সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৭.২ | জ্ঞান ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে পরম সত্যের পূর্ণ উপলব্ধি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
জ্ঞানং তেহহং সবিজ্ঞানমিদং বক্ষ্যাম্যশেষতঃ।যজজ্ঞাত্বা নেহ ভূয়োহন্যজজ্ঞাতব্যমবশিষ্যতে।।২।।
জ্ঞানং তেহহং সবিজ্ঞানমিদং বক্ষ্যাম্যশেষতঃ।
যজজ্ঞাত্বা নেহ ভূয়োহন্যজজ্ঞাতব্যমবশিষ্যতে।।২।।

অনুবাদঃ আমি এখন তোমাকে বিজ্ঞান সমন্বিত এই জ্ঞানের কথা সম্পূর্ণরূপে বলব, যা জানা হলে এই জগতে আর কিছুই জানবার বাকি থাকে না।

—এর মূল বক্তব্য হলো পরম জ্ঞান ও তার প্রত্যক্ষ উপলব্ধি। ‘জ্ঞান’ শব্দটি সংস্কৃত √জ্ঞা ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ জানা, বোঝা বা উপলব্ধি করা; আর ‘বিজ্ঞান’ গঠিত ‘বি’ উপসর্গ ও ‘জ্ঞান’ থেকে, যার অর্থ বিশেষভাবে, বিশদভাবে বা প্রত্যক্ষভাবে জানা। তাই গীতার প্রেক্ষাপটে জ্ঞান কেবল কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য বা তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং তত্ত্বকে জানা; আর বিজ্ঞান হলো সেই তত্ত্বকে নিজের চেতনা ও জীবনের মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করা। যেমন কেউ বই পড়ে জানল যে মধু মিষ্টি—এটি জ্ঞান; কিন্তু নিজে মধু আস্বাদন করে তার মিষ্টতা অনুভব করা হলো উপলব্ধি বা বিজ্ঞান। শ্রীকৃষ্ণ যখন বলেন, “জ্ঞানং তে অহং সবিজ্ঞানমিদং বক্ষ্যাম্যশেষতঃ”, তখন তিনি অর্জুনকে শুধু ঈশ্বর, আত্মা, প্রকৃতি ও জগত সম্পর্কে তাত্ত্বিক শিক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না; তিনি এমন জ্ঞান দেওয়ার কথা বলছেন যা সাধনা ও উপলব্ধির মাধ্যমে জীবনের সত্যে পরিণত হয়। ‘অশেষতঃ’ অর্থ সম্পূর্ণরূপে, কোনো অংশ অবশিষ্ট না রেখে; আর “যজ্জ্ঞাত্বা নেহ ভূয়োহন্যজ্জ্ঞাতব্যমবশিষ্যতে” অর্থ—“যা জেনে এই জগতে আর অন্য কোনো পরম জ্ঞাতব্য বিষয় অবশিষ্ট থাকে না।” এর অর্থ এই নয় যে এই জ্ঞান লাভ করলে মানুষ পৃথিবীর প্রতিটি বৈজ্ঞানিক বা ব্যবহারিক তথ্য জেনে ফেলবে; বরং এমন এক মৌলিক সত্যকে উপলব্ধি করবে, যার জ্ঞান মানুষের অস্তিত্বসংক্রান্ত প্রধান প্রশ্নগুলোর ভিত্তি উন্মোচন করে—আমি কে, আমার প্রকৃত স্বরূপ কী, জগতের প্রকৃতি কী, ঈশ্বরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী এবং জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই পরম জ্ঞান আত্মা ও ব্রহ্মের ঐক্য উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়; ভক্তিমার্গে এটি ভগবানকে জানা এবং তাঁর সঙ্গে জীবের চিরন্তন সম্পর্ক উপলব্ধি করা; আবার যোগদর্শনের দৃষ্টিতে এটি কেবল তত্ত্ব বোঝা নয়, সাধনা ও ধ্যানের মাধ্যমে সেই সত্যকে প্রত্যক্ষ করা। এই কারণে শ্লোকটি মানুষের জ্ঞানচর্চাকে বাহ্যিক তথ্য থেকে অন্তর্গত আত্মজিজ্ঞাসার দিকে নিয়ে যায়। একজন মানুষ পৃথিবী, বিজ্ঞান, সমাজ, অর্থনীতি ও ইতিহাস সম্পর্কে অসংখ্য বিষয় জানতে পারেন, কিন্তু যদি তিনি নিজের প্রকৃতি ও জীবনের গভীর অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন, তবে গীতার দৃষ্টিতে তাঁর জ্ঞান এখনও অসম্পূর্ণ। অর্জুনের অবস্থাও এমনই ছিল—তিনি যুদ্ধ করতে জানতেন, কিন্তু যুদ্ধের নৈতিক ও অস্তিত্বগত অর্থ নিয়ে বিভ্রান্ত ছিলেন; কৃষ্ণের শিক্ষা সেই বিভ্রান্তিকে জ্ঞানের মাধ্যমে দূর করে আত্মোপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। প্রতীকীভাবে বলা যায়, জ্ঞান হলো মানচিত্র দেখা, আর বিজ্ঞান হলো সেই পথ ধরে নিজে গন্তব্যে পৌঁছানো; জ্ঞান হলো “আমি সত্যটি জানি”, আর বিজ্ঞান হলো “আমি সত্যটিকে উপলব্ধি করেছি।” তাই এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো—মানুষের চূড়ান্ত শিক্ষা কেবল অনেক কিছু জানা নয়, বরং যে ‘আমি’ জানছি তাকে জানা এবং অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করা। সংক্ষেপে, এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে তথ্য থেকে জ্ঞান, জ্ঞান থেকে মনন, মনন থেকে সাধনা এবং সাধনা থেকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির যে যাত্রা—সেটিই প্রকৃত আত্মজ্ঞান; আর যখন সেই পরম সত্য উপলব্ধ হয়, তখন বিচ্ছিন্ন অসংখ্য জ্ঞানের পেছনে ছুটে বেড়ানোর পরিবর্তে মানুষ সমস্ত জ্ঞানের অন্তর্নিহিত ঐক্য ও অর্থকে উপলব্ধি করতে পারে। অর্থাৎ, গীতার ভাষায় জ্ঞান সত্যকে জানে, আর বিজ্ঞান সেই সত্যে জাগ্রত হয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 16, 2026 August 16, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি