শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬.৯ | সমবুদ্ধি ও সকলের প্রতি সমদৃষ্টির মহিমা
সুহৃন্মিত্রার্যুদাসীনমধ্যস্থদ্বেষ্যবন্ধুষু।
সাধুষ্বপি চ পাপেষু সমবুদ্ধির্বিশিষ্যতে।।৯।।
অনুবাদঃ যিনি সুহৃদ, মিত্র, শত্রু, উদাসীন, মধ্যস্থ, মৎসর, বন্ধু, ধার্মিক ও পাপাচারী-সকলের প্রতি সমবুদ্ধি, তিনিই শ্রেষ্ঠতা লাভ করেন।
সংস্কৃত শাস্ত্রের এই গভীর ভাবসম্পন্ন শ্লোকটি মানবচেতনার এক উচ্চতর অবস্থার পরিচয় বহন করে, যেখানে একজন ব্যক্তি সকল সম্পর্ক, বৈপরীত্য এবং নৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সমবুদ্ধি বা সমদৃষ্টি অর্জন করেন। এখানে উল্লেখিত সুহৃত্, মিত্র, অরি, উদাসীন, মধ্যস্থ, দ্বেষ্য, বন্ধু, সাধু এবং পাপী এই শব্দগুলো কেবল মানুষের বিভিন্ন সামাজিক ও মানসিক অবস্থানকে নির্দেশ করে না, বরং মানবসমাজের বহুমাত্রিক সম্পর্কের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে। সুহৃত্ শব্দটি গঠিত হয়েছে সু অর্থে ভালো এবং হৃত্ অর্থে হৃদয় থেকে, যার দ্বারা বোঝায় নিঃস্বার্থ শুভাকাঙ্ক্ষী। মিত্র হলো বন্ধুত্বের প্রতীক, অরি শত্রুর রূপ, উদাসীন এমন একজন যিনি নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকেন, মধ্যস্থ এমন ব্যক্তি যিনি দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেন, দ্বেষ্য সেই যাকে ঘৃণা করা হয়, বন্ধু আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ, আর সাধু ও পাপী নৈতিকতার দুই বিপরীত প্রান্তকে নির্দেশ করে। এই সমস্ত পার্থক্যের মধ্যেও যিনি সমবুদ্ধি ধারণ করেন, অর্থাৎ সবার প্রতি সমান মনোভাব ও দৃষ্টি রাখেন, তাকেই এখানে শ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
এই সমবুদ্ধি শব্দটি সম এবং বুদ্ধি এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত, যেখানে সম অর্থ সমান এবং বুদ্ধি অর্থ জ্ঞান বা চেতনা। আক্ষরিক অর্থে এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে ব্যক্তি কারো প্রতি পক্ষপাত বা বিরাগ পোষণ করেন না। কিন্তু এর গভীর তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। এটি এমন এক অন্তর্দৃষ্টি যা মানুষকে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ, লাভ ক্ষতি কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েনের বাইরে নিয়ে যায়। একজন সমবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে সকল মানুষই এক বৃহত্তর অস্তিত্বের অংশ এবং তাদের ভিন্ন আচরণ মূলত পরিস্থিতি ও চেতনার স্তরের ফল। তাই তিনি কাউকে ঘৃণা করেন না বা কাউকে অতিরিক্ত আসক্তিও হন না।
দার্শনিকভাবে এই ধারণাটি অদ্বৈত দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, যেখানে বলা হয় যে সমস্ত সত্তার মধ্যে এক অভিন্ন চেতনা বিরাজমান। সেই উপলব্ধি যখন গভীর হয়, তখন মানুষের মধ্যে আর কোনো বিভাজন থাকে না। যোগ দর্শনেও সমত্বকে এক গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে মনকে স্থির ও সমান অবস্থায় রাখা হয়। বৌদ্ধ দর্শনে এই ভাবটি উপেক্ষা নামে পরিচিত, যা সকল জীবের প্রতি সমান সহানুভূতি ও নিরপেক্ষতার প্রতীক। এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য নয়, বরং মানসিক শান্তি ও সামাজিক সাদৃশ্যের জন্যও অপরিহার্য।
প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকটি এমন এক চেতনার প্রতিফলন যা আয়নার মতো স্বচ্ছ এবং সমুদ্রের মতো গভীর। যেমন সূর্য তার আলো সকলের উপর সমানভাবে বিস্তার করে, তেমনি সমবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই সবার প্রতি সমান আচরণ করেন। বাস্তব জীবনে একজন প্রকৃত শিক্ষক বা নেতা এই গুণের উদাহরণ হতে পারেন, যিনি ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায় ও মানবিকতার ভিত্তিতে সকলকে সমানভাবে মূল্যায়ন করেন। এই সমদৃষ্টি মানুষকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে এবং বৃহত্তর মানবিকতার পথে পরিচালিত করে।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব বাহ্যিক অর্জনে নয়, বরং অন্তরের সমতা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিশুদ্ধতায় নিহিত। ভাষাগতভাবে এটি বিভিন্ন সম্পর্ক ও অবস্থানের সমন্বয়ে গঠিত একটি সমৃদ্ধ প্রকাশ, দার্শনিকভাবে এটি একত্বের উপলব্ধির পথ নির্দেশ করে এবং প্রতীকীভাবে এটি শান্ত, স্থির ও নিরপেক্ষ চেতনার প্রতীক। যে ব্যক্তি এই সমবুদ্ধি অর্জন করতে পারেন, তিনি কেবল নিজেই শান্তি লাভ করেন না, বরং সমাজেও সাম্য ও সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে দেন।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!