সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.১৭ — জগতের পিতা-মাতা, ধাতা-পিতামহ এবং ওঙ্কাররূপ পরম সত্যের তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
পিতাহমস্য জগতো মাতা ধাতা পিতামহঃ। বেদ্যং পবিত্রম্ ওঙ্কার ঋক্ সাম যজুরেব চ।।১৭।।
পিতাহমস্য জগতো মাতা ধাতা পিতামহঃ। 
বেদ্যং পবিত্রম্ ওঙ্কার ঋক্ সাম যজুরেব চ।।১৭।।

অনুবাদঃ আমিই এই জগতের পিতা, মাতা বিধাতা ও পিতামহ। আমি জ্ঞেয় বস্তু, শোধনকারী ও ওঙ্কার। আমিই ঋক্, সাম ও যজুর্বেদ। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের সপ্তদশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর স্বরূপকে এমন এক বিস্তৃত পরিসরে প্রকাশ করেছেন, যেখানে ঈশ্বরকে কেবল জগতের স্রষ্টা হিসেবে দেখলে তাঁর প্রকৃত তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায় না। কৃষ্ণ বলেন, “পিতাহমস্য জগতো মাতা ধাতা পিতামহঃ। বেদ্যং পবিত্রম্ ওঙ্কার ঋক্ সাম যজুরেব চ।” অর্থাৎ তিনি এই জগতের পিতা, মাতা, ধাতা ও পিতামহ। তিনিই জ্ঞাতব্য, পবিত্র এবং ওঙ্কার। তিনিই ঋক্, সাম ও যজুর্বেদের অন্তর্নিহিত সত্য। এই একটি শ্লোকের মধ্যে সৃষ্টি, পালন, ধারণ, জ্ঞান, পবিত্রতা, শব্দ, যজ্ঞ এবং পরম সত্যের এক বিস্ময়কর সমন্বয় দেখা যায়।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো পিতাহম্। এটি পিতা এবং অহম্ এই দুটি শব্দের সন্ধিবদ্ধ রূপ। পিতা অর্থ জনক এবং অহম্ অর্থ আমি। ফলে পিতাহম্ অর্থ দাঁড়ায় আমি পিতা। পিতা শব্দটি সংস্কৃত পিতৃ শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর ভাষাগত আত্মীয়তা পৃথিবীর বহু প্রাচীন ইন্দো ইউরোপীয় ভাষায় দেখা যায়। ইংরেজি ফাদার, লাতিন পাত্র এবং গ্রিক পাতের শব্দের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু গীতায় পিতা শব্দটির অর্থ কেবল জৈবিক জনকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষ্ণ যখন বলেন তিনি জগতের পিতা, তখন তিনি বোঝাচ্ছেন যে সমস্ত সৃষ্টির অস্তিত্বের পেছনে যে পরম কারণ রয়েছে, তিনি সেই কারণ। মানুষ তার পিতার মাধ্যমে পৃথিবীতে আসে, কিন্তু সমগ্র জগতের অস্তিত্ব যে মহাকারণের উপর নির্ভরশীল, কৃষ্ণ সেই পরম কারণের কথা বলছেন।

এর পরেই এসেছে মাতা শব্দটি। সংস্কৃত মাতৃ শব্দ থেকে মাতা শব্দের উৎপত্তি। পিতার সঙ্গে মাতার সংযোজন এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পিতা সৃষ্টির সূচনাকে নির্দেশ করলে মাতা নির্দেশ করেন ধারণ, পুষ্টি, আশ্রয় এবং লালনকে। একটি শিশু শুধু জন্মগ্রহণ করলেই তার অস্তিত্ব সম্পূর্ণ হয় না। তাকে ধারণ করতে হয়, তাকে পুষ্ট করতে হয় এবং তাকে আশ্রয় দিতে হয়। একইভাবে জগতের অস্তিত্বও কোনো এক মুহূর্তের সৃষ্টির মধ্যে শেষ হয়ে যায় না। তাকে ধারণ করার জন্য একটি মহাশক্তির প্রয়োজন। ভারতীয় দর্শনে প্রকৃতিকে বহু সময় মাতৃরূপে কল্পনা করা হয়েছে। ধরিত্রী মাতা জীবজগতকে ধারণ করেন। এই অর্থে কৃষ্ণের মাতৃরূপ হলো সেই পরম আশ্রয়, যার মধ্যে সমস্ত জীবনের বিকাশ ঘটে।

এরপর এসেছে ধাতা শব্দটি। ধাতা শব্দের মূল সংস্কৃত ধাতু হলো ধা, যার অর্থ রাখা, স্থাপন করা, ধারণ করা এবং প্রতিষ্ঠা করা। সেই অর্থে ধাতা হলেন যিনি ধারণ করেন, যিনি অস্তিত্বকে স্থিতিশীল রাখেন এবং যিনি সমস্ত কিছুকে তার নিজস্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত রাখেন। সৃষ্টি করা এবং সৃষ্টি হওয়া জগতকে ধারণ করা এক বিষয় নয়। একটি ঘর নির্মাণ করা যেমন এক ধরনের কাজ, তেমনি সেই ঘরের ভিত্তি ও কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখা আরেকটি কাজ। কৃষ্ণের ধাতা রূপ এই দ্বিতীয় সত্যকে প্রকাশ করে। জগত শুধু সৃষ্টি হয়েছে বলেই টিকে নেই। এর পেছনে রয়েছে এক গভীর নিয়ম, সামঞ্জস্য ও ধারণশক্তি। সেই মহাজাগতিক ধারণশক্তির প্রতীক হলেন ধাতা।

পিতামহ শব্দটির মধ্যেও গভীর দার্শনিক অর্থ রয়েছে। সাধারণ ভাষায় পিতামহ অর্থ পিতার পিতা। অর্থাৎ দাদা বা ঠাকুরদা। কিন্তু গীতার প্রেক্ষাপটে এই শব্দটি আরও বিস্তৃত। যদি পিতা সৃষ্টির কারণ হন, তাহলে পিতামহ সেই কারণেরও পূর্ববর্তী কারণকে নির্দেশ করতে পারে। ভারতীয় সৃষ্টিতত্ত্বে ব্রহ্মাকে সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা হলেও কৃষ্ণ নিজেকে সেই সৃষ্টিশৃঙ্খলারও ঊর্ধ্ববর্তী পরম কারণ হিসেবে প্রকাশ করছেন। তাই পিতামহ শব্দটি শুধু পারিবারিক সম্পর্কের প্রতীক নয়। এটি আদিকারণের প্রতীক। সমস্ত কারণের পেছনে যে পরম কারণ, সমস্ত সৃষ্টির পেছনে যে অনাদি সত্য, সেই সত্যের দিকেই এই শব্দটি আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়।

পিতা, মাতা, ধাতা এবং পিতামহ এই চারটি শব্দ একসঙ্গে রাখলে শ্লোকটির গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। পিতা নির্দেশ করেন সৃষ্টির উৎসকে। মাতা নির্দেশ করেন ধারণ ও পুষ্টিকে। ধাতা নির্দেশ করেন স্থিতি ও প্রতিষ্ঠাকে। পিতামহ নির্দেশ করেন আদিকারণকে। অর্থাৎ কৃষ্ণ এখানে ঈশ্বরকে কোনো একমাত্রিক ধারণার মধ্যে আবদ্ধ করছেন না। তিনি বলছেন, অস্তিত্বের সূচনায় আমি আছি, অস্তিত্বের বিকাশে আমি আছি, অস্তিত্বের স্থিতিতে আমি আছি এবং অস্তিত্বের গভীরতম কারণেও আমি আছি। ঈশ্বর এখানে কেবল সৃষ্টিকর্তা নন। তিনি সৃষ্টির অন্তর্নিহিত ভিত্তি।

এরপর শ্লোকটি আরও গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তরে প্রবেশ করে। কৃষ্ণ বলেন বেদ্যম্। বেদ্যম্ শব্দটি বিদ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদ্ অর্থ জানা। বিদ্যা, বেদ এবং বেদ্য এই শব্দগুলোর মধ্যে একই জ্ঞানমূলক সম্পর্ক রয়েছে। বেদ্য অর্থ যাকে জানা যায় বা যাকে জানা উচিত। কৃষ্ণ যখন বলেন তিনিই বেদ্য, তখন তিনি বোঝাচ্ছেন যে সমস্ত জ্ঞানের সর্বোচ্চ লক্ষ্য পরম সত্যকে উপলব্ধি করা। মানুষ পৃথিবী সম্পর্কে অসংখ্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। বিজ্ঞান, ইতিহাস, প্রযুক্তি এবং দর্শন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। কিন্তু সেই জ্ঞান যদি অস্তিত্বের চূড়ান্ত সত্যের প্রশ্নে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে গীতার দৃষ্টিতে জ্ঞানের পূর্ণতা এখনও আসেনি। সেই কারণে কৃষ্ণ নিজেকে চূড়ান্ত জ্ঞাতব্য হিসেবে ঘোষণা করছেন।

এরপর এসেছে পবিত্রম্। পবিত্র শব্দের মধ্যে শুদ্ধতা ও শুদ্ধ করার ধারণা নিহিত রয়েছে। ঈশ্বর নিজে পবিত্র এবং তাঁর উপলব্ধি চেতনাকেও পবিত্র করে। এখানে পবিত্রতা শুধু বাহ্যিক আচার বা পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়। মানুষের অন্তরে যে অহংকার, লোভ, মোহ, হিংসা, ভয় এবং অজ্ঞতা জমে থাকে, সেগুলো থেকে মুক্ত হওয়াও এক ধরনের পবিত্রতা। কৃষ্ণের স্মরণ, জ্ঞান এবং ঈশ্বরচেতনা সেই অন্তরের অন্ধকারকে দূর করার পথ হিসেবে গীতায় প্রকাশিত হয়েছে। তাই পবিত্রম্ শব্দটি মানুষের অন্তর্জগতের রূপান্তরের কথাও বলে।

এরপর আসে ওঙ্কার। ওঙ্কার হলো ওঁ ধ্বনির প্রকাশ। ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে ওঁ কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এটি পরম সত্যের একটি শক্তিশালী ধ্বনিগত প্রতীক। উপনিষদীয় চিন্তায় ওঁকে সমগ্র অস্তিত্ব এবং চেতনার বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। জাগ্রত, স্বপ্ন এবং সুপ্তির মতো চেতনার অবস্থার সঙ্গে অকার, উকার ও মকারের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে এবং এই তিনের অতীত নীরবতাকে তুরীয় চেতনার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাই কৃষ্ণ যখন বলেন তিনি ওঙ্কার, তখন তিনি শব্দের মধ্যেও পরম সত্যের উপস্থিতি প্রকাশ করছেন। অর্থাৎ ঈশ্বর শুধু দৃশ্যমান জগতের মধ্যে নন, তিনি শব্দ ও চেতনার গভীর স্তরেও প্রকাশিত।

শ্লোকের শেষ অংশে এসেছে ঋক্, সাম এবং যজুঃ। ঋক্ বলতে ঋগ্বেদের মন্ত্র ও স্তোত্রকে বোঝানো হয়। এটি জ্ঞান, স্তব এবং মন্ত্রের প্রতীক। সাম শব্দটি সামবেদের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে সুর ও সংগীতের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মন্ত্র যখন সুরের মাধ্যমে উচ্চারিত হয়, তখন জ্ঞান হৃদয়ের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয়। যজুঃ শব্দটি যজ্ঞীয় মন্ত্র এবং নিবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে কর্ম ও উৎসর্গের ধারণা প্রকাশিত হয়। ফলে ঋক্, সাম ও যজুঃকে একত্রে দেখলে জ্ঞান, সুর এবং কর্মের একটি ত্রিবিধ সমন্বয় দেখা যায়।

এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি অত্যন্ত সুন্দর একটি দার্শনিক কাঠামো নির্মাণ করে। প্রথমে কৃষ্ণ নিজেকে সম্পর্কের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তিনি পিতা, মাতা, ধাতা এবং পিতামহ। তারপর তিনি নিজেকে জ্ঞানের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তিনি বেদ্য এবং পবিত্র। এরপর তিনি নিজেকে শব্দ ও বৈদিক প্রকাশের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তিনি ওঙ্কার, ঋক্, সাম এবং যজুঃ। অর্থাৎ ঈশ্বরকে পাওয়ার পথ শুধু একটি নয়। সম্পর্কের মধ্যে তাঁকে অনুভব করা যায়। জ্ঞানের মধ্যে তাঁকে অনুসন্ধান করা যায়। সাধনার মধ্যে তাঁকে উপলব্ধি করা যায়। শব্দের মধ্যে তাঁকে স্মরণ করা যায়। কর্মের মধ্যে তাঁকে নিবেদন করা যায়।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই বক্তব্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। সেখানে পরম সত্য ব্রহ্ম। বহুরূপী জগতের অন্তরালে এক পরম ঐক্য রয়েছে। পিতা, মাতা, ধাতা এবং পিতামহের মতো বিভিন্ন সম্পর্ক ও পরিচয় সেই এক পরম সত্যের বিভিন্ন প্রকাশ হিসেবে বোঝা যায়। বাহ্যিকভাবে আমরা বহু নাম ও রূপ দেখতে পাই, কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত অস্তিত্বের ভিত্তি এক। এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি বহুর মধ্যে এককে উপলব্ধি করার আহ্বান।

ভক্তির দৃষ্টিতে আবার এই শ্লোকের অনুভূতি আরও মানবিক। একজন ভক্ত ঈশ্বরকে কেবল দূরের কোনো মহাশক্তি হিসেবে দেখেন না। তিনি ঈশ্বরকে পিতা হিসেবে অনুভব করতে পারেন। আবার মাতা হিসেবে আশ্রয় নিতে পারেন। কখনো তাঁকে প্রভু হিসেবে, কখনো বন্ধু হিসেবে এবং কখনো জীবনের অন্তরঙ্গ আশ্রয় হিসেবে অনুভব করতে পারেন। কৃষ্ণের পিতা ও মাতা রূপের ঘোষণা তাই ভক্তির মধ্যে নিরাপত্তা এবং আশ্রয়ের এক গভীর অনুভূতি সৃষ্টি করে। মানুষ যখন জীবনের কঠিন সময়ে নিজেকে একা মনে করে, তখন এই শিক্ষা তাকে মনে করিয়ে দেয় যে তার অস্তিত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও পিতা, মাতা, ধাতা এবং পিতামহ শব্দগুলোর গভীর প্রতীকী মূল্য রয়েছে। পিতা নির্দেশ করতে পারেন শক্তি, দিকনির্দেশ ও কাঠামোকে। মাতা নির্দেশ করতে পারেন আশ্রয়, গ্রহণযোগ্যতা ও পুষ্টিকে। ধাতা নির্দেশ করতে পারেন স্থিতি ও ভারসাম্যকে। পিতামহ নির্দেশ করতে পারেন ঐতিহ্য, শিকড় এবং অস্তিত্বের দীর্ঘ ধারাবাহিকতাকে। একজন মানুষ যখন নিজের পরিচয় খুঁজতে থাকে, তখন সে মূলত জানতে চায় সে কোথা থেকে এসেছে, কোন শক্তি তাকে ধারণ করছে এবং তার জীবনের গভীর ভিত্তি কোথায়। এই শ্লোক সেই অনুসন্ধানকে মহাজাগতিক মাত্রা দেয়।

বাস্তব জীবনের একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একটি গাছকে কল্পনা করা যাক। বীজ তার সূচনার প্রতীক। মাটি তাকে ধারণ করে। জল ও সূর্য তাকে পুষ্ট করে। শিকড় তাকে স্থিতিশীল রাখে। আবার সেই বীজের পেছনেও রয়েছে পূর্ববর্তী গাছের দীর্ঘ ইতিহাস। একটি গাছের বর্তমান অস্তিত্বকে বুঝতে হলে শুধু তার দৃশ্যমান অংশ দেখলে হয় না। তার শিকড়, মাটি, জল, আলো এবং পূর্ববর্তী ধারাবাহিকতা সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হয়। কৃষ্ণের পিতা, মাতা, ধাতা এবং পিতামহ রূপের ধারণাও তেমন। জীবনের দৃশ্যমান অস্তিত্বের পেছনে রয়েছে অদৃশ্য কারণের এক বিশাল পরম্পরা।

আধুনিক মানুষের জন্য এই শ্লোকের শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজ মানুষ প্রযুক্তি, বিজ্ঞান এবং তথ্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ উন্নতি করেছে। আমরা জানি কীভাবে অনেক কিছু তৈরি করতে হয়। আমরা জানি কীভাবে প্রকৃতির শক্তিকে ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে। আমি কোথা থেকে এসেছি। আমার অস্তিত্বের ভিত্তি কী। জীবন কেন অর্থপূর্ণ। আমার জ্ঞান কোথায় গিয়ে শেষ হয়। এই প্রশ্নগুলো কেবল বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে সম্পূর্ণ সমাধান হয় না। এগুলো মানুষের গভীরতম দর্শনচেতনার সঙ্গে যুক্ত। গীতা সেই অনুসন্ধানের দিকে মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

এই কারণে ৯.১৭ শ্লোকটি কেবল ঈশ্বরের মহিমা ঘোষণা নয়। এটি মানুষের নিজের অস্তিত্বকে নতুনভাবে দেখার একটি আহ্বান। আমরা সাধারণত নিজেকে আলাদা ব্যক্তি হিসেবে দেখি। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন, তোমার অস্তিত্বের পেছনে যে মহাজাগতিক উৎস, যে ধারণশক্তি, যে জ্ঞান এবং যে পরম সত্য রয়েছে, তা আমার মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। ফলে মানুষ নিজের অস্তিত্বকে বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে শেখে।

এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। ঈশ্বরকে শুধু সৃষ্টিকর্তা হিসেবে দেখলে ঈশ্বর আমাদের কাছে দূরের কোনো শক্তি হয়ে থাকেন। কিন্তু কৃষ্ণ নিজেকে পিতা ও মাতা হিসেবে প্রকাশ করে সেই দূরত্বকে ভেঙে দেন। ধাতা হিসেবে তিনি জানান যে তিনি আমাদের অস্তিত্বকে ধারণ করছেন। পিতামহ হিসেবে তিনি জানান যে সমস্ত কারণের গভীরতম শিকড়েও তাঁর উপস্থিতি রয়েছে। বেদ্য হিসেবে তিনি জানান যে সমস্ত জ্ঞানের শেষ লক্ষ্য তাঁকে জানা। পবিত্র হিসেবে তিনি জানান যে তাঁর উপলব্ধি মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ করতে পারে। আর ওঙ্কার, ঋক্, সাম ও যজুঃ হিসেবে তিনি জানান যে শব্দ, জ্ঞান, সুর এবং যজ্ঞের মধ্যেও তাঁর প্রকাশ রয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, “পিতাহমস্য জগতো মাতা ধাতা পিতামহঃ” কেবল একটি ধর্মীয় উক্তি নয়। এটি অস্তিত্বের একটি সমন্বিত দর্শন। পিতা এখানে উৎসের প্রতীক। মাতা আশ্রয় ও পুষ্টির প্রতীক। ধাতা স্থিতি ও ধারণের প্রতীক। পিতামহ আদিকারণের প্রতীক। বেদ্য চূড়ান্ত জ্ঞানের প্রতীক। পবিত্র অন্তরের শুদ্ধতার প্রতীক। ওঙ্কার পরম সত্যের ধ্বনির প্রতীক। ঋক্ জ্ঞানের প্রতীক। সাম সেই জ্ঞানের সুরেলা প্রকাশের প্রতীক। যজুঃ কর্ম ও নিবেদনের প্রতীক। সবকিছু মিলিয়ে কৃষ্ণ এখানে এমন এক পরম সত্যের কথা বলছেন, যিনি জগতের বাইরে কোনো দূরবর্তী সত্তা নন, বরং জগতের উৎস, আশ্রয়, স্থিতি, জ্ঞান এবং অন্তর্নিহিত ঐক্যের ভিত্তি। এই উপলব্ধিই শ্লোকটিকে কেবল পাঠের বিষয় না রেখে আত্মঅনুসন্ধানের এক গভীর দরজায় পরিণত করে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি