শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.৪০ | সৎকর্মের কখনো বিনাশ হয় না—শ্রীকৃষ্ণের আশ্বাসবাণী
শ্রীভগবানুবাচ
পার্থ নৈবেহ নামুত্র বিনাশন্তস্য বিদ্যতে।
ন হি কল্যাণকৃৎ কশ্চিদ্ দুর্গতিং তাত গচ্ছতি।।৪০।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পার্থ! শুভানুষ্ঠানকারী পরমার্থবিদের ইহলোকে ও পরলোকে কোন দুর্গতি হয় না। হে বৎস! তার কারণ, কল্যানকারীর কখনও অধোগতি হয় না।
শ্রীভগবান উবাচ পার্থ নৈবেহ নামুত্র বিনাশস্তস্য বিদ্যতে ন হি কল্যাণকৃত কশ্চিদ দুর্গতিং তাত গচ্ছতি এই শ্লোকটি ভাগবত গীতার এক গভীর আশ্বাসবাণী যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে জীবনের একটি চিরন্তন সত্য বুঝিয়ে দেন। এখানে শ্রী শব্দটি মহিমা ও ঐশ্বর্যের প্রতীক এবং ভগবান শব্দটি সেই সত্তাকে নির্দেশ করে যিনি জ্ঞান শক্তি সৌন্দর্য ও করুণার পূর্ণ আধার। উবাচ অর্থ তিনি বললেন যা একটি ঐশ্বরিক উচ্চারণের সূচনা করে। পার্থ শব্দটি অর্জুনকে সম্বোধন করে এবং তাকে কুন্তীর পুত্র হিসেবে তার মানবিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে। শ্লোকের প্রতিটি শব্দই একটি গভীর দর্শন বহন করে যেখানে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয় বরং আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বাহন হয়ে ওঠে।
এই শ্লোকে বলা হয়েছে যে এই জগতে কিংবা পরজগতে কোনো সৎকর্মের বিনাশ ঘটে না। এখানে ইহ মানে বর্তমান জগৎ এবং আমুত্র মানে পরবর্তী বা অদৃশ্য জগৎ। বিনাশ শব্দটি ধ্বংস বা লুপ্ত হয়ে যাওয়ার ধারণা প্রকাশ করে কিন্তু ভগবান স্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে কল্যাণকৃত অর্থাৎ যে ব্যক্তি সৎকর্ম করে তার কোনো কর্মই হারিয়ে যায় না। কল্যাণ শব্দটি মঙ্গল শুভতা এবং মানবিক উৎকর্ষের প্রতীক আর কৃত বোঝায় সেই কাজের কর্তা। অন্যদিকে দুর্গতি মানে পতন বা অধঃপতন যা এক ধরনের নৈতিক বা আধ্যাত্মিক অবনতি নির্দেশ করে। এইভাবে শব্দগুলোর গঠন ও অর্থ একত্রে একটি শক্তিশালী নৈতিক বার্তা সৃষ্টি করে।
আক্ষরিক অর্থে শ্লোকটি বলে যে কোনো সৎকর্ম কখনোই বৃথা যায় না। একজন মানুষ যদি সামান্য ভালো কাজও করে তার ফল একসময় অবশ্যই প্রকাশ পায়। এটি শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয় বরং একটি সার্বজনীন নৈতিক সত্য যা মানবসমাজে ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা করে। দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রায়ই দেখি ভালো কাজের ফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না কিন্তু এই শ্লোক আমাদের ধৈর্য ও বিশ্বাস ধরে রাখতে শেখায়। এটি মানুষকে হতাশার মধ্যে আশার আলো দেখায় এবং মনে করিয়ে দেয় যে প্রতিটি ইতিবাচক প্রচেষ্টা কোনো না কোনোভাবে ফলপ্রসূ হয়।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক কর্মতত্ত্বের একটি মৌলিক ভিত্তি উপস্থাপন করে। কর্মফল ধারণা অনুযায়ী প্রতিটি কাজের একটি প্রতিক্রিয়া রয়েছে এবং সেই প্রতিক্রিয়া কখনো নষ্ট হয় না। বেদান্ত দর্শনে আত্মাকে অবিনশ্বর বলা হয় এবং সৎকর্ম সেই আত্মার অগ্রগতিকে সহায়তা করে। যোগ দর্শনেও বলা হয় যে আধ্যাত্মিক পথে সামান্য অগ্রগতিও মূল্যবান এবং তা কখনো হারিয়ে যায় না। এইভাবে শ্লোকটি মানুষের জীবনে ধারাবাহিক উন্নতির ধারণা প্রতিষ্ঠা করে এবং তাকে নৈতিকতার পথে দৃঢ় থাকতে উৎসাহিত করে।
প্রতীকী অর্থে এই শ্লোক আলো ও অন্ধকারের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে যেখানে কল্যাণ হলো আলোর প্রতীক আর দুর্গতি হলো অন্ধকারের প্রতীক। সাহিত্য সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চিন্তায় এই ধারণা বারবার প্রতিফলিত হয়েছে যে সত্য ও ন্যায়ের পথ শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ইতিবাচক চিন্তার শক্তিকে নির্দেশ করে যা মানুষের মানসিক উন্নতি ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে। বাস্তব জীবনে একজন শিক্ষক যখন নিষ্ঠার সঙ্গে তার ছাত্রদের শিক্ষা দেন তখন তার সেই প্রচেষ্টা বহু বছর পরে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে ফিরে আসে। ঠিক তেমনি একটি ছোট সৎকর্মও দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে মানবজীবনের প্রতিটি সৎ প্রচেষ্টা মহাবিশ্বের এক বৃহৎ নৈতিক ব্যবস্থার অংশ। ভাষাগত দিক থেকে এটি সংস্কৃত শব্দের সূক্ষ্ম গঠন ও অর্থের গভীরতা প্রকাশ করে। দার্শনিকভাবে এটি কর্মফল ও ন্যায়বিচারের চিরন্তন নীতিকে প্রতিষ্ঠা করে। প্রতীকীভাবে এটি আলোর স্থায়িত্ব এবং অন্ধকারের অস্থায়িত্বকে নির্দেশ করে। তাই এই শ্লোক কেবল একটি ধর্মীয় বাণী নয় বরং মানবজীবনের জন্য এক চিরন্তন প্রেরণা যা মানুষকে সৎ পথে অবিচল থাকতে এবং নিজের কর্মের প্রতি আস্থা রাখতে অনুপ্রাণিত করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!