শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.১৭ | সুষম আহার, কর্ম, নিদ্রা ও জীবনযাপনে দুঃখহরণকারী যোগ
যুক্তহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু।
যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা।।১৭।।
অনুবাদঃ যিনি পরিমিত আহার ও বিহার করেন, পরিমিত প্রয়াস করেন, যাঁর নিদ্রা ও জাগরণ নিয়মিত, তিনিই যোগ অভ্যাসের দ্বারা সমস্ত জড়-জাগতিক দুঃখের নিবৃত্তি সাধন করতে পারেন।
ভগবদ্গীতার ধ্যানযোগ অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক হল “যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্ম্মসু যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা”। এই শ্লোকটি মানবজীবনের এক গভীর এবং সার্বজনীন সত্যকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ সুসংগঠিত ভাষায় প্রকাশ করে। এখানে মূল ধারণাটি ঘুরে ফিরে আসে একটি শব্দকে কেন্দ্র করে, সেটি হল যুক্ত। সংস্কৃত ধাতু যুজ থেকে উৎপন্ন এই শব্দের অর্থ হল সংযম, নিয়ন্ত্রণ এবং সুষম অবস্থা। এই একই ধাতু থেকে যোগ শব্দটিরও উৎপত্তি, যা সংযোগ, ঐক্য এবং আত্মসাধনার প্রতীক। ফলে যুক্ত শব্দটি কেবল একটি ভাষাগত উপাদান নয়, এটি একটি জীবনদর্শনের ভিত্তি।
শ্লোকটির গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি একাধিক সমাসবদ্ধ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। যুক্ত আহার বিহারস্য দ্বারা বোঝানো হয়েছে এমন একজন ব্যক্তি যার খাদ্যগ্রহণ এবং চলাফেরা বা বিনোদন সুষম ও নিয়ন্ত্রিত। যুক্ত চেষ্টস্য কর্ম্মসু অংশটি নির্দেশ করে কর্মক্ষেত্রে তার প্রচেষ্টা সংযত এবং পরিমিত। একইভাবে যুক্ত স্বপ্ন অববোধস্য বোঝায় তার ঘুম এবং জাগরণের মধ্যেও রয়েছে একটি সুষম ভারসাম্য। এইভাবে শ্লোকটি মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি দৈনন্দিন কার্যকলাপকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত জীবনধারার দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
আক্ষরিক অর্থে এই শ্লোকটি বলে যে যার আহার, বিহার, কর্মপ্রচেষ্টা এবং নিদ্রা ও জাগরণ সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত ও সুষম, তার যোগ বা আত্মসংযোগ দুঃখ দূর করে। এখানে দুঃখহা শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, যার অর্থ দুঃখনাশক। অর্থাৎ যোগ এমন একটি অবস্থা যা কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটায় না, বরং জীবনের দুঃখ কষ্টকে লাঘব করে এবং অন্তরে স্থিরতা আনে।
প্রাসঙ্গিকভাবে এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত বাস্তবমুখী। এটি আমাদের শেখায় যে অতিরিক্ততা কখনোই কল্যাণকর নয়। অতিরিক্ত ভোগ যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অতিরিক্ত ত্যাগও জীবনের ভারসাম্য নষ্ট করে। আধুনিক জীবনে আমরা প্রায়ই দেখি কেউ অতিরিক্ত কাজের চাপে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে, আবার কেউ অলসতায় ডুবে থেকে নিজের সম্ভাবনাকে নষ্ট করছে। এই শ্লোক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি সুষম অবস্থানই প্রকৃত উন্নতির পথ। এটি এক ধরনের জীবনবিজ্ঞান যেখানে শরীর, মন এবং আত্মার মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা হয়।
এই শিক্ষার গভীরে গেলে আমরা একটি বৃহত্তর দার্শনিক সত্যের সন্ধান পাই। এটি মধ্যপন্থার ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করে, যা বিভিন্ন দর্শনে প্রতিফলিত হয়েছে। বৌদ্ধ দর্শনে যেমন মধ্যমার্গের কথা বলা হয়েছে, তেমনি পাশ্চাত্য দার্শনিক আরিস্টটলও তার নীতিশাস্ত্রে মধ্যম অবস্থাকে সর্বোত্তম বলে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ চরমতার পরিবর্তে ভারসাম্যই হল মানবজীবনের প্রকৃত গুণ। যোগদর্শনের ভাষায় এই ভারসাম্য চিত্তের স্থিতি আনে এবং মনকে অশান্তি থেকে মুক্ত করে।
প্রতীকী দিক থেকে শ্লোকটি মানুষের সামগ্রিক জীবনচক্রকে উপস্থাপন করে। আহার প্রতীক শরীরের পুষ্টির, বিহার মানসিক প্রশান্তির, চেষ্টা কর্মজীবনের সক্রিয়তার, স্বপ্ন বিশ্রামের এবং অববোধ সচেতনতার প্রতীক। এই প্রতিটি উপাদান একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং একটির ভারসাম্যহীনতা অন্যটির উপর প্রভাব ফেলে। তাই এই শ্লোক আমাদের শেখায় জীবনের প্রতিটি দিককে সমান গুরুত্ব দিয়ে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে।
বাস্তব জীবনের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা যায়। একজন শিক্ষার্থী যদি সারাদিন পড়াশোনায় নিমগ্ন থাকে তবে সে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়বে, আবার যদি সে একেবারেই পড়াশোনা না করে তবে তার উন্নতি সম্ভব নয়। সুষম সময় বণ্টনই তাকে সফলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। প্রকৃতির দিকেও তাকালে আমরা একই নিয়ম দেখতে পাই। সূর্য নির্দিষ্ট সময়ে উদয় ও অস্ত যায়, দিন এবং রাতের এই ভারসাম্যই পৃথিবীতে জীবনের ধারাকে সচল রাখে। ইতিহাসেও দেখা যায় যে বুদ্ধ অতিরিক্ত তপস্যার পথ ত্যাগ করে মধ্যপথ গ্রহণ করেছিলেন এবং সেখানেই তিনি জ্ঞান লাভ করেন।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকটি একটি গভীর জীবনদর্শনের সারাংশ বহন করে। এটি আমাদের শেখায় যে সংযম এবং সুষমতাই প্রকৃত শান্তি ও সুখের মূল চাবিকাঠি। ভাষাগত দিক থেকে এটি একটি সুন্দর সমাসবদ্ধ গঠন, দার্শনিক দিক থেকে এটি মধ্যপন্থার প্রতিফলন এবং প্রতীকী দিক থেকে এটি মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। যে ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তার জীবনেই আসে স্থিরতা, প্রশান্তি এবং দুঃখ থেকে মুক্তির প্রকৃত অভিজ্ঞতা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!