সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.১৪ — নিরন্তর কীর্তন, দৃঢ়ব্রত, ভক্তি ও নিত্য ঈশ্বরস্মরণের গভীর তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
সততং কীর্তয়ন্তো মাং যতন্তশ্চ দৃঢ়ব্রতাঃ।নমস্যন্তশ্চ মাং ভক্ত্যা নিত্যযুক্তা উপাসতে।।১৪।।
সততং কীর্তয়ন্তো মাং যতন্তশ্চ দৃঢ়ব্রতাঃ।
নমস্যন্তশ্চ মাং ভক্ত্যা নিত্যযুক্তা উপাসতে।।১৪।। 

অনুবাদঃ দৃঢ়ব্রত ও যত্নশীল হয়ে, সর্বদা আমার মহিমা কীর্তন করে এবং আমাকে প্রণাম করে, এই সমস্ত মহাত্মরা নিরন্তর যুক্ত হয়ে ভক্তি সহকারে আমার উপাসনা করে।  

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের চতুর্দশ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ ভক্ত মানুষের একটি গভীর ও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় তুলে ধরেছেন। শ্লোকটি হলো “সততং কীর্তয়ন্তো মাং যৎনতশ্চ দৃঢ়ব্রতাঃ নমস্যন্তশ্চ মাং ভক্ত্যা নিত্যযুক্তা উপাসতে।” এর সরল অর্থ হলো যাঁরা সর্বদা আমার মহিমা কীর্তন করেন, যাঁরা দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সাধনায় নিয়োজিত থাকেন, যাঁরা ভক্তির সঙ্গে আমাকে প্রণাম করেন এবং সর্বদা আমার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাঁরা আমাকে উপাসনা করেন। কিন্তু এই শ্লোকের সৌন্দর্য কেবল তার সরল অর্থে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি শব্দের মধ্যে ভক্তির একটি করে স্তর, মানুষের চরিত্র গঠনের একটি করে শিক্ষা এবং ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের একটি করে গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে। এই শ্লোককে গভীরভাবে উপলব্ধি করলে বোঝা যায় যে গীতার ভক্তি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ, সংকল্প এবং সমগ্র জীবনকে একটি উচ্চতর সত্যের দিকে পরিচালিত করার সাধনা।

শ্লোকটির প্রথম শব্দ “সততং”। সংস্কৃত সতত শব্দের অর্থ সর্বদা, নিরন্তর, অবিরাম এবং অবিচ্ছিন্নভাবে। এখানে এমন একটি ধারাবাহিকতার কথা বলা হয়েছে যা সাময়িক আবেগের ওপর নির্ভর করে না। মানুষের জীবনে অনেক ভালো সংকল্প আসে, কিন্তু সব সংকল্প দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কোনো একটি মুহূর্তে মানুষ গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়, আবার কিছুদিন পর সেই অনুপ্রেরণা হারিয়ে যায়। গীতার “সততং” সেই অস্থায়ী আবেগের পরিবর্তে ধারাবাহিক চেতনার কথা বলে। ঈশ্বরকে স্মরণ করা শুধু পূজার সময়ের কাজ নয়। জীবনের আনন্দে, দুঃখে, সাফল্যে, ব্যর্থতায় এবং কঠিন সিদ্ধান্তের সময়েও যদি মানুষের অন্তরে একটি উচ্চতর সত্যের স্মরণ জাগ্রত থাকে, তখনই সেই স্মরণ সত্যিকার অর্থে জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

এরপর এসেছে “কীর্তয়ন্তঃ” শব্দটি। এটি সংস্কৃত কীর্ত ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ হলো মহিমা প্রকাশ করা, গুণগান করা, প্রশংসা করা কিংবা কোনো মহান সত্তার কীর্তি স্মরণ ও প্রচার করা। কীর্তন শব্দটির সঙ্গে এই একই ভাবের সম্পর্ক রয়েছে। তবে কীর্তনকে শুধু গান বা নামসংকীর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে শব্দটির গভীরতা কমে যায়। ঈশ্বরের মহিমা মুখে উচ্চারণ করা যেমন কীর্তনের একটি রূপ, তেমনি তাঁর গুণকে নিজের জীবনে ধারণ করাও কীর্তনের গভীরতর রূপ। একজন মানুষ যদি করুণার কথা বলে কিন্তু নিজে নিষ্ঠুর হয়, সত্যের কথা বলে কিন্তু নিজে অসত্যকে গ্রহণ করে, তাহলে তার কীর্তন কেবল মুখের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যখন ঈশ্বরের গুণ মানুষের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়, তখন তার জীবন নিজেই এক ধরনের কীর্তনে পরিণত হয়।

“মাম্” শব্দটির অর্থ আমাকে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে নির্দেশ করে এই সর্বোচ্চ আশ্রয়ের কথা বলেছেন। গীতার দার্শনিক ব্যাখ্যায় এই “মাম্” শব্দটি কেবল ঐতিহাসিক ব্যক্তি কৃষ্ণকে বোঝানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন বেদান্তীয় ব্যাখ্যায় এটি পরমেশ্বর, পরম সত্য এবং সর্বব্যাপী ঈশ্বরীয় সত্তার প্রতি নির্দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে “কীর্তয়ন্তো মাং” অর্থ দাঁড়ায় যাঁরা পরম সত্যের মহিমা স্মরণ করেন, প্রকাশ করেন এবং সেই সত্যকে নিজেদের জীবনের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করেন।

এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন “যতন্তশ্চ”। যতন্তঃ শব্দটি সংস্কৃত যৎ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ চেষ্টা করা, উদ্যোগী হওয়া, সাধনা করা এবং কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করা। এই শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি দেখিয়ে দেয় যে ভক্তি শুধু অনুভূতির বিষয় নয়। মানুষ ঈশ্বরকে ভালোবাসতে পারে, ঈশ্বরের কথা ভাবতে পারে এবং ঈশ্বরকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করতে পারে, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব জীবনের সাধনায় পরিণত করতে হলে প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ভক্তির সঙ্গে তাই যত্ন ও সাধনা যুক্ত হয়েছে। কেবল ঈশ্বরকে স্মরণ করলেই হবে না, নিজের চরিত্র, চিন্তা ও আচরণকেও ধীরে ধীরে সেই আদর্শের উপযোগী করে তুলতে হবে।

এই ভাবকে আরও দৃঢ় করে পরবর্তী শব্দ “দৃঢ়ব্রতাঃ”। এটি গঠিত হয়েছে দৃঢ় এবং ব্রত এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে। দৃঢ় অর্থ শক্ত, স্থির, অটল এবং সহজে বিচলিত হয় না এমন। ব্রত অর্থ সংকল্প, নিয়ম, প্রতিজ্ঞা কিংবা কোনো উচ্চতর উদ্দেশ্যের প্রতি অঙ্গীকার। ফলে দৃঢ়ব্রত অর্থ এমন ব্যক্তি যাঁর সংকল্প অটল। ভক্তির পথে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুণ। কারণ আধ্যাত্মিক জীবনেও যেমন, তেমনি সাধারণ জীবনেও মানুষকে নানা প্রলোভন, হতাশা, ব্যর্থতা এবং প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যে ব্যক্তি পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেই নিজের আদর্শ পরিবর্তন করে, তার সংকল্প এখনো দৃঢ় হয়নি। কিন্তু যে ব্যক্তি প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের সত্য ও কর্তব্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে, সে দৃঢ়ব্রত।

এরপর এসেছে “নমস্যন্তশ্চ”। নমস্যন্তঃ শব্দটির মূল সম্পর্ক সংস্কৃত নম্ ধাতুর সঙ্গে। নম্ অর্থ নত হওয়া, মাথা ঝুঁকানো, শ্রদ্ধায় প্রণত হওয়া। এখান থেকেই নমঃ, নমস্কার এবং প্রণামের মতো শব্দের জন্ম। বাহ্যিকভাবে প্রণাম একটি শারীরিক অঙ্গভঙ্গি হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ অনেক গভীর। মানুষ যখন সত্যিকার অর্থে প্রণাম করে, তখন সে প্রতীকীভাবে স্বীকার করে যে সে নিজেই সবকিছুর কেন্দ্র নয়। তার জ্ঞান সীমিত, তার ক্ষমতা সীমিত এবং তার নিয়ন্ত্রণও সীমিত। নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে বৃহত্তর সত্যের সামনে মাথা নত করা হলো বিনয়ের প্রকাশ। তাই গীতার প্রণাম কেবল শরীরের নতি নয়, অহংকারের নতিও।

“ভক্ত্যা” শব্দটি এসেছে ভক্তি থেকে। ভক্তি শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃত ভজ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। ভজ্ ধাতুর মধ্যে ভাগ করা, অংশ নেওয়া, সেবা করা এবং সম্পর্ক স্থাপনের ভাব রয়েছে। সেই অর্থে ভক্তি কেবল আবেগ নয়। ভক্তির মধ্যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সেবা, নিবেদন এবং গভীর সম্পর্কের অনুভূতি রয়েছে। “ভক্ত্যা” অর্থ ভক্তির দ্বারা বা ভক্তিপূর্ণভাবে। অর্থাৎ প্রণাম শুধু বাহ্যিক আচরণ হলে তার পূর্ণতা নেই। সেই প্রণামের মধ্যে যদি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং আত্মনিবেদন থাকে, তখনই তা ভক্তির প্রকাশ হয়ে ওঠে।

শ্লোকটির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদ “নিত্যযুক্তাঃ”। নিত্য অর্থ সর্বদা, চিরস্থায়ী এবং অবিচ্ছিন্ন। যুক্ত শব্দটি এসেছে যুজ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ যুক্ত করা, সংযোগ স্থাপন করা এবং মিলিত করা। এখান থেকেই যোগ শব্দটির উৎপত্তি। নিত্যযুক্ত অর্থ যিনি সর্বদা সংযুক্ত। এই সংযোগ বাহ্যিক কোনো সম্পর্কের মতো নয়। এটি চেতনার সংযোগ। মানুষ সংসারের কাজ করবে, পড়াশোনা করবে, জীবিকা অর্জন করবে, সম্পর্ক রক্ষা করবে এবং নানা দায়িত্ব পালন করবে, কিন্তু তার অন্তরের কেন্দ্র যদি কোনো উচ্চতর সত্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে সেই মানুষ নিত্যযুক্ত হওয়ার পথে রয়েছে। গীতার শিক্ষা তাই জীবনের কাজ থেকে পালিয়ে যাওয়ার শিক্ষা নয়। বরং জীবনের মধ্যেই একটি উচ্চতর চেতনা ধরে রাখার শিক্ষা।

সবশেষে এসেছে “উপাসতে” শব্দটি। উপাসনা শব্দটি সংস্কৃত উপ এবং আস্ এই দুই উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কিত। উপ অর্থ কাছে এবং আস্ অর্থ বসা। এই ব্যুৎপত্তিগত অর্থটি অত্যন্ত সুন্দর। উপাসনা অর্থ শুধু কোনো দেবতার সামনে কিছু আচার পালন করা নয়। এর গভীর অর্থ হলো পরম সত্যের কাছে বসা, তার নৈকট্য অনুভব করা এবং নিজের চেতনাকে সেই সত্যের দিকে স্থাপন করা। মানুষ সাধারণত ঈশ্বরকে দূরে কোথাও খোঁজে। কিন্তু উপাসনার গভীর দর্শন বলে যে ঈশ্বরের নৈকট্য কেবল কোনো নির্দিষ্ট স্থানে নয়, মানুষের চেতনার মধ্যেও অনুভূত হতে পারে। যখন মন সত্য, প্রেম, করুণা, ন্যায় এবং আত্মনিবেদনের দিকে ধাবিত হয়, তখন মানুষের জীবনই ধীরে ধীরে উপাসনার রূপ নিতে শুরু করে।

এই শ্লোকের শব্দগুলো একত্র করলে ভক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি পাওয়া যায়। সততং আমাদের শেখায় ধারাবাহিকতা। কীর্তয়ন্তঃ শেখায় ঈশ্বরের মহিমা স্মরণ ও প্রকাশ করতে। যতন্তঃ শেখায় চেষ্টা করতে। দৃঢ়ব্রতাঃ শেখায় সংকল্পে স্থির থাকতে। নমস্যন্তঃ শেখায় অহংকারকে নত করতে। ভক্ত্যা শেখায় ভালোবাসা ও নিবেদন নিয়ে এগোতে। নিত্যযুক্তাঃ শেখায় সর্বদা ঈশ্বরসচেতন থাকতে। আর উপাসতে শেখায় সেই পরম সত্যের নৈকট্যে জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করতে। অর্থাৎ ভক্তি এখানে একটি বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় কাজ নয়। এটি ধীরে ধীরে মানুষের কথা, কাজ, সংকল্প, অহংকার, হৃদয় ও চেতনাকে রূপান্তরিত করার একটি জীবনদর্শন।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোক অত্যন্ত গভীর। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে ভক্তি মানুষের মনকে শুদ্ধ করে এবং সেই শুদ্ধ মনকে আত্মজ্ঞান ও ব্রহ্মজ্ঞান উপলব্ধির জন্য প্রস্তুত করে। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে ভক্তি হলো ঈশ্বরের সঙ্গে জীবের গভীর সম্পর্ক, প্রেম ও আত্মনিবেদনের প্রকাশ। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের পার্থক্য স্বীকার করে ঈশ্বরের প্রতি শ্রদ্ধা, সেবা ও ভক্তির সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দর্শনের ভিন্নতা থাকলেও একটি বিষয় সাধারণভাবে প্রকাশিত হয়। মানুষের সীমাবদ্ধ অহংকে অতিক্রম করে একটি উচ্চতর সত্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করাই ভক্তির মূল উদ্দেশ্য।

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মন স্বভাবতই অস্থির এবং বিচ্ছিন্ন। এক মুহূর্তে মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে, পরের মুহূর্তে অতীতের কথা ভাবে, আবার অন্য মুহূর্তে কোনো আকাঙ্ক্ষা বা ভয়ের দ্বারা পরিচালিত হয়। এই বিচ্ছিন্নতার মধ্যে একটি উচ্চতর আদর্শকে জীবনের কেন্দ্র করে তুললে মানুষের চিন্তা ও আচরণের মধ্যে ধীরে ধীরে ঐক্য তৈরি হয়। সততং তৈরি করে ধারাবাহিকতা, দৃঢ়ব্রত তৈরি করে আত্মনিয়ন্ত্রণ, ভক্তি তৈরি করে গভীর আবেগীয় সংযোগ এবং নিত্যযুক্ত তৈরি করে সচেতনতার ধারাবাহিকতা। এই দিক থেকে শ্লোকটি শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, মানুষের চরিত্র ও মানসিক শক্তি গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন।

আধুনিক জীবনে এই শিক্ষার মূল্য আরও স্পষ্ট। আজকের মানুষ নানা তথ্য, আকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতা এবং উদ্বেগের মধ্যে বাস করে। মন এক মুহূর্তে এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে ছুটে যায়। এই পরিস্থিতিতে নিত্যযুক্ত হওয়ার শিক্ষা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের একটি অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র থাকা দরকার। সেই কেন্দ্র হতে পারে ঈশ্বর, সত্য, ন্যায়, মানবকল্যাণ অথবা কোনো উচ্চতর নৈতিক আদর্শ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষ যেন তার জীবনের সর্বোচ্চ মূল্যবোধকে কেবল কথায় না রেখে প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত ও আচরণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে।

একজন মানুষ যদি সত্যকে জীবনের আদর্শ বলে গ্রহণ করেন, তাহলে সত্যের প্রশংসা করা তাঁর কীর্তন হতে পারে। সত্য বলার জন্য সচেতনভাবে চেষ্টা করা হতে পারে যতন্তঃ। সুবিধার জন্য সত্যকে ত্যাগ না করা হতে পারে দৃঢ়ব্রত। নিজের ভুল স্বীকার করা হতে পারে নমস্যন্তঃ। সত্যের প্রতি অন্তরের ভালোবাসা হতে পারে ভক্ত্যা। জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে সত্যকে স্মরণ করা হতে পারে নিত্যযুক্ততা। আর যখন সত্য তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়, তখন তাঁর জীবনই এক ধরনের উপাসনায় পরিণত হয়। এই উদাহরণটি দেখায় যে শ্লোকের শিক্ষা কেবল মন্দির বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনেও বাস্তব হয়ে উঠতে পারে।

মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্রে গীতার আবির্ভাব হওয়ার ঘটনাটিও এখানে বিশেষভাবে স্মরণীয়। কৃষ্ণ অর্জুনকে কোনো নির্জন পরিবেশে বসিয়ে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেননি। তিনি দিয়েছিলেন এমন এক মুহূর্তে যখন অর্জুনের সামনে ছিল কর্তব্য, সম্পর্ক, ভয়, নৈতিক সংকট এবং জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্ত। তাই গীতার ভক্তি বাস্তব জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার শিক্ষা নয়। বরং জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও অন্তরের কেন্দ্রকে উচ্চতর সত্যের সঙ্গে যুক্ত রাখার শিক্ষা। নিত্যযুক্ততার প্রকৃত পরীক্ষা তাই শান্ত সময়ে নয়, সংকটের সময়ে।

এই শ্লোকের গভীরতম সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই যে এটি ভক্তিকে শুধু অনুভূতি হিসেবে দেখেনি। ভক্তির সঙ্গে এখানে স্মরণ আছে, প্রচেষ্টা আছে, দৃঢ়তা আছে, বিনয় আছে, ভালোবাসা আছে এবং নিত্য সংযোগ আছে। অর্থাৎ সত্যিকারের ভক্ত সেই ব্যক্তি নন যিনি শুধু ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করেন। সত্যিকারের ভক্ত হলেন সেই ব্যক্তি যাঁর চিন্তা, কর্ম, চরিত্র এবং জীবন ধীরে ধীরে তাঁর আরাধ্য সত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সবশেষে বলা যায়, “সততং কীর্তয়ন্তো মাং যৎনতশ্চ দৃঢ়ব্রতাঃ নমস্যন্তশ্চ মাং ভক্ত্যা নিত্যযুক্তা উপাসতে” শ্লোকটি ভক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। এখানে ঈশ্বরকে স্মরণ করা শুধু মুখের কাজ নয়, ঈশ্বরের পথে চলা শুধু বাহ্যিক আচরণ নয় এবং উপাসনা শুধু কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। সত্যিকারের উপাসনা তখনই শুরু হয় যখন মানুষের মুখে ঈশ্বরের স্মরণ, কর্মে তাঁর আদর্শ, সংকল্পে দৃঢ়তা, হৃদয়ে ভক্তি, আচরণে বিনয় এবং চেতনার মধ্যে নিত্য ঈশ্বরসচেতনতা জন্ম নেয়। তখন মানুষ শুধু ঈশ্বরের উপাসনা করে না, তার সমগ্র জীবনই ধীরে ধীরে উপাসনার একটি রূপ হয়ে ওঠে। এই শ্লোক তাই আমাদের শেখায় যে ঈশ্বরকে পাওয়ার পথ শুধু প্রার্থনার মধ্যে নয়, বরং ধারাবাহিক স্মরণ, আন্তরিক সাধনা, দৃঢ় সংকল্প, বিনয়, প্রেম এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে একটি উচ্চতর সত্যের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্যেই নিহিত।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি