শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.১৩ — মহাত্মার স্বরূপ, দৈবী প্রকৃতি ও অনন্য ভক্তির গভীর তত্ত্ব
মহাত্মানস্তু মাং পার্থ দৈবীং প্রকৃতিমাশ্রিতাঃ।
ভজন্ত্যনন্যমনসো জ্ঞাত্বা ভূতাদিমব্যয়ম্।।১৩।।
অনুবাদঃ হে পার্থ! মোহমুক্ত মহাত্মাগণ আমার দৈবী প্রকৃতিকে আশ্রয় করেন। তাঁরা আমাকে সর্বভূতের আদি ও অব্যয় জেনে অনন্যচিত্তে আমার ভজনা করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের ত্রয়োদশ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মহাত্মার প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরেছেন। শ্লোকটি হলো “মহাত্মানস্তু মাং পার্থ দৈবীং প্রকৃতিমাশ্রিতাঃ। ভজন্ত্যনন্যমনসো জ্ঞাত্বা ভূতাদিমব্যয়ম্।” এর সরল অর্থ হলো, হে পার্থ, মহাত্মাগণ দৈবী প্রকৃতির আশ্রয় গ্রহণ করে একনিষ্ঠ মনে আমাকে ভজনা করেন। তাঁরা আমাকে সমস্ত জীব ও সৃষ্টির অবিনশ্বর আদি উৎস হিসেবে জানেন। এই শ্লোকটি শুধু ঈশ্বরের উপাসনার কথা বলে না। এর মধ্যে মানুষ কীভাবে সংকীর্ণ আত্মকেন্দ্রিকতা অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর চেতনার অধিকারী হতে পারে, তার গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “মহাত্মা”। শব্দটি গঠিত হয়েছে “মহা” এবং “আত্মা” এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে। মহা অর্থ মহান, বিশাল, বিস্তৃত বা উৎকৃষ্ট। আত্মা বলতে বোঝায় অন্তর্গত সত্তা, নিজের প্রকৃত অস্তিত্ব বা চৈতন্যস্বরূপ। সেই অর্থে মহাত্মা হলেন এমন ব্যক্তি যার অন্তরের পরিধি বৃহৎ। এখানে মহত্ত্ব বলতে ধনসম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি কিংবা সামাজিক মর্যাদা বোঝানো হয় না। একজন মানুষ পৃথিবীর দৃষ্টিতে অত্যন্ত সফল হয়েও অন্তরে সংকীর্ণ হতে পারেন। আবার বাহ্যিকভাবে সাধারণ একজন মানুষও গভীর করুণা, সত্যনিষ্ঠা, আত্মসংযম এবং সর্বজনীন চেতনার অধিকারী হয়ে প্রকৃত অর্থে মহাত্মা হতে পারেন। গীতার মহাত্মা তাই কোনো বাহ্যিক উপাধি নয়। এটি একটি উন্নত চেতনার পরিচয়।
এই “মহাত্মা” শব্দের পরেই এসেছে “তু”। তু অর্থ কিন্তু বা অন্যদিকে। এই ছোট শব্দটির মধ্যেই আগের শ্লোকের সঙ্গে বর্তমান শ্লোকের একটি গভীর বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। নবম অধ্যায়ের দ্বাদশ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের কথা বলেছেন যারা তাঁর প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি না করে মোহগ্রস্ত হয়ে আসুরী ও রাক্ষসী প্রকৃতির আশ্রয় গ্রহণ করে। তার পরেই তিনি বলছেন, কিন্তু মহাত্মারা অন্যরকম। অর্থাৎ মানুষের সামনে দুটি সম্ভাবনা রয়েছে। একটি হলো সংকীর্ণ অহং, লোভ, মোহ ও আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে এগিয়ে যাওয়া। অন্যটি হলো চেতনার বিস্তার, আত্মসংযম, সত্য, ভক্তি ও জ্ঞানের দিকে অগ্রসর হওয়া। “তু” শব্দটি যেন সেই দুই পথের মাঝখানে একটি মানসিক মোড় নির্দেশ করে।
“দৈবীং প্রকৃতিমাশ্রিতাঃ” পদটির মধ্যেও শ্লোকটির মূল দর্শন নিহিত রয়েছে। দৈবী শব্দটি দেব শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেব অর্থ আলোকিত, উজ্জ্বল বা ঈশ্বরীয়। প্রকৃতি শব্দটি গঠিত হয়েছে প্র এবং কৃ ধাতুর ভাব থেকে। কৃ অর্থ করা বা সৃষ্টি করা। প্রকৃতি বলতে তাই কোনো কিছুর মৌলিক স্বভাব, গঠন বা কার্যপ্রবাহ বোঝানো হয়। মানুষের ক্ষেত্রেও প্রকৃতি বলতে তার অন্তর্নিহিত মানসিক ও নৈতিক প্রবণতাকে বোঝানো যায়। দৈবী প্রকৃতি হলো সেই অন্তর্গত প্রবণতা যা মানুষকে সত্য, পবিত্রতা, সংযম, করুণা, নম্রতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও বৃহত্তর কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়। মহাত্মা সেই ব্যক্তি যিনি এই দৈবী প্রকৃতির আশ্রয় গ্রহণ করেন।
এখানে “আশ্রিতাঃ” শব্দটির অর্থও অত্যন্ত গভীর। এটি আশ্রয় গ্রহণের ধারণা প্রকাশ করে। মানুষ তার জীবনে কোনো না কোনো কিছুকে আশ্রয় করে। কেউ অর্থকে আশ্রয় করে, কেউ ক্ষমতাকে, কেউ খ্যাতিকে, কেউ নিজের অহংকে। আবার কেউ সত্যকে, ন্যায়কে, করুণাকে কিংবা ঈশ্বরকে জীবনের আশ্রয় করে। শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্য হলো মহাত্মার অন্তর্গত ভিত্তি দৈবী প্রকৃতি। তার চিন্তা, আচরণ এবং সিদ্ধান্তের পেছনে যে মূল্যবোধ কাজ করে তা তাকে ক্রমাগত উচ্চতর চেতনার দিকে নিয়ে যায়।
এরপর এসেছে “ভজন্তি” শব্দটি। এটি সংস্কৃত √ভজ্ ধাতু থেকে এসেছে। ভজ ধাতুর মধ্যে ভাগ করা, অংশ নেওয়া, সেবা করা, উপাসনা করা এবং ভক্তি করার ভাব রয়েছে। তাই ভজনা মানে কেবল কোনো নির্দিষ্ট আচার পালন করা নয়। ভজনা হলো নিজের জীবনকে কোনো উচ্চতর সত্যের সঙ্গে যুক্ত করা। একজন মানুষ যদি ঈশ্বরকে পূজা করেন কিন্তু জীবনের প্রতিটি কাজে অহং, লোভ ও নিষ্ঠুরতার দ্বারা পরিচালিত হন, তাহলে গীতার এই গভীর অর্থে তাঁর ভজনা পূর্ণতা পায় না। সত্যিকারের ভজনা তখনই গভীর হয় যখন মানুষের চিন্তা, কর্ম, মন এবং জীবনধারা তার বিশ্বাস করা সত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
“অনন্যমনসঃ” শব্দটি এই ভজনার প্রকৃতি ব্যাখ্যা করে। অনন্য অর্থ অন্য নয় এবং মনস্ অর্থ মন। অনন্যমনসঃ অর্থ যাঁদের মন অন্যত্র বিভক্ত নয়। সাধারণ মানুষের মন নানা আকাঙ্ক্ষা, ভয়, লোভ, প্রতিযোগিতা, অহং এবং প্রত্যাশার মধ্যে ক্রমাগত ছুটে বেড়ায়। এক মুহূর্তে সে এক জিনিস চায়, পরের মুহূর্তে অন্য কিছুর পেছনে ছুটে যায়। ফলে তার মন বিভক্ত হয়ে পড়ে। মহাত্মার মন সেই অর্থে অনন্য। তাঁর জীবনের একটি কেন্দ্রীয় সত্য থাকে। তাঁর চিন্তা ও কর্ম ধীরে ধীরে সেই সত্যের দিকে একত্রিত হয়। এই একাগ্রতাই অনন্যমনস্কতার গভীর অর্থ।
এরপর শ্রীকৃষ্ণ ব্যবহার করেছেন “জ্ঞাত্বা” শব্দটি। √জ্ঞা ধাতু থেকে উৎপন্ন এই শব্দের অর্থ জেনে বা উপলব্ধি করে। এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করার মতো। কৃষ্ণ বলেন, তাঁরা “জ্ঞাত্বা” অর্থাৎ জেনে আমাকে ভজনা করেন। অর্থাৎ গীতার ভক্তি অন্ধ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। জ্ঞান এবং ভক্তির মধ্যে এখানে গভীর ঐক্য রয়েছে। মানুষ যখন কোনো সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে, তখন সেই উপলব্ধি তার জীবন ও অনুভূতিকে পরিবর্তিত করে। তাই প্রকৃত ভক্তি কেবল আবেগ নয়। তা জ্ঞান ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে পরিণত হয়।
কী জ্ঞান তাঁরা লাভ করেন। তার উত্তর রয়েছে “ভূতাদিমব্যয়ম্” পদে। ভূত শব্দটি √ভূ ধাতু থেকে এসেছে। √ভূ অর্থ হওয়া বা অস্তিত্ব লাভ করা। ভূত বলতে তাই সমস্ত সৃষ্ট সত্তা বা অস্তিত্বশীল জীবকে বোঝানো যায়। আদি অর্থ শুরু, প্রথম, মূল বা উৎস। ভূতাদি অর্থ সমস্ত সত্তার আদি বা উৎস। কৃষ্ণ নিজেকে এখানে সমস্ত অস্তিত্বের মূল উৎস হিসেবে প্রকাশ করছেন। এই উপলব্ধি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়। এর মধ্যে একটি মৌলিক অস্তিত্বগত প্রশ্ন রয়েছে। এই বহুবিধ জগতের মূল কোথায়। সমস্ত জীবনের উৎস কী। সমস্ত পরিবর্তনশীল অস্তিত্বের পেছনে কি কোনো অপরিবর্তনীয় সত্য রয়েছে। গীতার উত্তরে সেই পরম উৎসকে কৃষ্ণের স্বরূপ হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে “অব্যয়ম্” শব্দটি। অব্যয় শব্দটি অ এবং ব্যয় এই দুই অংশে বোঝা যায়। ব্যয় মানে ক্ষয়, পরিবর্তন বা নিঃশেষ হওয়া। অ অর্থ তার অনুপস্থিতি। ফলে অব্যয় অর্থ ক্ষয়হীন, অবিনশ্বর বা যা নিঃশেষ হয় না। জগতের সমস্ত দৃশ্যমান বস্তু পরিবর্তনশীল। মানুষ জন্মায়, বেড়ে ওঠে এবং একদিন তার দেহের পরিবর্তন ঘটে। সভ্যতা পরিবর্তিত হয়। রাজনীতি পরিবর্তিত হয়। অর্থনীতি পরিবর্তিত হয়। প্রযুক্তি পরিবর্তিত হয়। কিন্তু গীতার দর্শনে এই পরিবর্তনশীল অস্তিত্বের অন্তরালে একটি অবিনশ্বর সত্য রয়েছে। মহাত্মা সেই সত্যকে উপলব্ধি করেন।
এই কারণে পুরো শ্লোকটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক সূত্রের মতো কাজ করে। দৈবী প্রকৃতির আশ্রয় মানুষের চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে। পরিশুদ্ধ চরিত্র মনকে একাগ্র করে। একাগ্র মন গভীর জ্ঞান লাভের উপযোগী হয়। সেই জ্ঞান মানুষকে অস্তিত্বের মূল সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। আর সেই উপলব্ধি থেকে জন্ম নেয় প্রকৃত ভক্তি। তাই মহাত্মার জীবনকে শুধু ধর্মীয় আচরণের মাধ্যমে বোঝা যায় না। এটি একটি অন্তর্গত বিবর্তনের পথ।
দার্শনিক দৃষ্টিতে মহাত্মা শব্দটির মধ্যে মানুষের চেতনার বিস্তারের ধারণা রয়েছে। সাধারণ মানুষ নিজের অস্তিত্বকে “আমি” এবং “আমার” এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। আমার পরিবার, আমার সম্পদ, আমার সাফল্য, আমার সম্মান এবং আমার ইচ্ছাই তার চিন্তার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই আত্মকেন্দ্রিকতা যত প্রবল হয়, চেতনা তত সংকীর্ণ হয়। কিন্তু মানুষ যখন উপলব্ধি করতে শুরু করে যে তার অস্তিত্ব বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন তার চেতনার পরিধি প্রসারিত হয়। সে শুধু নিজের সুখের কথা ভাবে না। অন্যের দুঃখও তার কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। সত্য, ন্যায় এবং কল্যাণ তার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। এই বিস্তৃত চেতনাই মহাত্মত্বের অন্যতম লক্ষণ।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আজকের মানুষ অসংখ্য তথ্য, আকাঙ্ক্ষা এবং বাহ্যিক উদ্দীপনার মধ্যে বসবাস করে। তার মন ক্রমাগত এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে ছুটে যায়। এই অবস্থায় “অনন্যমনসঃ” একটি গভীর শিক্ষা দেয়। মানুষের নিজের একটি অন্তর্গত কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। যে মানুষ জানে তার জীবনের মূল মূল্যবোধ কী এবং সে কোন সত্যের জন্য বাঁচতে চায়, তার মন তুলনামূলকভাবে স্থির হয়। বাইরের পরিবর্তন তাকে প্রভাবিত করলেও তার অন্তরের কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে না। গীতার মহাত্মার একাগ্রতা তাই আধুনিক জীবনের জন্যও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
একটি নদীর কথা ভাবা যেতে পারে। পাহাড় থেকে নেমে আসার সময় নদী নানা পাথর, বাঁক এবং বাধার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু তার একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকে। সে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চলে। মানুষের মনও তেমন। জীবনে অসংখ্য বাধা ও আকর্ষণ আসবে। কিন্তু যার জীবনের একটি উচ্চতর উদ্দেশ্য আছে, সে সেই উদ্দেশ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। মহাত্মার অনন্য মন সেই নদীর মতো, যার প্রবাহ বিচ্ছিন্ন নয়। তার জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সত্যের দিকে প্রবাহিত হয়।
এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো জ্ঞান ও ভক্তির ঐক্য। অনেক সময় মনে করা হয় জ্ঞানী মানুষ যুক্তিবাদী আর ভক্ত মানুষ আবেগপ্রবণ। কিন্তু গীতার এই শ্লোক সেই বিভাজনকে অতিক্রম করে। এখানে মহাত্মারা জেনে ভজনা করেন। অর্থাৎ জ্ঞান তাঁদের ভক্তিকে গভীর করে এবং ভক্তি তাঁদের জ্ঞানকে জীবন্ত করে। কেবল জ্ঞান মানুষের হৃদয়কে পরিবর্তন না করলে তা শুষ্ক হতে পারে। আবার জ্ঞানহীন আবেগও বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে। জ্ঞান ও ভক্তির মিলনেই একটি পরিপূর্ণ আধ্যাত্মিক জীবন গড়ে ওঠে।
আধুনিক সমাজের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের একটি গভীর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। মানুষ আজ সাফল্যকে প্রায়ই অর্থ, ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা এবং সামাজিক মর্যাদার মাধ্যমে বিচার করে। কিন্তু গীতা অন্য একটি মানদণ্ড সামনে আনে। একজন মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার কত সম্পদ রয়েছে তা দিয়ে নয়, বরং তার চেতনা কতটা বিস্তৃত তা দিয়ে বিচার করা উচিত। সে নিজের ক্ষমতাকে কীভাবে ব্যবহার করে, দুর্বল মানুষের প্রতি তার আচরণ কেমন, সত্যের প্রতি তার আনুগত্য কতটা এবং নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যের কল্যাণকে সে কতটা গুরুত্ব দেয়, এসব প্রশ্নই তার অন্তর্গত মহত্ত্ব প্রকাশ করে।
“মহাত্মা” তাই কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের একচেটিয়া শব্দ নয়। এটি মানুষের সম্ভাবনার একটি প্রতীক। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই চেতনার বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষ তার প্রবৃত্তি, অহং এবং স্বার্থের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারে। সে নিজের জীবনের কেন্দ্রকে বৃহত্তর সত্যের দিকে স্থানান্তর করতে পারে। সেই যাত্রার মধ্যেই মহাত্মত্বের সূচনা।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ে এই শ্লোকটি তাই একটি গভীর বৈপরীত্যের মাধ্যমে মানবজীবনের দুটি পথ দেখায়। একদিকে রয়েছে মোহ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও সংকীর্ণতার পথ। অন্যদিকে রয়েছে দৈবী প্রকৃতি, একাগ্রতা, জ্ঞান ও ভক্তির পথ। মহাত্মা সেই দ্বিতীয় পথের যাত্রী। তিনি পৃথিবী থেকে পালিয়ে যান না। বরং নিজের অন্তরকে এমনভাবে রূপান্তরিত করেন যাতে তাঁর জীবন সত্য, করুণা, জ্ঞান ও ভক্তির বাহন হয়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, “মহাত্মানস্তু মাং পার্থ” শ্লোকের প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষের মহত্ত্ব তার বাহ্যিক পরিচয়ে নয়, তার অন্তরের বিস্তারে। “মহা” এখানে চেতনার ব্যাপ্তি, “আত্মা” অন্তর্গত সত্তা, “দৈবী প্রকৃতি” সেই সত্তার পরিশুদ্ধ প্রকাশ, “অনন্যমনসঃ” একাগ্র ও অবিভক্ত মন এবং “ভূতাদিমব্যয়ম্” সমস্ত অস্তিত্বের অবিনশ্বর উৎসের উপলব্ধিকে নির্দেশ করে। যে মানুষ দৈবী গুণকে আশ্রয় করে, মনকে একাগ্র করে, অস্তিত্বের গভীর সত্যকে উপলব্ধি করে এবং সেই উপলব্ধির ভিত্তিতে ঈশ্বরের সঙ্গে নিজের জীবনকে যুক্ত করে, গীতার ভাষায় সেই প্রকৃত মহাত্মা। এই শ্লোক তাই শুধু ভক্তির একটি শিক্ষা নয়। এটি মানুষের অন্তর্গত রূপান্তরের একটি আহ্বান। মানুষ যত নিজের সংকীর্ণ সত্তাকে অতিক্রম করে বৃহত্তর সত্যের দিকে এগিয়ে যায়, ততই তার আত্মা মহৎ হয়ে ওঠে এবং সেই মহত্ত্বের মধ্যেই প্রকাশ পায় প্রকৃত মহাত্মত্ব।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!