শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.৩৫ | অভ্যাস ও বৈরাগ্যের মাধ্যমে চঞ্চল মন নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা
শ্রীভগবানুবাচ
অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম্।
অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে।।৩৫।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন-হে মহাবাহো! মন যে দুর্দমনীয় ও চঞ্চল তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু হে কৌন্তেয়! ক্রমশ অভ্যাস ও বৈরাগ্যর দ্বারা মনকে বশীভূত করা যায়।
“শ্রীভগবান উবাচ অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম্ অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেন চ গৃহ্যতে” এই শ্লোকটি মানবমনের প্রকৃতি ও তার নিয়ন্ত্রণের গভীর সত্যকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করে। সংস্কৃত ভাষার দৃষ্টিতে এখানে প্রতিটি শব্দের নিজস্ব উৎস ও গঠনগত তাৎপর্য রয়েছে। শ্রীভগবান শব্দটি শ্রী এবং ভগবান এই দুটি অংশ থেকে গঠিত যেখানে শ্রী নির্দেশ করে মঙ্গল সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য এবং ভগবান বোঝায় সেই সত্তাকে যিনি সর্বগুণ ও শক্তির অধিকারী। উবাচ শব্দটি বলা ক্রিয়ার অতীত রূপ যা নির্দেশ করে তিনি বললেন। অসংশয়ং শব্দের মাধ্যমে নিঃসন্দেহতা প্রকাশ পায় এবং মহাবাহো সম্বোধনের মাধ্যমে শক্তিশালী ও সক্ষম ব্যক্তিকে আহ্বান করা হয়। মন শব্দটি মানুষের চিন্তা চেতনা অনুভূতির কেন্দ্র এবং দুর্নিগ্রহং চলম্ এই দুটি শব্দ মিলে মনের স্বভাবকে ব্যাখ্যা করে যেখানে বলা হচ্ছে মন অত্যন্ত চঞ্চল এবং নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অভ্যাসেন এবং বৈরাগ্যেন এই দুটি শব্দ শ্লোকটির মূল সমাধান অংশ যেখানে অভ্যাস বলতে নিয়মিত চর্চা এবং বৈরাগ্য বলতে আসক্তিহীনতা বোঝানো হয়েছে। গৃহ্যতে শব্দটি নির্দেশ করে এই উপায়ের মাধ্যমে মনকে আয়ত্ত করা সম্ভব।
শব্দ গঠনের দিক থেকে এই শ্লোকটি একদিকে সমস্যার স্বীকারোক্তি এবং অন্যদিকে তার সমাধানের নির্দেশনা প্রদান করে। মনকে এখানে এমন এক শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে যা স্বভাবতই অস্থির এবং বহির্জগতের আকর্ষণে সর্বদা বিচলিত থাকে। বাংলা অর্থে এটি স্পষ্ট করে যে মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয় বরং সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করলে তা অর্জন করা যায়। আক্ষরিক অর্থে এটি মনের চঞ্চলতা এবং নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে কিন্তু প্রাসঙ্গিক অর্থে এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একটি সার্বজনীন নীতি হয়ে ওঠে। পড়াশোনা কর্মজীবন সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত উন্নয়ন সব ক্ষেত্রেই মনোসংযম অপরিহার্য এবং এই শ্লোক সেই সংযমের পথ দেখায়।
এর গভীর তাৎপর্য এই যে মানুষ প্রায়ই নিজের মনকে নিজের শত্রু মনে করে কিন্তু এই শিক্ষা জানায় যে মনকে জয় করা সম্ভব। এটি হতাশার পরিবর্তে আশা জাগায় এবং বলে যে নিয়মিত চর্চা ও আসক্তি থেকে মুক্ত থাকার মাধ্যমে ব্যক্তি তার মানসিক শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। দার্শনিকভাবে এই শ্লোকটি যোগ দর্শন বেদান্ত এবং বৌদ্ধ চিন্তাধারার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যোগ দর্শনে মন নিয়ন্ত্রণই ধ্যান ও সমাধির ভিত্তি এবং বেদান্তে মনকে মায়ার উৎস হিসেবে দেখা হয় যেখানে তার নিয়ন্ত্রণ আত্মজ্ঞান লাভের পথ খুলে দেয়। একইভাবে বৌদ্ধ দর্শনে চিত্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভের কথা বলা হয়েছে যা এই শ্লোকের ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
প্রতীকী অর্থে মনকে প্রায়ই বানর বা বায়ুর সঙ্গে তুলনা করা হয় কারণ এটি এক মুহূর্তও স্থির থাকে না। অভ্যাস এখানে সেই শক্তি যা মনকে ধীরে ধীরে একাগ্র করে এবং বৈরাগ্য সেই মানসিক অবস্থা যা বাহ্যিক আকর্ষণ থেকে মনকে মুক্ত রাখে। বাস্তব জীবনে একজন ছাত্র যখন প্রতিদিন নিয়মিত পড়াশোনা করে তখন তার মন ধীরে ধীরে স্থির হয় এবং যখন সে অপ্রয়োজনীয় আসক্তি থেকে দূরে থাকে তখন তার মনোযোগ আরও গভীর হয়। একইভাবে মনকে একটি অশান্ত ঘোড়ার সঙ্গে তুলনা করা যায় যেখানে অভ্যাস হলো প্রশিক্ষণ এবং বৈরাগ্য হলো লাগাম যা তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকটি ভাষাগত দিক থেকে সুগঠিত এবং দার্শনিক দিক থেকে অত্যন্ত গভীর একটি শিক্ষা বহন করে। এটি আমাদের শেখায় যে মন যদিও স্বভাবতই অস্থির তবুও তা নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং সেই নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি রয়েছে আমাদের নিজের মধ্যেই। নিয়মিত অনুশীলন এবং আসক্তিহীন মানসিকতা অর্জনের মাধ্যমে মানুষ তার মনকে আয়ত্ত করতে পারে এবং এর মাধ্যমে জীবনের প্রকৃত সাফল্য ও শান্তি লাভ করতে সক্ষম হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!