শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.৩৯ | সংশয় দূর করার জন্য কৃষ্ণের প্রতি অর্জুনের পূর্ণ আস্থা
এতন্মে সংশয়ং কৃষ্ণ ছেত্তুমর্হস্যশেষতঃ।
ত্বদন্যঃ সংশয়স্যাস্য ছেত্তা ন হুপপদ্যতে।।৩৯।।
অনুবাদঃ হে কৃষ্ণ! তুমিই কেবল আমার এই সংশয় দূর করতে সমর্থ। কারণ, তুমি ছাড়া আর কেউই আমার এই সংশয় দূর করতে পারবে না।
ভগবদ্গীতা এর ষষ্ঠ অধ্যায়ের একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ শ্লোক হলো “এতম্মে সংশয়ং কৃষ্ণ ছেত্তুমর্হস্যশেষতঃ ত্বদন্যঃ সংশয়স্যাস্য ছেত্তা ন হ্যুপপদ্যতে” যেখানে অর্জুন তার অন্তরের দ্বিধা ও অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য কৃষ্ণের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন। এই শ্লোকটি কেবল একটি সাধারণ প্রশ্ন বা অনুরোধ নয় বরং এটি মানবমনের চিরন্তন এক অবস্থার প্রতিফলন যেখানে মানুষ সত্য উপলব্ধির পথে সংশয়ের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সেই সংশয় দূর করার জন্য একজন প্রজ্ঞাময় পথপ্রদর্শকের আশ্রয় কামনা করে। এখানে সংশয় শব্দটি সংস্কৃত সম এবং শি ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত যা মানসিক অস্থিরতা ও দ্বিধার অবস্থা নির্দেশ করে এবং ছেত্তুম শব্দটি ছিদ ধাতু থেকে উৎপন্ন যার অর্থ কেটে ফেলা বা বিচ্ছিন্ন করা অর্থাৎ সংশয়ের বন্ধন ছিন্ন করা। অর্হস্য শব্দের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যোগ্যতা বা সামর্থ্য এবং উপপদ্যতে দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে এই কাজ অন্য কারও দ্বারা সম্ভব নয়।
এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ হলো হে কৃষ্ণ আমার এই সংশয় তুমি সম্পূর্ণরূপে দূর করতে সক্ষম এবং তোমা ছাড়া অন্য কেউ এই সংশয়ের অবসান ঘটাতে পারে না কিন্তু এর অন্তর্নিহিত অর্থ আরও গভীর। এখানে কৃষ্ণ কেবল একটি ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক চরিত্র নন তিনি জ্ঞানের প্রতীক এবং চেতনার আলোকরূপে উপস্থিত আর সংশয় হলো অজ্ঞতার অন্ধকার যা মানুষের চিন্তাকে বিভ্রান্ত করে। মানবজীবনে প্রায়শই এমন পরিস্থিতি আসে যখন ব্যক্তি নিজস্ব বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয় তখন সে এমন এক উৎসের সন্ধান করে যা তাকে সত্যের দিকে পরিচালিত করতে পারে। এই শ্লোক সেই চিরন্তন নির্ভরতার কথা বলে যেখানে শিষ্য তার গুরুর প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা রেখে জ্ঞান প্রার্থনা করে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বেদান্ত মতে সংশয় হলো অবিদ্যার ফল এবং ব্রহ্মজ্ঞানই একে দূর করতে পারে। যোগ দর্শনে মনকে চঞ্চল ও অস্থির বলা হয়েছে এবং সেই অস্থিরতাই সংশয়ের জন্ম দেয় যা যোগ সাধনার মাধ্যমে প্রশমিত হয়। ভক্তি দর্শনে এই শ্লোক আত্মসমর্পণের এক উজ্জ্বল উদাহরণ যেখানে ভক্ত ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ নির্ভরতা প্রকাশ করে এবং বিশ্বাস করে যে ঈশ্বরই তার অন্তরের অন্ধকার দূর করবেন। প্রতীকী অর্থে সংশয় হলো মেঘের মতো যা সূর্যের আলোকে আড়াল করে রাখে আর কৃষ্ণ সেই সূর্যের প্রতীক যার আলো উদিত হলে সকল মেঘ সরে যায় এবং সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাস্তব জীবনের প্রেক্ষাপটে এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে জ্ঞান অর্জনের জন্য বিনয় ও প্রশ্ন করার মানসিকতা অপরিহার্য। একজন শিক্ষার্থী যেমন তার শিক্ষকের কাছে জটিল বিষয় বুঝতে সাহায্য চায় তেমনি মানুষকেও জীবনের গভীর প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে একজন জ্ঞানী পথপ্রদর্শকের শরণাপন্ন হতে হয়। এই শ্লোক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সংশয় কোনো দুর্বলতা নয় বরং তা সত্য অনুসন্ধানের একটি ধাপ এবং সঠিক জ্ঞান লাভের মাধ্যমে সেই সংশয় দূর করা সম্ভব। সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোক মানবজীবনের এক মৌলিক সত্যকে প্রকাশ করে যে জ্ঞানই অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করার একমাত্র উপায় এবং সত্য উপলব্ধির জন্য একজন বিশ্বস্ত ও প্রজ্ঞাময় দিশারীর প্রয়োজন অপরিহার্য।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!