সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.১৮ | আত্মায় স্থির মন ও কামনামুক্ত যোগের পরিচয়

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
যদা বিনিয়তং চিত্তমাত্মন্যেবাবতিষ্ঠতে। নিস্পৃহঃ সর্বকামেভ্যো যুক্ত ইত্যুচতে তদা।।১৮।।
যদা বিনিয়তং চিত্তমাত্মন্যেবাবতিষ্ঠতে। 
নিস্পৃহঃ সর্বকামেভ্যো যুক্ত ইত্যুচতে তদা।।১৮।।

অনুবাদঃ যোগী যখন অনুশীলনের দ্বারা চিত্তবৃত্তির নিরোধ করেন এবং সমস্ত জড় কামনা বাসনা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মাতে অবস্থান করেন, তখন তিনি যোগযুক্ত হয়েছেন বলে বলা হয়। 

উক্ত শ্লোকটি মানবমনের গভীরতম স্তর এবং আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার এক অনন্য চিত্র তুলে ধরে। এখানে বলা হয়েছে, যখন মানুষের মন সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত হয়ে আত্মার মধ্যেই স্থির হয়ে যায় এবং সমস্ত প্রকার কামনা থেকে মুক্ত থাকে, তখন সেই অবস্থাকেই প্রকৃত যোগ বা সত্যিকারের ঐক্য বলা হয়। এই ভাবনার ভেতরে লুকিয়ে আছে ভাষাগত সূক্ষ্মতা, দার্শনিক গভীরতা এবং মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে এক সুস্পষ্ট নির্দেশনা।

শব্দগুলোর উৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে প্রতিটি পদ একটি নির্দিষ্ট মানসিক বা আধ্যাত্মিক অবস্থাকে প্রকাশ করে। যদা শব্দটি সময় নির্দেশ করে এবং বোঝায় একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকে, যখন একটি বিশেষ অবস্থা অর্জিত হয়। বিনিয়তং শব্দটি নিয়ন্ত্রণ বা সংযমের ধারণা বহন করে, যা মনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। চিত্তম বলতে বোঝানো হয়েছে মানুষের মন বা মানসিক কার্যকলাপের কেন্দ্র, যা অনুভব, চিন্তা এবং স্মৃতির আধার। আত্মনি শব্দটি নির্দেশ করে আত্মার মধ্যে অবস্থান করা, যা মানুষের প্রকৃত সত্তা বা অন্তর্গত সত্যকে বোঝায়। অবতিষ্ঠতে শব্দটি স্থির হয়ে থাকা বা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ধারণা দেয়, যা একটি অচঞ্চল অবস্থার ইঙ্গিত করে। নিস্পৃহ শব্দটি সমস্ত আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত থাকার অবস্থাকে প্রকাশ করে এবং সর্বকামেভ্য শব্দটি সমস্ত প্রকার ইচ্ছা বা কামনার সমষ্টিকে বোঝায়। যুক্ত শব্দটি যোগ বা ঐক্যের ধারণা বহন করে, যা আত্মার সাথে সম্পূর্ণ সংযোগ স্থাপনের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ হলো, যখন সংযত মন আত্মার মধ্যেই স্থির থাকে এবং সমস্ত কামনা থেকে মুক্ত হয়ে যায়, তখন সেই ব্যক্তিকে যোগী বলা হয়। তবে এর প্রাসঙ্গিক অর্থ আরও বিস্তৃত। এখানে কেবল ধ্যান বা যোগের একটি নির্দিষ্ট অনুশীলনের কথা বলা হয়নি, বরং এমন একটি মানসিক অবস্থার কথা বলা হয়েছে যেখানে মানুষ বাহ্যিক জগতের প্রলোভন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয়ে নিজের অন্তর্গত সত্তার সাথে সংযুক্ত হয়। এই অবস্থায় মন আর বাহ্যিক বস্তু বা ইচ্ছার দ্বারা প্রভাবিত হয় না, বরং এক গভীর শান্তি ও স্থিরতার মধ্যে অবস্থান করে।

এর গভীর তাৎপর্য হলো যে মানুষের সকল অশান্তির মূল কারণ তার অপ্রাপ্ত কামনা এবং অস্থির মন। যখন মন নিয়ন্ত্রিত হয় এবং কামনা থেকে মুক্ত হয়, তখনই প্রকৃত শান্তি লাভ করা সম্ভব হয়। এই শিক্ষা মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে বাহ্যিক অর্জন নয়, বরং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণই প্রকৃত সুখের উৎস। এই অবস্থায় মানুষ আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠে এবং বাইরের জগতের উপর নির্ভরশীলতা কমে যায়।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বেদান্ত মতে আত্মাই চিরন্তন সত্য এবং মন যখন আত্মার সাথে একীভূত হয় তখন মানুষ মুক্তি লাভ করে। যোগ দর্শনে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে স্থির অবস্থায় নিয়ে যাওয়াই মূল লক্ষ্য এবং এই শ্লোক সেই চূড়ান্ত অবস্থার বর্ণনা দেয়। একইভাবে বৌদ্ধ দর্শনেও কামনাকে দুঃখের মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং কামনাহীন অবস্থাকেই মুক্তির পথ বলা হয়। ফলে এই শ্লোকটি বিভিন্ন দর্শনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন রচনা করে।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকটি মানুষের মনের সাথে একটি সমুদ্রের তুলনা করা যেতে পারে। যেমন সমুদ্রের উপরিভাগে ঢেউ থাকে কিন্তু গভীরে থাকে নিস্তব্ধতা, তেমনি মানুষের মনও বাহ্যিকভাবে অস্থির হলেও তার গভীরে রয়েছে এক স্থির ও শান্ত সত্তা। কামনা সেই ঢেউয়ের মতো, যা মনকে অস্থির করে তোলে। যখন এই ঢেউ থেমে যায়, তখন মন তার প্রকৃত স্বরূপে ফিরে আসে এবং আত্মার সাথে সংযুক্ত হয়।

বাস্তব জীবনে আমরা এমন মানুষের উদাহরণ দেখতে পাই যারা নানা প্রলোভন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও স্থির ও শান্ত থাকতে পারেন। তারা সহজেই বিচলিত হন না এবং তাদের মধ্যে এক ধরনের অন্তর্গত প্রশান্তি বিরাজ করে। এই ধরনের ব্যক্তিরাই প্রকৃত অর্থে এই শ্লোকের শিক্ষা ধারণ করেন। একটি প্রদীপের শিখা যেমন বাতাসহীন স্থানে স্থিরভাবে জ্বলে, তেমনি একটি নিয়ন্ত্রিত মনও সকল অস্থিরতার মাঝেও অচঞ্চল থাকতে পারে।

সবকিছু মিলিয়ে বলা যায় যে এই শ্লোকটি কেবল একটি ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক উপদেশ নয়, বরং মানবমনের গভীর সত্যের একটি সার্বজনীন ব্যাখ্যা। এটি আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের শান্তি এবং পরিপূর্ণতা বাহ্যিক অর্জনে নয়, বরং নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে আত্মার সাথে সংযোগ স্থাপনের মধ্যে নিহিত। যখন মানুষ সমস্ত কামনা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের অন্তর্গত সত্তায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই সে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন এবং পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 12, 2026 August 12, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি