শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.৪ | ইন্দ্রিয়বিষয় ও সংকল্পের আসক্তি ত্যাগে যোগারূঢ় হওয়ার শিক্ষা
যদা হি নেন্দ্রিয়ার্থেষু ন কর্মস্বনুষজ্জতে।
সর্বসংকল্পসন্ন্যাসী যোগারূঢ়স্তদোচ্যতে।।৪।।
অনুবাদঃ যখন যোগী জড় সুখভোগের সমস্ত সংকল্প ত্যাগ করে ইন্দ্রিয়ভোগ্য বিষয়ে এবং সকাম কর্মের প্রতি আসক্তি রহিত হন, তথন তাঁকেই যোগারূঢ় বলা হয়।
ভগবদ্গীতার ধ্যানযোগ অধ্যায়ের এই শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর সত্যকে প্রকাশ করে। এখানে বলা হয়েছে যে যখন মানুষ ইন্দ্রিয়ের বিষয়বস্তু ও বাহ্যিক কর্মের প্রতি আসক্ত থাকে না এবং সমস্ত সঙ্কল্প বা মানসিক আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে তখনই তাকে প্রকৃত অর্থে যোগে প্রতিষ্ঠিত বলা হয়। এই ধারণাটি শুধু আধ্যাত্মিক অনুশীলনের একটি স্তর নয় বরং মানবজীবনের এক সার্বজনীন সত্য যা আত্মসংযম আত্মজ্ঞান এবং মানসিক স্বাধীনতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
শব্দগত দিক থেকে শ্লোকটির প্রতিটি অংশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদা শব্দটি একটি শর্ত নির্দেশ করে যা সময়ের একটি নির্দিষ্ট অবস্থাকে বোঝায়। হি শব্দটি বক্তব্যকে দৃঢ়তা প্রদান করে এবং ন নির্দেশ করে সম্পূর্ণ বর্জন। ইন্দ্রিয়ার্থেষু বলতে বোঝানো হয়েছে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধ সমস্ত বস্তু যেমন দৃশ্য শব্দ গন্ধ স্বাদ ও স্পর্শ। কর্ম্মসু শব্দটি জীবনের যাবতীয় কার্যকলাপকে নির্দেশ করে। অনুষজ্জতে শব্দটি আসক্ত হওয়া বা লেগে থাকার মানসিক প্রবণতাকে বোঝায়। সর্বসঙ্কল্পসন্ন্যাসী বলতে এমন একজন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যিনি সমস্ত মানসিক ইচ্ছা পরিকল্পনা ও কামনা ত্যাগ করেছেন। যোগারূঢ় শব্দটি নির্দেশ করে এমন এক অবস্থাকে যেখানে ব্যক্তি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সমত্বের স্তরে উন্নীত হয়েছে।
এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ সরল হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এখানে কর্ম ত্যাগের কথা বলা হয়নি বরং কর্মের সঙ্গে যুক্ত মানসিক আসক্তি ত্যাগের কথা বলা হয়েছে। মানুষ জীবনে কাজ করবে দায়িত্ব পালন করবে কিন্তু তার মন যেন সেই কাজের ফলের প্রতি আবদ্ধ না হয়। এই ধারণা মানুষের মানসিক মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে কারণ আসক্তিই মূলত দুঃখের কারণ। যখন কেউ কোনো কিছু অর্জনের প্রতি অতিরিক্ত আকৃষ্ট হয় তখন তার মধ্যে ভয় উদ্বেগ এবং হতাশা জন্ম নেয়। কিন্তু যখন সে কাজকে কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং ফলকে ছেড়ে দেয় তখন সে অন্তর্গত শান্তি অনুভব করতে পারে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি বেদান্ত এবং যোগ দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় ধারণাকে প্রতিফলিত করে। বেদান্ত বলে যে আত্মা স্বয়ং সম্পূর্ণ এবং সে বাহ্যিক বস্তু বা কর্মের উপর নির্ভরশীল নয়। যোগ দর্শন বলে যে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং চিত্তের অস্থিরতা দূর করাই প্রকৃত সাধনা। এই শ্লোক সেই অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে মানুষ তার মনকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করে যে বাহ্যিক জগত তাকে আর বিচলিত করতে পারে না। বৌদ্ধ দর্শনের তৃষ্ণা ত্যাগের ধারণার সঙ্গেও এর গভীর সাদৃশ্য রয়েছে যেখানে আকাঙ্ক্ষাই দুঃখের মূল হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রতীকী অর্থে ইন্দ্রিয়ার্থ এখানে জগতের সমস্ত প্রলোভনকে নির্দেশ করে এবং কর্ম মানুষের দৈনন্দিন দায়িত্ব ও সংগ্রামের প্রতীক। সঙ্কল্প হলো অহংকার ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। যখন একজন মানুষ এই সবকিছুর উপর নিজেকে নির্ভরশীল হতে দেয় না তখন সে অন্তরের স্বাধীনতা অর্জন করে। এই অবস্থাই যোগারূঢ় অবস্থা যেখানে ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয় এবং বাইরের পরিস্থিতি তার মানসিক অবস্থাকে আর প্রভাবিত করতে পারে না।
বাস্তব জীবনে এই ধারণাটি নানা উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যায়। একজন ছাত্র মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে কিন্তু ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয় না। একজন চিকিৎসক তার দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে কিন্তু আবেগে নিজেকে হারিয়ে ফেলে না। একটি পদ্মফুল যেমন পানির মধ্যে থেকেও নিজেকে অমল রাখে তেমনি একজন যোগারূঢ় ব্যক্তি জগতে থেকেও আসক্তিহীন থাকতে পারে। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে আসক্তিহীনতা মানে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয় বরং জীবনকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা।
সবশেষে বলা যায় যে এই শ্লোকটি মানুষের জীবনে এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থার শিক্ষা দেয়। এটি শেখায় কিভাবে কাজ করতে হয় কিন্তু কাজের দ্বারা আবদ্ধ না হতে হয়। ভাষাগতভাবে এটি একটি শর্ত ও ফলের সুশৃঙ্খল প্রকাশ। দার্শনিকভাবে এটি আত্মজ্ঞান ও মুক্তির পথ নির্দেশ করে। প্রতীকীভাবে এটি মানুষের অন্তর্গত স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক। এর মূল বার্তা হলো মানুষ যখন তার ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা এবং আসক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে তখনই সে প্রকৃত অর্থে যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জীবনের গভীর শান্তি উপলব্ধি করতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!