শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.১১ — মানবদেহে ঈশ্বরের প্রকাশ, অজ্ঞতার দৃষ্টি ও পরম স্বরূপের তত্ত্ব
অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানষীং তনুমাশ্রিতম্।
পরং ভাবমজানন্তো মম ভূতমহেশ্বরম্।।১১।।
অনুবাদঃ আমি যখন মনুষ্যরূপে অবতীর্ণ হই, তখন মুর্খেরা আমাকে অবজ্ঞা করে। তারা আমার পরম ভাব সম্বন্ধে অবগত নয় এবং তারা আমাকে সর্বভূতের মহেশ্বর বলে জানে না।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের একাদশ শ্লোক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির একটি গভীর সীমাবদ্ধতার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, “অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতম্। পরং ভাবমজানন্তো মম ভূতমহেশ্বরম্।” অর্থাৎ যারা অজ্ঞতা ও মোহে আচ্ছন্ন, তারা আমাকে মানবদেহ ধারণ করে দেখে অবজ্ঞা করে। তারা আমার সেই পরম স্বরূপকে জানে না, যিনি সকল জীবের মহেশ্বর। এই শ্লোকের মধ্যে কেবল কৃষ্ণের ঈশ্বরত্বের ঘোষণা নেই। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের দেখার ক্ষমতা, বিচারবুদ্ধি, অজ্ঞতা, বাহ্যিক রূপ এবং অন্তর্নিহিত সত্য সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক শিক্ষা।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অবজানন্তি। এই শব্দের মধ্যে অবজ্ঞা, তুচ্ছজ্ঞান করা এবং যথার্থ মর্যাদা না দেওয়ার ভাব রয়েছে। এর সঙ্গে জ্ঞানের ধারণার একটি গভীর সম্পর্ক আছে। মানুষ যখন কোনো কিছুর প্রকৃত স্বরূপ জানে না, তখন অনেক সময় সে তার সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে। সেই ভুল ধারণা থেকেই অবজ্ঞা জন্ম নিতে পারে। তাই কৃষ্ণের বক্তব্যে অবজ্ঞা কেবল একটি আচরণ নয়। এর পেছনে রয়েছে একটি ভুল উপলব্ধি। মানুষ যা বুঝতে পারে না, অনেক সময় সেটিকেই নিজের সীমিত বোধের মাপকাঠিতে বিচার করে ফেলে।
এর পরেই এসেছে মূঢ়া শব্দটি। মূঢ় বলতে শুধু অশিক্ষিত বা কম বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে বোঝানো হয় না। মূঢ়তার গভীর অর্থ হলো মোহে আচ্ছন্ন থাকা এবং সত্যকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে না পারা। একজন মানুষ অনেক বিদ্যা অর্জন করতে পারেন, অনেক তথ্য জানতে পারেন, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন, কিন্তু তবুও তিনি মূঢ় হতে পারেন যদি বাহ্যিক রূপের আড়ালে থাকা সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা তাঁর না থাকে। এই কারণে গীতার মূঢ়তা মূলত বুদ্ধির পরিমাণের সমস্যা নয়। এটি দৃষ্টির সমস্যা। মানুষ কী দেখছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সে যা দেখছে তার অর্থ কতটা গভীরভাবে বুঝতে পারছে।
কৃষ্ণ এরপর বলেন মানুষীং তনুমাশ্রিতম্। মানুষীং তনু অর্থ মানবীয় দেহ বা মানুষের মতো অবয়ব। আশ্রিতম্ অর্থ আশ্রয় করা বা গ্রহণ করা। কৃষ্ণ এখানে এমন এক সত্যের কথা বলছেন যেখানে পরম সত্তা মানবীয় রূপে প্রকাশিত হয়েছেন। মানুষের চোখে সেই রূপ পরিচিত। তাই মানুষ সহজেই মনে করতে পারে যে কৃষ্ণও অন্য সব মানুষের মতোই একজন মানুষ। কিন্তু এই ধারণার মধ্যেই শ্লোকটির মূল সমস্যা নিহিত। দৃশ্যমান রূপ সত্যের একটি প্রকাশ হতে পারে, কিন্তু সেটিই সত্যের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়।
এই বিষয়টি বোঝার জন্য পরং ভাবম্ শব্দযুগলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরম অর্থ সর্বোচ্চ, অতীন্দ্রিয় বা সাধারণ উপলব্ধির সীমার অতীত। ভাব অর্থ সত্তা, স্বরূপ, প্রকৃতি বা অন্তর্নিহিত অস্তিত্ব। ফলে পরং ভাবম্ বলতে কৃষ্ণের সেই পরম স্বরূপকে বোঝানো হয়েছে, যা তাঁর দৃশ্যমান মানবীয় অবয়বের চেয়ে অসীমভাবে গভীর। মানুষ কৃষ্ণের দেহ দেখতে পারে, তাঁর কথা শুনতে পারে, তাঁর চলাফেরা দেখতে পারে, কিন্তু সেই মানবীয় প্রকাশের মধ্য দিয়ে যে পরম সত্তা প্রকাশিত হচ্ছে, তা উপলব্ধি করতে না পারলে তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানা হয় না।
এইখানেই শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। একদিকে মানুষীং তনুম্ অর্থাৎ মানবীয় দেহ। অন্যদিকে ভূতমহেশ্বরম্ অর্থাৎ সমস্ত জীবের মহেশ্বর। বাহ্যিকভাবে কৃষ্ণ মানুষ। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় সকল সত্তার অধীশ্বর। এই দুই স্তরকে একসঙ্গে দেখতে না পারাই মূঢ়তার লক্ষণ। মানুষ বাহ্যিক রূপকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেয় এবং অন্তর্নিহিত সত্যকে অস্বীকার করে। কৃষ্ণ সেই ভুল দৃষ্টিভঙ্গির সংশোধন করছেন।
ভূতমহেশ্বরম্ শব্দটির মধ্যেও অসাধারণ গভীরতা রয়েছে। ভূত শব্দটি অস্তিত্ব লাভ করা সত্তা বা জীবকে বোঝায়। মহেশ্বর অর্থ মহান ঈশ্বর বা সর্বোচ্চ অধীশ্বর। অর্থাৎ কৃষ্ণ নিজেকে শুধু একজন শিক্ষক, দার্শনিক বা অসাধারণ মানুষ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন না। তিনি বলছেন যে সমস্ত জীব ও সৃষ্টির উপর তাঁর পরম অধিকার রয়েছে। তাঁর মানবীয় অবয়ব তাঁর ঈশ্বরত্বকে সীমাবদ্ধ করে না। বরং সেই মানবীয় রূপের মধ্য দিয়েই পরম সত্তা মানুষের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেছেন।
এই বক্তব্যকে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আসে। অসীম সত্তাকে মানুষ যখন উপলব্ধি করতে চায়, তখন তাকে কোনো না কোনো প্রকাশের মাধ্যমে অনুভব করতে হয়। নিরাকার ও অনন্ত সত্য মানুষের সীমিত ইন্দ্রিয়ের কাছে সহজে ধরা পড়ে না। তাই ঈশ্বর যখন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন, তখন তাঁর প্রকাশ মানুষের কাছে পরিচিত রূপ গ্রহণ করতে পারে। কৃষ্ণের মানবীয় রূপ সেই অর্থে ঈশ্বরীয় প্রকাশের একটি গভীর প্রতীক। কিন্তু মানুষ সেই রূপকে যদি কেবল সাধারণ মানবীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে, তাহলে প্রকাশের আড়ালে থাকা পরম সত্য তার চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য থেকে যায়।
এই শ্লোকের মধ্যে বাহ্যিকতা এবং অন্তর্নিহিত সত্যের একটি গভীর দ্বন্দ্ব রয়েছে। আমরা প্রতিদিনের জীবনেও এই ভুল করি। একজন মানুষের পোশাক দেখে তার চরিত্র বিচার করি। তার সামাজিক অবস্থান দেখে তার মূল্য নির্ধারণ করি। তার অর্থসম্পদ দেখে তার যোগ্যতা বিচার করি। তার নীরবতা দেখে তাকে দুর্বল মনে করি। আবার কখনও কারও বাহ্যিক সাফল্য দেখে তার অন্তর্গত মহত্ত্ব সম্পর্কে অতিরিক্ত ধারণা তৈরি করি। অর্থাৎ মানুষ প্রায়ই যা দেখা যায় সেটিকেই সম্পূর্ণ সত্য বলে ধরে নেয়। গীতার এই শ্লোক সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করে।
একটি বীজের কথা ভাবা যায়। একটি ছোট বীজের মধ্যে একটি বিশাল বৃক্ষের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। চোখ দিয়ে বীজকে দেখলে সেখানে একটি ক্ষুদ্র বস্তু ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি জানেন যে সেই ক্ষুদ্রতার মধ্যে ভবিষ্যতের বিশালতার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে কৃষ্ণের মানবীয় অবয়ব বাহ্যিকভাবে সীমিত বলে মনে হলেও তাঁর মধ্যে প্রকাশিত সত্তা অসীম। যে শুধু চোখ দিয়ে দেখে, সে দেহ দেখে। যে জ্ঞান দিয়ে দেখে, সে সেই দেহের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত গভীরতর সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে।
সমুদ্র ও তরঙ্গের উপমাও এখানে প্রাসঙ্গিক। একটি তরঙ্গের নির্দিষ্ট আকার রয়েছে। তার একটি শুরু আছে এবং একটি শেষ আছে। কিন্তু তরঙ্গের গভীরে রয়েছে সমুদ্রের জল। কেউ যদি শুধু তরঙ্গের আকার দেখে বলে এটি কেবল সামান্য জল, তাহলে সে তরঙ্গের প্রকৃত অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারেনি। তেমনি কৃষ্ণের মানবীয় রূপ তাঁর পরম সত্তার সীমা নয়। মানবীয় রূপ তাঁর প্রকাশের একটি দৃশ্যমান মাত্রা মাত্র।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোককে বাস্তবতা এবং প্রতীয়মানতার সম্পর্ক হিসেবেও দেখা যায়। আমরা যা দেখি তা সবসময় বাস্তবতার সম্পূর্ণ রূপ নয়। চোখ সীমিত, ইন্দ্রিয় সীমিত এবং মানুষের বিচারবুদ্ধিও সীমিত। ফলে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাইরে থাকা সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য গভীর চিন্তা ও আত্মঅনুসন্ধানের প্রয়োজন হয়। কৃষ্ণের বক্তব্যের মধ্যে তাই একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক শিক্ষা রয়েছে। সত্যকে জানতে হলে শুধু দেখা যথেষ্ট নয়। দেখা জিনিসটির অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করতে হয়।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোককে দেখলে বাহ্যিক নাম ও রূপের আড়ালে থাকা পরম সত্তার ধারণাটি বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে। নাম ও রূপ পরিবর্তনশীল। কিন্তু পরম সত্য পরিবর্তনাতীত। এই দৃষ্টিতে মানবীয় অবয়ব একটি প্রকাশিত রূপ হলেও তার অন্তর্নিহিত সত্য সীমিত দেহের মধ্যে আবদ্ধ নয়। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের আলোকে কৃষ্ণের ভূতমহেশ্বর পরিচয় তাঁর সর্বোচ্চ ঈশ্বরত্বকে নির্দেশ করে এবং সমস্ত জীব ও জগতের সঙ্গে তাঁর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে প্রকাশ করে। দ্বৈত দর্শনে কৃষ্ণ এবং জীবের পার্থক্য স্পষ্ট। কৃষ্ণ পরম ঈশ্বর এবং জীব তাঁর অধীন। বিভিন্ন দর্শনের ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট থাকে। কৃষ্ণের মানবীয় রূপকে সাধারণ মানবীয় সীমার মধ্যে আবদ্ধ করে দেখলে তাঁর প্রকৃত পরিচয় উপলব্ধি করা যায় না।
ভক্তির দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও আবেগময়। ঈশ্বর যদি কেবল অদৃশ্য ও অপ্রাপ্য থাকতেন, তবে মানুষের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন কঠিন হতো। কৃষ্ণ মানুষের কাছে এসেছেন মানুষের মতো হয়ে। তিনি বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছেন, অর্জুনের সারথি হয়েছেন, মানুষের দুঃখ ও সংশয়ের কথা শুনেছেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জীবন ও কর্তব্যের শিক্ষা দিয়েছেন। এখানে ঈশ্বরের মহত্ত্ব তাঁর দূরত্বে নয়, বরং তাঁর নৈকট্যেও প্রকাশিত হয়েছে। অসীম যখন সীমিত মানুষের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেন, তখন সীমিত মানুষ যদি কেবল বাহ্যিক রূপ দেখে তাঁকে বিচার করে, তবে সে সেই ঈশ্বরীয় নৈকট্যের গভীর অর্থ হারিয়ে ফেলে।
শ্লোকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অজানন্তঃ। অর্থাৎ যারা জানে না। লক্ষ করার বিষয় হলো, কৃষ্ণ প্রথমে অজ্ঞতার কথা বলেছেন এবং তারপর অবজ্ঞার কথা বলেছেন। অর্থাৎ না জানা থেকে ভুল বিচার এবং ভুল বিচার থেকে অবজ্ঞা জন্মায়। এই ধারাটি মানুষের জীবনে অত্যন্ত পরিচিত। আমরা কোনো ব্যক্তি বা বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট না জেনে সিদ্ধান্ত নিই। তারপর সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাকে মূল্যায়ন করি। পরে আমাদের সেই মূল্যায়নই সত্য বলে মনে হয়। গীতার শিক্ষা হলো সত্যের প্রতি বিনয়ী হওয়া এবং নিজের সীমিত উপলব্ধিকে চূড়ান্ত বলে ধরে না নেওয়া।
এই কারণে মূঢ়তা আসলে তথ্যের অভাব নয়। একজন মানুষের কাছে অসংখ্য তথ্য থাকতে পারে, কিন্তু যদি সে সত্যের গভীরে যেতে না চায়, তবে সেই তথ্য তার জ্ঞানকে মুক্ত করতে পারে না। জ্ঞান তখন কেবল স্মৃতি হয়ে থাকে। গীতার জ্ঞান হলো এমন উপলব্ধি যা মানুষের দৃষ্টিকে পরিবর্তন করে। মানুষ যখন বাহ্যিক রূপের আড়ালে থাকা সত্যকে দেখতে শেখে, তখন তার বিচারবুদ্ধি আরও গভীর হয় এবং তার মধ্যে বিনয় জন্মায়।
আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানুষ কয়েকটি ছবি, কয়েকটি বাক্য বা কয়েকটি দৃশ্য দেখে অন্য মানুষের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। বাহ্যিক সাফল্যকে বাস্তব সুখ মনে করা হয়। জনপ্রিয়তাকে যোগ্যতার প্রমাণ মনে করা হয়। আবার সাধারণ জীবনযাপনকে ব্যর্থতার লক্ষণ বলে মনে করা হয়। এই প্রবণতা আমাদের শেখায় যে মানুষ এখনও বাহ্যিক রূপের দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হয়। গীতার এই শ্লোক আমাদের সেই তাড়াহুড়োর বিচার থেকে সাবধান করে।
কৃষ্ণের নিজের জীবনও এই সত্যের একটি অসাধারণ উদাহরণ। তিনি রাজদরবারে সর্বদা রাজা হিসেবে উপস্থিত হননি। অনেক সময় তিনি দূত হয়েছেন, উপদেষ্টা হয়েছেন, বন্ধুর ভূমিকা নিয়েছেন এবং অর্জুনের রথের সারথি হয়েছেন। বাহ্যিক পদমর্যাদার দিক থেকে সারথির ভূমিকা সর্বোচ্চ বলে মনে নাও হতে পারে। কিন্তু সেই সারথির মুখ থেকেই প্রকাশিত হয়েছে গীতার অমর জ্ঞান। এখানে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। মহত্ত্ব সবসময় বাহ্যিক অবস্থান বা সামাজিক মর্যাদার পোশাকে প্রকাশ পায় না।
এই শ্লোক তাই কেবল কৃষ্ণকে চেনার শিক্ষা নয়। এটি মানুষকে নিজের দেখার ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন করে। আমরা কি শুধু দেহ দেখি, না সত্তাকে দেখতে চেষ্টা করি। আমরা কি শুধু কথার শব্দ শুনি, না কথার অন্তর্নিহিত সত্য বুঝতে চেষ্টা করি। আমরা কি মানুষের বাহ্যিক অবস্থান দিয়ে তার মূল্য নির্ধারণ করি, না তার চরিত্র ও অন্তর্নিহিত গুণ উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। এই প্রশ্নগুলো শ্লোকটির আধ্যাত্মিক অর্থকে মানবজীবনের সঙ্গে যুক্ত করে।
সবশেষে বলা যায়, “অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতম্” আমাদের সামনে একটি চিরন্তন সত্য তুলে ধরে। দৃশ্যমান রূপ সবসময় সম্পূর্ণ সত্য নয়। বাহ্যিক পরিচয় কখনও কখনও গভীরতর সত্তাকে আড়াল করে রাখে। কৃষ্ণ মানবীয় দেহ ধারণ করেছেন, কিন্তু তাঁর পরিচয় সেই দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি নিজেকে পরম স্বরূপ এবং সকল জীবের মহেশ্বর হিসেবে প্রকাশ করেছেন। যে ব্যক্তি শুধু মানবীয় অবয়ব দেখে থেমে যায়, সে কৃষ্ণের গভীরতর সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে না। আর যে ব্যক্তি বাহ্যিকতার সীমা অতিক্রম করে স্বরূপের সন্ধান করে, তার কাছে এই শ্লোক একটি গভীর আধ্যাত্মিক আহ্বানে পরিণত হয়।
এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত শিক্ষা তাই অত্যন্ত সরল অথচ গভীর। যা দেখা যায় তাকে সম্মান করো, কিন্তু শুধু যা দেখা যায় তার মধ্যেই সত্যকে সীমাবদ্ধ করো না। রূপের আড়ালে স্বরূপকে খুঁজে দেখো। বাহ্যিকতার আড়ালে অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করো। কারণ অনেক সময় অসীম আমাদের সামনে সীমিত রূপে উপস্থিত হয়, আর আমাদের সীমাবদ্ধ দৃষ্টি সেই অসীমকে সাধারণ বলে ভুল করে। এই উপলব্ধিই “অবজানন্তি মাং মূঢ়া” শ্লোকটির ভাষাগত, দার্শনিক, আধ্যাত্মিক এবং মানবিক গভীরতার মূল কথা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!