শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.৪৪ | পূর্বজন্মের অভ্যাসের প্রভাবে যোগের পথে অগ্রগতি
পূর্বাভ্যাসেন তেনৈব হ্রিয়তে হ্যবশোহপি সঃ।
জিজ্ঞাসুরপি যোগস্য শব্দব্রহ্মাতিবর্ততে।।৪৪।।
অনুবাদঃ তিনি পূর্ব জন্মের অভ্যাস বসে যেন অবশ হয়ে যোগ-সাধনের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই প্রকার যোগশাস্ত্রের জিজ্ঞাসু পুরুষ বেদোক্ত সকাম কর্মমার্গকে অতিক্রম করেন, অর্থাৎ সকাম কর্মমার্গে যে ফল নির্দিষ্ট আছে, তার থেকে উৎকৃষ্ট ফল লাভ করেন।
পূর্ব্বাভ্যাসেন তেনৈব হ্রিয়তে হ্যবশোऽপি সঃ জিজ্ঞাসুরপি যোগস্য শব্দব্রহ্মাতিবর্ত্ততে এই সংস্কৃত শ্লোকটি মানবচেতনা অভ্যাস এবং আধ্যাত্মিক অগ্রগতির একটি গভীর সত্যকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করে। শব্দগুলোর গঠন এবং তাদের ব্যুৎপত্তিগত উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে পূর্ব্বাভ্যাসেন শব্দটি পূর্ব এবং অভ্যাস এই দুই অংশ থেকে গঠিত যার অর্থ পূর্বজন্ম বা অতীতের অনুশীলনের দ্বারা। তেনৈব শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে সেই অভ্যাসই এবং হ্রিয়তে শব্দটি হৃ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ টেনে নেওয়া বা আকৃষ্ট করা। অবশ শব্দটি নির্দেশ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে না থাকা অবস্থাকে। জিজ্ঞাসু শব্দটি জানা বা উপলব্ধি করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে এবং যোগস্য শব্দটি যোগের সঙ্গে সম্পর্ক নির্দেশ করে। শব্দব্রহ্ম বলতে বেদের শব্দরূপ জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে এবং অতিবর্ত্ততে শব্দটি বোঝায় অতিক্রম করা বা তার ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়া।
এই শ্লোকটির সামগ্রিক অর্থ হলো মানুষ তার পূর্ব অভ্যাসের দ্বারা এমনভাবে প্রভাবিত হয় যে সে নিজের অজান্তেই সেই পথে অগ্রসর হতে থাকে এবং যে ব্যক্তি সত্যিকারের জ্ঞান লাভের ইচ্ছা পোষণ করে সে শেষ পর্যন্ত বাহ্যিক আচার বা শব্দভিত্তিক জ্ঞানের সীমা অতিক্রম করে গভীরতর সত্যের দিকে পৌঁছে যায়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভ্যাসের শক্তি যা কেবল বর্তমান জীবনের সীমায় আবদ্ধ নয় বরং অতীতের অভিজ্ঞতা ও চর্চা মানুষের চেতনার ভেতরে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। এই ছাপ বা সংস্কার মানুষের প্রবৃত্তি মনোভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে কোনো সাধনা বা অনুশীলন কখনোই বৃথা যায় না। একজন ব্যক্তি যদি কোনো এক সময়ে আধ্যাত্মিক চর্চায় লিপ্ত হয়ে থাকে তবে সেই অভ্যাস ভবিষ্যতে আবার তাকে সেই পথের দিকে আকৃষ্ট করবে। এটি মানুষের মানসিক গঠনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যেখানে পুনরাবৃত্তি এবং চর্চা ধীরে ধীরে স্বভাবের অংশে পরিণত হয়। তাই দেখা যায় কেউ সংগীত চর্চা করলে সে সহজেই সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হয় কিংবা কেউ ধ্যানের অভ্যাস গড়ে তুললে সে স্বাভাবিকভাবেই অন্তর্মুখী শান্তির দিকে ধাবিত হয়।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোকটি বেদান্ত এবং যোগ দর্শনের একটি মৌলিক ধারণাকে প্রতিফলিত করে যেখানে আত্মাকে অবিনশ্বর এবং চেতনাকে ধারাবাহিক হিসেবে দেখা হয়। এখানে কর্ম এবং সংস্কারের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি কাজ এবং অভিজ্ঞতা মানুষের অন্তরে একটি ছাপ রেখে যায় যা ভবিষ্যতের আচরণকে প্রভাবিত করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানবজীবন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি একটি চলমান যাত্রা যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করে। যোগের জিজ্ঞাসু ব্যক্তি যখন এই সত্য উপলব্ধি করে তখন সে কেবল বাহ্যিক ধর্মীয় আচার বা শাস্ত্রীয় শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সে সেই জ্ঞানের অন্তর্নিহিত সারমর্ম উপলব্ধি করার চেষ্টা করে।
প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকটি মানুষের অবচেতন মন এবং তার ভেতরের অদৃশ্য টানের কথা বলে। পূর্ব অভ্যাস এখানে বীজের মতো যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অঙ্কুরিত হয়ে মানুষের জীবনে প্রকাশ পায়। শব্দব্রহ্ম এখানে বাহ্যিক জ্ঞান বা আনুষ্ঠানিকতার প্রতীক যা এক পর্যায়ে সত্য উপলব্ধির জন্য অতিক্রম করতে হয়। এই অতিক্রম করা মানে জ্ঞানকে অস্বীকার করা নয় বরং তার গভীরতর অর্থকে উপলব্ধি করা। এটি এমন এক পর্যায় যেখানে মানুষ শব্দের সীমা ছাড়িয়ে অভিজ্ঞতার স্তরে পৌঁছে যায়।
বাস্তব জীবনের উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। একজন শিক্ষার্থী যদি দীর্ঘদিন অধ্যবসায়ের সঙ্গে পড়াশোনা করে তবে সেই অভ্যাস তাকে ভবিষ্যতে সহজেই জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। একইভাবে একজন সাধক যদি ধ্যান বা যোগচর্চায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে তবে তার মন স্বাভাবিকভাবেই সেই দিকেই আকৃষ্ট হয় এমনকি যদি সে সচেতনভাবে তা না চায় তবুও। এটি নদীর প্রবাহের মতো যেখানে পানি স্বাভাবিকভাবে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায় কোনো বাধা ছাড়াই।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে মানুষের জীবন অভ্যাস দ্বারা গঠিত এবং সেই অভ্যাসই তাকে তার চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে পরিচালিত করে। ভাষাগতভাবে এটি সংস্কৃতের সূক্ষ্ম গঠন এবং সমাসের সৌন্দর্য প্রকাশ করে। দার্শনিকভাবে এটি কর্ম সংস্কার এবং চেতনার ধারাবাহিকতার ধারণাকে তুলে ধরে। আর আধ্যাত্মিকভাবে এটি নির্দেশ করে যে সত্যিকারের জ্ঞান লাভের জন্য কেবল বাহ্যিক শব্দ বা আচার নয় বরং গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। তাই বলা যায় মানুষ তার অভ্যাসেরই প্রতিফলন এবং সেই অভ্যাসই তাকে ধীরে ধীরে সত্যের পথে নিয়ে যায় অথবা বিপরীত দিকে ঠেলে দেয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!