গত করা বা সৃষ্টি করে বাইরে প্রকাশ করার ধারণা রয়েছে। এই প্রসঙ্গে বিসৃজন্ দেহের স্বাভাবিক ত্যাগ বা বর্জনের ক্রিয়াকে নির্দেশ করে। মানুষের কাছে এটি খুব সাধারণ শারীরিক কাজ। কিন্তু এই সাধারণ কাজটিকেও শ্রীকৃষ্ণ বৃহত্তর আত্মতত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। মানুষের শরীরের অসংখ্য কার্যকলাপ নিজস্ব জৈবিক নিয়মে সংঘটিত হয়। সেগুলোর অধিকাংশের উপর মানুষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণও নেই। তাই দেহের ক্রিয়াকে আত্মার ক্রিয়া মনে করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

গৃহ্ণন্ শব্দটির মূল রয়েছে গ্রহণের ধারণায়। সংস্কৃত গ্রহ্ ধাতুর অর্থ ধরা বা গ্রহণ করা। গৃহ্ণন্ বলতে গ্রহণ করতে থাকা বা কোনো কিছু গ্রহণ করার ক্রিয়াকে বোঝায়। মানুষ চোখ দিয়ে দৃশ্য গ্রহণ করে, কান দিয়ে শব্দ গ্রহণ করে, নাক দিয়ে গন্ধ গ্রহণ করে, জিহ্বা দিয়ে স্বাদ গ্রহণ করে এবং ত্বকের মাধ্যমে স্পর্শ অনুভব করে। আমরা সাধারণত বলি আমি দেখছি, আমি শুনছি অথবা আমি অনুভব করছি। কিন্তু গীতার শিক্ষা হলো এই অভিজ্ঞতাগুলোর সঙ্গে আত্মার প্রকৃত পরিচয়কে এক করে দেখা উচিত নয়। ইন্দ্রিয় তার বিষয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করছে। আত্মা সেই অভিজ্ঞতার সাক্ষী।

উন্মিষন্ এবং নিমিষন্ শব্দ দুটি এই শিক্ষাকে আরও সুন্দর করে প্রকাশ করেছে। উন্মিষন্ বলতে চোখ খোলা বা দৃষ্টি উন্মুক্ত হওয়াকে বোঝায় এবং নিমিষন্ বলতে চোখ বন্ধ করা বা পলক ফেলার ভাব প্রকাশ পায়। মানুষের চোখ খোলা এবং বন্ধ হওয়া অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। অথচ এই সামান্য ঘটনাকেও শ্রীকৃষ্ণ আত্মা ও দেহের পার্থক্য বোঝানোর জন্য ব্যবহার করেছেন। চোখ খোলা মানে দেহের একটি ইন্দ্রিয় সক্রিয় হয়েছে এবং চোখ বন্ধ মানে সেই ইন্দ্রিয়ের বাহ্যিক কার্যকলাপ সাময়িকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সাক্ষী যে চৈতন্য তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটে না।

অপি শব্দটি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন তৈরি করেছে। এর অর্থ এমনকি বা আরও। অর্থাৎ কেবল বড় বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রেই নয়, বরং চোখ খোলা ও চোখ বন্ধ করার মতো অতি সাধারণ কাজের ক্ষেত্রেও একই আত্মদৃষ্টি প্রযোজ্য। এই বক্তব্যের মধ্যে গীতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত রয়েছে। আধ্যাত্মিকতা কেবল ধ্যান, পূজা বা নির্জন সাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রতম কাজের মধ্যেও আত্মজ্ঞানকে ধারণ করা যায়।

এরপর শ্লোকে এসেছে ইন্দ্রিয়াণি শব্দটি। ইন্দ্রিয় বলতে মানুষের জ্ঞান ও কর্মের বিভিন্ন উপকরণকে বোঝানো হয়। চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, ত্বক ইত্যাদি জ্ঞানেন্দ্রিয় মানুষের কাছে বাহ্যিক জগতের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। আবার বাক্, হাত, পা এবং অন্যান্য কর্মেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মানুষ বাহ্যিক জগতে নিজের কার্যকলাপ প্রকাশ করে। ইন্দ্রিয় শব্দের গভীরে শক্তি ও অনুভবের ধারণা রয়েছে। এগুলো মানুষের অভিজ্ঞতার দ্বার। কিন্তু দ্বার কখনো ঘরের অধিবাসী নয়। ঠিক তেমনি ইন্দ্রিয় আত্মা নয়। ইন্দ্রিয় আত্মার অভিজ্ঞতার মাধ্যম মাত্র।

ইন্দ্রিয়ার্থেষু শব্দটি ইন্দ্রিয় এবং অর্থ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে অর্থ বলতে ইন্দ্রিয়ের বিষয়কে বোঝানো হয়েছে। চোখের বিষয় রূপ, কানের বিষয় শব্দ, নাকের বিষয় গন্ধ, জিহ্বার বিষয় রস এবং ত্বকের বিষয় স্পর্শ। অর্থাৎ ইন্দ্রিয় এবং ইন্দ্রিয়বিষয়ের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে। চোখ রূপের দিকে যায়, কান শব্দ গ্রহণ করে এবং জিহ্বা রস গ্রহণ করে। এই সম্পর্কটি প্রকৃতির নিয়মে সংঘটিত হয়। আত্মা নিজে কোনো ইন্দ্রিয় নয় এবং কোনো ইন্দ্রিয়বিষয়ও নয়।

বর্তন্তে শব্দটি বর্ত্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর অর্থ চলা, অবস্থান করা বা কার্যকর থাকা। এখানে এর অর্থ হলো ইন্দ্রিয়সমূহ তাদের নিজ নিজ বিষয়ে ক্রিয়াশীল রয়েছে। এই একটি শব্দই শ্লোকটির দার্শনিক কেন্দ্রকে অত্যন্ত পরিষ্কার করে দেয়। মানুষ যদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে তবে দেখতে পাবে যে দেহের বহু কার্যকলাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে। হৃদপিণ্ড স্পন্দিত হয়, শ্বাসপ্রশ্বাস চলে, চোখ পলক ফেলে এবং ইন্দ্রিয়সমূহ বাহ্যিক জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। মানুষ সবকিছুর প্রত্যক্ষ কর্তা নয়।

এই উপলব্ধিকে দৃঢ় করার জন্য শ্লোকের শেষে এসেছে ইতি ধারয়ন্। ধারয়ন্ শব্দটি ধৃ ধাতু থেকে এসেছে। ধৃ অর্থ ধারণ করা। অর্থাৎ শুধু একবার এই কথা শুনে নেওয়া নয়, বরং নিজের চেতনার মধ্যে এই সত্যকে ধারণ করে রাখা। জ্ঞানী ব্যক্তি প্রতিটি মুহূর্তে এই বোধকে ধরে রাখেন যে ইন্দ্রিয়সমূহ তাদের নিজ নিজ বিষয়ের মধ্যে ক্রিয়াশীল। এই উপলব্ধি তার মধ্যে অহংকার এবং আসক্তিকে ধীরে ধীরে ক্ষীণ করে।

এই শ্লোকের গভীর দার্শনিক তাৎপর্য বোঝার জন্য কর্তা ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ মনে করে আমি কর্তা। আমি কাজ করছি, আমি কথা বলছি, আমি দেখছি, আমি শুনছি এবং আমিই ফল ভোগ করছি। কিন্তু গীতার জ্ঞানযোগ এই আমি ধারণাকে বিশ্লেষণ করে দেখায় যে মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি এবং আত্মা এক জিনিস নয়। দেহ কাজ করে, ইন্দ্রিয় বিষয় গ্রহণ করে, মন অভিজ্ঞতাকে সংগঠিত করে, বুদ্ধি বিচার করে এবং আত্মা এসবের সাক্ষীস্বরূপ অবস্থান করে। আত্মাকে যখন দেহ ও মনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক করে দেখা হয় তখন জন্ম নেয় অহংকার, আসক্তি এবং বন্ধন।

এই শিক্ষার একটি সুন্দর উপমা হতে পারে আকাশ ও মেঘের সম্পর্ক। মেঘ আকাশে আসে এবং চলে যায়। কখনো আকাশ মেঘে ঢাকা পড়ে, কখনো পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু মেঘের আসা যাওয়ায় আকাশের প্রকৃত অস্তিত্ব পরিবর্তিত হয় না। তেমনি চিন্তা আসে এবং চলে যায়, অনুভূতি আসে এবং চলে যায়, ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতা আসে এবং চলে যায়। কিন্তু তাদের সাক্ষী চৈতন্য নিজের প্রকৃত স্বরূপে অপরিবর্তিত থাকে। মানুষ যখন নিজেকে মেঘের সঙ্গে এক করে ফেলে তখন সে অস্থির হয়। যখন নিজেকে আকাশের মতো সাক্ষী চৈতন্য হিসেবে উপলব্ধি করতে শেখে তখন অন্তরে এক ধরনের স্বাধীনতা জন্ম নেয়।

এই শিক্ষা কর্মজীবনের ক্ষেত্রেও গভীরভাবে প্রযোজ্য। একজন শিক্ষক পড়াচ্ছেন, একজন চিকিৎসক চিকিৎসা করছেন, একজন কৃষক জমিতে কাজ করছেন, একজন শিল্পী ছবি আঁকছেন এবং একজন সাধারণ মানুষ নিজের দৈনন্দিন দায়িত্ব পালন করছেন। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কাজ হচ্ছে। কিন্তু কাজের সঙ্গে আমি কর্তা এই অহংকারকে যুক্ত না করেও কাজ করা সম্ভব। গীতার কর্মযোগ এই অবস্থাকেই বিশেষ গুরুত্ব দেয়। কাজ থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং কাজের মধ্যেই অন্তরের আসক্তি ও অহংকারকে অতিক্রম করা হলো প্রকৃত সাধনা।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শিক্ষার মূল্য রয়েছে। মানুষ প্রায়ই নিজের চিন্তা, আবেগ এবং অনুভূতির সঙ্গে এত গভীরভাবে এক হয়ে যায় যে সে মনে করে তার চিন্তাই তার সম্পূর্ণ পরিচয়। কিন্তু পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় চিন্তা পরিবর্তিত হয়, অনুভূতি পরিবর্তিত হয় এবং মানসিক অবস্থাও পরিবর্তিত হয়। যে ব্যক্তি নিজের চিন্তাকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে পর্যবেক্ষক এবং পর্যবেক্ষিত বিষয়ের মধ্যে একটি পার্থক্য রয়েছে। গীতার সাক্ষীভাবের ধারণার সঙ্গে এই পর্যবেক্ষণশীল অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে।

সাহিত্যিক ও প্রতীকী অর্থেও এই শ্লোকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রলপন্ মানুষের বাক্যকে প্রতীক করে, গৃহ্ণন্ গ্রহণকে প্রতীক করে, বিসৃজন্ ত্যাগকে প্রতীক করে এবং উন্মিষন্ ও নিমিষন্ জাগরণ ও প্রত্যাহারের প্রতীক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ মানুষের সমগ্র জীবন যেন গ্রহণ এবং ত্যাগ, জাগরণ এবং বিশ্রাম, অভিজ্ঞতা এবং প্রত্যাহারের একটি ধারাবাহিক প্রবাহ। এর মধ্য দিয়ে মানুষ যদি নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে যায় তবে সে বাহ্যিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকেও পরিবর্তনশীল মনে করে। কিন্তু যদি সাক্ষীভাব অর্জন করে তবে সে বুঝতে পারে যে পরিবর্তনের মধ্যে থেকেও অপরিবর্তনের একটি স্তর রয়েছে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে মুক্তির জন্য সব কাজ বন্ধ করা প্রয়োজন নয়। বরং কাজ চলতে পারে, ইন্দ্রিয় কাজ করতে পারে, মন চিন্তা করতে পারে এবং দেহ নিজের স্বাভাবিক নিয়মে চলতে পারে। তবু অন্তরে এমন একটি উপলব্ধি জন্ম নিতে পারে যেখানে মানুষ নিজেকে সমস্ত কাজের সীমিত কর্তা হিসেবে আঁকড়ে ধরে থাকে না। এই অবস্থায় কর্ম থাকে কিন্তু কর্মের অহংকার থাকে না। অভিজ্ঞতা থাকে কিন্তু অতিরিক্ত আসক্তি থাকে না। জীবন থাকে কিন্তু জীবনের প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে আত্মপরিচয়কে জড়িয়ে ফেলা হয় না।

ভগবদ্গীতার এই শ্লোক তাই কেবল ইন্দ্রিয়সংযমের শিক্ষা নয়। এটি আত্মপরিচয়ের একটি গভীর অনুসন্ধান। মানুষ কে, তার কাজ কে করছে, অনুভূতি কোথায় জন্ম নিচ্ছে এবং সেই সমস্ত পরিবর্তনের অন্তরালে কী অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে, এই প্রশ্নগুলোর দিকে শ্লোকটি আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়। প্রলপন্ থেকে ধারয়ন্ পর্যন্ত প্রতিটি শব্দ যেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি দরজা খুলে দেয়। সেই দরজা দিয়ে দেখা যায় দেহের ক্রিয়া এবং আত্মার স্বরূপ এক নয়।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোকের মূল উপলব্ধি হলো ইন্দ্রিয়সমূহ তাদের নিজ নিজ বিষয়ের মধ্যে ক্রিয়াশীল থাকে। চোখ দেখে, কান শোনে, জিহ্বা কথা বলে, দেহ গ্রহণ করে ও ত্যাগ করে এবং মন নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। কিন্তু আত্মা এসবের অন্তরালে অবস্থানকারী সাক্ষী চৈতন্য। এই সত্যকে শুধু বুদ্ধিতে জানা নয়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ধারণ করাই হলো ধারয়নের প্রকৃত অর্থ। তখন মানুষ কর্মের মধ্যেও শান্ত থাকতে শেখে, সাফল্যে অতিরিক্ত অহংকার করে না, ব্যর্থতায় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে না এবং ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতাকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় বলে মনে করে না। এই সাক্ষীভাবই কর্মের মধ্যে স্বাধীনতা এবং জীবনের মধ্যে অন্তরের শান্তির দিকে নিয়ে যায়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 11, 2026 August 11, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি