সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.১৯ — তাপ, বৃষ্টি, অমৃত, মৃত্যু এবং সৎ-অসতের মধ্যে ঈশ্বরের সর্বব্যাপী স্বরূপ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
তপাম্যহমহং বর্ষং নিগৃহ্নাম্যুৎসৃজামি চ। অমৃতং চৈব মৃত্যুশ্চ সদসচ্চাহমর্জুন।।১৯।।
তপাম্যহমহং বর্ষং নিগৃহ্নাম্যুৎসৃজামি চ। 
অমৃতং চৈব মৃত্যুশ্চ সদসচ্চাহমর্জুন।।১৯।।

অনুবাদঃ হে অর্জুন! আমি তাপ প্রদান করি এবং আমি বৃষ্টি বর্ষণ করি ও আকর্ষণ করি। আমি অমৃত এবং আমি মৃত্যু। জড় ও চেতন বস্তু উভয়ই আমার মধ্যে। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায় রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগের উনিশতম শ্লোকটি শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বব্যাপী সত্তার এক অসাধারণ প্রকাশ। এখানে কৃষ্ণ নিজেকে কেবল জীবনের আনন্দ, কল্যাণ ও সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত করেননি। তিনি একই সঙ্গে তাপ, বৃষ্টি, অমৃত, মৃত্যু, সৎ এবং অসতের মধ্যেও নিজের উপস্থিতির কথা ঘোষণা করেছেন। শ্লোকটি হলো তপাম্যহমহং বর্ষং নিগৃহ্নাম্যুৎসৃজামি চ। অমৃতং চৈব মৃত্যুশ্চ সদসচ্চাহমর্জুন। এর সহজ অর্থ হলো, হে অর্জুন, আমিই তাপ দিই, আমিই বৃষ্টি ধারণ করি এবং আমিই তা বর্ষণ করি। আমিই অমৃত এবং আমিই মৃত্যু। আমিই সৎ এবং অসৎ।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ তপামি। এটি সংস্কৃত তপ্ ধাতু থেকে এসেছে। তপ্ ধাতুর অর্থ তাপ দেওয়া, উত্তপ্ত করা, দীপ্ত হওয়া এবং তপস্যা করা। তাই তপ শব্দের মধ্যে শুধু আগুনের উত্তাপের ধারণা নেই। এর মধ্যে আত্মশুদ্ধি ও রূপান্তরের একটি গভীর ভাবও রয়েছে। যেমন আগুনে স্বর্ণ উত্তপ্ত হয়ে মলিনতা হারিয়ে বিশুদ্ধ হয়, তেমনি জীবনের তাপ ও কঠিন অভিজ্ঞতা মানুষের অন্তরকে পরিণত করতে পারে। কৃষ্ণ যখন বলেন আমিই তাপ দিই, তখন তিনি সূর্যের তাপের মতো প্রকৃতির একটি মৌলিক শক্তির দিকে ইঙ্গিত করছেন। একই সঙ্গে তিনি বোঝাচ্ছেন যে জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতাগুলিও বৃহত্তর সত্যের বাইরে নয়।

এরপর আসে অহম শব্দটি। অহম অর্থ আমি। কিন্তু এখানে এই আমি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত অহংকারের আমি নয়। কৃষ্ণ এখানে সীমাবদ্ধ ব্যক্তিসত্তার পরিচয় দিচ্ছেন না। তিনি সেই পরম ঈশ্বরীয় সত্তার কথা বলছেন যিনি বিশ্বপ্রকৃতির নানা কার্যকলাপের অন্তর্নিহিত ভিত্তি। এই শ্লোকে আমি শব্দটির পুনরাবৃত্তি তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কৃষ্ণ যেন বলছেন, প্রকৃতির বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর মধ্যে যে ঐক্য রয়েছে, তার অন্তরে যে একক পরম সত্য রয়েছে, সেই সত্যই আমি।

বর্ষ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত বর্ষ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দমূল থেকে। এর অর্থ বৃষ্টি বা বর্ষণ। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে বৃষ্টি ছিল জীবনধারণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বৃষ্টি মানে কৃষি, খাদ্য, উর্বরতা এবং জীবনের ধারাবাহিকতা। তাই কৃষ্ণের বর্ষণ সম্পর্কিত বক্তব্য কেবল আবহাওয়ার একটি সাধারণ ঘটনা নয়। এটি প্রকৃতির জীবনদায়ী শক্তির প্রতীক। সূর্যের তাপ যেমন পৃথিবীর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে সক্রিয় রাখে, তেমনি বৃষ্টি পৃথিবীকে সিক্ত করে জীবনের বিকাশ ঘটায়। এই দুই বিপরীত প্রকৃতির শক্তিকেই কৃষ্ণ নিজের প্রকাশ হিসেবে দেখিয়েছেন।

নিগৃহ্ণামি শব্দটি নি উপসর্গ এবং গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত সংস্কৃত ধাতু থেকে গঠিত। এর মধ্যে ধরে রাখা, ধারণ করা, সংযত করা এবং নিয়ন্ত্রণ করার ভাব রয়েছে। কৃষ্ণ বলেন, আমিই বৃষ্টি ধারণ করি। অর্থাৎ প্রকৃতির প্রবাহ কখন সংযত হবে এবং কখন প্রকাশিত হবে, সেই নিয়ন্ত্রণও ঈশ্বরীয় ব্যবস্থার অংশ। এর পরেই এসেছে উৎসৃজামি শব্দটি। উৎ এবং সৃজ ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত এই শব্দের অর্থ বাইরে প্রবাহিত করা, মুক্ত করে দেওয়া বা প্রকাশ করা। অর্থাৎ কৃষ্ণ একদিকে ধারণ করেন, অন্যদিকে মুক্ত করেন। একদিকে সংযম, অন্যদিকে প্রকাশ। একদিকে স্থিতি, অন্যদিকে প্রবাহ। প্রকৃতির ভারসাম্য এই দুই প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত।

এই দুটি শব্দকে পাশাপাশি রাখলে শ্লোকটির একটি গভীর জীবনদর্শন প্রকাশ পায়। জীবনে সবকিছু ধরে রাখাও যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সবকিছু ছেড়ে দেওয়াও প্রজ্ঞার পরিচয় নয়। কখন ধারণ করতে হবে এবং কখন মুক্ত করতে হবে, কখন সংযত হতে হবে এবং কখন নিজের শক্তিকে প্রবাহিত করতে হবে, এই ভারসাম্যই পরিপক্ব জীবনের লক্ষণ। প্রকৃতির জলচক্র থেকে শুরু করে মানুষের চিন্তা ও আবেগ পর্যন্ত সর্বত্র এই ধারণ ও মুক্তির প্রক্রিয়া কাজ করে।

এরপর কৃষ্ণ এমন দুটি শব্দ ব্যবহার করেন যেগুলো ভারতীয় দর্শনের অন্যতম গভীর ধারণাকে ধারণ করে। একটি হলো অমৃত এবং অন্যটি মৃত্যু। অমৃত শব্দটি মূলত অ এবং মৃতের সমন্বয়ে গঠিত। মৃত শব্দটি মৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ মৃত্যু বা বিনষ্ট হওয়া। তাই অমৃতের আক্ষরিক অর্থ হলো যা মৃত নয়, যা মৃত্যুকে অতিক্রম করেছে। ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় অমৃত শুধু কোনো পৌরাণিক পানীয় নয়। এটি অমরত্ব, অবিনাশিতা এবং চিরন্তন সত্যের প্রতীক। মানুষের গভীরতম আকাঙ্ক্ষার মধ্যে যে মৃত্যুকে অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, অমৃত সেই আকাঙ্ক্ষারই প্রতীকী প্রকাশ।

অন্যদিকে মৃত্যু শব্দটি মৃ ধাতু থেকে এসেছে এবং জীবনের একটি নির্দিষ্ট অবস্থার অবসানকে নির্দেশ করে। সাধারণ মানুষের কাছে মৃত্যু ভয়, বিচ্ছেদ ও সমাপ্তির প্রতীক। কিন্তু গীতার বৃহত্তর দর্শনে মৃত্যু কেবল একটি শেষ নয়। এটি পরিবর্তনের একটি অনিবার্য পর্যায়। দেহ পরিবর্তিত হয়, জীবন এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় যায় এবং জগতের সমস্ত দৃশ্যমান রূপ ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্যে থাকে। কৃষ্ণ যখন বলেন আমিই মৃত্যু, তখন তিনি মানুষের মৃত্যুভয়কে অস্বীকার করছেন না। বরং তিনি মৃত্যুকেও সেই বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে শেখাচ্ছেন যার অন্তর্নিহিত সত্য ঈশ্বরীয়।

এখানে শ্লোকটির একটি অত্যন্ত গভীর দার্শনিক দিক প্রকাশিত হয়। মানুষ সাধারণত ঈশ্বরকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সুখে ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া সহজ। কিন্তু মৃত্যু, ক্ষয়, বিচ্ছেদ ও পরিবর্তনের মধ্যে ঈশ্বরকে অনুভব করা কঠিন। কৃষ্ণ সেই সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙে দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, অমৃত যেমন আমার প্রকাশ, মৃত্যুও তেমনি আমার বিশ্বব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। এর অর্থ এই নয় যে নৈতিকভাবে ভালো ও মন্দ একই জিনিস। বরং এর অর্থ হলো, জীবনের সমগ্র চক্রকে কোনো একটি পছন্দসই অংশে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

এরপর আসে সৎ এবং অসৎ। সৎ শব্দটি অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। সংস্কৃত অস্ ধাতুর অর্থ থাকা বা অস্তিত্বশীল হওয়া। সেই ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত সৎ শব্দের অর্থ হতে পারে যা আছে, যা সত্য, যা বাস্তব এবং যা অস্তিত্বশীল। অন্যদিকে অসৎ হলো অ এবং সৎ এর সমন্বয়। এর অর্থ প্রসঙ্গ অনুযায়ী অনস্তিত্ব, অপ্রকাশ, পরিবর্তনশীলতা অথবা স্থায়ী বাস্তবতার বিপরীত কোনো স্তর। এই শব্দদুটিকে শুধু ভালো ও খারাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে শ্লোকটির দার্শনিক গভীরতা অনেকটাই হারিয়ে যায়। এখানে সৎ এবং অসৎ মূলত অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব, প্রকাশ ও অপ্রকাশ এবং স্থায়িত্ব ও পরিবর্তনশীলতার বৃহত্তর দার্শনিক প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে।

এই কারণে শ্লোকটির কেন্দ্রীয় বক্তব্যকে বলা যায় বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের দর্শন। তাপ ও বৃষ্টি পরস্পর ভিন্ন। ধারণ ও মুক্তি পরস্পর বিপরীতমুখী। অমৃত ও মৃত্যু একে অপরের বিপরীত। সৎ ও অসৎও বিপরীত ধারণা। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন এই সমস্ত বিপরীততার অন্তর্নিহিত ভিত্তি তিনিই। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেখাচ্ছেন যে মানুষের দৃষ্টিতে যে জগৎ অসংখ্য বিচ্ছিন্ন অংশে বিভক্ত, পরম সত্যের দৃষ্টিতে সেই জগতের মধ্যে একটি গভীর ঐক্য রয়েছে।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোককে আরও গভীরভাবে বোঝা যায়। অদ্বৈত দর্শনে চূড়ান্ত বাস্তবতা এক এবং অবিভক্ত। বহুরূপী জগত সেই এক পরম বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান বিভিন্ন নাম ও রূপের মধ্যে পার্থক্য দেখতে পায়। কিন্তু জ্ঞানের গভীর স্তরে সেই সমস্ত বৈচিত্র্যের অন্তর্নিহিত ঐক্য উপলব্ধি করা যায়। কৃষ্ণের আমি তাই কেবল একটি ব্যক্তিগত সত্তার আমি নয়। এটি পরম বাস্তবতার সর্বব্যাপী প্রকাশ হিসেবেও বোঝা যায়।

ভক্তির দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির তাৎপর্য অসাধারণ। একজন ভক্ত যদি সত্যিই কৃষ্ণকে সর্বত্র দেখতে শেখে, তবে তার কাছে ঈশ্বর কেবল মন্দিরের দেবমূর্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন না। সূর্যের তাপ তাকে কৃষ্ণের কথা মনে করিয়ে দেবে। বৃষ্টির জল তাকে কৃষ্ণের করুণার কথা স্মরণ করাবে। জীবনের আনন্দ তাকে ঈশ্বরের কৃপা অনুভব করাবে এবং মৃত্যুর অনিবার্যতা তাকে জীবনের গভীর সত্যের দিকে ফিরিয়ে দেবে। এইভাবে ভক্তির দৃষ্টি জগতকে ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন না দেখে ঈশ্বরীয় উপস্থিতির বহুমাত্রিক প্রকাশ হিসেবে উপলব্ধি করে।

শ্লোকটির মনোবৈজ্ঞানিক তাৎপর্যও গভীর। মানুষের জীবনে সুখ এবং দুঃখ, সাফল্য এবং ব্যর্থতা, আশা এবং হতাশা, অর্জন এবং হারানো সবই আসে। মানুষ সাধারণত সুখকে গ্রহণ করতে চায় এবং দুঃখকে প্রত্যাখ্যান করতে চায়। কিন্তু জীবনকে কেবল আনন্দের অংশ দিয়ে বোঝা যায় না। তাপ যেমন প্রকৃতির অংশ, তেমনি বৃষ্টিও প্রকৃতির অংশ। একইভাবে কঠিন অভিজ্ঞতাও মানুষের বিকাশের একটি অংশ হতে পারে। জীবনের প্রতিটি কষ্ট ভালো নয় এবং প্রতিটি দুঃখকে মহিমান্বিত করাও উচিত নয়। কিন্তু প্রতিকূলতার মধ্যেও শেখা, পরিণত হওয়া এবং নিজের গভীরতর সত্তাকে আবিষ্কার করার সুযোগ থাকে। এই দৃষ্টিতে তপ শব্দের মধ্যে থাকা তাপ ও রূপান্তরের ভাবটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

একজন কৃষকের জীবন এই শ্লোকের একটি সুন্দর উপমা হতে পারে। প্রচণ্ড রোদ যেমন জমির ওপর প্রভাব ফেলে, তেমনি বৃষ্টি ছাড়া ফসলের বিকাশ সম্ভব নয়। অতিরিক্ত তাপ ক্ষতিকর হতে পারে, আবার অতিরিক্ত বৃষ্টিও ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই প্রকৃতির ভারসাম্য সৃষ্টি হয় বিভিন্ন শক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে। কৃষকের কাছে আকাশের তাপ ও বৃষ্টি আলাদা ঘটনা হলেও বৃহত্তর কৃষিজীবনের কাছে তারা একই প্রাকৃতিক চক্রের অংশ। কৃষ্ণের বক্তব্যও এমনই। যা মানুষের চোখে বিচ্ছিন্ন, বৃহত্তর সত্যের দৃষ্টিতে তা একই বিশ্বব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত।

আধুনিক মানুষও এই শ্লোক থেকে গভীর শিক্ষা নিতে পারে। আমরা প্রায়ই জীবনের একটি নির্দিষ্ট রূপ চাই। আমরা সাফল্য চাই কিন্তু ব্যর্থতা চাই না। আনন্দ চাই কিন্তু দুঃখ চাই না। অর্জন চাই কিন্তু হারানোর অভিজ্ঞতা চাই না। স্থায়িত্ব চাই কিন্তু পরিবর্তন মেনে নিতে চাই না। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম আমাদের শেখায় যে পরিবর্তন অনিবার্য। জীবন প্রবাহমান। যে জিনিস আজ আছে, কাল তা অন্য রূপ নিতে পারে। এই সত্যকে বুঝতে পারলে মানুষ জীবনের প্রতি আরও বাস্তবসম্মত এবং গভীর দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত মানুষের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিকে প্রসারিত করা। আমরা কোনো একটি ঘটনা দেখে সেটিকে ভালো বা খারাপ, সুখকর বা দুঃখকর, লাভ বা ক্ষতি হিসেবে বিচার করি। কিন্তু মহাজাগতিক দৃষ্টিতে একটি ঘটনার অর্থ অনেক বৃহত্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কৃষ্ণ তাই অর্জুনকে কেবল বাহ্যিক ঘটনা দেখতে বলছেন না। তিনি তাকে সেই গভীর সত্য দেখতে শেখাচ্ছেন যার মধ্যে সমস্ত ঘটনা সংঘটিত হয়।

তপাম্যহমহং বর্ষং শ্লোকটি শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে এক মহৎ দার্শনিক উপলব্ধি নিয়ে আসে। ঈশ্বরকে যদি শুধু আনন্দের মধ্যে খোঁজা হয়, তবে ঈশ্বরের ধারণা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ঈশ্বরকে কেবল জীবনের সূচনায় দেখলে জীবনের সমাপ্তির রহস্য অজানা থেকে যায়। কিন্তু কৃষ্ণ যখন বলেন আমিই তাপ, আমিই বৃষ্টি, আমিই অমৃত, আমিই মৃত্যু, আমিই সৎ এবং অসৎ, তখন তিনি জগতের সমস্ত বিপরীত অভিজ্ঞতার অন্তর্নিহিত একত্বের দিকে ইঙ্গিত করেন।

এই শ্লোকের ভাষাগত সৌন্দর্য তার দর্শনের গভীরতার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। তপ শব্দে রয়েছে তাপ ও সাধনার ইঙ্গিত। বর্ষ শব্দে রয়েছে জীবনের সঞ্জীবনী প্রবাহ। নিগৃহ্ণামি ধারণ ও সংযমের কথা বলে। উৎসৃজামি মুক্তি ও প্রকাশের কথা বলে। অমৃত চিরন্তনতার আকাঙ্ক্ষা বহন করে। মৃত্যু অনিত্যতার সত্যকে সামনে আনে। সৎ অস্তিত্ব ও সত্যের দিকে নির্দেশ করে। অসৎ নির্দেশ করে অনস্তিত্ব, অপ্রকাশ অথবা পরিবর্তনশীলতার দিকে। আর এই সমস্ত ধারণার কেন্দ্রে বারবার ফিরে আসে অহম। সেই আমি ব্যক্তিগত অহংকারের আমি নয়। সেই আমি সর্বব্যাপী ঈশ্বরীয় সত্তার আমি।

অতএব শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই উনিশতম শ্লোক আমাদের শেখায় যে জগৎকে খণ্ডিত করে দেখলে তার প্রকৃত রহস্য উপলব্ধি করা যায় না। তাপ এবং বৃষ্টি, সৃষ্টি এবং ক্ষয়, অমৃত এবং মৃত্যু, প্রকাশ এবং অপ্রকাশ সবকিছুর মধ্যেই একটি গভীর ঐক্য রয়েছে। মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রা সেই ঐক্যকে উপলব্ধি করার যাত্রা। যখন মানুষ সুখের মধ্যে যেমন ঈশ্বরকে দেখতে শেখে, তেমনি জীবনের কঠিন সত্যের মধ্যেও ঈশ্বরীয় ব্যবস্থাকে উপলব্ধি করতে শেখে, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। তখন জগৎ কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি থাকে না। জগৎ হয়ে ওঠে এক পরম সত্যের বহুরূপী প্রকাশ। এই উপলব্ধিই তপাম্যহমহং বর্ষং শ্লোকের গভীরতম সৌন্দর্য এবং দার্শনিক মহিমা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি