শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.১৫ — জ্ঞানযজ্ঞ, একত্বদর্শন, পৃথকত্ব ও বহুরূপে ঈশ্বরোপাসনার তত্ত্ব
জ্ঞানযজ্ঞেন চাপ্যন্যে যজন্তো মামুপাসতে।
একত্বেন পৃথক্ত্বেন বহুধা বিশ্বতোমুখম্।।১৫।।
অনুবাদঃ অন্য কেউ কেউ জ্ঞান যজ্ঞের দ্বারা অভেদ চিন্তাপূর্বক, কেউ কেউ বহুরুপে প্রকাশিত ভেদ চিন্তাপূর্বক এবং অন্য কেউ আমার বিশ্বরূপের উপাসনা করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায় রাজবিদ্যা রাজগুহ্যযোগের পঞ্চদশ শ্লোকটি ঈশ্বর উপলব্ধির বহুমাত্রিক পথের এক গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা। এখানে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কেউ জ্ঞানযজ্ঞের মাধ্যমে তাঁকে উপাসনা করে, কেউ একত্বের দৃষ্টিতে তাঁকে উপলব্ধি করে, কেউ পৃথকত্বের দৃষ্টিতে তাঁকে আরাধনা করে এবং কেউ বহুরূপে সর্বদিকে প্রকাশিত বিশ্বসত্তা হিসেবে তাঁকে দেখে। এই একটি শ্লোকের মধ্যে জ্ঞান, যজ্ঞ, উপাসনা, ঐক্য, স্বাতন্ত্র্য, বৈচিত্র্য এবং সর্বব্যাপী ঈশ্বরচেতনার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। তাই শ্লোকটি শুধু ধর্মীয় উপাসনার একটি পদ্ধতির কথা বলে না, বরং মানুষ কীভাবে পরম সত্যকে জানতে, অনুভব করতে এবং জীবনের মধ্যে উপলব্ধি করতে পারে তার একটি বিস্তৃত দর্শন উপস্থাপন করে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ জ্ঞানযজ্ঞেন। জ্ঞান শব্দটি সংস্কৃত জ্ঞা ধাতু থেকে এসেছে, যার মূল অর্থ জানা, উপলব্ধি করা বা সত্যকে চিনতে পারা। তবে গীতার ভাষায় জ্ঞান কেবল কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ নয়। তথ্য মানুষের স্মৃতিকে সমৃদ্ধ করে, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করে। যে জ্ঞান মানুষকে নিজের প্রকৃতি, জগতের প্রকৃতি এবং পরম সত্য সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধানে নিয়ে যায়, সেই জ্ঞানই আধ্যাত্মিক অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যজ্ঞ শব্দটি। যজ্ঞ শব্দের মূল ধাতু যজ, যার মধ্যে পূজা, আরাধনা, নিবেদন এবং অর্পণের ভাব রয়েছে। প্রাচীন বৈদিক পরম্পরায় যজ্ঞ বলতে দেবতার উদ্দেশে অগ্নিতে আহুতি দেওয়ার ধর্মীয় আচার বোঝানো হলেও গীতায় যজ্ঞের অর্থ অনেক বিস্তৃত। যজ্ঞের অন্তর্নিহিত সত্য হলো নিজের কোনো কিছু বৃহত্তর কোনো সত্যের উদ্দেশে অর্পণ করা। সেই অর্থে জ্ঞানযজ্ঞ হলো নিজের অজ্ঞতা, অহংকার, ভ্রান্ত ধারণা এবং সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে জ্ঞানের আগুনে অর্পণ করা।
জ্ঞানযজ্ঞের প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই যে জ্ঞান কেবল অর্জন করার বস্তু নয়, জ্ঞান নিজেই একটি সাধনা। একজন মানুষ বহু গ্রন্থ পড়তে পারে, অসংখ্য শাস্ত্রের বক্তব্য মুখস্থ করতে পারে এবং ঈশ্বর সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারে। কিন্তু যদি সেই জ্ঞান তার অহংকার, সংকীর্ণতা, হিংসা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা দূর করতে না পারে, তাহলে সেই জ্ঞান এখনো প্রকৃত জ্ঞানযজ্ঞে পরিণত হয়নি। জ্ঞানযজ্ঞ তখনই সম্পূর্ণ হয় যখন জ্ঞান মানুষের অন্তর্গত অন্ধকারকে আলোকিত করে এবং তার জীবনদৃষ্টিকে পরিবর্তন করে। অর্থাৎ জ্ঞানযজ্ঞের আগুনে বাহ্যিক কোনো দ্রব্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের নিজের অজ্ঞতা ও অহংকারের অর্পণ।
এরপর এসেছে চাপ্যন্যে শব্দটি। এর মধ্যে চ, অপি এবং অন্যে এই তিনটি ভাব রয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় অন্যরাও বা আরও কিছু সাধক। এর মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর সাধনাপথ একটিমাত্র নয়। মানুষের মানসিক গঠন, জ্ঞান, ভক্তি এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ভিন্ন হতে পারে। তাই ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার পদ্ধতিও ভিন্ন হতে পারে। এই বৈচিত্র্যকে গীতা অস্বীকার করছে না। বরং বৃহত্তর সত্যের মধ্যে বিভিন্ন সাধনাপথকে স্থান দিচ্ছে।
যজন্তো শব্দটি এসেছে যজ ধাতু থেকে। এর অর্থ যজ্ঞ করা, পূজা করা, আরাধনা করা। এখানে জ্ঞানযজ্ঞ এবং যজন্তো শব্দের মধ্যে একটি সুন্দর সম্পর্ক রয়েছে। জ্ঞান কেবল চিন্তার বিষয় নয়, জ্ঞানও একটি উপাসনা হয়ে উঠতে পারে। সত্যকে জানার আন্তরিক চেষ্টা নিজেই ঈশ্বরের উদ্দেশে একটি নিবেদন হতে পারে। যখন একজন মানুষ নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করে সত্য অনুসন্ধান করে, তখন তার সেই অনুসন্ধানও এক ধরনের আধ্যাত্মিক সাধনায় পরিণত হয়।
এরপর এসেছে মাম্ অর্থাৎ আমাকে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে নিজের দিকে নির্দেশ করছেন। কিন্তু গীতার সামগ্রিক দর্শনের আলোকে মাম্ শব্দটিকে কেবল ঐতিহাসিক ব্যক্তি কৃষ্ণের সীমিত পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করলে শ্লোকটির গভীরতা কমে যায়। এখানে কৃষ্ণ নিজেকে সেই পরম সত্যের প্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন করছেন, যাঁকে মানুষ জ্ঞান, ভক্তি এবং বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারে। অর্থাৎ কৃষ্ণের মধ্যে ব্যক্তি এবং পরমের একটি গভীর সমন্বয় প্রকাশিত হয়েছে।
উপাসতে শব্দটির মধ্যেও রয়েছে অসাধারণ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। উপাসনা শব্দটি উপ এবং আস ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। উপ অর্থ কাছে এবং আস অর্থ বসা। আক্ষরিক অর্থে উপাসনা মানে নিকটে বসা। এই ব্যুৎপত্তি উপাসনার গভীর অর্থকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশ করে। ঈশ্বরের উপাসনা মানে শুধু দূরে অবস্থানকারী কোনো শক্তির কাছে প্রার্থনা করা নয়। উপাসনা হলো নিজের চেতনাকে সেই সত্যের নিকটে নিয়ে আসা। মানুষ যখন ঈশ্বরকে স্মরণ করে, ধ্যান করে, তাঁর সম্পর্কে চিন্তা করে এবং সত্যের অনুসন্ধান করে, তখন তার মন ধীরে ধীরে সেই সত্যের দিকে অভিমুখী হয়। এই অর্থে উপাসনা হলো চেতনার দিক পরিবর্তন।
এরপর শ্লোকে আসে একত্বেন। একত্ব শব্দটি এক থেকে এসেছে এবং ত্ব প্রত্যয় কোনো গুণ বা অবস্থার ভাব প্রকাশ করে। একত্ব অর্থ এক হওয়ার অবস্থা, ঐক্য বা অভিন্নতা। আধ্যাত্মিক অর্থে একত্ব হলো বহুর অন্তরালে এক সত্যকে উপলব্ধি করা। অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে এই একত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আত্মা এবং ব্রহ্মের গভীরতম সত্যকে অভিন্ন বলে উপলব্ধি করা হয়। বাহ্যিকভাবে মানুষ ও জগতের মধ্যে অসংখ্য পার্থক্য থাকলেও চেতনার গভীরে একটি অখণ্ড সত্যের সন্ধান করা হয়। একত্বের সাধনা তাই মানুষকে বাহ্যিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে অস্তিত্বের মৌলিক ঐক্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি বলেছেন পৃথক্ত্বেন। পৃথকত্ব অর্থ ভিন্নতা বা স্বাতন্ত্র্য। এই দৃষ্টিতে জীব এবং ঈশ্বরকে সম্পূর্ণ অভিন্ন না দেখে তাদের মধ্যে সম্পর্ক ও পার্থক্য উভয়কেই স্বীকার করা হয়। ভক্তি এবং দ্বৈতধর্মী দর্শনের মধ্যে এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মানুষ নিজেকে ঈশ্বরের ভক্ত, সেবক বা আশ্রিত হিসেবে অনুভব করে। ঈশ্বর আর নিজের সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন কোনো বিমূর্ত সত্য নন, বরং তিনি একজন আরাধ্য সত্তা, যার সঙ্গে জীবের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই পৃথকত্বের অনুভূতি ভক্তির মধ্যে প্রেম, আত্মসমর্পণ এবং শ্রদ্ধার জন্ম দেয়।
একত্ব এবং পৃথকত্বকে প্রথম দৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু গীতার গভীর দর্শন এই দুই দৃষ্টিকে মানুষের আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বিভিন্ন স্তর হিসেবে দেখার সুযোগ দেয়। একত্ব আমাদের অস্তিত্বের গভীর ঐক্য উপলব্ধি করতে শেখায় এবং পৃথকত্ব আমাদের ব্যক্তিত্ব, সম্পর্ক ও দায়িত্বকে উপলব্ধি করতে শেখায়। একটি সমুদ্রের মধ্যে অসংখ্য তরঙ্গের কথা ভাবা যায়। প্রতিটি তরঙ্গ আলাদা এবং তার নিজস্ব রূপ রয়েছে। এটি পৃথকত্বের প্রতীক। কিন্তু প্রতিটি তরঙ্গের মূল উপাদান একই জল। এটি একত্বের প্রতীক। আবার অসংখ্য তরঙ্গের বৈচিত্র্য হলো বহুধার প্রকাশ। এই উপমার মাধ্যমে বোঝা যায় যে ঐক্য ও বৈচিত্র্য একে অপরকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করেও একই বৃহত্তর সত্যের মধ্যে অবস্থান করতে পারে।
বহুধা শব্দটি এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। বহু থেকে বহুধা শব্দের উৎপত্তি এবং এর অর্থ বহুপ্রকারে বা নানা রূপে। ঈশ্বরকে কোনো একটি নির্দিষ্ট রূপ বা অভিজ্ঞতার মধ্যে আবদ্ধ না রেখে এখানে তাঁর বহুরূপ প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। মানুষ প্রকৃতির মধ্যে সৌন্দর্য দেখতে পারে, জ্ঞানের মধ্যে সত্য অনুভব করতে পারে, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা অনুভব করতে পারে এবং বিশ্বজগতের বিশালতার মধ্যে এক অসীম শক্তির উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারে। এই সমস্ত প্রকাশের মধ্যেই পরম সত্যকে অনুসন্ধান করা সম্ভব। তাই বহুধা শুধু সংখ্যার বহুত্ব নয়, এটি প্রকাশের বহুমাত্রিকতা।
এই বহুরূপতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বতোমুখম্। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো যার মুখ সর্বদিকে অথবা যিনি সর্বদিকমুখী। এটি কোনো সাধারণ শারীরিক বর্ণনা নয়। এর মধ্যে একটি গভীর প্রতীকী ও দার্শনিক অর্থ রয়েছে। বিশ্বতোমুখম্ এমন এক পরম সত্তার ধারণা প্রকাশ করে যিনি কোনো একটি স্থান, রূপ বা সীমার মধ্যে আবদ্ধ নন। তাঁর প্রকাশ সর্বদিকে। পূর্বে তিনি আছেন, পশ্চিমেও তিনি আছেন, প্রকৃতির মধ্যে তাঁর প্রকাশ আছে, জীবনের মধ্যে তাঁর প্রকাশ আছে এবং অসংখ্য জীব ও অভিজ্ঞতার মধ্যেও তাঁর উপস্থিতি অনুভব করা যায়। এই ধারণাটি পরবর্তীকালে গীতার বিশ্বরূপদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।
বিশ্বতোমুখম্ শব্দটির সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। কল্পনা করা যায় একটি মাত্র মুখ নয়, অসংখ্য মুখের মধ্যে বিশ্বসত্তার প্রকাশ। একটি শিশুর মুখে জীবনের সম্ভাবনা, একজন বৃদ্ধের মুখে সময়ের অভিজ্ঞতা, একজন শ্রমজীবী মানুষের মুখে সংগ্রামের ইতিহাস এবং একজন জ্ঞানীর মুখে সত্যের অনুসন্ধান। এই প্রতিটি মুখ যেন বিশ্বসত্তার একটি আলাদা জানালা। সেই অর্থে সমগ্র বিশ্বই যেন পরম সত্যের একটি বিশাল মুখ, যার অসংখ্য দিক দিয়ে সেই সত্য নিজেকে প্রকাশ করছে।
এই শ্লোকের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক শিক্ষা হলো সত্যের বহুমাত্রিকতা। মানুষ একই পরম সত্যকে বিভিন্নভাবে উপলব্ধি করতে পারে। কেউ তাকে নিরাকার চৈতন্য হিসেবে অনুভব করতে পারে। কেউ ব্যক্তিগত ভগবান হিসেবে ভালোবাসতে পারে। কেউ তাকে বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে দেখতে পারে। কেউ নিজের অন্তরের আত্মার মধ্যে অনুসন্ধান করতে পারে। আবার কেউ সমস্ত জীবের মধ্যে একই পরম সত্যের প্রকাশ অনুভব করতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ এই বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে একটি বৃহত্তর আধ্যাত্মিক পরিসরের মধ্যে স্থাপন করেছেন।
এই শিক্ষার আধুনিক সামাজিক তাৎপর্যও অত্যন্ত গভীর। মানুষ আজ নানা পরিচয়, মতামত, সংস্কৃতি এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতে বিভক্ত। প্রত্যেকে নিজের দৃষ্টিকেই একমাত্র সত্য বলে মনে করতে পারে। কিন্তু এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে ঐক্য উপলব্ধি করতে হলে বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। আবার বৈচিত্র্যকে স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে মানুষের মধ্যে কোনো গভীর সম্পর্ক নেই। একত্ব আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি দেখায়। পৃথক্ত্ব আমাদের অন্যের স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করতে শেখায়। আর বহুধা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একই বৃহত্তর সত্য অসংখ্য রূপে প্রকাশিত হতে পারে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের গভীরতা রয়েছে। মানুষ সাধারণত নিজের পরিচয়কে একটি সীমিত ধারণার মধ্যে আবদ্ধ করে। সে ভাবে আমি এই ব্যক্তি, আমার মতই সত্য, আমার অভিজ্ঞতাই বাস্তবতার শেষ সীমা। কিন্তু জ্ঞানযজ্ঞ সেই সীমাবদ্ধ পরিচয়কে প্রশ্ন করতে শেখায়। মানুষ যখন নিজেকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করে, তখন সে বুঝতে পারে যে তার পরিচয় কেবল বাহ্যিক নাম, পেশা, সামাজিক অবস্থান বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আত্মঅনুসন্ধান তখন তার চেতনাকে আরও বিস্তৃত করে এবং তাকে নিজের বাইরে বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে সাহায্য করে।
জ্ঞানযজ্ঞের সঙ্গে সাধারণ জ্ঞানের পার্থক্য এখানেই। সাধারণ জ্ঞান মানুষকে অনেক কিছু জানাতে পারে, কিন্তু জ্ঞানযজ্ঞ মানুষকে নিজেকেই প্রশ্ন করতে শেখায়। সত্যিকারের জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে। তাকে নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন করে। তার অহংকার কমায় এবং সত্যের প্রতি তার শ্রদ্ধা বাড়ায়। তাই জ্ঞানযজ্ঞের আগুনে সবচেয়ে মূল্যবান আহুতি হলো নিজের অহংকার এবং অজ্ঞতা।
শ্রীকৃষ্ণের এই শ্লোকের একটি অসাধারণ দিক হলো জ্ঞান এবং ভক্তির মধ্যে কোনো কৃত্রিম বিরোধ সৃষ্টি না করা। জ্ঞানযজ্ঞের মাধ্যমে ঈশ্বরকে জানা যায় এবং উপাসনার মাধ্যমে তাঁকে ভালোবাসা যায়। একত্বের মাধ্যমে তাঁকে অস্তিত্বের গভীরে উপলব্ধি করা যায় এবং পৃথক্ত্বের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। বহুধার মাধ্যমে তাঁর অসংখ্য প্রকাশ দেখা যায় এবং বিশ্বতোমুখম্-এর মাধ্যমে সমগ্র অস্তিত্বের মধ্যে তাঁর উপস্থিতি অনুভব করা যায়। অর্থাৎ জ্ঞান, ভক্তি এবং বিশ্বদৃষ্টি এখানে পরস্পরকে সমৃদ্ধ করে।
এই শ্লোককে মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি ধারাবাহিকতাও বলা যায়। প্রথমে মানুষ জানতে চায় সত্য কী। তারপর সে অনুসন্ধান করে। অনুসন্ধান ধীরে ধীরে সাধনায় পরিণত হয়। সাধনা তাকে সত্যের নিকটে নিয়ে যায়। তারপর সে প্রশ্ন করে আমি এবং সেই পরম সত্যের সম্পর্ক কী। কোনো এক পর্যায়ে সে ঐক্য অনুভব করতে পারে। অন্য পর্যায়ে সে নিজেকে ঈশ্বরের ভক্ত বা আশ্রিত হিসেবে অনুভব করতে পারে। আরও গভীর উপলব্ধিতে সে দেখতে পারে যে বহুর মধ্যে এক এবং একের মধ্যে বহু প্রকাশিত হচ্ছে।
এই কারণে জ্ঞানযজ্ঞেন চাপ্যন্যে যজন্তো মামুপাসতে একত্বেন পৃথক্ত্বেন বহুধা বিশ্বতোমুখম্ শ্লোকটি কেবল উপাসনার বিভিন্ন পদ্ধতির তালিকা নয়। এটি মানুষের চেতনার বিস্তারের একটি দার্শনিক মানচিত্র। এখানে জ্ঞান মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বের করে। যজ্ঞ তাকে আত্মঅর্পণের শিক্ষা দেয়। উপাসনা তাকে পরম সত্যের নিকটে নিয়ে যায়। একত্ব তাকে ঐক্য উপলব্ধি করতে শেখায়। পৃথক্ত্ব তাকে সম্পর্ক ও স্বাতন্ত্র্যের মূল্য বোঝায়। বহুধা তাকে বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য দেখায়। আর বিশ্বতোমুখম্ তাকে সমগ্র বিশ্বকে একটি বৃহত্তর আধ্যাত্মিক বাস্তবতার প্রকাশ হিসেবে দেখতে শেখায়।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো পরম সত্যকে একটি মাত্র ধারণা বা রূপের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। কেউ তাকে জ্ঞানের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে, কেউ ভক্তির মাধ্যমে অনুভব করে, কেউ ঐক্যের মধ্যে উপলব্ধি করে, কেউ পৃথক সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসে এবং কেউ সমগ্র বিশ্ববৈচিত্র্যের মধ্যে তাঁর প্রকাশ দেখতে শেখে। সত্যের এই বহুমাত্রিক উপলব্ধিই শ্লোকটির মহত্ত্ব। জ্ঞান যখন অহংকারকে পুড়িয়ে ফেলে, উপাসনা যখন হৃদয়কে সত্যের নিকটে নিয়ে যায়, একত্ব যখন বিভেদের অন্তরালে ঐক্য দেখায়, পৃথক্ত্ব যখন সম্পর্কের সৌন্দর্য উপলব্ধি করায় এবং বহুধা যখন বৈচিত্র্যের মধ্যে পরম সত্যের প্রকাশ দেখায়, তখন মানুষের দৃষ্টি সীমিত ব্যক্তি থেকে বিস্তৃত বিশ্বচেতনার দিকে এগিয়ে যায়। এই কারণেই এই শ্লোক আমাদের শুধু ঈশ্বরকে কীভাবে উপাসনা করতে হয় তা শেখায় না, বরং আমাদের কীভাবে পৃথিবী, মানুষ এবং নিজের অস্তিত্বকে নতুন চোখে দেখতে হয় সেই শিক্ষাও দেয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!