সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.৮ | জ্ঞান-বিজ্ঞানে তৃপ্তি, কূটস্থতা ও বিজিতেন্দ্রিয় যোগীর পরিচয়

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
জ্ঞানবিজ্ঞানতৃপ্তাত্মা কূটস্থো বিজিতেন্দ্রিয়ঃ। যুক্ত ইত্যুচ্যতে যোগী সমলোষ্ট্রাশ্মকাঞ্চনঃ।।৮।।
জ্ঞানবিজ্ঞানতৃপ্তাত্মা কূটস্থো বিজিতেন্দ্রিয়ঃ। 
যুক্ত ইত্যুচ্যতে যোগী সমলোষ্ট্রাশ্মকাঞ্চনঃ।।৮।।

অনুবাদঃ যে যোগী শাস্ত্রজ্ঞান ও তত্ত্ব অনুভূতিতে পরিতৃপ্ত, ‍যিনি চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত ও জিতেন্দ্রিয় এবং যিনি মৃৎখন্ড,প্রস্তর ও সুবর্ণে সমদর্শী, তিনি যোগারূঢ় বলে কথিত হন। 

ভগবদ্গীতার উক্ত শ্লোকাংশে মানুষের আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার এক গভীর ও সুসমন্বিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে জ্ঞান বিজ্ঞান তৃপ্ত আত্মা কূটস্থ এবং বিজিতেন্দ্রিয় অবস্থার মাধ্যমে এক আদর্শ যোগীর স্বরূপ প্রকাশ পায়। এখানে জ্ঞান শব্দটি সাধারণ উপলব্ধি বা তাত্ত্বিক বোঝাপড়াকে নির্দেশ করে, আর বিজ্ঞান শব্দটি সেই জ্ঞানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ উপলব্ধিকে বোঝায়। যখন এই দুই একত্রিত হয়ে মানুষের অন্তরে সম্পূর্ণ তৃপ্তি সৃষ্টি করে, তখন তার আত্মা আর বাহ্যিক কোনো বস্তু বা আকাঙ্ক্ষার ওপর নির্ভরশীল থাকে না। এই তৃপ্ত আত্মা এক গভীর অন্তর্মুখী শান্তির প্রতীক, যা বাইরের পরিবর্তনশীল জগতের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে।

এই অবস্থাকে আরও স্পষ্ট করে কূটস্থ শব্দটি, যার অর্থ অচঞ্চল ও অপরিবর্তনীয়। যেমন একটি পর্বত ঝড় বৃষ্টি বা ঋতুর পরিবর্তনে প্রভাবিত হয় না, তেমনি একজন কূটস্থ ব্যক্তি সুখ দুঃখ লাভ ক্ষতি বা সম্মান অপমানের দ্বারা বিচলিত হন না। তার মন এক স্থিতিশীল কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত থাকে, যেখানে কোনো দ্বন্দ্ব বা অস্থিরতা প্রবেশ করতে পারে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিজিতেন্দ্রিয় ধারণা, যার মাধ্যমে বোঝানো হয় যে সেই ব্যক্তি তার ইন্দ্রিয়গুলোকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ থেকে মুক্ত হওয়া মানে কেবল বাহ্যিক সংযম নয়, বরং অভ্যন্তরীণ আসক্তির সম্পূর্ণ অবসান।

এই শ্লোকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো সমলোষ্ট্রাশ্মকাঞ্চন ভাবনা, যেখানে মাটি পাথর ও স্বর্ণকে সমানভাবে দেখার কথা বলা হয়েছে। এটি কেবল বাহ্যিক বস্তুগত সমতা নয়, বরং মানুষের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির এক গভীর রূপান্তরকে নির্দেশ করে। সাধারণত স্বর্ণ মানুষের লোভ ও আকর্ষণের প্রতীক, পাথর নিরপেক্ষতার প্রতীক, আর মাটি সাধারণ ও তুচ্ছ বলে বিবেচিত। কিন্তু একজন সত্যিকারের যোগীর কাছে এই তিনটির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না, কারণ তিনি বস্তুগত মূল্যবোধের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছেন। তার কাছে সবকিছুই সমান, কারণ তিনি বস্তু নয়, তার অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করেন।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অদ্বৈত ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, যেখানে সবকিছুকে এক পরম সত্যের প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। যখন মানুষ এই একত্ব উপলব্ধি করে, তখন তার কাছে ভেদাভেদ বিলীন হয়ে যায় এবং সে সমদৃষ্টির অবস্থায় পৌঁছে যায়। যোগ দর্শনের ভাষায় এটি চিত্তের সম্পূর্ণ প্রশান্তি এবং বৃত্তির নিয়ন্ত্রণ, যেখানে মন আর বাহ্যিক প্রভাবের দ্বারা বিচলিত হয় না। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি এক ধরনের গভীর মানসিক স্থিতি, যেখানে আবেগের ওঠানামা নিয়ন্ত্রিত এবং ব্যক্তি এক সুসংহত ভারসাম্যে অবস্থান করে।

এই ধারণার বাস্তব প্রয়োগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন সত্যিকারের শিক্ষক বা নেতা যখন ধনী গরিব সকলকে সমানভাবে দেখেন, তখন তিনি এই সমদৃষ্টিরই পরিচয় দেন। আবার জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও যিনি ধৈর্য ও স্থিরতা বজায় রাখতে পারেন, তিনিও এই অবস্থার আভাস লাভ করেন। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে প্রকৃত শান্তি বাহ্যিক অর্জনে নয়, বরং অন্তরের উপলব্ধিতে নিহিত। যখন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা মিলিত হয়ে আত্মাকে তৃপ্ত করে এবং মন ইন্দ্রিয়ের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে সমদৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই মানুষ সত্যিকারের স্বাধীনতা ও পরিপূর্ণতার স্বাদ লাভ করে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 12, 2026 August 12, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি