শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৭.১ | কৃষ্ণে মনোনিবেশ, আশ্রয় ও যোগের মাধ্যমে পরম সত্যকে জানা
শ্রীভগবানুবাচ
ময্যাসক্তমনাঃ পার্থ যোগং যুঞ্জন্মদাশ্রয়ঃ।
অসংশয়ং সমগ্রং মাং যথা জ্ঞাস্যসি তচ্ছৃণু।। ১।।
অনুবাদঃ শ্রীভগবান বললেন- হে পার্থ! আমাতে আসক্তচিত্ত হয়ে, আমাতে মনোনিবেশ করে যোগাভ্যাস করলে, কিভাবে সমস্ত সংশয় থেকে মুক্ত হয়ে আমাকে জানতে পারবে, তা শ্রবণ কর।
ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ঈশ্বরকে কীভাবে সত্যিকার অর্থে জানা যায় তার একটি গভীর পথ নির্দেশ করেছেন। শ্লোকটি হলো ময়্যাসক্তমনাঃ পার্থ যোগং যুঞ্জন্মদাশ্রয়ঃ অসংশয়ং সমগ্রং মাং যথা জ্ঞাস্যসি তচ্ছৃণু। এর সহজ অর্থ হলো, হে পার্থ, আমার প্রতি মনকে নিবিষ্ট করে, আমাকে আশ্রয় করে এবং যোগসাধনায় যুক্ত থেকে তুমি কীভাবে আমাকে সম্পূর্ণরূপে এবং কোনো সংশয় ছাড়াই জানতে পারবে, তা শোনো। এই শ্লোকটি কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয়। এর মধ্যে মানুষের মন, সাধনা, জ্ঞান, ভক্তি এবং পরম সত্যকে উপলব্ধি করার একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো ময়্যাসক্তমনাঃ। ময়ি অর্থ আমার মধ্যে বা আমার প্রতি এবং আসক্ত অর্থ গভীরভাবে যুক্ত বা নিবিষ্ট। মনাঃ অর্থ মন। সুতরাং ময়্যাসক্তমনাঃ বলতে বোঝায় যার মন কৃষ্ণের মধ্যে গভীরভাবে নিবিষ্ট। এখানে আসক্তি শব্দটি সাধারণ জাগতিক আসক্তির অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। সাধারণ আসক্তি মানুষকে কোনো বস্তু, ব্যক্তি বা ইন্দ্রিয়সুখের সঙ্গে বেঁধে রাখে। কিন্তু কৃষ্ণের প্রতি আসক্তি মানুষের মনকে নিম্নতর আকর্ষণ থেকে উচ্চতর সত্যের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ তার জীবনে যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তার চিন্তা স্বাভাবিকভাবেই বারবার সেই বিষয়ের দিকে ফিরে যায়। তাই কৃষ্ণ প্রথমেই বলছেন, মানুষের মনের কেন্দ্র যেন পরম সত্যের দিকে ফিরে যায়।
মন শব্দটির মধ্যেও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। সংস্কৃত মনস্ শব্দটি চিন্তা ও মানসিক উপলব্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। ভারতীয় দর্শনে মন শুধু চিন্তা করার একটি যন্ত্র নয়। মন হলো আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি, দ্বন্দ্ব, স্মৃতি এবং মানসিক প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মানুষের মন যেখানে নিবিষ্ট হয়, ধীরে ধীরে তার জীবনও সেই দিকে পরিচালিত হয়। যদি মানুষের মন অর্থ, ক্ষমতা, খ্যাতি বা ইন্দ্রিয়সুখে সম্পূর্ণভাবে নিবিষ্ট থাকে, তাহলে তার জীবনও সেই বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। কৃষ্ণ তাই মনকে দমন করার পরিবর্তে তার দিক পরিবর্তনের শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, যে শক্তি দিয়ে মন জগতের অসংখ্য বিষয়ে ছুটে বেড়ায়, সেই শক্তিকেই ঈশ্বরের দিকে নিবদ্ধ করো।
এরপর কৃষ্ণ অর্জুনকে পার্থ বলে সম্বোধন করেছেন। পার্থ অর্থ পৃথার পুত্র। পৃথা ছিলেন কুন্তীর আরেক নাম। এই সম্বোধনের মধ্যে শুধু পারিবারিক পরিচয় নেই, এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের এক গভীর অনুভব। কৃষ্ণ অর্জুনকে এমনভাবে সম্বোধন করছেন যাতে তার নিজের পরিচয় এবং তার সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্কের কথাও স্মরণ হয়। গীতার শিক্ষা সবসময় মানুষের বাস্তব জীবন ও ব্যক্তিগত অবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তাই কৃষ্ণ কেবল একটি বিমূর্ত দর্শন উপস্থাপন করছেন না, বরং সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে তার প্রকৃত পথ দেখাচ্ছেন।
এরপর এসেছে মদাশ্রয়ঃ শব্দটি। মদ অর্থ আমাকে এবং আশ্রয় অর্থ অবলম্বন বা নির্ভরতার স্থান। মদাশ্রয় অর্থ আমাকে আশ্রয় করে। কিন্তু এর গভীর অর্থ হলো নিজের অহংকার, ভয় এবং অনিশ্চয়তাকে জীবনের একমাত্র ভিত্তি না বানিয়ে পরম সত্যকে জীবনের আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করা। মানুষ জীবনে নানা কিছুর উপর নির্ভর করে। কেউ অর্থকে আশ্রয় মনে করে, কেউ ক্ষমতাকে, কেউ সামাজিক মর্যাদাকে, কেউ সম্পর্ককে। কিন্তু এই সমস্ত আশ্রয় পরিবর্তনশীল। কৃষ্ণ এমন এক আশ্রয়ের কথা বলছেন যা মানুষের অন্তর্গত অস্তিত্বকে স্থির করতে পারে। ঈশ্বরকে আশ্রয় করা মানে জীবনের সমস্ত দায়িত্ব পরিত্যাগ করা নয়। বরং জীবনের কর্মের মধ্যেই একটি উচ্চতর সত্যের উপর আস্থা স্থাপন করা।
ময়্যাসক্তমনাঃ এবং মদাশ্রয়ঃ এই দুটি পদ একসঙ্গে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রথমটি নির্দেশ করছে মন কোথায় থাকবে এবং দ্বিতীয়টি নির্দেশ করছে জীবন কোন ভিত্তির উপর দাঁড়াবে। শুধু মুখে ঈশ্বরের কথা বলা যথেষ্ট নয়। মনকেও ঈশ্বরমুখী হতে হবে এবং জীবনকেও সেই সত্যকে আশ্রয় করে পরিচালিত করতে হবে। অর্থাৎ চিন্তা ও জীবনযাপনকে একই কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। মানুষের অন্তরে যা বিশ্বাস, তার সঙ্গে তার জীবনযাত্রারও সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
এরপর এসেছে যোগং যুঞ্জন্। যোগ শব্দটি সংস্কৃত যুজ্ ধাতু থেকে এসেছে। এর মূল ভাব হলো যুক্ত হওয়া, সংযুক্ত করা এবং একত্রিত করা। গীতার প্রেক্ষাপটে যোগ কেবল শারীরিক ব্যায়াম বা আসনের নাম নয়। যোগ হলো চেতনার সঙ্গে পরম সত্যের সংযোগ স্থাপন। যুঞ্জন্ শব্দের মধ্যে চলমান সাধনার ভাব রয়েছে। অর্থাৎ এই সংযোগ একবার তৈরি করলেই শেষ হয়ে যায় না। নিয়মিত সাধনা, আত্মসংযম, মনোযোগ, ভক্তি এবং আত্মপর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই সংযোগকে গভীর করতে হয়।
এই দৃষ্টিতে যোগ হলো মানুষের ছিন্নবিচ্ছিন্ন চেতনাকে একটি কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া। সাধারণ মানুষ নানা চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, ভয় এবং প্রত্যাশার মধ্যে নিজের মনকে ছড়িয়ে দেয়। ফলে তার ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হয়। যোগ সেই ছড়িয়ে থাকা মনকে একটি উচ্চতর লক্ষ্যের দিকে কেন্দ্রীভূত করে। যেমন একটি নদীর জল যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন তার শক্তি কমে যায়, কিন্তু যখন সেই জল একটি নির্দিষ্ট প্রবাহে একত্রিত হয় তখন তা শক্তিশালী নদীতে পরিণত হয়। মানুষের মনও তেমন। মন যখন অসংখ্য আকর্ষণের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে তখন তার গভীর শক্তি প্রকাশ পায় না। কিন্তু যখন তা একটি উচ্চতর সত্যের দিকে নিবিষ্ট হয় তখন একাগ্রতা ও অন্তর্দৃষ্টি জন্ম নিতে শুরু করে।
এরপর কৃষ্ণ বলেন অসংশয়ং সমগ্রং মাং জ্ঞাস্যসি। অসংশয় অর্থ সংশয়হীনভাবে এবং সমগ্র অর্থ সম্পূর্ণভাবে। মাং অর্থ আমাকে এবং জ্ঞাস্যসি অর্থ জানতে পারবে। এখানে জ্ঞান বলতে কেবল কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা বোঝায় না। গীতার জ্ঞান হলো সত্যকে অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করা। একজন মানুষ বই পড়ে জানতে পারে যে আগুন গরম। কিন্তু আগুনের তাপ অনুভব করা সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তেমনি ঈশ্বর সম্পর্কে অনেক কথা জানা এবং ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। কৃষ্ণ এমন এক জ্ঞানের কথা বলছেন যা মানুষের চেতনার গভীরে পরিবর্তন সৃষ্টি করে।
সমগ্রং মাং কথাটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণ এখানে আংশিক ঈশ্বরজ্ঞান নয়, সমগ্র ঈশ্বরজ্ঞান সম্পর্কে কথা বলছেন। মানুষ অনেক সময় সত্যের একটি অংশকে সম্পূর্ণ সত্য মনে করে। কেউ ঈশ্বরকে কেবল সৃষ্টিকর্তা হিসেবে দেখে, কেউ নৈতিক বিধানের উৎস হিসেবে দেখে, কেউ নিরাকার চৈতন্য হিসেবে উপলব্ধি করে এবং কেউ ব্যক্তিগত প্রেমময় ঈশ্বর হিসেবে অনুভব করে। গীতার এই অংশে কৃষ্ণ এমন এক পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধির দিকে নির্দেশ করছেন যেখানে সত্যকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, তার সামগ্রিক অস্তিত্বের মধ্যে উপলব্ধি করার চেষ্টা করা হয়।
জ্ঞাস্যসি শব্দটি সংস্কৃত জ্ঞা ধাতু থেকে এসেছে। এর অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। কিন্তু এই জানা নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক তথ্য নয়। ভারতীয় দর্শনে সত্যিকার জ্ঞান মানুষের অস্তিত্বকে পরিবর্তিত করে। একজন ব্যক্তি যখন সত্যকে সত্যিই উপলব্ধি করে, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ এবং জীবনযাপনও পরিবর্তিত হয়। তাই গীতার জ্ঞান কেবল মস্তিষ্কের জ্ঞান নয়, এটি চেতনার জ্ঞান।
এই শ্লোকের শেষে কৃষ্ণ বলেন তচ্ছৃণু অর্থ তা শোনো। এখানে শোনা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া। সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য প্রথমে মনকে গ্রহণক্ষম করতে হয়। অস্থির এবং অহংকেন্দ্রিক মন অনেক কথা শুনলেও তার গভীর অর্থ গ্রহণ করতে পারে না। তাই কৃষ্ণ প্রথমে মনকে ঈশ্বরের দিকে নিবিষ্ট করার কথা বলেছেন, তারপর আশ্রয়ের কথা বলেছেন, তারপর যোগসাধনার কথা বলেছেন এবং শেষে জ্ঞানের কথা বলেছেন। এই ধারাবাহিকতার মধ্যে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। প্রস্তুত মনই গভীর জ্ঞান গ্রহণ করতে পারে।
অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের একটি বিশেষ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। অদ্বৈত বেদান্তে চূড়ান্ত সত্য হলো ব্রহ্ম। সেই দৃষ্টিতে ঈশ্বরকে জানার অর্থ শেষ পর্যন্ত নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে উপলব্ধি করা। বাহ্যিকভাবে ব্যক্তি এবং পরম সত্য পৃথক বলে মনে হলেও গভীর আত্মজ্ঞান সেই বিভেদের সীমা অতিক্রম করে। কৃষ্ণকে জানা তখন পরম চৈতন্যকে জানা এবং নিজের প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করার পথ হয়ে ওঠে।
ভক্তি দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের অর্থ আরও ব্যক্তিগত ও প্রেমময়। এখানে কৃষ্ণ কেবল একটি বিমূর্ত পরম সত্য নন। তিনি ভক্তের আশ্রয়, প্রেমের কেন্দ্র এবং জীবনের সর্বোচ্চ অবলম্বন। ময়্যাসক্তমনাঃ তখন হয়ে ওঠে ঈশ্বরের প্রতি প্রেমময় মনোনিবেশ এবং মদাশ্রয়ঃ হয়ে ওঠে ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ। এই দৃষ্টিতে ঈশ্বরকে জানা শুধু চিন্তার বিষয় নয়, এটি ভালোবাসারও বিষয়। ভক্তির মাধ্যমে জ্ঞান এবং জ্ঞানের মাধ্যমে ভক্তি পরস্পরকে গভীর করে।
যোগদর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের চেতনাকে বহির্মুখী অবস্থা থেকে অন্তর্মুখী অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দেয়। মানুষের ইন্দ্রিয় সাধারণত বাহ্যিক বিষয়ের দিকে ছুটে যায়। সেখান থেকে আকাঙ্ক্ষা জন্মায়, আকাঙ্ক্ষা থেকে আসক্তি এবং আসক্তি থেকে মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়। কৃষ্ণ সেই প্রবাহকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে বলছেন। মনকে একটি উচ্চতর সত্যের দিকে নিবদ্ধ করলে ধীরে ধীরে একাগ্রতা জন্মায় এবং একাগ্রতার মধ্য দিয়ে গভীর উপলব্ধির দরজা খুলে যায়।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। মানুষ যে বিষয় নিয়ে নিয়মিত চিন্তা করে, তার মন ধীরে ধীরে সেই বিষয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়। যদি একজন মানুষ সারাক্ষণ ভয় নিয়ে চিন্তা করে, তাহলে তার জীবন ভয়কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। যদি সে সারাক্ষণ অর্থ ও প্রতিযোগিতা নিয়ে চিন্তা করে, তাহলে তার মূল্যবোধও সেই অনুযায়ী গড়ে ওঠে। কৃষ্ণের শিক্ষা হলো মনকে এমন একটি উচ্চতর কেন্দ্রের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া যা মানুষের জীবনকে অর্থপূর্ণ, স্থির এবং গভীর করে তুলতে পারে।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। এখানে মন হলো মানুষের চেতনার প্রতীক। আসক্তি হলো সেই চেতনার দিকনির্দেশ। আশ্রয় হলো জীবনের ভিত্তি। যোগ হলো বিচ্ছিন্নতার অবসান। অসংশয় হলো অন্তর্দ্বন্দ্বের অবসান এবং সমগ্র হলো পূর্ণ সত্যের অনুসন্ধান। অর্থাৎ শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি যাত্রার প্রতীক। বহির্মুখী অস্থিরতা থেকে অন্তর্মুখী একাগ্রতা, নির্ভরতার সংকট থেকে প্রকৃত আশ্রয়, বিচ্ছিন্নতা থেকে সংযোগ এবং সংশয় থেকে উপলব্ধির দিকে এই যাত্রাই এখানে প্রকাশিত হয়েছে।
বাস্তব জীবনের দৃষ্টিতে এই শ্লোক আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমার মন আসলে কোথায় আসক্ত। আমি কি সত্যের প্রতি আসক্ত, নাকি অর্থের প্রতি। আমি কি আত্মিক উন্নতির প্রতি নিবিষ্ট, নাকি মানুষের প্রশংসার প্রতি। আমি কি স্থায়ী সত্যকে আশ্রয় করেছি, নাকি পরিবর্তনশীল বিষয়কে জীবনের একমাত্র ভিত্তি বানিয়েছি। এই আত্মপর্যবেক্ষণই শ্লোকটির ব্যবহারিক দিক। কৃষ্ণ প্রথমে পৃথিবী পরিবর্তনের কথা বলছেন না। তিনি বলছেন নিজের মন কোন দিকে যাচ্ছে তা দেখো।
একটি কম্পাসের কাঁটা যেমন নির্দিষ্ট দিক নির্দেশ করে, মানুষের মনও সবসময় কোনো না কোনো দিক নির্দেশ করে। সেই দিক যদি নিম্নতর আকাঙ্ক্ষার দিকে থাকে তাহলে জীবন সেই পথেই এগোয়। আর যদি মন পরম সত্যের দিকে স্থির হয়, তাহলে জীবনের কর্মকাণ্ডও ধীরে ধীরে সেই সত্যের আলোতে পরিচালিত হতে শুরু করে। এই অর্থে ময়্যাসক্তমনাঃ শুধু একটি ধর্মীয় বাক্য নয়। এটি মানুষের মানসিক শক্তিকে একটি উচ্চতর উদ্দেশ্যের দিকে পরিচালিত করার একটি গভীর শিক্ষা।
সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতা ৭.১ এর এই শ্লোকটি ঈশ্বরকে জানার একটি পূর্ণাঙ্গ পথ নির্দেশ করে। মনকে ঈশ্বরের মধ্যে নিবিষ্ট করতে হবে, ঈশ্বরকে জীবনের আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, নিয়মিত যোগসাধনার মাধ্যমে সেই সম্পর্ককে গভীর করতে হবে এবং তখনই জ্ঞান ধীরে ধীরে সংশয়মুক্ত ও পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধিতে পরিণত হবে। এই শ্লোকের সারকথা হলো মানুষের মন যেদিকে সম্পূর্ণভাবে নিবিষ্ট হয়, তার জীবনও শেষ পর্যন্ত সেই দিকেই গড়ে ওঠে। তাই যদি মানুষ পরম সত্যকে জানতে চায়, তবে প্রথমে তাকে নিজের মনের কেন্দ্র পরিবর্তন করতে হবে। ঈশ্বরকে জানা কেবল বুদ্ধির বিষয় নয়। এটি মন, বিশ্বাস, সাধনা, আত্মসমর্পণ এবং প্রত্যক্ষ উপলব্ধির একটি পূর্ণাঙ্গ যাত্রা। সেই যাত্রায় মন যখন পরম সত্যে স্থির হয়, জীবন যখন সেই সত্যকে আশ্রয় করে এবং সাধনা যখন অবিচ্ছিন্ন থাকে, তখন জ্ঞান আর কেবল শোনা কোনো কথা থাকে না। তা মানুষের নিজের জীবনের অন্তর্গত সত্যে পরিণত হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!