শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.২ | সংকল্প ত্যাগেই প্রকৃত সন্ন্যাস ও যোগীর পরিচয়
যং সন্ন্যাসমিতি প্রাহুর্যোগং তং বিদ্ধি পান্ডব।
ন হ্যসংন্যস্তসংকল্পো যোগী ভবতি কশ্চন।।২।।
অনুবাদঃ হে পান্ডব! যাকে সন্ন্যাস বলা যায়, তাকেই যোগ বলা যায়, কারণ ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের বাসনা ত্যাগ না করলে কখনই যোগী হওয়া যায় না।
ভগবদ্গীতার এই গভীর শ্লোকটি মানবজীবনের এক অনন্য সত্যকে উন্মোচিত করে যেখানে সন্ন্যাস ও যোগকে এক অভিন্ন দর্শনে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যে মানুষ সাধারণত সন্ন্যাস বলতে বাহ্যিক ত্যাগ বোঝে কিন্তু প্রকৃত অর্থে সন্ন্যাস হলো অন্তরের সংকল্প ত্যাগ। সংস্কৃত শব্দ সন্ন্যাসের উৎপত্তি সম্ এবং ন্যাস ধাতু থেকে যার অর্থ সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা। অন্যদিকে যোগ শব্দটি যুজ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ যুক্ত হওয়া বা মিলন। এই দুই শব্দের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে যেখানে বোঝানো হয়েছে যে প্রকৃত ত্যাগই প্রকৃত যোগ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার অন্তরের আকাঙ্ক্ষা ইচ্ছা ও মানসিক আসক্তিকে ত্যাগ করতে পারে সেই প্রকৃত অর্থে যোগী।
এই শ্লোকের শব্দগঠন লক্ষ্য করলে দেখা যায় যং সন্ন্যাসমিতি প্রাহু অংশটি নির্দেশ করে যে যাকে সন্ন্যাস বলা হয়, যোগং তং বিদ্ধি পাণ্ডব অংশটি বলে তাকে তুমি যোগ বলে জানো। এরপর বলা হয়েছে যে যে ব্যক্তি তার সংকল্প ত্যাগ করেনি সে কখনো যোগী হতে পারে না। এখানে সংকল্প শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি মানুষের মানসিক আকাঙ্ক্ষা পরিকল্পনা এবং বাসনার প্রতীক। অসংন্যস্ত সংকল্প অর্থাৎ যার সংকল্প ত্যাগ করা হয়নি সেই ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে যতই সাধু বা সংযমী হোক না কেন সে প্রকৃত যোগের অবস্থায় পৌঁছাতে পারে না।
বাংলা অর্থে এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে ত্যাগ মানে কাজ থেকে পালিয়ে যাওয়া নয় বরং কাজের মধ্যে থেকেও মনকে আসক্তি মুক্ত রাখা। আক্ষরিকভাবে এটি বোঝায় যে ত্যাগই যোগ এবং যোগই ত্যাগ। কিন্তু এর গভীর তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। মানুষ জীবনে নানা লক্ষ্য আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছার দ্বারা আবদ্ধ থাকে এবং এই বন্ধনই তাকে অস্থির করে তোলে। যখন মানুষ এই অভ্যন্তরীণ বন্ধন থেকে মুক্ত হতে শেখে তখনই সে প্রকৃত শান্তি লাভ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় যে সন্ন্যাস কোনো নির্দিষ্ট পোশাক বা জীবনযাত্রার নাম নয় বরং এটি একটি মানসিক অবস্থা।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোকটি অদ্বৈত ও যোগ দর্শনের একটি মৌলিক সত্যকে প্রকাশ করে। অদ্বৈত মতে আত্মা ও ব্রহ্ম এক এবং এই ঐক্য উপলব্ধি করতে হলে মনের সমস্ত দ্বৈত চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হয়। যোগ দর্শনে চিত্তবৃত্তির নিরোধকে যোগ বলা হয় এবং সংকল্পই সেই চিত্তবৃত্তির একটি প্রধান রূপ। তাই সংকল্প ত্যাগ করা মানেই যোগের পথে অগ্রসর হওয়া। কর্মযোগের দৃষ্টিতে এই শ্লোকটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এখানে বলা হচ্ছে যে ফলের প্রতি আসক্তি ছাড়া কর্ম করাই প্রকৃত ত্যাগ এবং সেটিই প্রকৃত যোগ।
প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকটি মানুষের অন্তরের এক যুদ্ধকে তুলে ধরে যেখানে একদিকে রয়েছে আকাঙ্ক্ষা আর অন্যদিকে রয়েছে মুক্তি। সংকল্প এখানে বন্ধনের প্রতীক আর ত্যাগ মুক্তির প্রতীক। এই ভাবনা সাহিত্য সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক চর্চায় বারবার ফিরে আসে। যেমন পদ্মফুল জলে থেকেও জলে ভেজে না তেমনি একজন মানুষ কর্মজীবনের মধ্যে থেকেও যদি আসক্তিহীন থাকতে পারে তবে সে প্রকৃত যোগী। বাস্তব জীবনে আমরা দেখি একজন চিকিৎসক যদি নিঃস্বার্থভাবে রোগীর সেবা করেন তবে তিনি যোগের পথেই চলছেন কিন্তু যদি তার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র খ্যাতি বা অর্থ হয় তবে তিনি এখনো সংকল্পের বন্ধনে আবদ্ধ।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত পরিবর্তন বাহ্যিক নয় বরং অন্তরের। সন্ন্যাস ও যোগ আসলে একই সত্যের দুইটি ভিন্ন প্রকাশ যেখানে মূল বিষয় হলো মানসিক মুক্তি। যে ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সেই প্রকৃত শান্তি ও জ্ঞানের পথে অগ্রসর হয়। এই শ্লোকের সারমর্ম হলো আসক্তিহীন কর্মই প্রকৃত যোগ এবং সংকল্পত্যাগই প্রকৃত সন্ন্যাস।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!