সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.২৫ | ধীরে ধীরে মনসংযম ও আত্মায় চিত্ত প্রতিষ্ঠার শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
শনৈঃ শনৈরুপরমেদ্ বুদ্ধা ধৃতিগৃহীতয়া। আত্মসংস্থং মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ।।২৫।।
শনৈঃ শনৈরুপরমেদ্ বুদ্ধা ধৃতিগৃহীতয়া। 
আত্মসংস্থং মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ।।২৫।।

অনুবাদঃ ধৈর্যযুক্ত বুদ্ধির দ্বারা মনকে ধীরে ধীরে আত্মাতে স্থির করে এবং অন্য কোন কিছুই চিন্তা না করে সমাধিস্থ হতে হয়। 

ভগবদ্গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ের পঁচিশ নম্বর শ্লোকটি মানবমনের নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য এবং আত্মচেতনার এক অনন্য শিক্ষা বহন করে। “শনৈঃ শনৈরুপরমেদ্ বুদ্ধ্যা ধৃতিগৃহীতয়া আত্মসংস্থং মনঃ কृत्वা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ” এই শ্লোকটি মূলত ধ্যান ও আত্মসংযমের প্রক্রিয়াকে সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করে। এখানে প্রতিটি শব্দ গভীর অর্থ বহন করে এবং সম্মিলিতভাবে এটি মানুষের অন্তর্জগতের এক ধীর ও সচেতন রূপান্তরের পথ নির্দেশ করে।

শব্দগুলোর উৎপত্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে “শনৈঃ শনৈঃ” শব্দটি ধীরে ধীরে বা ক্রমান্বয়ে এই ধারণাকে প্রকাশ করে। এটি সংস্কৃত ভাষার “শন” ধাতু থেকে উদ্ভূত এবং দ্বিরুক্তির মাধ্যমে এর অর্থকে আরও জোরালো করা হয়েছে। “উপরমেত্” শব্দটি “উপ” উপসর্গ এবং “রম” ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত, যার অর্থ থেমে যাওয়া বা নিবৃত্ত হওয়া। “বুদ্ধ্যা” শব্দটি “বুধ” ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ জানা বা জাগ্রত হওয়া, আর “ধৃতিগৃহীতয়া” বোঝায় ধৈর্য দ্বারা ধারণ করা। “আত্মসংস্থং” শব্দটি আত্মায় প্রতিষ্ঠিত হওয়াকে নির্দেশ করে এবং “মনঃ কृत्वা” মানে মনকে সেই অবস্থায় স্থাপন করা। শেষাংশ “ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ” নির্দেশ করে যেন কোনো কিছুই চিন্তা না করা হয়।

এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ হলো ধীরে ধীরে ধৈর্য এবং বুদ্ধির সাহায্যে মনকে সংযত করে আত্মায় স্থাপন করা এবং সমস্ত চিন্তা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। তবে এর প্রাসঙ্গিক অর্থ আরও গভীর। এখানে হঠাৎ করে মনকে দমন করার কথা বলা হয়নি বরং বলা হয়েছে ধাপে ধাপে মনকে প্রশমিত করতে। যোগসাধনায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ মন স্বভাবতই অস্থির এবং একে জোর করে থামানো সম্ভব নয়। বরং ধৈর্য, সচেতনতা এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়।

এই শিক্ষার গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের অন্তর্মুখী যাত্রা। বাহ্যিক জগতের অসংখ্য আকর্ষণ ও বিভ্রান্তির মধ্যে মন ক্রমাগত বিচলিত হয়। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রয়োজন স্থিরতা, সহনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাস। যখন মন আত্মায় প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাহ্যিক প্রভাব আর ততটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। এটি এমন এক অবস্থার কথা বলে যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের শান্তিকে উপলব্ধি করতে পারে এবং বাহ্যিক অস্থিরতা তাকে আর বিচলিত করতে পারে না।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অদ্বৈত দর্শনে আত্মাকে সর্বোচ্চ সত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং মনকে সেই আত্মার দিকে পরিচালিত করাই মুক্তির পথ। যোগদর্শনেও মনোবৃত্তির নিয়ন্ত্রণকে মুক্তির মূল উপায় বলা হয়েছে। এখানে সেই একই ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে যেখানে মনকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করে আত্মার সাথে একীভূত করার কথা বলা হয়েছে। এটি এক ধরনের আত্মসচেতনতার শিক্ষা যা মানুষকে নিজের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকটি মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং আত্মজয়ের প্রতীক। এখানে মনকে একটি অস্থির সত্তা হিসেবে ধরা যায় যা সর্বদা ছুটে বেড়ায়, আর বুদ্ধি হলো সেই শক্তি যা তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আত্মা হলো সেই চূড়ান্ত গন্তব্য যেখানে পৌঁছালে সব অস্থিরতা শেষ হয়। এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি মানুষের জীবনযাত্রার একটি প্রতীকী রূপক যেখানে ধৈর্য এবং সচেতনতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা হয়।

বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থী যখন নতুন কিছু শেখে তখন সে একদিনে সফল হয় না বরং ধীরে ধীরে অনুশীলনের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে। একইভাবে একজন সাধক দীর্ঘদিনের সাধনার মাধ্যমে মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। এটি নদীর মতো যার প্রবাহ প্রথমে অস্থির থাকে কিন্তু ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে সমুদ্রে মিশে যায়। মানুষের মনও তেমনই ধীরে ধীরে প্রশান্ত হয়ে আত্মার সাথে মিলিত হয়।

সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আত্মজ্ঞান বা মানসিক শান্তি কোনো হঠাৎ অর্জিত বিষয় নয় বরং এটি একটি ধীর এবং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ভাষাগত দিক থেকে এটি ধীরে অগ্রগতির ধারণাকে তুলে ধরে, দার্শনিকভাবে এটি আত্মউপলব্ধির পথ নির্দেশ করে এবং প্রতীকীভাবে এটি মানুষের অন্তর্জগতের রূপান্তরের কথা বলে। এর সারমর্ম হলো ধৈর্য এবং বুদ্ধির মাধ্যমে মনকে ধীরে ধীরে আত্মায় স্থির করে সমস্ত চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠতে পারলেই প্রকৃত শান্তি এবং মুক্তি লাভ করা সম্ভব।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 12, 2026 August 12, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি