সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.২৪ | সংকল্পজাত কামনা ত্যাগ ও ইন্দ্রিয়সংযমের শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
 স নিশ্চয়েন যোক্তব্যো যোগোহনির্বিণ্ণচেতসা। সংকল্পপ্রভবান্ কামাংস্ত্যক্ত্বা সর্বনশেষতঃ। মনসৈবেন্দ…
 স নিশ্চয়েন যোক্তব্যো যোগোহনির্বিণ্ণচেতসা। 
সংকল্পপ্রভবান্ কামাংস্ত্যক্ত্বা সর্বনশেষতঃ। 
মনসৈবেন্দ্রিয়গ্রামং বিনিয়ম্য সমন্ততঃ।।২৪।।

অনুবাদঃ অবিচলিত অধ্যবসায় ও বিশ্বাস সহকারে এই যোগ অনুশীলন করা উচিত। সংকল্পজাত সমস্ত কামনা সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে মনের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলিকে সব দিক থেকে নিয়ন্ত্রিত করা কর্তব্য। 

ভগবদ্গীতা-এর ধ্যানযোগ অধ্যায়ের এই শ্লোক মানবমনের প্রকৃতি, ইচ্ছার উৎপত্তি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর শিক্ষা বহন করে। “সঙ্কল্পপ্রভবান্ কামাংস্ত্যক্ত্বা সর্ব্বানশেষতঃ মনসৈবেন্দ্রিয়গ্রামং বিনিয়ম্য সমন্ততঃ” এই বাক্যাংশটি প্রথম দৃষ্টিতে একটি সাধনপদ্ধতির নির্দেশনা মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের মানসিক স্বাধীনতা অর্জনের এক মৌলিক সূত্র। এখানে সঙ্কল্প শব্দটি এসেছে সংস্কৃত সম্ এবং কল্প ধাতু থেকে যার অর্থ একত্র চিন্তা বা মানসিক নির্মাণ। এই সঙ্কল্প থেকেই জন্ম নেয় কামনা অর্থাৎ ইচ্ছা বা বাসনা। প্রভবান্ শব্দটি নির্দেশ করে উৎপত্তি বা উদ্ভবের উৎসকে। অর্থাৎ মানুষের মনে যে অসংখ্য কামনা জন্ম নেয় তার মূল উৎস তার নিজের সঙ্কল্প বা মানসিক কল্পনা।

শব্দগঠনের দিক থেকে এই শ্লোকটি অত্যন্ত সুসংবদ্ধ। সঙ্কল্পপ্রভবান্ কামান্ দ্বারা বোঝানো হয়েছে সঙ্কল্পজাত সমস্ত কামনা এবং ত্যক্ত্বা দ্বারা বোঝানো হয়েছে সেগুলিকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা। সর্বানশেষতঃ শব্দটি এই ত্যাগের পরিপূর্ণতা নির্দেশ করে যেখানে কোনো অবশিষ্ট থাকে না। এরপর মনসা শব্দটি নির্দেশ করে মনকে এবং ইন্দ্রিয়গ্রাম বলতে বোঝানো হয়েছে ইন্দ্রিয়সমূহের সমষ্টি। বিনিয়ম্য শব্দটি নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াকে বোঝায় এবং সমন্ততঃ শব্দটি সর্বদিক থেকে সম্পূর্ণভাবে এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা বলে। পুরো শ্লোকটির অর্থ দাঁড়ায় মানুষ যেন তার মন দ্বারা সমস্ত ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সঙ্কল্প থেকে উৎপন্ন সমস্ত কামনাকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে।

বাংলা অর্থের দিক থেকে এই শ্লোকটি সহজ হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য গভীর। এটি আমাদের শেখায় যে মানুষের সমস্ত অস্থিরতা এবং দুঃখের মূল তার নিজের ইচ্ছা। আক্ষরিকভাবে এটি একটি আত্মনিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা হলেও বাস্তব জীবনে এটি মানসিক শান্তির এক অনন্য উপায়। দৈনন্দিন জীবনে আমরা যখন অপ্রয়োজনীয় ইচ্ছার পেছনে ছুটে চলি তখন আমাদের মন ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু যদি আমরা সেই ইচ্ছার উৎস অর্থাৎ সঙ্কল্পকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তবে আমাদের জীবন অনেক বেশি শান্ত ও স্থির হয়ে ওঠে।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগ দর্শনে বলা হয় মনই মানুষের বন্ধন এবং মুক্তির কারণ। যখন মন কামনার দ্বারা চালিত হয় তখন তা মানুষকে দুঃখের দিকে নিয়ে যায় আর যখন মন নিয়ন্ত্রিত হয় তখন তা মুক্তির পথ খুলে দেয়। বেদান্ত দর্শনে কামনাকে মায়ার প্রকাশ হিসেবে দেখা হয় এবং এই কামনা ত্যাগের মধ্য দিয়েই আত্মজ্ঞান লাভ সম্ভব। বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গেও এই ধারণার গভীর মিল রয়েছে যেখানে তৃষ্ণাকে দুঃখের মূল কারণ বলা হয়েছে। এই শ্লোকটি সেই একই সত্যকে অন্যভাবে উপস্থাপন করে যেখানে বলা হচ্ছে সঙ্কল্প নিয়ন্ত্রণ করলেই কামনা নিয়ন্ত্রিত হবে এবং তাতে দুঃখের অবসান ঘটবে।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকটি মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের একটি চিত্র তুলে ধরে। সঙ্কল্পকে ধরা যেতে পারে একটি বীজ হিসেবে যেখান থেকে কামনার বৃক্ষ জন্ম নেয়। মন এখানে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে এবং ইন্দ্রিয়গুলো যেন সেই বাহন যার মাধ্যমে মানুষ বাহ্যিক জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকে। যদি মন এই ইন্দ্রিয়গুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে তবে জীবন সুষম ও সুশৃঙ্খল হয়। অন্যথায় ইন্দ্রিয়ের টানে মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। এই ধারণাটি উপনিষদীয় রথের উপমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেখানে মন সারথি এবং ইন্দ্রিয়গুলো ঘোড়ার মতো আচরণ করে।

বাস্তব জীবনের উদাহরণ দিয়েও এই শ্লোকটির সত্যতা বোঝা যায়। যেমন একজন মানুষ যখন কোনো বস্তু বা অভ্যাসের প্রতি আকৃষ্ট হয় তখন প্রথমে তার মনে একটি সঙ্কল্প জন্ম নেয়। সেই সঙ্কল্প থেকেই ধীরে ধীরে কামনা তৈরি হয় এবং তা অভ্যাসে পরিণত হয়। যদি সেই ব্যক্তি শুরুতেই তার সঙ্কল্পকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তবে সে সেই আসক্তি থেকে মুক্ত থাকতে পারে। সাহিত্যেও কামনাকে প্রায়ই আগুনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে কারণ এটি যত বেশি জ্বালানি পায় তত বেশি জ্বলে ওঠে। তাই কামনা ত্যাগ করা মানে এই আগুনকে নিভিয়ে ফেলা এবং শান্তির পথে অগ্রসর হওয়া।

সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকটি মানুষের মানসিক গঠন এবং আত্মউন্নয়নের একটি গভীর দিকনির্দেশনা প্রদান করে। ভাষাগতভাবে এটি সঙ্কল্প থেকে কামনার উৎপত্তি এবং তার পরিণতির একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা তুলে ধরে। দার্শনিকভাবে এটি আমাদের শেখায় যে কামনা দুঃখের মূল এবং মননিয়ন্ত্রণ মুক্তির পথ। প্রতীকীভাবে এটি মানুষের অন্তর্জগতের এক সূক্ষ্ম চিত্র যেখানে মন এবং ইন্দ্রিয়ের সমন্বয়ই জীবনের সঠিক পথ নির্ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত বলা যায় মানুষ যদি তার সঙ্কল্পকে সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তবে সে তার কামনা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে এবং এর মাধ্যমে সে অর্জন করতে পারবে প্রকৃত মানসিক শান্তি ও আত্মমুক্তি।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 12, 2026 August 12, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি