সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.১০ — ঈশ্বরের অধ্যক্ষতায় প্রকৃতির কার্যপ্রবাহ ও জগতের পরিবর্তনশীল সৃষ্টি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্। হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদ্ বিপরিবর্ততে।।১০।।
ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্। 
হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদ্ বিপরিবর্ততে।।১০।। 

অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! আমার অধ্যক্ষতার দ্বারা জড়া প্রকৃতি এই চারাচর ‍বিশ্ব সৃষ্টি করে। প্রকৃতির নিয়মে এই জগৎ পুনঃ পুনঃ সৃষ্টি হয় এবং ধ্বংস হয়। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের দশম শ্লোকটি জগতের সৃষ্টি, প্রকৃতির কার্যপ্রণালী এবং ঈশ্বরের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশ করে। শ্লোকটি হলো “ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্। হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদ্ বিপরিবর্ততে।” সহজ বাংলায় এর অর্থ হলো, হে কুন্তীপুত্র, আমার অধ্যক্ষতায় প্রকৃতি সমস্ত সচরাচর জগতকে উৎপন্ন করে এবং এই কারণেই সমগ্র জগৎ তার পরিবর্তনশীল গতির মধ্যে আবর্তিত হয়। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দের মধ্যেই ভারতীয় দর্শনের একটি বিশাল ভাবজগৎ নিহিত আছে। এখানে কৃষ্ণ শুধু জগতের সৃষ্টি কীভাবে হয় তা বলছেন না। তিনি প্রকৃতি, ঈশ্বর, চেতনা, পরিবর্তন এবং বিশ্বব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সম্পর্কের কথাও প্রকাশ করছেন।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “ময়াধ্যক্ষেণ”। শব্দটি ময়া এবং অধ্যক্ষেণ এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। ময়া অর্থ আমার দ্বারা এবং অধ্যক্ষ অর্থ তত্ত্বাবধায়ক, নিয়ামক, পর্যবেক্ষক বা অধিষ্ঠাতা। সেই অর্থে ময়াধ্যক্ষেণ বলতে বোঝায় আমার অধ্যক্ষতায়, আমার নিয়ামক উপস্থিতির অধীনে অথবা আমার তত্ত্বাবধানে। এখানে কৃষ্ণ এমন কোনো স্রষ্টার কথা বলছেন না যিনি প্রতিটি বস্তু নিজের হাতে আলাদাভাবে তৈরি করছেন। বরং তিনি বলছেন যে প্রকৃতির সমস্ত কার্যক্রম তাঁর অধ্যক্ষতার অধীনে পরিচালিত হয়। এই ধারণাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। প্রকৃতি কাজ করে, কিন্তু প্রকৃতি সর্বময় স্বাধীন কর্তৃত্ব নয়। প্রকৃতির কার্যকলাপের অন্তরালে রয়েছে একটি সর্বোচ্চ চৈতন্য ও নিয়ামক সত্য।

“অধ্যক্ষ” শব্দের মধ্যে নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধানের ভাব রয়েছে। একজন অধ্যক্ষ নিজে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কাজ হাতে করেন না, কিন্তু তাঁর অধীনে প্রতিষ্ঠানের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেই অর্থে কৃষ্ণের অধ্যক্ষতা প্রত্যক্ষভাবে প্রতিটি কাজ সম্পাদন করার অর্থ নয়। বরং প্রকৃতির নিয়ম, গতি ও কার্যকারণ তাঁর নিয়ামক উপস্থিতির অধীনে অবস্থান করে। এই ভাবটি গীতার ঈশ্বরতত্ত্ব বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বর এখানে জগতের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নন। তিনি জগতের কার্যপ্রবাহের গভীরে অবস্থানকারী চূড়ান্ত নিয়ামক সত্য।

এরপর আসে “প্রকৃতিঃ” শব্দটি। প্রকৃতি ভারতীয় দর্শনের অন্যতম মৌলিক ধারণা। শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃত কৃ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার অর্থ করা, সৃষ্টি করা, নির্মাণ করা বা সম্পাদন করা। প্রকৃতি বলতে তাই সেই সৃষ্টিশীল শক্তিকে বোঝানো যায় যার মাধ্যমে অব্যক্ত সম্ভাবনা বিভিন্ন ব্যক্ত রূপে প্রকাশিত হয়। সাধারণ অর্থে আমরা প্রকৃতি বলতে পাহাড়, নদী, বৃক্ষ, প্রাণী, আকাশ বা পৃথিবীকে বুঝি। কিন্তু গীতার দর্শনে প্রকৃতি তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এখানে প্রকৃতি হলো সমগ্র পরিবর্তনশীল জগতের কার্যকরী শক্তি। দেহ, মন, ইন্দ্রিয়, বস্তুজগৎ এবং প্রকৃতির বিভিন্ন পরিবর্তন তার কার্যক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত।

“সূয়তে” শব্দটির মধ্যেও সৃষ্টির একটি গভীর ধারণা রয়েছে। এর সঙ্গে সংস্কৃত সূ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার অর্থ উৎপন্ন করা, জন্ম দেওয়া বা প্রকাশ করা। প্রকৃতি সচরাচর জগতকে সূয়তে অর্থাৎ উৎপন্ন করে। এখানে উৎপন্ন করার অর্থ শূন্য থেকে কিছু সৃষ্টি করা এমন নয়। ভারতীয় দর্শনের অনেক ধারায় সৃষ্টি বলতে অব্যক্ত অবস্থা থেকে ব্যক্ত অবস্থায় প্রকাশকে বোঝানো হয়। যেমন একটি বীজের মধ্যে একটি বৃক্ষের সম্ভাবনা থাকে। উপযুক্ত পরিবেশে সেই সম্ভাবনা প্রকাশিত হয়ে বৃক্ষের রূপ নেয়। প্রকৃতির ক্ষেত্রেও তেমনই অব্যক্ত সম্ভাবনা বিভিন্ন রূপ ও প্রকাশের মাধ্যমে জগতে প্রতিভাত হয়।

এরপর রয়েছে “সচরাচরম্” শব্দটি। এটি চর এবং অচর এই দুই ভাবের সমন্বয়। চর অর্থ যা চলে বা গতিশীল এবং অচর অর্থ যা স্থির বা অচল। ফলে সচরাচর বলতে বোঝায় চলমান এবং স্থির সমস্ত কিছু। জীব ও জড়, প্রাণী ও উদ্ভিদ, মানুষ ও পরিবেশ, গতিশীল এবং স্থিতিশীল সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। কৃষ্ণ এই একটি শব্দের মাধ্যমে সমগ্র দৃশ্যমান বিশ্বকে বোঝাচ্ছেন। অর্থাৎ প্রকৃতি কেবল জীবজগতকে নয়, সমগ্র প্রকাশিত জগতকেই তার কার্যপ্রবাহের মধ্যে ধারণ করে।

“হেতুনানেন” শব্দটি শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হেতু অর্থ কারণ। অনেন অর্থ এই দ্বারা বা এই কারণে। তাই হেতুনানেন অর্থ এই কারণেই বা এই নিয়ামক সম্পর্কের কারণেই। কৃষ্ণ বলছেন যে তাঁর অধ্যক্ষতায় প্রকৃতির কার্যক্রমের কারণেই জগৎ তার পরিবর্তনের মধ্যে আবর্তিত হয়। এখানে সৃষ্টি এবং পরিবর্তনের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। প্রকৃতি শুধু একবার জগত সৃষ্টি করে থেমে যায় না। প্রকৃতি অবিরাম পরিবর্তন, উৎপাদন, বিকাশ, ক্ষয় এবং পুনর্গঠনের ধারায় জগতকে পরিচালিত করে।

“কৌন্তেয়” হলো অর্জুনের সম্বোধন। এর অর্থ কুন্তীর পুত্র। কৃষ্ণ যখন অর্জুনকে কৌন্তেয় বলে সম্বোধন করেন, তখন তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের একটি কোমলতা যুক্ত হয়। একই সঙ্গে তিনি অর্জুনকে তাঁর বংশ ও পরিচয়ের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। গীতার সংলাপে কৃষ্ণের বিভিন্ন সম্বোধনের মধ্য দিয়ে কখনও স্নেহ, কখনও উৎসাহ, কখনও সতর্কতা এবং কখনও গভীর দার্শনিক বক্তব্যের আবহ তৈরি হয়েছে।

এরপর আসে “জগৎ” শব্দটি। জগৎ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত গম ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। গম অর্থ যাওয়া বা চলা। সেই কারণে জগৎ শব্দের মধ্যে গতিশীলতার ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জগৎ মানে শুধু একটি স্থান নয়। জগৎ হলো যা সর্বদা চলমান, পরিবর্তনশীল এবং রূপান্তরিত। এই শব্দটির মধ্যেই গীতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বদর্শন প্রকাশ পায়। আমরা যে পৃথিবীকে স্থায়ী বলে মনে করি, তা আসলে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। মানুষের দেহ পরিবর্তিত হচ্ছে, চিন্তা পরিবর্তিত হচ্ছে, সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে, সভ্যতা পরিবর্তিত হচ্ছে এবং প্রকৃতিও তার নিজস্ব নিয়মে পরিবর্তিত হচ্ছে।

“বিপরিবর্ততে” শব্দটি সেই পরিবর্তনের ধারাকেই আরও স্পষ্ট করে। এর মধ্যে ঘোরা, আবর্তিত হওয়া, পরিবর্তিত হওয়া এবং রূপান্তরিত হওয়ার ভাব রয়েছে। তাই জগদ্ বিপরিবর্ততে বলতে শুধু পৃথিবী বদলে যায় এমন নয়। বরং সমগ্র বিশ্ব এক অবিরাম পরিবর্তন ও আবর্তনের মধ্যে অবস্থান করে। জন্মের পর বৃদ্ধি, বৃদ্ধির পর ক্ষয় এবং ক্ষয়ের পর নতুন প্রকাশ এই ধারাই প্রকৃতির নিয়ম। দিনের পর রাত আসে, রাতের পর আবার দিন আসে। ঋতু পরিবর্তিত হয়। নদী প্রবাহিত হয়। সভ্যতা গড়ে ওঠে এবং বিলীন হয়। মানুষ জন্ম নেয় এবং একদিন তার দেহ প্রকৃতির উপাদানে ফিরে যায়। এই অবিরাম পরিবর্তনের মধ্যেই জগতের গতি।

এই শ্লোকের দার্শনিক গভীরতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয় প্রকৃতি এবং ঈশ্বরের সম্পর্কের মধ্যে। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি একটি মৌলিক তত্ত্ব এবং সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণের পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃতির বিভিন্ন প্রকাশ ঘটে। গীতায় কৃষ্ণ সেই প্রকৃতিকে আরও বৃহত্তর ঈশ্বরতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করেছেন। প্রকৃতি শক্তিশালী, সৃষ্টিশীল এবং কার্যকরী হলেও তা সর্বোচ্চ স্বাধীন শক্তি নয়। প্রকৃতি ঈশ্বরের অধ্যক্ষতায় কার্য করে। ফলে গীতার বিশ্বদর্শনে জগৎ কেবল একটি অন্ধ যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। জগতের কার্যকারণ ও পরিবর্তনের পেছনে একটি গভীর নিয়ামক চেতনার উপস্থিতি রয়েছে।

বেদান্তের বিভিন্ন ধারায় এই শ্লোকের ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য দেখা যায়। অদ্বৈত বেদান্তে ব্রহ্মকে পরম সত্য হিসেবে দেখা হয় এবং প্রকৃতি বা মায়ার মাধ্যমে বহুরূপী জগতের প্রকাশ ব্যাখ্যা করা হয়। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর প্রকৃতি ও জীবের অন্তর্নিহিত নিয়ামক এবং প্রকৃতি তাঁর অধীন বাস্তব শক্তি। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর, জীব ও প্রকৃতির মধ্যে বাস্তব পার্থক্য রয়েছে এবং ঈশ্বর প্রকৃতির সর্বোচ্চ নিয়ামক। ব্যাখ্যার এই পার্থক্য সত্ত্বেও একটি মূল ভাব স্পষ্ট থাকে। প্রকৃতি তার কার্যক্ষমতা নিয়ে বাস্তব হলেও তার ওপর সর্বোচ্চ নিয়ামক কর্তৃত্ব ঈশ্বরের।

এই শ্লোক মানুষের জীবন সম্পর্কেও গভীর শিক্ষা দেয়। মানুষের মধ্যেও এক ধরনের প্রকৃতি কাজ করে। মানুষের অভ্যাস, প্রবৃত্তি, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, রাগ, আসক্তি এবং নানা মানসিক প্রবণতা তার আচরণকে প্রভাবিত করে। মানুষ অনেক সময় ভাবে সে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সবকিছু করছে। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় যে তার আচরণের পেছনে পরিবার, পরিবেশ, অভ্যাস, সংস্কার এবং মানসিক প্রবণতার গভীর প্রভাব রয়েছে। গীতার শিক্ষা হলো নিজের প্রকৃতিকে অস্বীকার করা নয়, বরং তাকে বোঝা এবং তার ঊর্ধ্বে চেতনার অবস্থান উপলব্ধি করা। মানুষ যখন নিজের চিন্তা ও আবেগকে সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে, তখন সে নিজের প্রকৃতির কার্যকলাপ সম্পর্কে একটি নতুন স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে।

এই শ্লোককে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একটি বিশাল অর্কেস্ট্রার কথা কল্পনা করা যেতে পারে। সেখানে অসংখ্য বাদ্যযন্ত্র নিজেদের নিজস্ব নিয়মে বাজছে। প্রত্যেক যন্ত্রের নিজস্ব শব্দ ও ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সবগুলো মিলিয়ে একটি সুন্দর সংগীত তৈরি হচ্ছে কারণ সমগ্র ব্যবস্থার মধ্যে একটি সমন্বয়কারী নেতৃত্ব রয়েছে। প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি যেন সেই বাদ্যযন্ত্রগুলোর মতো। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব নিয়ম আছে। তাদের পারস্পরিক ক্রিয়ায় জগতের বিশাল সংগীত সৃষ্টি হচ্ছে। আর কৃষ্ণের অধ্যক্ষতা সেই সমগ্র ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত ঐক্য ও নিয়ামক চেতনার প্রতীক।

মানবসভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালেও এই শ্লোকের সত্যতা অন্য একভাবে উপলব্ধি করা যায়। কোনো সাম্রাজ্য চিরস্থায়ী হয়নি। কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা চিরকাল একই থাকেনি। প্রযুক্তি বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, অর্থনীতি বদলেছে এবং সমাজের মূল্যবোধও পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় যে প্রযুক্তি ছিল বিস্ময়কর, পরবর্তী যুগে সেটিই পুরোনো হয়ে গেছে। আজকের পৃথিবীতেও প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্থনীতি ও রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই সব পরিবর্তনের মধ্যে “জগদ্ বিপরিবর্ততে” কথাটি নতুন অর্থ পায়। জগৎ স্থির নয়। পরিবর্তনই তার স্বভাব।

তবে গীতার শিক্ষা শুধু পরিবর্তনকে স্বীকার করা নয়। পরিবর্তনের মধ্যেও যে একটি গভীর শৃঙ্খলা রয়েছে, সেটিকে উপলব্ধি করা। মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসবেই। সুখ আসবে এবং চলে যাবে। দুঃখ আসবে এবং চলে যাবে। সাফল্য আসবে এবং তার সঙ্গে ব্যর্থতাও আসতে পারে। সম্পর্কের পরিবর্তন হবে। শরীর পরিবর্তিত হবে। সামাজিক অবস্থাও পরিবর্তিত হবে। কিন্তু মানুষ যদি প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয়কে বেঁধে ফেলে, তাহলে সে চিরস্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে থাকবে। গীতার দৃষ্টিতে তাই পরিবর্তনশীল প্রকৃতির মধ্যে থেকেও অপরিবর্তনীয় চেতনার সন্ধান করতে হয়।

এই কারণে “ময়াধ্যক্ষেণ” শব্দটি শুধু একটি ব্যাকরণগত পদ নয়। এটি গীতার আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি দরজা। এটি আমাদের জিজ্ঞাসা করতে শেখায় যে প্রকৃতির কার্যকলাপের পেছনে কী রয়েছে। “প্রকৃতিঃ” আমাদের দেখায় সৃষ্টির কার্যকরী শক্তিকে। “সূয়তে” আমাদের দেখায় প্রকাশ ও উৎপত্তির ধারাকে। “সচরাচরম্” আমাদের সামনে জীব ও জড় সমগ্র বিশ্বকে উপস্থিত করে। “জগৎ” আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে অস্তিত্ব মূলত গতিশীল। আর “বিপরিবর্ততে” আমাদের শেখায় যে পরিবর্তন বিশ্বজগতের অবিচ্ছেদ্য স্বভাব।

সবশেষে বলা যায়, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের দশম শ্লোক প্রকৃতি ও ঈশ্বরের সম্পর্ক সম্পর্কে এক অসাধারণ দার্শনিক উপলব্ধি প্রকাশ করে। প্রকৃতি জগতের সৃষ্টি ও পরিবর্তনের কার্যকরী শক্তি। কিন্তু সেই প্রকৃতি এক সর্বোচ্চ চৈতন্যের অধ্যক্ষতায় কার্য করে। জগৎ তাই শুধু বস্তু ও ঘটনার সমষ্টি নয়। এটি একটি অবিরাম পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া, যার অন্তরালে গীতার দৃষ্টিতে রয়েছে এক গভীর নিয়ামক সত্য। মানুষ যদি কেবল পরিবর্তনশীল জগতের দিকে তাকায়, তবে সে জগতের বহিরঙ্গ দেখে। কিন্তু যদি পরিবর্তনের পেছনের নিয়ম, সেই নিয়মের পেছনের চেতনা এবং সেই চেতনার সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে উপলব্ধি করতে পারে, তখন তার দৃষ্টিতে জীবন এক নতুন অর্থ লাভ করে। এই শ্লোক তাই আমাদের শুধু বিশ্বসৃষ্টির কথা বলে না। এটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃতির পরিবর্তনের মাঝেও একটি গভীর ঐক্য আছে, জগতের গতির মধ্যেও একটি অন্তর্নিহিত নিয়ামক সত্য আছে এবং সেই সত্যকে উপলব্ধি করাই মানুষের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের অন্যতম গভীর পথ।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি