শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.৩৬ | অসংযত মন ও যোগলাভের কঠিনতা
অসংযতাত্মনা যোগো দুষ্প্রাপ ইতি মে মতিঃ।
বশ্যাত্মনা তু যততা শক্যোহবাপ্তুমুপায়তঃ।।৩৬।।
অনুবাদঃ অসংযত চিত্ত ব্যক্তির পক্ষে আত্ম-উপলব্ধি দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু যার মন সংযত এবং যিনি যথার্থ উপায় অবলম্বন করে মনকে বশ করতে চেষ্টা করেন, তিনি অবশ্যই সিদ্ধি লাভ করেন। সেটিই আমার অভিমত।
সংস্কৃত দর্শনের গভীর ভাণ্ডার থেকে উদ্ধৃত এই শ্লোক “অসংযতাত্মনা যোগো দুষ্প্রাপ ইতি মে মতিঃ। বশ্যাত্মনা তু যততা শক্যোऽবাপ্তুমুপায়তঃ” মানুষের মন ও আত্মসংযমের এক চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে। শব্দগুলোর উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে অসংযতাত্মনা শব্দটি গঠিত হয়েছে নিষেধাত্মক উপসর্গ অ এবং সংযত শব্দের সাথে আত্মা যুক্ত হয়ে যার অর্থ দাঁড়ায় যে ব্যক্তি নিজের মন বা আত্মাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। অন্যদিকে বশ্যাত্মনা বলতে বোঝায় সেই ব্যক্তি যার মন বশে আছে এবং নিয়ন্ত্রিত। যোগ শব্দটির মূল ধাতু যুজ যার অর্থ সংযোগ বা মিলন এবং দুষ্প্রাপ শব্দটি বোঝায় যা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। এইভাবে শব্দগুলোর গঠন ও উৎপত্তি একত্রে এমন একটি ভাব প্রকাশ করে যেখানে মানুষের অন্তর্জগতের শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ হলো যে যার মন সংযত নয় তার পক্ষে যোগ বা আত্মিক উপলব্ধি অর্জন করা কঠিন কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম এবং আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে সে যথাযথ উপায়ে সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। এখানে যোগ শুধুমাত্র শারীরিক ব্যায়াম নয় বরং আত্মার সাথে পরম সত্যের সংযোগের প্রতীক। এই ধারণাটি দৈনন্দিন জীবনেও সমানভাবে প্রযোজ্য। একজন ছাত্র যদি নিজের মনোযোগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তবে তার পক্ষে পড়াশোনায় সফল হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবার একজন ব্যক্তি যদি নিজের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তবে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সে সহজেই অগ্রগতি করতে পারে।
গভীর তাৎপর্যের দিক থেকে এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার নিজের মন। অসংযত মন মানুষকে বিভ্রান্ত করে তাকে লক্ষ্যচ্যুত করে এবং অস্থিরতার দিকে নিয়ে যায়। অন্যদিকে সংযত মন মানুষকে স্থিরতা দেয় একাগ্রতা দেয় এবং তাকে সাফল্যের পথে পরিচালিত করে। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি যোগ দর্শন এবং বেদান্ত উভয়েরই একটি কেন্দ্রীয় শিক্ষা যেখানে বলা হয় যে আত্ম উপলব্ধির জন্য ইন্দ্রিয় ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। এই ধারণাটি বৌদ্ধ দর্শনের চিত্তনিয়ন্ত্রণের ধারণার সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত যেখানে মনকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়া হয়।
প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকটি মানুষের মনকে একটি অশিক্ষিত ঘোড়ার সাথে তুলনা করে যা নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় ছুটে বেড়ায় এবং মানুষকে বিপদের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যখন সেই ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তখন সেটি একটি শক্তিশালী বাহনে পরিণত হয় যা মানুষকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। বাস্তব জীবনের উদাহরণে দেখা যায় যে যেকোনো সাফল্যের পেছনে আত্মসংযম একটি মৌলিক উপাদান। একজন ক্রীড়াবিদ নিয়মিত অনুশীলন এবং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার দক্ষতা বৃদ্ধি করে। একজন সাধক ধ্যানের মাধ্যমে তার মনকে শান্ত করে এবং উচ্চতর চেতনার দিকে অগ্রসর হয়।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকটি আমাদের একটি সার্বজনীন সত্যের সামনে দাঁড় করায় যে আত্মসংযম ছাড়া কোনো উচ্চতর লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ভাষাগতভাবে এটি সূক্ষ্ম সমাসবদ্ধ শব্দের মাধ্যমে একটি গভীর ভাব প্রকাশ করে এবং দার্শনিকভাবে এটি মানুষের আত্মউন্নয়নের মূল ভিত্তিকে তুলে ধরে। প্রতীকীভাবে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নিজের মনকে জয় করাই প্রকৃত জয়। যে ব্যক্তি নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয় এবং শেষ পর্যন্ত আত্মিক শান্তি লাভ করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!