শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.১ | কর্মফলের আসক্তি ত্যাগই প্রকৃত সন্ন্যাস ও যোগের পথ
শ্রীভগবানুবাচ
অনাশ্রিতঃ কর্মফলং কার্যং কর্ম করোতি যঃ।
স সন্ন্যাসী চ যোগী চ ন নিরগ্নির্ন চাক্রিয়ঃ।।১।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- যিনি অগ্নিহোত্রাদি কর্ম ত্যাগ করেছেন এবং দৈহিক চেষ্টাশূন্য তিনি সন্যাসী বা যোগী নন। যিনি কর্মফলের প্রতি আসক্ত না হয়ে তাঁর কর্তব্য কর্ম করেন, তিনিই যথার্থ সন্নাসী বা যোগী।
ভগবদ্গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকটি মানুষের কর্মজীবন ও আধ্যাত্মিক সাধনার এক গভীর সত্যকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করে। শ্রীভগবান এখানে এমন এক জীবনদর্শনের কথা বলেন যেখানে বাহ্যিক ত্যাগের চেয়ে অন্তরের ত্যাগকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনাশ্রিত শব্দটি নির্দেশ করে এমন এক মানসিক অবস্থাকে যেখানে মানুষ নিজের কর্মের ফলের উপর নির্ভরশীল থাকে না। এই শব্দটি সংস্কৃত অন উপসর্গ এবং শ্রি ধাতু থেকে গঠিত, যার অর্থ আশ্রয় নেওয়া। ফলে অনাশ্রিত অর্থ দাঁড়ায় যে ব্যক্তি আশ্রয় নেয় না, বিশেষ করে কর্মফলের উপর নির্ভর করে না। কর্মফল শব্দটি আবার কর্ম এবং ফল এই দুটি ধারণার সমন্বয়ে গঠিত, যেখানে কর্ম বোঝায় কাজ এবং ফল বোঝায় তার পরিণতি। কার্য্যং কর্ম বলতে বোঝানো হয়েছে সেই কাজ যা করা কর্তব্য, অর্থাৎ যা মানুষের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। করোতি শব্দটি করা ক্রিয়ার বর্তমান রূপ যা নির্দেশ করে সক্রিয়ভাবে কাজ সম্পাদন করা। সন্ন্যাসী শব্দটি সম এবং নি উপসর্গসহ অস ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ সম্পূর্ণ ত্যাগ করা। যোগী শব্দটি যুজ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ সংযোগ স্থাপন করা বা ঐক্যবদ্ধ হওয়া। নিরগ্নি শব্দটি এমন ব্যক্তিকে বোঝায় যে বাহ্যিক যজ্ঞ বা অগ্নিকর্ম ত্যাগ করেছে এবং অক্রিয় শব্দটি বোঝায় যে ব্যক্তি কোনো কাজ করে না।
এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ অনুযায়ী যে ব্যক্তি কর্মফলের প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে নিজের কর্তব্য কাজ সম্পাদন করে, সেই প্রকৃত সন্ন্যাসী এবং প্রকৃত যোগী। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যে কেবল বাহ্যিকভাবে অগ্নি ত্যাগ করা বা কাজ না করাই সন্ন্যাস নয়। বরং প্রকৃত সন্ন্যাস নিহিত রয়েছে অন্তরের আসক্তিহীনতায়। এই শিক্ষা আমাদের জানায় যে কাজ থেকে পালিয়ে যাওয়া বা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া কোনো আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ নয়। বরং দায়িত্ব পালন করেও অন্তরের মুক্তি অর্জন করা সম্ভব।
প্রাসঙ্গিকভাবে এই শ্লোকটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীরভাবে প্রযোজ্য। একজন ছাত্র যদি শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলের চিন্তা না করে নিষ্ঠার সঙ্গে অধ্যয়ন করে তবে সে এই শিক্ষার অনুসরণ করছে। একজন কর্মজীবী মানুষ যদি নিজের কাজ সততার সঙ্গে করে কিন্তু লাভ ক্ষতির হিসাবের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রাখে তবে সেও এই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ করছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেয় এবং তাকে আরও স্থিতিশীল করে তোলে।
এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো যে মানুষের দুঃখের মূল কারণ তার আসক্তি। যখন মানুষ নিজের কাজের ফলের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ অনুভব করে তখন সে ভয়, উদ্বেগ এবং হতাশার মধ্যে পড়ে যায়। কিন্তু যখন সে ফলের প্রতি নিরাসক্ত হয়ে শুধুমাত্র কর্তব্য পালনে মনোযোগ দেয় তখন তার মন মুক্ত থাকে। এই মুক্ত অবস্থাই প্রকৃত যোগের অবস্থা। এখানে কর্মযোগের যে ধারণা উপস্থাপিত হয়েছে তা মানুষকে শেখায় কীভাবে কর্মের মধ্য দিয়েই মুক্তি অর্জন করা যায়।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি বেদান্ত দর্শনের একটি মৌলিক তত্ত্বকে প্রতিফলিত করে যেখানে বলা হয় আত্মা আসলে কর্মফলের ভোক্তা নয়। কর্ম এবং ফল উভয়ই প্রকৃতির মধ্যে ঘটে, কিন্তু আত্মা তাদের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। তাই যখন মানুষ নিজেকে কর্মের ফলের সঙ্গে যুক্ত করে তখন সে মোহের মধ্যে আবদ্ধ হয়। অন্যদিকে যখন সে নিজেকে কেবল কর্মের একজন মাধ্যম হিসেবে দেখে তখন সে মুক্তির দিকে এগিয়ে যায়। এই চিন্তাধারা অস্তিত্ববাদী দর্শনের সঙ্গেও একটি সূক্ষ্ম সাদৃশ্য বহন করে, যেখানে বলা হয় মানুষ তার কর্মের মাধ্যমেই নিজের সত্তাকে প্রকাশ করে।
প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকটি বাহ্যিক আচার এবং অন্তরের সত্যের মধ্যে পার্থক্যকে তুলে ধরে। এখানে অগ্নি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হয়েছে যজ্ঞ এবং ধর্মীয় আচারকে বোঝাতে, আর অক্রিয়তা প্রতীক হিসেবে বোঝায় নিষ্ক্রিয়তা বা দায়িত্ব থেকে পলায়ন। শ্লোকটি স্পষ্ট করে যে এই দুই চরম অবস্থার কোনোটিই প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার পথ নয়। প্রকৃত পথ হলো এমন এক সমন্বয় যেখানে মানুষ সক্রিয়ভাবে কাজ করে কিন্তু অন্তরে নিরাসক্ত থাকে।
বাস্তব জীবনে এই ধারণার একটি সুন্দর উদাহরণ হলো একজন কৃষক। সে তার জমিতে বীজ বপন করে, জমি চাষ করে এবং যত্ন নেয়, কিন্তু বৃষ্টি হবে কি না বা ফলন কেমন হবে তা তার হাতে নেই। তবুও সে তার কাজ করে যায়। এই নিষ্ঠা এবং ফলের প্রতি নিরাসক্তিই তাকে প্রকৃত কর্মযোগীর অবস্থানে নিয়ে যায়। একইভাবে একজন শিক্ষক বা চিকিৎসকও নিজের কর্তব্য পালন করেন মানুষের কল্যাণের জন্য, ফলের নিশ্চয়তার উপর নির্ভর না করে।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকটি আমাদের এমন এক জীবনদর্শনের শিক্ষা দেয় যেখানে কর্ম এবং ত্যাগ একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। ভাষাগতভাবে এটি উপসর্গ এবং ধাতুর সূক্ষ্ম ব্যবহারের মাধ্যমে গভীর অর্থ প্রকাশ করেছে। দার্শনিকভাবে এটি কর্মযোগের ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং প্রতীকীভাবে এটি আমাদের শেখায় যে বাহ্যিক আচারের চেয়ে অন্তরের অবস্থাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত বলা যায় যে যে ব্যক্তি নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে কিন্তু তার ফলের প্রতি আসক্ত হয় না, সেই প্রকৃত অর্থে মুক্ত, সেই প্রকৃত যোগী এবং সেই প্রকৃত সন্ন্যাসী।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!