সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.২২ — অনন্য ভক্তি, যোগক্ষেম ও ঈশ্বরের পরম আশ্রয়ের গভীর তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যুপাসতে।তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহম্।।২২।।
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যুপাসতে।
তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহম্।।২২।।

অনুবাদঃ অনন্যচিত্তে আমার চিন্তায় মগ্ন হয়ে, পরিপূর্ণ ভক্তি সহকারে যাঁরা সর্বদাই আমার উপাসনা করেন, তাঁদের সমস্ত অপ্রাপ্য বস্তু আমি বহন করি এবং তাঁদের প্রাপ্ত বস্তুর সংরক্ষণ করি।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের বাইশতম শ্লোকটি ভক্তি, একাগ্রতা, আত্মসমর্পণ এবং ঈশ্বরীয় আশ্রয়ের এক অসাধারণ সমন্বয়। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, অনন্যভাবে তাঁকে চিন্তা করে যারা একনিষ্ঠভাবে তাঁর উপাসনা করে এবং সর্বদা তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাদের যোগক্ষেমের ভার তিনি নিজেই বহন করেন। শ্লোকটির প্রতিটি শব্দের মধ্যে এমন একটি গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে, যা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়, মানুষের মন, জীবনবোধ, কর্তব্য, নিরাপত্তা এবং পরম আশ্রয়ের প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মানুষের চেতনা যখন অসংখ্য বিচ্ছিন্ন আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ছড়িয়ে না থেকে একটি পরম সত্যের দিকে নিবদ্ধ হয়, তখন তার জীবন এক নতুন ধরনের স্থিরতা লাভ করে।

শ্লোকটির শুরুতেই রয়েছে অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং। অনন্য শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং অন্য এই দুই অংশের সমন্বয়ে। অন্য অর্থ অপর বা ভিন্ন এবং অ নিষেধের ভাব প্রকাশ করে। তাই অনন্যের আক্ষরিক অর্থ অন্য নয়, অপরহীন বা দ্বিতীয়হীন। সাধারণ ব্যবহারে অনন্য শব্দের অর্থ অসাধারণ বা অতুলনীয় হলেও এই শ্লোকে তার অর্থ আরও গভীর। এখানে অনন্য বলতে বোঝানো হয়েছে এমন এক চেতনা, যার পরম আশ্রয় বিচ্ছিন্নভাবে বহু বাহ্যিক বিষয়ে ছড়িয়ে নেই। মানুষ সংসারে থাকবে, পরিবারকে ভালোবাসবে, নিজের কাজ করবে, জ্ঞান অর্জন করবে, সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে এবং জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির প্রতি মনোযোগ দেবে। তবু তার অন্তরের সর্বোচ্চ নির্ভরতার কেন্দ্র যদি এক পরম সত্য হয়, তাহলে সেই চেতনার মধ্যেই অনন্যতার প্রকাশ ঘটে।

চিন্তয়ন্তো শব্দটি এসেছে সংস্কৃত চিন্ত ধাতু থেকে। চিন্তার অর্থ শুধু উদ্বেগ করা নয়। সংস্কৃত অর্থে চিন্তা মানে কোনো বিষয়কে মনে ধারণ করা, তার উপর মনন করা এবং চেতনাকে তার দিকে নিবদ্ধ রাখা। তাই কৃষ্ণ যখন বলেন অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং, তখন তিনি শুধু ঈশ্বরের নাম মনে করার কথা বলছেন না। তিনি এমন এক অন্তর্গত স্মরণের কথা বলছেন, যেখানে ঈশ্বর মানুষের জীবনের চিন্তা ও মূল্যবোধের কেন্দ্র হয়ে ওঠেন। এটি দুশ্চিন্তা নয়, এটি চিন্তন। দুশ্চিন্তা মানুষের মনকে দুর্বল করে এবং ভবিষ্যতের ভয়ে আবদ্ধ করে। কিন্তু চিন্তন মানুষের মনকে একটি গভীর সত্যের দিকে স্থির করে।

এরপর আসে মাং শব্দটি। মাং অর্থ আমাকে। এই একটি শব্দের মধ্যেই শ্লোকটির ব্যক্তিগত ভক্তির রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৃষ্ণ এখানে কোনো দূরবর্তী বিমূর্ত সত্যের কথা বলছেন না। তিনি নিজেকে ভক্তের চিন্তার কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করছেন। ফলে গীতার ভক্তি শুধু কোনো মতবাদে বিশ্বাস নয়। এটি পরম সত্তার সঙ্গে একটি জীবন্ত সম্পর্ক। ভক্তের কাছে ঈশ্বর কেবল একটি দার্শনিক ধারণা নন। তিনি আশ্রয়, পথপ্রদর্শক এবং জীবনের চূড়ান্ত অর্থের কেন্দ্র।

শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শব্দ পর্যুপাসতে। এই শব্দটির ব্যুৎপত্তি অত্যন্ত সুন্দর। পরি, উপ এবং আস ধাতুর সমন্বয়ে এর গঠন। উপ অর্থ কাছে এবং আস ধাতুর অর্থ বসা বা অবস্থান করা। ফলে উপাসনার অন্তর্নিহিত অর্থ দাঁড়ায় নিকটে অবস্থান করা। পরি যুক্ত হওয়ায় এর মধ্যে সম্পূর্ণতা এবং সর্বাঙ্গীনতার ভাব আসে। তাই উপাসনা শুধু বাহ্যিক পূজা বা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার নয়। এর গভীর অর্থ হলো যার নিকটে মন অবস্থান করে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে যুক্ত থাকা। এই অর্থে একজন মানুষ মন্দিরে না থেকেও উপাসক হতে পারেন, যদি তাঁর মন সর্বদা পরম সত্যের দিকে ফিরে যায়। আবার বাহ্যিক আচার পালন করেও কেউ প্রকৃত উপাসনার অবস্থায় নাও থাকতে পারেন, যদি তাঁর মন সম্পূর্ণ অন্যত্র ছুটে বেড়ায়।

নিত্যাভিযুক্তানাম শব্দটিও শ্লোকটির দর্শনকে আরও গভীর করে। নিত্য অর্থ সর্বদা বা অবিরত। যুক্ত শব্দটি এসেছে যুজ ধাতু থেকে, যার অর্থ যুক্ত করা বা সংযোগ স্থাপন করা। অভিযুক্ত অর্থ বিশেষভাবে যুক্ত বা সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত। সুতরাং নিত্যাভিযুক্ত বলতে বোঝায় যারা সর্বদা পরম সত্যের সঙ্গে অন্তর্গতভাবে যুক্ত। এর অর্থ এই নয় যে একজন মানুষ সারাক্ষণ বাহ্যিক পূজার মধ্যে থাকবে। বরং জীবনের প্রতিটি কর্মের অন্তর্নিহিত চেতনা যদি পরম সত্যের দিকে নিবদ্ধ থাকে, তাহলে সেই মানুষ নিত্যযুক্ত। একজন ছাত্র পড়াশোনা করতে পারেন, একজন কৃষক জমিতে কাজ করতে পারেন, একজন শিক্ষক শিক্ষা দিতে পারেন এবং একজন কর্মজীবী মানুষ নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবু তাঁদের কর্ম যদি কর্তব্যবোধ, সততা এবং ঈশ্বরস্মরণের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে কর্মের মধ্যেও নিত্যযোগের প্রকাশ ঘটতে পারে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে আলোচিত ধারণা হলো যোগক্ষেম। যোগ এবং ক্ষেম দুটি পৃথক শব্দ হলেও এখানে তারা একত্রে একটি সম্পূর্ণ জীবনদর্শন তৈরি করেছে। যোগ শব্দটি যুজ ধাতু থেকে এসেছে। এর মধ্যে সংযোগ এবং অর্জনের ভাব রয়েছে। ক্ষেমের অর্থ কল্যাণ, নিরাপত্তা, স্থিতি এবং রক্ষা। তাই যোগ বলতে বোঝানো যায় যা প্রয়োজন অথচ এখনও অর্জিত হয়নি তা লাভ করা। আর ক্ষেম বলতে বোঝানো যায় যা ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে তার রক্ষা এবং স্থিতি নিশ্চিত করা। মানুষের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় এই দুই আকাঙ্ক্ষাই তার অধিকাংশ কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে রয়েছে। মানুষ যা পায়নি তা পেতে চায় এবং যা পেয়েছে তা হারাতে চায় না। অর্থ, শিক্ষা, সম্পর্ক, সম্মান, কর্মজীবন এবং নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রেই অর্জন ও সংরক্ষণের এই দ্বৈত আকাঙ্ক্ষা কাজ করে।

এই কারণে যোগক্ষেম শুধু সম্পদ বা অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো শব্দ নয়। এর মধ্যে জীবনের সামগ্রিক কল্যাণের ধারণা রয়েছে। একজন মানুষ জ্ঞান অর্জন করতে পারেন, কিন্তু সেই জ্ঞানকে জীবনে ধারণ করাও প্রয়োজন। কেউ সম্পর্ক অর্জন করতে পারেন, কিন্তু সেই সম্পর্ককে যত্ন ও বিশ্বাসের মাধ্যমে রক্ষা করাও প্রয়োজন। কেউ আধ্যাত্মিক উপলব্ধি অর্জন করতে পারেন, কিন্তু সেই উপলব্ধিকে জীবনের মধ্যে স্থির করাও প্রয়োজন। এই অর্জন এবং রক্ষার সমগ্র প্রক্রিয়াকে যোগক্ষেমের বৃহত্তর অর্থের মধ্যে দেখা যায়।

এরপর আসে বহামি। এটি বহ ধাতু থেকে এসেছে। বহ অর্থ বহন করা বা নিয়ে যাওয়া। কৃষ্ণ বলেন, যোগক্ষেমং বহাম্যহম্। অর্থাৎ আমি তাদের যোগক্ষেম বহন করি। এখানে কৃষ্ণ শুধু সাহায্য করার কথা বলছেন না। বহন করার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের একটি গভীর অনুভূতি রয়েছে। এই শব্দটি তাই শ্লোকটির আবেগময় কেন্দ্রও বলা যায়। মানুষ যখন জীবনের সমস্ত ভার নিজের কাঁধে বহন করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন এই শ্লোক তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে পরম সত্যের উপর আস্থা রাখা মানে নিজের কর্তব্য ত্যাগ করা নয়, বরং নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একটি বৃহত্তর আশ্রয়ের অনুভূতি লাভ করা।

তবে এই শ্লোকের অর্থ কখনোই এমন নয় যে ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস রাখলে মানুষ নিজের কাজ করবে না। গীতার সামগ্রিক দর্শন কর্মবিমুখতার শিক্ষা দেয় না। কৃষ্ণ বরং কর্মের মধ্যেই মানুষকে স্থিত হতে বলেছেন। অনন্যভক্তি মানে কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং কর্মের ফলের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ভয় থেকে নিজেকে মুক্ত করা। একজন মানুষ তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, নিজের কর্তব্য পালন করবে, কিন্তু নিজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত নিরাপত্তাকে কেবল বাহ্যিক সাফল্যের উপর নির্ভরশীল করবে না। এই অবস্থানেই ভক্তি এবং কর্মের মধ্যে একটি সুন্দর সমন্বয় তৈরি হয়।

দার্শনিকভাবে দেখলে অনন্যচিন্তা মানুষের চেতনার বহুত্ব থেকে ঐক্যের দিকে যাত্রার প্রতীক। সাধারণ মানুষ এক মুহূর্তে অর্থ নিয়ে চিন্তা করে, পরের মুহূর্তে সম্মান নিয়ে, তারপর সম্পর্ক নিয়ে, তারপর ভবিষ্যৎ নিয়ে। তার মন ক্রমাগত এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে ছুটে চলে। এই বিচ্ছিন্নতা তাকে ক্লান্ত করে। অনন্যচিন্তা সেই বিক্ষিপ্ত মনকে একটি কেন্দ্রের দিকে ফিরিয়ে আনে। অদ্বৈত দর্শনের আলোকে এটি পরম সত্যের ঐক্য উপলব্ধির দিকে যাত্রা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। ভক্তি দর্শনের আলোকে এটি ঈশ্বরের প্রতি একনিষ্ঠ প্রেম ও আত্মসমর্পণ। উভয় ক্ষেত্রেই একটি বিষয় সাধারণ। মানুষের চেতনা তার ক্ষুদ্র স্বার্থের সীমা অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর সত্যের দিকে অগ্রসর হয়।

মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও এই শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মন যখন একই সঙ্গে অসংখ্য আকাঙ্ক্ষা, ভয় এবং প্রত্যাশার মধ্যে বিভক্ত থাকে, তখন তার মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। অনন্যচিন্তা সেই বিচ্ছিন্ন মনোযোগকে একটি গভীর কেন্দ্রে স্থাপন করার প্রতীক। এই কারণে উপাসনা শুধু ধর্মীয় আচার নয়। এটি মনকে পুনরায় কেন্দ্রীভূত করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবেও দেখা যায়। মানুষ যখন প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের জীবনের একটি পরম উদ্দেশ্য স্মরণ করে, তখন বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যেও তার ভিতরে একটি স্থিরতা তৈরি হতে পারে।

এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। অনন্য হলো একাগ্রতার প্রতীক। উপাসনা হলো নৈকট্যের প্রতীক। নিত্যযোগ হলো অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কের প্রতীক। যোগক্ষেম হলো জীবনের অর্জন এবং সংরক্ষণের প্রতীক। আর বহামি হলো আশ্রয় ও ঈশ্বরীয় দায়িত্বগ্রহণের প্রতীক। এই সবকিছুকে একত্র করলে শ্লোকটি যেন একটি পূর্ণ আধ্যাত্মিক যাত্রার ছবি হয়ে ওঠে। মানুষ প্রথমে নিজের মনকে একাগ্র করে। তারপর পরম সত্যের নিকটে আসে। এরপর তার জীবন সেই সত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। তখন তার অর্জন এবং কল্যাণের প্রশ্নও একটি বৃহত্তর আশ্রয়ের মধ্যে স্থান পায়।

বাস্তব জীবনে এর একটি সহজ উদাহরণ একজন ছাত্রের জীবন থেকে নেওয়া যায়। একজন ছাত্র যদি শুধু ফলাফলের চিন্তায় ভীত থাকে, তাহলে পড়াশোনাও তার কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। কিন্তু যদি সে নিজের কর্তব্যকে কেন্দ্র করে পড়াশোনা করে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, তাহলে তার মন অনেক বেশি স্থির হয়। ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার অস্তিত্বের সম্পূর্ণ অর্থ ফলাফলের উপর নির্ভর করে না। একইভাবে একজন কর্মজীবী মানুষ যদি শুধু পদোন্নতি এবং অর্থের চিন্তায় নিজের জীবনকে পরিচালিত করেন, তাহলে অর্জনের পরও নিরাপত্তাহীনতা থেকে যেতে পারে। কিন্তু যদি কাজকে কর্তব্য, সততা এবং বৃহত্তর জীবনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে যোগক্ষেমের ধারণাটি একটি গভীর মানসিক অর্থ লাভ করে।

একটি নদীতে ভাসমান নৌকার কথাও ভাবা যায়। নৌকার যদি কোনো নির্দিষ্ট দিকনির্দেশ না থাকে, তাহলে স্রোত তাকে যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই যেতে হবে। মানুষের মনও তেমন। কখনো অর্থ, কখনো খ্যাতি, কখনো ভয়, কখনো প্রশংসা এবং কখনো আকাঙ্ক্ষা তার মনকে বিভিন্ন দিকে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু জীবনের যদি একটি পরম কেন্দ্র থাকে, তাহলে মানুষ স্রোতে ভেসে যাওয়া সত্তা হয়ে থাকে না। অনন্য শব্দটি সেই কেন্দ্রের প্রতীক। এটি মানুষের কাছে প্রশ্ন রাখে যে জীবনের সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যেও তার কাছে কোন সত্যটি অপরিবর্তনীয়।

এই শ্লোকের শেষ অংশে কৃষ্ণের একটি গভীর আশ্বাস রয়েছে। মানুষ যখন সত্যের প্রতি একনিষ্ঠ হয়, তখন সে একা নয়। তার নিজের কর্ম তাকে করতেই হবে, নিজের কর্তব্য তাকে পালন করতেই হবে, কিন্তু তার জীবনের চূড়ান্ত ভার কেবল তার সীমিত অহংকারের হাতে নয়। এই উপলব্ধিই আত্মসমর্পণকে দুর্বলতার পরিবর্তে শক্তিতে পরিণত করে। আত্মসমর্পণ মানে নিজের বুদ্ধি বা কর্মক্ষমতা পরিত্যাগ করা নয়। আত্মসমর্পণ মানে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে একটি বৃহত্তর সত্যের উপর আস্থা স্থাপন করা।

সবশেষে বলা যায়, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের বাইশতম শ্লোক মানুষের জীবনের একটি মৌলিক সংকটের উত্তর খোঁজে। মানুষ সারাজীবন ভাবতে থাকে কীভাবে সে যা চায় তা অর্জন করবে এবং যা অর্জন করেছে তা কীভাবে রক্ষা করবে। এই দুই আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই তার আনন্দ, ভয়, সাফল্য এবং উদ্বেগ আবর্তিত হয়। কৃষ্ণ সেই চিরন্তন দুশ্চিন্তার মধ্যে একটি অন্য পথ দেখান। তিনি বলেন, চেতনাকে অনন্য করে পরম সত্যের দিকে স্থাপন করো। নিজের কর্তব্য পালন করো। ঈশ্বরের নিকটে অবস্থান করো। জীবনের সমস্ত কিছু নিজের সীমিত শক্তির উপর নির্ভর করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে বৃহত্তর সত্যের উপর আস্থা রাখো। তখন যোগক্ষেমের ধারণা শুধু বাহ্যিক প্রাপ্তি এবং নিরাপত্তার অর্থে থাকে না। এটি জীবনের গভীরতর কল্যাণ, অন্তরের স্থিরতা এবং পরম আশ্রয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই কারণেই অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং এবং যোগক্ষেমং বহাম্যহম্ গীতার অন্যতম সান্ত্বনাময় এবং গভীর বাণী। এখানে মানুষের পক্ষ থেকে রয়েছে অনন্যতা, স্মরণ, উপাসনা এবং নিত্যসংযোগ। আর ঈশ্বরের পক্ষ থেকে রয়েছে আশ্রয়, কল্যাণ এবং বহনের প্রতিশ্রুতি। এই দুইয়ের মিলনেই গীতার ভক্তিতত্ত্ব পূর্ণতা পায়। মানুষের মন যখন অসংখ্য আকাঙ্ক্ষার মধ্যে হারিয়ে না গিয়ে একটি পরম সত্যে স্থির হয়, তখন তার জীবনের অর্থও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। সে শুধু কী পাবে সেই প্রশ্ন করে না। সে বুঝতে শেখে কোন সত্যকে ধারণ করবে, কোন আশ্রয়ে স্থির থাকবে এবং কোন চেতনার মধ্যে নিজের জীবনকে পরিচালিত করবে। এই উপলব্ধিই এই শ্লোকের প্রকৃত গভীরতা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি