সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.২৪ — সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা ও প্রভু হিসেবে ঈশ্বরের পরম স্বরূপ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
অহং হি সর্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুরেব চ।ন তু মামভিজানন্তি তত্ত্বেনাতশ্চ্যবন্তি তে।।২৪।।
অহং হি সর্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুরেব চ।
ন তু মামভিজানন্তি তত্ত্বেনাতশ্চ্যবন্তি তে।।২৪।।

অনুবাদঃ আমিই সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা ও প্রভু। কিন্তু যারা আমার চিন্ময় স্বরূপ জানে না, তারা আবার সংসার সমুদ্রে অধঃপতিত হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায় রাজবিদ্যা রাজগুহ্য যোগ নামে পরিচিত। এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ ভক্তি, যজ্ঞ, ঈশ্বরচেতনা এবং মানুষের সঙ্গে পরম সত্যের সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। নবম অধ্যায়ের চব্বিশতম শ্লোকে তিনি এমন একটি সত্য প্রকাশ করেন যা বাহ্যিক ধর্মাচরণকে অতিক্রম করে মানুষের কর্ম ও উপাসনার প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরায়। শ্লোকটি হলো “অহং হি সর্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুরেব চ। ন তু মামভিজানন্তি তত্ত্বেনাতশ্চ্যবন্তি তে।” এর সহজ অর্থ হলো আমিই সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা এবং প্রভু। কিন্তু মানুষ আমাকে প্রকৃত স্বরূপে জানে না। তাই তারা সত্য থেকে বিচ্যুত হয়।

এই শ্লোকের প্রথম শব্দ “অহম্” অর্থ আমি। সংস্কৃত ভাষায় “অহম্” একটি প্রাচীন সর্বনাম এবং এটি বক্তার আত্মপরিচয় প্রকাশ করে। কিন্তু এখানে এই “আমি” সাধারণ মানুষের অহংকারের আমি নয়। মানুষের অহংকারের আমি বলে আমি কর্তা, আমি ভোক্তা, আমার সম্পদ, আমার সাফল্য, আমার ক্ষমতা। কৃষ্ণের “অহম্” তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে তিনি নিজেকে পরম সত্য ও পরমেশ্বর হিসেবে প্রকাশ করছেন। তাই এই “আমি” কোনো সীমাবদ্ধ ব্যক্তিসত্তার ঘোষণা নয়। এটি সেই সর্বব্যাপী চৈতন্যের ঘোষণা যাঁর মধ্যে সমস্ত কর্ম, যজ্ঞ ও অস্তিত্বের চূড়ান্ত অর্থ প্রতিষ্ঠিত।

এরপর এসেছে “হি” শব্দটি। এটি একটি অব্যয় এবং এর অর্থ নিশ্চয়ই, প্রকৃতপক্ষে বা সত্যিই। “অহং হি” একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়ে বক্তব্যটির উপর বিশেষ জোর দিয়েছে। কৃষ্ণ যেন বলছেন, প্রকৃত সত্য হলো আমিই সমস্ত যজ্ঞের পরম ভোক্তা। এর পরে এসেছে “সর্বযজ্ঞানাম্” শব্দটি। এটি সর্ব এবং যজ্ঞ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। সর্ব অর্থ সমস্ত এবং যজ্ঞ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত √যজ্ ধাতু থেকে। যজ্ ধাতুর মধ্যে পূজা করা, উপাসনা করা, নিবেদন করা এবং পবিত্র উদ্দেশ্যে অর্পণ করার ধারণা রয়েছে। তাই যজ্ঞকে কেবল অগ্নিতে আহুতি দেওয়ার একটি বৈদিক আচার হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝা যায় না। গীতার দৃষ্টিতে যজ্ঞ হলো নিজের কর্ম, সম্পদ, শক্তি, জ্ঞান এবং জীবনের প্রচেষ্টাকে কোনো উচ্চতর সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা।

“সর্বযজ্ঞানাম্” অর্থ সমস্ত যজ্ঞের। অর্থাৎ কৃষ্ণ কোনো একটি বিশেষ যজ্ঞের কথা বলছেন না। বৈদিক যজ্ঞ, উপাসনা, দান, তপস্যা, জ্ঞানচর্চা কিংবা নিঃস্বার্থ কর্মের যে কোনো রূপের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য যদি পরম সত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে তার চূড়ান্ত আশ্রয় সেই পরম সত্য। এখানেই যজ্ঞের বাহ্যিক রূপের সঙ্গে তার অন্তর্নিহিত অর্থের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এরপর আসে “ভোক্তা” শব্দটি। ভোক্তা শব্দের উৎস সংস্কৃত √ভুজ্ ধাতু। ভুজ্ ধাতুর অর্থ ভোগ করা, গ্রহণ করা, উপভোগ করা কিংবা অভিজ্ঞতা লাভ করা। তাই ভোক্তা অর্থ যিনি গ্রহণ করেন বা ভোগ করেন। কিন্তু কৃষ্ণ যখন নিজেকে সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা বলছেন, তখন এর অর্থ কেবল এই নয় যে যজ্ঞে নিবেদিত কোনো দ্রব্য তিনি গ্রহণ করেন। এর গভীর অর্থ হলো মানুষের সমস্ত পবিত্র নিবেদনের চূড়ান্ত প্রাপক পরমেশ্বর। মানুষ যজ্ঞ করে, মানুষ আহুতি দেয়, মানুষ দান করে, মানুষ প্রার্থনা করে, কিন্তু সেই সমস্ত কর্মের প্রকৃত আধ্যাত্মিক গন্তব্য ঈশ্বর।

এই ধারণাটি মানুষের কর্মজীবনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ নিজের কর্মকে নিজের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করে দেখে। সে ভাবে আমি কাজ করছি, তাই ফল আমার। আমি অর্জন করছি, তাই সাফল্য আমার। আমি দান করছি, তাই আমার মহত্ত্ব প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু কৃষ্ণের শিক্ষা এই আত্মকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করে। তিনি মানুষকে বোঝাতে চান যে কর্মের প্রকৃত মূল্য শুধু তার ফলের মধ্যে নেই। কর্মের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ। যখন কর্ম নিজের অহংকারের জন্য হয়, তখন তা মানুষকে নিজের মধ্যেই আবদ্ধ করে। কিন্তু যখন কর্ম কোনো উচ্চতর সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়, তখন সেই কর্ম যজ্ঞের রূপ ধারণ করে।

“ভোক্তা চ প্রভুরেব চ” অংশটি আরও গভীর। কৃষ্ণ বলছেন তিনি শুধু যজ্ঞের ভোক্তা নন, তিনি প্রভুও। প্রভু শব্দের মধ্যে ক্ষমতা, অধিকার, কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণের ধারণা রয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে যে ঈশ্বর শুধু মানুষের নিবেদনের প্রাপক নন, তিনি সমগ্র যজ্ঞব্যবস্থার অধীশ্বর। মানুষ সীমিতভাবে কাজ করতে পারে, কিন্তু তার অস্তিত্বের মৌলিক নিয়মগুলি তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। জন্ম, মৃত্যু, সময়, প্রকৃতি এবং জীবনের অসংখ্য অনিশ্চয়তার সামনে মানুষ উপলব্ধি করে যে তার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। গীতার দৃষ্টিতে পরম প্রভু সেই সত্তা যাঁর মধ্যে এই সমস্ত অস্তিত্বের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ও আশ্রয় নিহিত।

এই শ্লোকের পরবর্তী অংশ হলো “ন তু মামভিজানন্তি”। এর অর্থ কিন্তু তারা আমাকে যথার্থভাবে জানে না। এখানে “ন” অর্থ না এবং “তু” অর্থ কিন্তু। “মাম্” অর্থ আমাকে। আর “অভিজানন্তি” এসেছে অভি উপসর্গ এবং √জ্ঞা ধাতু থেকে। জ্ঞা অর্থ জানা এবং অভি উপসর্গের মাধ্যমে বিশেষভাবে বা যথাযথভাবে জানার ভাব প্রকাশ পায়। তাই অভিজানন্তি শুধু সাধারণ তথ্য জানা নয়। এটি গভীরভাবে চিনতে পারা এবং প্রকৃত অর্থে উপলব্ধি করার ধারণা বহন করে।

এখানেই শ্লোকটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “তত্ত্বেন”। তত্ত্ব শব্দটি এসেছে তৎ এবং ত্ব থেকে। তৎ অর্থ সেই এবং ত্ব কোনো কিছুর সেই হওয়ার অবস্থা বা সত্তাকে নির্দেশ করে। তাই তত্ত্বের মৌলিক ভাব হলো কোনো কিছুর প্রকৃত স্বরূপ। তত্ত্বেন অর্থ তত্ত্বত, প্রকৃত স্বরূপে বা সত্যভাবে। কৃষ্ণ তাই বলছেন মানুষ তাঁকে তত্ত্বত জানে না। এর অর্থ শুধু কৃষ্ণের নাম জানা যথেষ্ট নয়। তাঁর জীবনের ঘটনা জানা, তাঁর বিভিন্ন নাম জানা, তাঁর উপদেশ মুখস্থ করা কিংবা তাঁর সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ করাও তত্ত্বজ্ঞান নয়। তত্ত্বজ্ঞান হলো তাঁর প্রকৃত সত্তা, তাঁর ঈশ্বরীয় অবস্থান এবং জীবনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে উপলব্ধি করা।

তথ্য জানা এবং তত্ত্ব জানা এই দুটি বিষয়ের পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কৃষ্ণ সম্পর্কে অনেক কিছু পড়তে পারে কিন্তু তাঁর শিক্ষা নিজের জীবনে উপলব্ধি নাও করতে পারে। আবার একজন সাধারণ মানুষ হয়তো খুব বেশি শাস্ত্রীয় তথ্য জানে না, কিন্তু নিজের কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার মাধ্যমে সেই শিক্ষার গভীরতর সত্য উপলব্ধি করতে পারে। এই কারণে গীতার তত্ত্বজ্ঞান কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান নয়। এটি মানুষের জীবনদৃষ্টিকে পরিবর্তন করার মতো জ্ঞান।

এরপর কৃষ্ণ বলেন “অতশ্চ্যবন্তি তে”। এখানে “অতঃ” অর্থ এই কারণে বা অতএব এবং “চ্যবন্তি” এসেছে √চ্যু ধাতু থেকে। চ্যু ধাতুর অর্থ সরে যাওয়া, স্থানচ্যুত হওয়া, পতিত হওয়া বা নিজের অবস্থান থেকে বিচ্যুত হওয়া। এখান থেকে চ্যুতি শব্দটির উৎপত্তি। তাই “চ্যবন্তি” শব্দটির গভীর অর্থ কেবল পতন নয়। এর অর্থ সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া, সঠিক অবস্থান থেকে সরে যাওয়া এবং আধ্যাত্মিক লক্ষ্য থেকে দূরে চলে যাওয়া।

এখানে কৃষ্ণ একটি গভীর কারণ ও ফলের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছেন। মানুষ যদি তাঁকে তত্ত্বত না জানে, তাহলে তার ধর্মীয় কর্ম বাহ্যিকভাবে যতই সুন্দর হোক না কেন, সেই কর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। তখন যজ্ঞ হয়ে যেতে পারে ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম, দান হয়ে যেতে পারে অহংকারের প্রকাশ, ধর্ম হয়ে যেতে পারে সামাজিক পরিচয়ের উপায় এবং জ্ঞান হয়ে যেতে পারে আত্মম্ভরিতার কারণ। অর্থাৎ বাহ্যিক কর্ম ঠিক থাকলেও অন্তর্নিহিত চেতনা ভুল হলে মানুষ সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হতে পারে।

এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য বিভিন্ন বেদান্ত দর্শনে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। অদ্বৈত দৃষ্টিতে কৃষ্ণের “অহম্” পরম ব্রহ্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাহ্যিকভাবে উপাসনার রূপ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সমস্ত উপাসনার চূড়ান্ত সত্য এক পরম সত্তায় প্রতিষ্ঠিত। বিশিষ্টাদ্বৈত দৃষ্টিতে ঈশ্বর হলেন সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত পরম সত্তা এবং জীব ও জগত তাঁর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই সমস্ত যজ্ঞের চূড়ান্ত ভোক্তা ও প্রভু ঈশ্বর। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের মধ্যে বাস্তব পার্থক্য রয়েছে এবং ঈশ্বর সর্বোচ্চ প্রভু, আর জীব তাঁর অধীন। ফলে এই শ্লোকে প্রভু শব্দটি ঈশ্বরের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা এবং জীবের নির্ভরশীলতাকে স্পষ্ট করে।

ভক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে শ্লোকটি আরও সহজ এবং হৃদয়গ্রাহী। ভক্তি হলো নিজের জীবনকে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা। একজন মানুষ যখন খাদ্য গ্রহণের আগে কৃতজ্ঞ হয়, নিজের শ্রমকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করে, নিজের সাফল্যকে কেবল নিজের অহংকারের সম্পত্তি মনে না করে ঈশ্বরের কৃপা হিসেবে দেখে, তখন তার জীবন যজ্ঞভাব গ্রহণ করতে শুরু করে। এখানে যজ্ঞের জন্য বিশাল আচার প্রয়োজন হয় না। মানুষের মন, কর্ম এবং উদ্দেশ্যই যজ্ঞের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।

এই শ্লোককে মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও গভীরভাবে বোঝা যায়। মানুষের অহংকার সাধারণত নিজেকে কেন্দ্র করে একটি জগৎ তৈরি করে। আমি কী পেলাম, আমি কতটা সফল হলাম, মানুষ আমাকে কতটা সম্মান করল এবং আমার ইচ্ছা কতটা পূর্ণ হলো, এই প্রশ্নগুলো তার মানসিকতার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। কৃষ্ণের শিক্ষা সেই কেন্দ্রকে পরিবর্তন করে। তিনি মানুষকে নিজের ক্ষুদ্র অহংকারের বাইরে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে তাকাতে শেখান। তখন মানুষ বুঝতে পারে যে সে শুধু ভোক্তা নয়, সে একটি বৃহত্তর অস্তিত্বব্যবস্থার অংশ। তার জীবন কেবল নিজের জন্য নয়। তার কর্মেরও একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি সুন্দর উদাহরণ একজন শিক্ষকের জীবনে দেখা যায়। একজন শিক্ষক যদি মনে করেন তিনি শুধু বেতন পাওয়ার জন্য পড়াচ্ছেন, তাহলে তার কর্মের কেন্দ্র ব্যক্তিগত লাভ। কিন্তু যদি তিনি উপলব্ধি করেন যে তাঁর জ্ঞান একজন শিক্ষার্থীর জীবনকে পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে একই কাজ একটি উচ্চতর উদ্দেশ্য লাভ করে। একজন চিকিৎসক যখন রোগীকে কেবল একজন গ্রাহক হিসেবে দেখেন, তখন সম্পর্কটি সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যখন তিনি রোগীর সেবাকে মানবকল্যাণের একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখেন, তখন তাঁর কর্মের মধ্যে যজ্ঞভাব জন্ম নেয়। একজন সাংবাদিক সত্য প্রকাশকে শুধু নিজের পরিচিতি বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে না দেখে সমাজের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করলে তার কাজও বৃহত্তর অর্থ লাভ করে।

একটি নদীর উপমা দিয়ে এই শ্লোককে আরও সহজভাবে বোঝা যায়। নদী যদি মনে করে তার জল শুধু তার নিজের, তাহলে তার অস্তিত্বের পূর্ণতা বোঝা হয় না। নদীর প্রকৃত গতি সমুদ্রের দিকে। তেমনি মানুষ যখন ভাবে আমার কর্ম, আমার সম্পদ, আমার জ্ঞান এবং আমার সাফল্য সবকিছু কেবল আমার জন্য, তখন সে নিজের অস্তিত্বকে সীমাবদ্ধ করে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে তার জীবন একটি বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে যুক্ত এবং তার কর্ম সেই সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হতে পারে, তখন জীবনের অর্থও পরিবর্তিত হয়।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো ধর্মের বাহ্যিক রূপের চেয়ে তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ অনেক আচার পালন করতে পারে, অনেক দান করতে পারে, অনেক প্রার্থনা করতে পারে, কিন্তু যদি তার মধ্যে পরম সত্যের উপলব্ধি না থাকে, তাহলে সেই কর্ম তাকে মুক্তির দিকে নিয়ে যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। কৃষ্ণ তাই শুধু কর্ম করতে বলছেন না। তিনি কর্মের প্রকৃত অধিকারী ও উদ্দেশ্যকে জানতে বলছেন। তিনি মানুষকে বাহ্যিক ধর্মাচরণ থেকে অন্তর্নিহিত ঈশ্বরচেতনার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

এই কারণে “ভোক্তা”, “প্রভু” এবং “তত্ত্বেন” এই তিনটি শব্দ শ্লোকটির কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভোক্তা প্রশ্ন তোলে কে গ্রহণ করেন। উত্তর হলো পরমেশ্বর। প্রভু প্রশ্ন তোলে কে অধীশ্বর। উত্তর হলো পরমেশ্বর। আর তত্ত্বেন প্রশ্ন তোলে তাঁকে কীভাবে জানতে হবে। উত্তর হলো তাঁর প্রকৃত স্বরূপে। এই তিনটি ধারণা একত্রে একটি পূর্ণ আধ্যাত্মিক শিক্ষা তৈরি করে।

আধুনিক মানুষের জন্যও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজ মানুষ অসংখ্য কাজ করছে, অসংখ্য লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে এবং প্রতিদিন নতুন নতুন সাফল্যের সংজ্ঞা তৈরি করছে। কিন্তু সেই ব্যস্ততার মধ্যে একটি প্রশ্ন প্রায়ই হারিয়ে যায়। আমি যা করছি, তার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী। যদি জীবনের প্রতিটি কাজ শুধু ব্যক্তিগত লাভ, প্রতিযোগিতা এবং অহংকারের জন্য হয়, তাহলে বাহ্যিক সাফল্যের মধ্যেও এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি কর্মের মধ্যে দায়িত্ব, কৃতজ্ঞতা, সত্য, সেবা এবং উচ্চতর উদ্দেশ্য যুক্ত হয়, তাহলে সেই কর্ম জীবনকে গভীর অর্থ দিতে পারে।

অতএব “অহং হি সর্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুরেব চ” শুধু একটি ধর্মীয় ঘোষণা নয়। এটি মানুষের কর্মদর্শন, ঈশ্বরদর্শন এবং আত্মপরিচয় সম্পর্কে একটি গভীর শিক্ষা। কৃষ্ণ এখানে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে জীবনের সবকিছু নিজের ভোগের জন্য নয়। মানুষ কর্ম করে, কিন্তু কর্মের চূড়ান্ত অর্থ তার ব্যক্তিগত অহংকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমস্ত যজ্ঞের প্রকৃত ভোক্তা এবং প্রভু সেই পরম সত্তা, যাঁর সঙ্গে মানুষের জীবন গভীরভাবে সম্পর্কিত।

শ্লোকটির শেষ শিক্ষা তাই অত্যন্ত গভীর। ঈশ্বর সম্পর্কে শুধু জানা যথেষ্ট নয়। তাঁকে তত্ত্বত জানতে হবে। কারণ তত্ত্বজ্ঞান মানুষের কর্মের উদ্দেশ্য পরিবর্তন করে, অহংকারকে নম্র করে, স্বার্থকে বিস্তৃত করে এবং জীবনকে নিবেদনের পথে নিয়ে যায়। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে তার কর্ম কেবল তার নিজের জন্য নয় এবং তার জীবন একটি বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে যুক্ত, তখন তার কর্ম যজ্ঞে পরিণত হতে পারে। আর সেই উপলব্ধিই মানুষকে বিচ্যুতি থেকে সত্যের দিকে নিয়ে যায়।

এই শ্লোকের সারমর্ম এক কথায় বলা যায়। যজ্ঞের প্রকৃত অর্থ বাহ্যিক আহুতি নয়, অন্তরের নিবেদন। ভোগের প্রকৃত অর্থ ব্যক্তিগত উপভোগ নয়, পরম সত্যের উদ্দেশ্যে অর্পণ। আর ঈশ্বরকে জানার প্রকৃত অর্থ শুধু তাঁর নাম জানা নয়, তাঁকে তত্ত্বত উপলব্ধি করা। কৃষ্ণের “অহম্” তাই মানুষের অহংকারের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সেই অহংকার অতিক্রম করে পরম সত্যের দিকে যাওয়ার আহ্বান। যখন মানুষ নিজের ক্ষুদ্র আমিকে অতিক্রম করে বৃহত্তর সত্যের কাছে নিজের কর্মকে নিবেদন করতে শেখে, তখন তার জীবনই এক গভীর যজ্ঞে পরিণত হয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি