সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.১৮ — পরম গতি, ভর্তা, সাক্ষী, নিবাস, শরণ ও সুহৃদরূপে ঈশ্বরের তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
গতির্ভর্তা প্রভুঃ সাক্ষী নিবাসঃ শরণং সুহৃৎ। প্রভবঃ প্রলয়ঃ স্থানং নিধানং বীজমব্যয়ম্।।১৮।।
গতির্ভর্তা প্রভুঃ সাক্ষী নিবাসঃ শরণং সুহৃৎ। 
প্রভবঃ প্রলয়ঃ স্থানং নিধানং বীজমব্যয়ম্।।১৮।।

অনুবাদঃ আমি সকলের গতি, ভর্তা, প্রভু, সাক্ষী, নিবাস, শরণ ও সুহৃৎ। আমিই উৎপত্তি, নাশ, স্থিতি, আশ্রয় ও অব্যয় বীজ। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপ উপলব্ধির এক অসাধারণ দার্শনিক প্রকাশ। এখানে কৃষ্ণ নিজেকে কেবল একজন উপাস্য দেবতা হিসেবে পরিচয় দেননি। তিনি নিজেকে জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য, জীবনের ধারক, সর্বোচ্চ অধিপতি, প্রত্যেক কর্মের সাক্ষী, সমস্ত অস্তিত্বের নিবাস, পরম আশ্রয় এবং নিঃস্বার্থ সুহৃদ হিসেবে প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন যে তিনিই সমস্ত সৃষ্টির উৎপত্তি, প্রলয়, স্থিতির ভিত্তি, অন্তিম নিধান এবং অবিনশ্বর বীজ। ফলে এই একটি শ্লোকের মধ্যে ঈশ্বরতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, চেতনতত্ত্ব, ভক্তিতত্ত্ব এবং মানবজীবনের গভীর দর্শন একত্রিত হয়েছে।

শ্লোকটির শুরুতেই এসেছে গতিঃ শব্দটি। সংস্কৃত গতি শব্দটি গম্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। গম্ অর্থ যাওয়া বা গমন করা। গতি তাই প্রথম অর্থে চলন বা গমন বোঝালেও গীতার এই প্রসঙ্গে এর অর্থ অনেক গভীর। এখানে গতি বলতে কেবল কোথাও যাওয়ার পথ বোঝানো হয় না। এর অর্থ জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য বা পরম পরিণতি। মানুষ সারাজীবন কোনো না কোনো লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। কেউ সম্পদের দিকে যায়, কেউ জ্ঞানের দিকে যায়, কেউ সম্মানের দিকে যায়, কেউ ভালোবাসার দিকে যায় এবং কেউ সত্যের অনুসন্ধানে এগিয়ে চলে। কিন্তু কৃষ্ণ যখন নিজেকে গতি বলছেন, তখন তিনি জানিয়ে দিচ্ছেন যে সমস্ত বাহ্যিক আকাঙ্ক্ষার অন্তরালে মানুষের প্রকৃত চূড়ান্ত গন্তব্য পরম সত্যের দিকে। অর্থাৎ জীবনের যাত্রার শেষ অর্থ যদি সত্য, চেতনা ও পরম অস্তিত্বের উপলব্ধি হয়, তবে সেই পরম গন্তব্যই কৃষ্ণ।

এরপর এসেছে ভর্তা শব্দটি। ভর্তা শব্দটি ভৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ভৃ অর্থ ধারণ করা, বহন করা, পালন করা বা রক্ষা করা। সেই অর্থে ভর্তা হলেন যিনি ধারণ করেন এবং পালন করেন। কৃষ্ণ নিজেকে ভর্তা বলার মাধ্যমে বোঝাচ্ছেন যে সমগ্র জীবজগৎ তাঁর উপর নির্ভরশীল। আমরা মনে করি আমরা নিজেদের জীবন নিজেরাই পরিচালনা করি। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় আমাদের অস্তিত্ব অসংখ্য অদৃশ্য ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। বায়ু, জল, আলো, খাদ্য, প্রকৃতি, পৃথিবী এবং অসংখ্য জীবনের পারস্পরিক সম্পর্ক আমাদের অস্তিত্বকে ধারণ করে। গীতার দৃষ্টিতে এই সমস্ত ধারণ ও রক্ষার অন্তর্নিহিত ভিত্তি হল পরম সত্তা। তাই ভর্তা শব্দটি আমাদের শেখায় যে মানুষ স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল হলেও সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।

প্রভুঃ শব্দটি এই উপলব্ধিকে আরও একটি স্তরে নিয়ে যায়। প্রভু বলতে বোঝায় অধিপতি, কর্তৃত্বসম্পন্ন সত্তা বা সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক। এখানে প্রভুত্ব কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতার অর্থ বহন করে না। মানুষের ক্ষমতা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। রাজা ক্ষমতা হারাতে পারেন, রাষ্ট্রের সীমা বদলাতে পারে, সম্পদ নষ্ট হতে পারে এবং মানুষের প্রভাব একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু কৃষ্ণের প্রভুত্ব সেই সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মতো নয়। তিনি সেই পরম কর্তৃত্বের প্রতীক যার উপর সমস্ত অস্তিত্বের নিয়ম প্রতিষ্ঠিত। এই কারণে প্রভু শব্দটি মানুষের অহংকারকে ছোট করে এবং তাকে অস্তিত্বের বৃহত্তর সত্যের সামনে বিনম্র হতে শেখায়।

এরপর আসে সাক্ষী শব্দটি। গীতার দর্শনে সাক্ষী একটি অত্যন্ত গভীর চেতনতাত্ত্বিক ধারণা। সাধারণ জীবনে সাক্ষী বলতে আমরা এমন একজনকে বুঝি যিনি কোনো ঘটনা নিজের চোখে দেখেছেন। কিন্তু আধ্যাত্মিক দর্শনে সাক্ষী হল সেই চেতনা যা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, ইচ্ছা এবং অভিজ্ঞতাকে প্রত্যক্ষ করে। মানুষের মনে কখনো আনন্দ আসে, কখনো দুঃখ আসে, কখনো রাগ আসে, কখনো ভয় আসে। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি যে এই অনুভূতিগুলো আমাদের মধ্যে ঘটছে। তাহলে যে সত্তা অনুভূতিকে অনুভব করছে এবং চিন্তাকে চিনতে পারছে, সেই প্রত্যক্ষ চেতনার ধারণাই সাক্ষী চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত। মেঘ যেমন আকাশে আসে এবং চলে যায়, তেমনি চিন্তা ও অনুভূতিও আসে এবং চলে যায়। কিন্তু যে চেতনা তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকে, তার গভীরতর স্তরকে সাক্ষী হিসেবে ভাবা যায়। কৃষ্ণ যখন নিজেকে সাক্ষী বলছেন, তখন তিনি জীবনের অন্তর্গত সেই সর্বব্যাপী চেতনার দিকে ইঙ্গিত করছেন যা সমস্ত অভিজ্ঞতার নীরব প্রত্যক্ষদর্শী।

নিবাসঃ শব্দটির মধ্যেও রয়েছে গভীর তাৎপর্য। নিবাস শব্দটি নি এবং বাস ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। বাস অর্থ অবস্থান করা বা বাস করা। নিবাস অর্থ বাসস্থান বা আবাস। কিন্তু এখানে কৃষ্ণ কোনো ভৌগোলিক স্থানকে বোঝাচ্ছেন না। তিনি নিজেকে সমস্ত অস্তিত্বের নিবাস হিসেবে প্রকাশ করছেন। অর্থাৎ জীব ও জগতের অস্তিত্ব যে পরম সত্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত, সেই পরম সত্যই কৃষ্ণ। আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, সেই পৃথিবীও বৃহত্তর মহাজাগতিক ব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান করছে। আবার সেই মহাজাগতিক অস্তিত্বও একটি পরম ভিত্তির উপর নির্ভরশীল। গীতার ভাষায় সেই পরম ভিত্তিই নিবাস।

শরণং শব্দটি মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। শরণ অর্থ আশ্রয়। মানুষ যখন নিজের শক্তির সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে এবং কোনো বৃহত্তর সত্যের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তখন শরণাগতির সূচনা হয়। এখানে শরণ মানে দুর্বল হয়ে পড়া নয়। বরং নিজের সীমাবদ্ধ অহংকারকে অতিক্রম করে সত্যের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করা। জীবনের অনেক সময় মানুষ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় যেখানে নিজের জ্ঞান, শক্তি ও পরিকল্পনা যথেষ্ট মনে হয় না। তখন সে এমন একটি আশ্রয় খোঁজে যার উপর নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করা যায়। গীতায় কৃষ্ণ সেই পরম আশ্রয়ের প্রতীক।

এই শ্লোকের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী শব্দগুলোর একটি হলো সুহৃৎ। সুহৃৎ শব্দটি সু এবং হৃৎ এই দুই ভাবের সঙ্গে যুক্ত। সু অর্থ শুভ বা মঙ্গল এবং হৃৎ অর্থ হৃদয়। অর্থাৎ সুহৃৎ হলেন সেই ব্যক্তি যার হৃদয় শুভ এবং যিনি অন্যের কল্যাণ চান। মিত্র ও সুহৃৎ শব্দের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। মিত্রের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সুহৃৎ এমন একজন যিনি প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়াই অন্যের মঙ্গল চান। কৃষ্ণ নিজেকে সুহৃৎ বলে যে পরিচয় দিয়েছেন, তার মধ্যে ঈশ্বরের এক অত্যন্ত মানবিক ও স্নেহময় রূপ প্রকাশ পায়। তিনি শুধু শক্তির অধিকারী প্রভু নন। তিনি জীবের অন্তর্নিহিত কল্যাণকামী। এই কারণে ভক্তির ক্ষেত্রে কৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু ভয় বা কর্তব্যের সম্পর্ক নয়। এটি বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং আশ্রয়ের সম্পর্ক।

শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে কৃষ্ণ বলেন তিনি প্রভব, প্রলয়, স্থান, নিধান এবং অব্যয় বীজ। প্রভব অর্থ উৎপত্তি বা উদ্ভব। এটি ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কোনো কিছুর প্রকাশ বা জন্মের ধারণা বহন করে। অর্থাৎ সমস্ত সৃষ্টির যে উৎস, কৃষ্ণ সেই উৎস। কোনো বস্তু, জীব বা জগত হঠাৎ শূন্য থেকে প্রকাশিত হয় না। তার পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকে। গীতার এই দর্শনে সমস্ত প্রকাশের অন্তর্নিহিত পরম কারণ হল কৃষ্ণ।

এর বিপরীতে রয়েছে প্রলয়। প্রলয় শব্দটি লী ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ লীন হওয়া বা বিলীন হওয়া। সাধারণভাবে প্রলয় বলতে ধ্বংস বোঝানো হলেও ভারতীয় দর্শনে প্রলয়ের অর্থ আরও গভীর। এটি শুধু ধ্বংস নয়, বরং প্রকাশিত রূপের মূল অবস্থায় প্রত্যাবর্তন। যা প্রকাশিত হয়েছে তা একদিন বিলীন হবে। শরীরের জন্ম হয় এবং একদিন শরীরের অবসান ঘটে। সভ্যতা তৈরি হয় এবং একদিন পরিবর্তিত হয়। নক্ষত্র জন্মায় এবং একদিন তারও পরিণতি ঘটে। এই পরিবর্তনশীলতার অন্তিম সত্যকে প্রলয় ধারণার মাধ্যমে বোঝানো হয়। কৃষ্ণ নিজেকে প্রলয় বলছেন অর্থাৎ সৃষ্টি যেমন তাঁর মধ্যে প্রকাশিত হয়, তেমনি তার অন্তিম প্রত্যাবর্তনও তাঁর মধ্যেই।

স্থান শব্দটি স্থা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। স্থা অর্থ দাঁড়ানো বা স্থিত হওয়া। স্থান তাই এমন একটি ভিত্তিকে বোঝায় যেখানে কোনো কিছু অবস্থান করে। কৃষ্ণ নিজেকে স্থান বলার মাধ্যমে বোঝাচ্ছেন যে তিনি কেবল সৃষ্টির উৎস নন, সৃষ্টির স্থিতির ভিত্তিও। সৃষ্টি কোথা থেকে এসেছে সেটি একটি প্রশ্ন, কিন্তু সৃষ্টি কোথায় অবস্থান করছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রভব উৎপত্তির কথা বলে, স্থান স্থিতির কথা বলে এবং প্রলয় প্রত্যাবর্তনের কথা বলে। এই তিনটি শব্দ একসঙ্গে সৃষ্টির সম্পূর্ণ চক্রকে প্রকাশ করে।

নিধান শব্দটিও অত্যন্ত গভীর। এটি নি এবং ধা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ধা অর্থ রাখা বা স্থাপন করা। নিধান অর্থ যেখানে কোনো কিছু নিহিত বা সংরক্ষিত থাকে। এই অর্থে কৃষ্ণ হলেন সমস্ত অস্তিত্বের অন্তিম আধার। যা প্রকাশিত হয় তা তাঁর থেকেই আসে, যা অবস্থান করে তা তাঁর উপর নির্ভর করে এবং যা লীন হয় তা শেষ পর্যন্ত তাঁর মধ্যেই নিহিত হয়। এখানে কৃষ্ণকে একটি মহাজাগতিক ভাণ্ডার বা অস্তিত্বের গভীরতম আধার হিসেবে কল্পনা করা যায়। জগতের দৃশ্যমান পরিবর্তনের অন্তরালে যে অপরিবর্তনীয় ভিত্তি রয়েছে, নিধান সেই ভিত্তির প্রতীক।

সবশেষে এসেছে অব্যয় বীজম্। বীজ সাধারণত সম্ভাবনার প্রতীক। একটি ছোট বীজের মধ্যে একটি বিশাল বৃক্ষের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। বীজ নিজে ক্ষুদ্র হলেও তার মধ্যে ভবিষ্যতের বিস্তার নিহিত থাকে। গীতার বীজ ধারণাটি আরও গভীর। অব্যয় অর্থ যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। তাই অব্যয় বীজ হল সেই অবিনশ্বর মূল কারণ, যার মধ্যে অসংখ্য প্রকাশের সম্ভাবনা নিহিত থাকে অথচ যা নিজে নিঃশেষিত হয় না। জগতের অসংখ্য রূপ পরিবর্তিত হয়, জন্ম নেয় এবং বিলীন হয়, কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত পরম কারণ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। এই কারণেই অব্যয় বীজ শব্দবন্ধটি গীতার সৃষ্টিতত্ত্বের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীক।

এই পুরো শ্লোকটিকে একসঙ্গে দেখলে একটি অসাধারণ অস্তিত্বতত্ত্ব প্রকাশিত হয়। কৃষ্ণ হলেন গতি অর্থাৎ জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য। তিনি ভর্তা অর্থাৎ জীবনের ধারক। তিনি প্রভু অর্থাৎ সর্বোচ্চ অধিপতি। তিনি সাক্ষী অর্থাৎ সমস্ত অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি নিবাস অর্থাৎ সমস্ত অস্তিত্বের আবাস। তিনি শরণ অর্থাৎ জীবের পরম আশ্রয়। তিনি সুহৃৎ অর্থাৎ নিঃস্বার্থ মঙ্গলকামী। তিনি প্রভব অর্থাৎ সমস্ত সৃষ্টির উৎস। তিনি প্রলয় অর্থাৎ সমস্ত প্রকাশের অন্তিম লয়। তিনি স্থান অর্থাৎ অস্তিত্বের ভিত্তি। তিনি নিধান অর্থাৎ সমস্ত কিছুর অন্তিম আধার। এবং তিনি অব্যয় বীজ অর্থাৎ সমগ্র প্রকাশের অবিনশ্বর মূল কারণ।

এই কারণে শ্লোকটি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের একটি বক্তব্য নয়। এটি মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি গভীর প্রশ্নও উত্থাপন করে। মানুষ কোথা থেকে এসেছে, কোথায় অবস্থান করছে, কোথায় ফিরে যাবে এবং তার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই মানুষ দর্শনের জন্ম দিয়েছে। গীতার উত্তর হলো জীবনের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর পেছনে একটি ঐক্যবদ্ধ পরম সত্য রয়েছে। সেই সত্যই সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের অন্তর্নিহিত ভিত্তি।

মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের তাৎপর্য অসীম। গতি আমাদের জিজ্ঞাসা করতে শেখায় আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি। ভর্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা একা নই এবং আমাদের অস্তিত্ব অসংখ্য সহায়তার উপর নির্ভরশীল। প্রভু আমাদের অহংকারকে সংযত করে। সাক্ষী আমাদের নিজের চিন্তা ও অনুভূতিকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখায়। নিবাস আমাদের অস্তিত্বের গভীর ভিত্তি খুঁজতে সাহায্য করে। শরণ আমাদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে বৃহত্তর সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শেখায়। সুহৃৎ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃত সম্পর্কের মূল হলো নিঃস্বার্থ মঙ্গল। আর অব্যয় বীজ আমাদের দেখায় যে পরিবর্তনের অন্তরালে একটি অপরিবর্তনীয় সত্যের সন্ধান করা সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, গীতা ৯.১৮ এর এই শ্লোকটি কৃষ্ণের একটি বহুমাত্রিক পরিচয় তুলে ধরে। তিনি একই সঙ্গে পথ এবং গন্তব্য, ধারক এবং অধিপতি, দর্শক এবং আশ্রয়, উৎস এবং পরিণতি, ভিত্তি এবং অন্তিম আধার। তাঁর মধ্যে সৃষ্টি ও লয়ের বিরোধও এক হয়ে যায়। তিনি জীবনের শুরুতে যেমন উপস্থিত, তেমনি তার অন্তিম পরিণতিতেও উপস্থিত। আর সুহৃৎ শব্দটি এই মহাজাগতিক দর্শনের মধ্যে মানবিক উষ্ণতা এনে দেয়। সর্বশক্তিমান সেই পরম সত্তাই আবার জীবের নিঃস্বার্থ মঙ্গলকামী। তাই এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো মানুষ যখন নিজের জীবনের গতি, নিজের অস্তিত্বের ভিত্তি এবং নিজের অন্তরের সাক্ষীকে উপলব্ধি করতে শুরু করে, তখন তার ঈশ্বরচেতনা কেবল বাহ্যিক উপাসনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ধীরে ধীরে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি পরিবর্তন এবং নিজের অন্তরের গভীরতম নীরবতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এই উপলব্ধিতেই গীতা ৯.১৮ এর প্রকৃত গভীরতা নিহিত।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি