সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.৩১ — ধর্মাত্মা হওয়া, চিরশান্তি ও ভক্তের অবিনাশী আশ্রয়

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি।কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি।।৩১।।
ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি।
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি।।৩১।।

অনুবাদঃ তিনি শীঘ্রই ধর্মাত্মায় পরিণত হন এবং নিত্য শান্তি লাভ করেন। হে কৌন্তেয়! তুমি দীপ্ত কন্ঠে ঘোষণা কর যে, আমার ভক্ত কখনও বিনষ্ট হন না।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের একত্রিশতম শ্লোক মানবজীবনের পরিবর্তন, নৈতিক পুনর্জাগরণ এবং ঈশ্বরের প্রতি ভক্তির গভীর তাৎপর্যকে এক অসাধারণ ভাষায় প্রকাশ করেছে। শ্লোকটির প্রথম অংশে বলা হয়েছে, “ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি।” অর্থাৎ মানুষ যখন সত্যিকার অর্থে ঈশ্বরের আশ্রয় গ্রহণ করে এবং তার চেতনা ঈশ্বরমুখী হয়, তখন সে শীঘ্রই ধর্মাত্মা হয়ে ওঠে এবং চিরস্থায়ী শান্তির দিকে অগ্রসর হয়। পরবর্তী অংশে কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, “কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি।” অর্থাৎ হে কুন্তীপুত্র, তুমি ঘোষণা করো যে আমার ভক্ত কখনো বিনষ্ট হয় না। এই একটি শ্লোকের মধ্যে তাই মানুষের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে দেখার এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গি নিহিত রয়েছে।

“ক্ষিপ্রং” শব্দটির অর্থ শীঘ্রই, দ্রুত অথবা অল্প সময়ের মধ্যে। সংস্কৃত ক্ষিপ্র শব্দ থেকে এর উৎপত্তি। এখানে দ্রুততার অর্থ কেবল সময়ের গতি নয়, বরং অন্তরের পরিবর্তনের গতি। একজন মানুষের জীবন বহুদিন ধরে ভুল পথে চলতে পারে। তার মধ্যে নানা দুর্বলতা থাকতে পারে। সে অতীতে অন্যায়ও করতে পারে। কিন্তু কোনো এক মুহূর্তে তার চেতনার দিক পরিবর্তিত হতে পারে। সে নিজের ভুল উপলব্ধি করে সত্যের দিকে ফিরতে পারে। গীতা সেই পরিবর্তনের সম্ভাবনাকেই অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই ক্ষিপ্রং শব্দটি এখানে আশার একটি শক্তিশালী প্রতীক। এটি যেন মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে পরিবর্তনের জন্য অতীতের সমস্ত অন্ধকার শেষ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। সত্যের দিকে ফিরে আসার সিদ্ধান্তটি আজই নেওয়া সম্ভব।

এরপর এসেছে “ভবতি” শব্দটি। এটি সংস্কৃত √ভূ ধাতু থেকে এসেছে। √ভূ অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা, পরিণত হওয়া অথবা কোনো অবস্থায় প্রবেশ করা। ভবতি অর্থ সে হয় অথবা সে হয়ে ওঠে। এই “হয়ে ওঠা” কথাটির মধ্যে গীতার মানবদর্শনের একটি অসাধারণ সত্য রয়েছে। কৃষ্ণ বলেননি যে মানুষ জন্ম থেকেই ধর্মাত্মা অথবা জন্ম থেকেই অধর্মী। বরং মানুষ তার জীবনযাত্রা, চিন্তা, কর্ম এবং চেতনার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলে। মানুষ একটি চলমান সত্তা। সে আজ যে অবস্থায় আছে, আগামীকালও তাকে ঠিক সেই অবস্থায় থাকতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। তার মধ্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে।

“ধর্মাত্মা” শব্দটি গঠিত হয়েছে ধর্ম এবং আত্মা এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে। ধর্ম শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃত √ধৃ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। √ধৃ অর্থ ধারণ করা, ধরে রাখা বা স্থিতি প্রদান করা। সেই দৃষ্টিতে ধর্ম হলো এমন নীতি যা জীবনকে ধারণ করে, মানুষকে সঠিক পথে স্থাপন করে এবং ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। ধর্ম শব্দের অর্থ তাই কেবল ধর্মীয় পরিচয় নয়। এর মধ্যে সত্য, ন্যায়, কর্তব্য, নৈতিকতা, সৎ আচরণ এবং জীবনের গভীর বিধানের ধারণা রয়েছে। আর আত্মা শব্দটি মানুষের অন্তঃসত্তা, নিজস্ব সত্তা বা চৈতন্যকে নির্দেশ করে। সুতরাং ধর্মাত্মা বলতে শুধু একজন ধার্মিক মানুষকে বোঝায় না। গভীর অর্থে ধর্মাত্মা হলেন এমন একজন ব্যক্তি যার অন্তরের সত্তা ধর্মের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে এবং যার চিন্তা, উদ্দেশ্য ও কর্ম ধীরে ধীরে সেই ধর্মবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই কারণে “ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা” বাক্যটির অর্থ কেবল “সে দ্রুত ভালো মানুষ হয়ে যায়” নয়। এর গভীর অর্থ হলো, একজন মানুষের অন্তরের অভিমুখ যখন সত্যিকারভাবে ঈশ্বরের দিকে পরিবর্তিত হয়, তখন তার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিচয়ও পরিবর্তিত হতে শুরু করে। এখানে বাহ্যিক আচরণের পরিবর্তনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো চেতনার পরিবর্তন। কারণ মানুষের কাজ তার চিন্তা ও উদ্দেশ্য থেকে জন্ম নেয়। অন্তর পরিবর্তিত হলে কর্মের প্রকৃতিও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। তাই ধর্মাত্মা হওয়া কেবল কিছু ভালো কাজ করার নাম নয়। এটি অন্তরের কেন্দ্রের পরিবর্তন।

এই শ্লোকটি বুঝতে হলে আগের শ্লোকের কথাও মনে রাখতে হয়। নবম অধ্যায়ের ত্রিশতম শ্লোকে কৃষ্ণ এমন একজন ব্যক্তির কথা বলেছেন, যিনি অতীতে অত্যন্ত দুরাচারী হলেও একনিষ্ঠভাবে ঈশ্বরের ভজনা করেন। এরপর একত্রিশতম শ্লোকে বলা হচ্ছে যে তিনি শীঘ্রই ধর্মাত্মা হয়ে ওঠেন। এখানে গীতার একটি অসাধারণ নৈতিক দর্শন প্রকাশ পেয়েছে। মানুষকে তার অতীতের একটি ভুল বা একটি পরিচয়ের মধ্যে চিরদিন বন্দী করে রাখা উচিত নয়। অতীতের কর্ম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং তার ফলও রয়েছে। কিন্তু অতীত মানুষের ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণভাবে নির্ধারণ করে না। একজন মানুষ তার বর্তমান চেতনা ও কর্মের মাধ্যমে নিজের জীবনের নতুন দিক তৈরি করতে পারে।

এরপর শ্লোকে এসেছে “শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি”। শশ্বৎ অর্থ চিরস্থায়ী, অবিরাম অথবা সর্বদা বিদ্যমান। শান্তি অর্থ প্রশান্তি, অন্তরের স্থিরতা এবং দ্বন্দ্বের অবসান। নিগচ্ছতি শব্দটি √গম্ ধাতু থেকে এসেছে। √গম্ অর্থ যাওয়া বা কোনো স্থানে পৌঁছানো। নি উপসর্গের মাধ্যমে নির্দিষ্ট দিকে গমন বা কোনো অবস্থায় প্রবেশের ভাব প্রকাশ পায়। তাই শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি অর্থ হলো সে চিরস্থায়ী শান্তির দিকে পৌঁছে যায় অথবা সেই শান্তি লাভ করে।

গীতার শান্তি ধারণা অত্যন্ত গভীর। এখানে শান্তি মানে শুধু চারপাশে কোনো ঝগড়া না থাকা নয়। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে আরামদায়ক পরিবেশে থেকেও ভিতরে অশান্ত হতে পারে। আবার কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কোনো মানুষ অন্তরে স্থির থাকতে পারে। গীতার শান্তি মূলত সেই অন্তরের স্থিরতা যেখানে মানুষ নিজের আসক্তি, ভয়, অহংকার এবং অস্থিরতার দ্বারা ক্রমাগত পরিচালিত হয় না। তাই ধর্মাত্মা হওয়ার পরিণতি হিসেবে শান্তির কথা বলা হয়েছে। সত্যিকারের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের শেষ লক্ষ্য শুধু ভালো কাজ করা নয়। তার লক্ষ্য হলো অন্তরের গভীরে একটি স্থায়ী প্রশান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

“কৌন্তেয়” শব্দটি অর্জুনের একটি বিশেষ নাম। কুন্তীর পুত্র হওয়ার কারণে অর্জুনকে কৌন্তেয় বলা হয়। কৃষ্ণ যখন বলেন “কৌন্তেয় প্রতিজানীহি”, তখন তিনি অর্জুনকে শুধু সম্বোধন করছেন না, বরং তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের সাক্ষী ও ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন। প্রতিজানীহি শব্দের অর্থ ঘোষণা করো, দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতি দাও অথবা নিশ্চিতভাবে জানিয়ে দাও। কৃষ্ণ নিজে এই ঘোষণা না করে অর্জুনকে দিয়ে ঘোষণা করাচ্ছেন যে তাঁর ভক্ত কখনো বিনষ্ট হয় না। এর মধ্যে একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যেন কৃষ্ণ বলছেন, এই সত্য শুধু আমার মুখে উচ্চারিত একটি আশ্বাস নয়। তুমি নিজে এই সত্যের সাক্ষী হয়ে পৃথিবীকে জানাও।

“ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি” এই শ্লোকের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশ। ন অর্থ না, মে অর্থ আমার, ভক্তঃ অর্থ ভক্ত এবং প্রণশ্যতি অর্থ সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হওয়া। পুরো বাক্যের সরল অর্থ হলো আমার ভক্ত কখনো বিনষ্ট হয় না। কিন্তু এখানে বিনষ্ট হওয়ার অর্থ শুধু শারীরিক মৃত্যু নয়। আধ্যাত্মিক অর্থে এর মধ্যে মানুষের সত্যের পথে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট না হওয়ার কথা রয়েছে। মানুষ ভুল করতে পারে। সে পড়ে যেতে পারে। তার চরিত্রে দুর্বলতা থাকতে পারে। কিন্তু যদি সে সত্যিকারভাবে ঈশ্বরের দিকে ফিরে আসে, তবে তার আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টা অর্থহীন হয়ে যায় না।

এই কথার মধ্যে মানুষের প্রতি এক অসাধারণ আশাবাদ রয়েছে। পৃথিবী অনেক সময় মানুষকে তার অতীত দিয়ে বিচার করে। একজন ব্যক্তি একবার ব্যর্থ হলে তাকে ব্যর্থ মানুষ বলা হয়। কেউ একবার ভুল করলে তাকে চিরদিনের জন্য খারাপ মানুষ বলে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু গীতা মানুষের দিকে আরও গভীরভাবে তাকায়। সে বলে মানুষের অতীত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার পরিবর্তনের ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভুল মানুষের জীবনের একটি অধ্যায় হতে পারে, কিন্তু পুরো বই নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের সমাজেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শাস্তি ও ন্যায়বিচারের পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্গঠনের সুযোগও তাই মানবিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ।

তবে এই শ্লোকের অর্থ এমন নয় যে কেউ নিজেকে ভক্ত বলে পরিচয় দিয়ে ইচ্ছামতো অন্যায় করতে পারে। ভক্তি কোনো অনৈতিকতার লাইসেন্স নয়। বরং সত্যিকারের ভক্তির ফলই হলো চরিত্রের পরিবর্তন। নবম অধ্যায়ের ত্রিশতম শ্লোকের দুরাচার ব্যক্তি একত্রিশতম শ্লোকে ধর্মাত্মা হয়ে ওঠে। এই রূপান্তরই প্রমাণ করে যে ভক্তি কেবল মুখের কথা নয়। সত্যিকারের ঈশ্বরভক্তি মানুষের আচরণ, চিন্তা, উদ্দেশ্য এবং মূল্যবোধের মধ্যে পরিবর্তন আনে। যদি ভক্তির নামে মানুষের চরিত্রে কোনো পরিবর্তন না আসে এবং অন্যায়কে ন্যায্যতা দেওয়া হয়, তবে সেই ভক্তির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক মানুষের স্বাধীনতা এবং পরিবর্তনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। মানুষ কি তার অতীত কর্মের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত। গীতার উত্তর হলো না। অতীত মানুষের বর্তমানকে প্রভাবিত করে, কিন্তু বর্তমানের চেতনা ভবিষ্যতের পথ পরিবর্তন করতে পারে। এই কারণে মানুষকে কেবল তার অতীতের সমষ্টি হিসেবে দেখা যায় না। মানুষের মধ্যে আত্মসংশোধনের শক্তি রয়েছে। সে নিজের ভুল দেখতে পারে, নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে এবং নতুন মূল্যবোধের ভিত্তিতে জীবন নির্মাণ করতে পারে।

এই বিষয়টি একটি নদীর উপমা দিয়ে সহজে বোঝা যায়। একটি নদী একবার যে পথে প্রবাহিত হয়েছে, সেই প্রবাহের ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। কিন্তু মানুষের জীবন নদীর মতো সম্পূর্ণ পূর্বনির্ধারিত নয়। মানুষ নিজের পথ সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। সে থামতে পারে, নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে এবং নতুন পথে যাত্রা করতে পারে। তাই মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন হলো নিজের অস্তিত্বের দিক সম্পর্কে সচেতন হওয়ার একটি যাত্রা। ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা এই পরিবর্তনের সম্ভাবনাকেই স্বীকৃতি দেয়।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের তাৎপর্য গভীর। মানুষের আত্মপরিচয় অনেক সময় তার অতীত অভিজ্ঞতা ও আচরণ দ্বারা গঠিত হয়। কিন্তু মানুষ নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন মূল্যবোধ এবং নতুন আচরণের মাধ্যমে নিজের পরিচয়ও পরিবর্তন করতে পারে। একজন ব্যক্তি যদি নিজের ভুল স্বীকার করে, নতুন জীবনদর্শন গ্রহণ করে এবং ধারাবাহিকভাবে সেই অনুযায়ী জীবনযাপন করে, তবে তার নিজের সম্পর্কে ধারণাও পরিবর্তিত হতে পারে। গীতার ভাষায় এই পরিবর্তনকে দুরাচার থেকে ধর্মাত্মার দিকে অগ্রসর হওয়া বলা যায়।

সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটির নির্মাণ অত্যন্ত সুন্দর। প্রথমে বলা হচ্ছে ক্ষিপ্রং, অর্থাৎ দ্রুত। তারপর ভবতি, অর্থাৎ হয়ে ওঠে। তারপর ধর্মাত্মা, অর্থাৎ ধর্মময় সত্তায় পরিণত হয়। এরপর বলা হচ্ছে শশ্বৎ শান্তিং নিগচ্ছতি, অর্থাৎ চিরস্থায়ী শান্তির দিকে পৌঁছে যায়। এর মধ্যে যেন একটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক যাত্রা রয়েছে। প্রথমে আসে পরিবর্তনের সূচনা, তারপর চরিত্রের রূপান্তর এবং শেষে অন্তরের শান্তি। আর সবশেষে আসে কৃষ্ণের আশ্বাস যে তাঁর ভক্ত কখনো বিনষ্ট হয় না।

মানবজীবনের জন্য এই শ্লোকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এই যে মানুষকে তার অতীতের অন্ধকার দিয়ে চূড়ান্তভাবে বিচার করা উচিত নয়। একজন মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে ফিরে আসার ক্ষমতা থাকতে পারে। একজন মানুষ দুর্বল হতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকতে পারে। একজন মানুষ দীর্ঘদিন ভুল পথে থাকতে পারে, কিন্তু সত্যের দিকে ফিরে আসার একটি মুহূর্ত তার জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। সেই কারণে ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা কেবল একটি ধর্মীয় বাক্য নয়। এটি মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনার প্রতি এক গভীর আস্থা।

এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত সত্যকে যদি এক কথায় প্রকাশ করা হয়, তবে তা হলো মানুষের অতীত তার পরিচয়ের একটি অংশ, কিন্তু তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়। সত্যিকারের ভক্তি মানুষের অন্তরকে পরিবর্তিত করতে পারে। সেই পরিবর্তিত অন্তর ধর্মের দিকে অগ্রসর হয় এবং ধর্মের পথে অগ্রসর মানুষ ধীরে ধীরে অন্তরের শান্তি লাভ করে। তাই “ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা” মানুষের জন্য একটি আশার বাণী, “শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি” তার আধ্যাত্মিক গন্তব্যের কথা বলে এবং “ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি” তাকে ঈশ্বরের অটুট আশ্বাসের মধ্যে স্থাপন করে।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে মানুষের জীবনে পতন থাকতে পারে, কিন্তু প্রত্যাবর্তনের পথও থাকে। অতীতের ভুল থাকতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও থাকে। অস্থিরতা থাকতে পারে, কিন্তু শান্তির সন্ধানও থাকে। আর সত্যিকারভাবে ঈশ্বরের দিকে ফিরে যাওয়া মানুষের জন্য সেই পথ কখনো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় না। এই কারণেই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোক মানবজীবনের নৈতিক পুনর্জাগরণ, আধ্যাত্মিক পরিবর্তন এবং অন্তরের শান্তির এক অনন্য ঘোষণা হিসেবে আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি