শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.৩২ — ঈশ্বরের আশ্রয়, আধ্যাত্মিক সমতা ও পরমগতি লাভের তত্ত্ব
মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য যেহপি স্যুঃ পাপযোনয়ঃ।
স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাস্তেহপি যান্তি পরাং গতিম্।।৩২।।
অনুবাদঃ হে পার্থ! যারা আমাকে বিশেষভাবে আশ্রয় করে, তারা স্ত্রী, বৈশ্য, শুদ্র আদি নীচকুলে জাত হলেও অবিলম্বে পরাগতি লাভ করে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের বত্রিশতম শ্লোকটি মানবজীবনের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা, ঈশ্বরের আশ্রয় এবং মানুষের সামাজিক পরিচয়ের সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক গভীর সত্য প্রকাশ করে। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, যারা তাঁকে আশ্রয় গ্রহণ করে তারা যে সামাজিক বা জন্মগত অবস্থানেরই হোক না কেন, এমনকি যাদের সমাজের প্রচলিত কাঠামোতে নিম্ন বা বঞ্চিত বলে গণ্য করা হতো, তারাও পরম গতি লাভ করতে পারে। এই বক্তব্যের অন্তরে রয়েছে একটি গভীর মানবিক ও দার্শনিক উপলব্ধি। মানুষের বাহ্যিক পরিচয় তার সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু তার আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার শেষ সীমা নির্ধারণ করতে পারে না।
শ্লোকটির সূচনা হয়েছে মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য শব্দগুলির মাধ্যমে। মাং শব্দটি সংস্কৃত মদ্ সর্বনামের দ্বিতীয়া একবচন রূপ এবং এর অর্থ আমাকে। এখানে কৃষ্ণ নিজেকে কেবল ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে নির্দেশ করছেন না। গীতার দার্শনিক প্রেক্ষাপটে তিনি পরম সত্য ও পরমেশ্বরের প্রতীক হিসেবেও নিজেকে প্রকাশ করছেন। হি একটি অব্যয় শব্দ, যার অর্থ নিশ্চয়ই, সত্যিই বা অবশ্যই। আর পার্থ হলো পৃথার পুত্র অর্জুনের নাম। পৃথা ছিলেন কুন্তীর আরেক নাম। তাই পার্থ শব্দের মধ্যে একদিকে যেমন অর্জুনের পরিচয় রয়েছে, অন্যদিকে কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্কের সুরও রয়েছে। কৃষ্ণ যেন অর্জুনকে শুধু কোনো তাত্ত্বিক শিক্ষা দিচ্ছেন না, বরং গভীর স্নেহ ও প্রত্যয়ের সঙ্গে মানবজীবনের একটি চিরন্তন সত্য জানাচ্ছেন।
এই শ্লোকের অন্যতম গভীর শব্দ হলো ব্যপাশ্রিত্য। এই শব্দটি সংস্কৃত ভাষার আশ্রয় গ্রহণের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে কেবল কোনো কিছুর ওপর নির্ভর করার অর্থ নেই। এর মধ্যে রয়েছে সম্পূর্ণভাবে কোনো উচ্চতর সত্যকে অবলম্বন করা, তার দিকে নিজের চেতনাকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং নিজের সীমাবদ্ধ অহংকারকে পরম সত্যের সামনে সমর্পণ করা। মানুষ যখন নিজের ক্ষমতা, অহংকার, সামাজিক মর্যাদা এবং বাহ্যিক পরিচয়কে জীবনের চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করে, তখন তার চেতনা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে তার অস্তিত্বের মধ্যে এমন একটি গভীর সত্য রয়েছে যা ব্যক্তিগত সাফল্য ও ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে, তখন তার জীবন অন্য একটি দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। এই পরিবর্তিত অভিমুখই ব্যপাশ্রিত্য শব্দটির গভীর তাৎপর্যকে প্রকাশ করে।
এরপর আসে পাপযোনয়ঃ শব্দটি। এই শব্দটি শ্লোকটির সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশগুলির একটি। পাপ এবং যোনি এই দুটি ধারণার সমন্বয়ে শব্দটির গঠন। পাপ বলতে অশুভতা, অধর্ম বা অনৈতিকতার ধারণা বোঝায় এবং যোনি বলতে জন্ম, উৎস, উৎপত্তি বা কোনো অবস্থার কারণ বোঝানো হয়। প্রাচীন ভাষ্যকারদের আলোচনায় পাপযোনি বলতে এমন কিছু জন্ম বা সামাজিক অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে যেগুলি সেই সময়ের ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোতে নিম্ন বা বঞ্চিত বলে বিবেচিত ছিল। এই শব্দটিকে তাই আধুনিক অর্থে কোনো ব্যক্তিকে জন্মগতভাবে পাপী বলে ঘোষণা করার বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। বরং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এটি এমন মানুষদের নির্দেশ করে যাদের ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক সুযোগ সীমিত ছিল।
এই ব্যাখ্যার মধ্যেই শ্লোকটির গভীর মানবিক শক্তি প্রকাশ পায়। কারণ কৃষ্ণ এই পরিচয়গুলিকে উল্লেখ করার পর তাদের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা অস্বীকার করেননি। বরং বলেছেন তারাও পরম গতি লাভ করতে পারে। অর্থাৎ যে সমাজ কোনো মানুষকে তার জন্ম, পরিচয় বা অবস্থানের কারণে নিচে রাখতে পারে, আধ্যাত্মিক সত্যের বিচারে সেই মানুষটির পরম সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা যায় না। এখানেই শ্লোকটির অন্তর্ভুক্তিমূলক শক্তি।
এরপর কৃষ্ণ বলেন স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাঃ। এখানে স্ত্রী, বৈশ্য ও শূদ্র শব্দগুলি প্রাচীন ভারতীয় সামাজিক কাঠামোর পরিচয় বহন করে। স্ত্রী অর্থ নারী। বৈশ্য ঐতিহ্যগত বর্ণব্যবস্থায় কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক শ্রেণিকে নির্দেশ করে। শূদ্র ঐতিহাসিকভাবে শ্রম ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক শ্রেণিকে নির্দেশ করেছে। এই পরিচয়গুলির উল্লেখ সেই সময়কার সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু কৃষ্ণের বক্তব্যের বিশেষ তাৎপর্য হলো, এসব পরিচয়কে আধ্যাত্মিক মুক্তির চূড়ান্ত বাধা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
এই বিষয়টি বোঝার জন্য সামাজিক পরিচয় ও আত্মিক পরিচয়ের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। মানুষ সমাজে বিভিন্ন পরিচয় নিয়ে জন্মায়। সে কোনো পরিবারের সন্তান, কোনো অঞ্চলের মানুষ, কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত, কোনো সামাজিক শ্রেণির সদস্য। কিন্তু গীতার দর্শন মানুষের পরিচয়কে কেবল এই বাহ্যিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখে না। প্রশ্নটি আরও গভীরে নিয়ে যায়। মানুষ আসলে কে। তার জীবনের উদ্দেশ্য কী। তার চেতনার গন্তব্য কোথায়। এই প্রশ্নগুলিই আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের মূল ভিত্তি।
এই কারণেই শ্লোকের পরবর্তী শব্দ তে অপি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ তারাও। এই ছোট্ট শব্দবন্ধের মধ্যে রয়েছে এক গভীর অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা। তারা বাদ নয়। তারা অযোগ্য নয়। তাদের জন্ম বা সামাজিক অবস্থান তাদের পরম সত্যের পথে চিরতরে বন্ধ করে দেয় না। কৃষ্ণের বক্তব্যের এই দিকটি মানবমর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক ভিত্তি তৈরি করে। মানুষকে তার বর্তমান অবস্থার দ্বারা বিচার করা যায়, কিন্তু তার সম্ভাবনাকে কেবল সেই অবস্থার মধ্যে বন্দী করা যায় না।
এরপর আসে যান্তি শব্দটি। এর মূল ধাতু হলো গম্, যার অর্থ যাওয়া। এই ধাতু থেকেই গতি, গমন, আগমন এবং অন্যান্য বহু শব্দের উৎপত্তি। কিন্তু এখানে যান্তি শব্দের অর্থ কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়। এটি আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রতীক। মানুষ তার অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে যেতে পারে। অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে যেতে পারে। আসক্তি থেকে মুক্তির দিকে যেতে পারে। অস্থিরতা থেকে শান্তির দিকে যেতে পারে। তাই যান্তি শব্দের মধ্যে একটি পরিবর্তন ও উত্তরণের ধারণা নিহিত রয়েছে।
এই যাত্রার গন্তব্য হলো পরাং গতিম্। পরা অর্থ সর্বোচ্চ, উৎকৃষ্ট বা সীমার অতীত। গতি অর্থ চলন, পথ, গন্তব্য বা চূড়ান্ত প্রাপ্তি। তাই পরাং গতিম্ অর্থ পরম গতি বা সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক গন্তব্য। ভক্তি দর্শনে এটি ঈশ্বরপ্রাপ্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। মোক্ষের দর্শনে এটি বন্ধন থেকে মুক্তি হিসেবে বোঝা যায়। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এটি আত্মস্বরূপের উপলব্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই পরম গতি কোনো সাধারণ স্থান পরিবর্তন নয়। এটি চেতনার সর্বোচ্চ উত্তরণ।
শ্লোকটির দার্শনিক তাৎপর্য এখানেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষ কোথায় জন্মেছে সেটি তার জীবনের সূচনা নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু সে কোথায় পৌঁছাবে তা কেবল জন্মের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। একজন মানুষ সীমিত সামাজিক পরিচয় নিয়ে জন্ম নিতে পারে, কিন্তু তার চেতনা অসীম সত্যের দিকে অগ্রসর হতে পারে। এই দৃষ্টিতে জন্ম হলো জীবনের একটি প্রাথমিক অবস্থা, চূড়ান্ত পরিচয় নয়।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই বক্তব্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। অদ্বৈত দর্শন মনে করে আত্মার প্রকৃতি চৈতন্য এবং পরম সত্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক মৌলিক। নারী, পুরুষ, বৈশ্য, শূদ্র, ধনী, দরিদ্র ইত্যাদি পরিচয় দেহ ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলি আত্মার চূড়ান্ত স্বরূপ নয়। তাই পরাং গতিম্ বলতে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধির দিকেও ইঙ্গিত করা যায়। মানুষ যখন বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে নিজের গভীরতর সত্তাকে উপলব্ধি করতে শুরু করে তখন তার আধ্যাত্মিক যাত্রা শুরু হয়।
ভক্তি দর্শনে এই শ্লোকের অর্থ আরও হৃদয়গ্রাহী। এখানে ঈশ্বরকে উপলব্ধির জন্য মানুষের সামাজিক মর্যাদা নয়, ঈশ্বরের প্রতি তার অন্তরের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ব্যপাশ্রিত্য শব্দটি তাই ভক্তির কেন্দ্রীয় ধারণা হয়ে ওঠে। আশ্রয় মানে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা নয়। বরং নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে পরম সত্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। মানুষ যখন বলে আমি সবকিছু জানি না, আমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না এবং আমার অস্তিত্বের চেয়েও বৃহত্তর একটি সত্য আছে, তখন তার অহংকারের কেন্দ্র ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকটির একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। মানুষ অনেক সময় নিজের অতীত, পরিবার, সামাজিক অবস্থান, ব্যর্থতা বা অন্যের মতামত দিয়ে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে। সে ভাবতে শুরু করে যে তার অতীতই তার ভবিষ্যৎ। কিন্তু গীতার এই শিক্ষা মানুষকে সেই সীমাবদ্ধ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে। একজন মানুষের জন্ম তার জীবনের শুরু হতে পারে, কিন্তু তার চেতনার যাত্রা তার সম্ভাবনার নতুন পথ খুলে দিতে পারে। এই অর্থে পরাং গতিম্ হলো নিজের উচ্চতর সম্ভাবনার দিকে উত্তরণ।
একটি নদীর কথা ভাবা যায়। একটি বিশাল নদী হয়তো পাহাড়ের ক্ষুদ্র একটি ঝরনা থেকে জন্ম নিয়েছে। তার শুরু ছিল অতি সামান্য। কিন্তু সেই ক্ষুদ্র উৎসই একদিন তাকে বিশাল সমুদ্রের দিকে নিয়ে যেতে পারে। নদীর জন্মস্থান তার চূড়ান্ত গন্তব্য নির্ধারণ করে না। তেমনি মানুষের জন্ম বা সামাজিক অবস্থান তার আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার শেষ সীমা নয়। তার জীবন কোন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
শ্লোকটির সাহিত্যিক সৌন্দর্যও এই বৈপরীত্যের মধ্যে রয়েছে। একদিকে রয়েছে পাপযোনয়ঃ, স্ত্রিয়ঃ, বৈশ্যাঃ ও শূদ্রাঃ এর মতো সামাজিক পরিচয়। অন্যদিকে রয়েছে পরাং গতিম্ এর মতো সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক গন্তব্য। এই দুই প্রান্তকে সংযুক্ত করেছে ব্যপাশ্রিত্য এবং যান্তি। অর্থাৎ সীমিত পরিচয় থেকে পরম গন্তব্যের দিকে যাত্রার সেতু হলো ঈশ্বরের আশ্রয় এবং আধ্যাত্মিক অভিমুখ।
নবম অধ্যায়ের পূর্ববর্তী শ্লোকগুলির সঙ্গে এই বক্তব্যের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্রিশতম শ্লোকে কৃষ্ণ বলেন যে অত্যন্ত দুরাচার ব্যক্তিও যদি একান্তভাবে তাঁকে ভজনা করে, তবে তার পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। একত্রিশতম শ্লোকে বলা হয় যে সে দ্রুত ধর্মাত্মা হয়ে ওঠে। বত্রিশতম শ্লোকে এই ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করে বলা হয় যে সামাজিকভাবে বঞ্চিত বা নিম্ন বলে গণ্য মানুষও পরম গতি লাভ করতে পারে। অর্থাৎ ধারাটি হলো মানুষের বর্তমান অবস্থার সীমাবদ্ধতা থেকে ঈশ্বরের আশ্রয়, তারপর অন্তরের পরিবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত পরম গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হওয়া।
আধুনিক সমাজের জন্য এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজও মানুষ জন্ম, অর্থ, শিক্ষা, পারিবারিক পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা এবং পেশার ভিত্তিতে অন্য মানুষকে বিচার করে। অনেকেই নিজের অবস্থার কারণে মনে করে তার পক্ষে বড় কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। কেউ নিজের অতীতকে নিজের ভবিষ্যতের শাস্তি মনে করে। কিন্তু গীতার এই শিক্ষা মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের সম্ভাবনা তার বর্তমান পরিচয়ের চেয়ে গভীর। একজন মানুষ কোথা থেকে এসেছে তার গুরুত্ব আছে, কিন্তু সে কোন দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তার গুরুত্বও কম নয়।
তবে এই শ্লোককে ব্যাখ্যা করার সময় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও মনে রাখা প্রয়োজন। একে সরাসরি আধুনিক সামাজিক সমতার পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে পড়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি একে কেবল জন্মগত বৈষম্যের সমর্থন হিসেবেও পড়া শ্লোকটির আধ্যাত্মিক বক্তব্যকে সংকুচিত করে। এর মূল শিক্ষা হলো মানুষের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা সামাজিক পরিচয়ের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় না। কৃষ্ণ যে মানুষদের সামাজিক কাঠামোর দৃষ্টিতে নিম্ন বা বঞ্চিত হিসেবে উল্লেখ করছেন, তাদের ক্ষেত্রেও পরম গতি লাভের সম্ভাবনা স্বীকার করছেন।
সবশেষে বলা যায়, মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য থেকে পরাং গতিম্ পর্যন্ত এই শ্লোকটি আসলে মানুষের এক গভীর আধ্যাত্মিক যাত্রার কথা বলে। মাং আমাদের পরম সত্যের দিকে ফিরিয়ে দেয়। ব্যপাশ্রিত্য শেখায় সেই সত্যকে আশ্রয় করতে। পাপযোনয়ঃ এবং অন্যান্য সামাজিক পরিচয় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের বাহ্যিক পরিচয় নানা রকম হতে পারে। তে অপি ঘোষণা করে যে কেউই চিরতরে বাদ পড়ে না। যান্তি আমাদের চলার কথা মনে করিয়ে দেয়। আর পরাং গতিম্ সেই যাত্রার সর্বোচ্চ গন্তব্যের কথা বলে।
এই শ্লোকের সারমর্ম তাই এক গভীর মানবিক সত্যে এসে পৌঁছায়। মানুষের জন্ম তার জীবনের একটি সূচনা হতে পারে, কিন্তু তার চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার সীমা নয়। সমাজ মানুষকে নানা পরিচয়ে চিহ্নিত করতে পারে, কিন্তু পরম সত্যের সামনে সেই পরিচয়ের চেয়েও গভীর হলো তার অন্তরের অভিমুখ। যে মানুষ সত্যের দিকে ফিরে যায়, নিজের অহংকার অতিক্রম করে এবং পরমকে আশ্রয় করে, তার জন্য আধ্যাত্মিক উত্তরণের পথ উন্মুক্ত থাকে। সেই কারণেই এই শ্লোক শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়। এটি মানুষের সম্ভাবনা, মর্যাদা, আত্মপরিচয় এবং পরম সত্যের দিকে তার অন্তহীন যাত্রার এক গভীর ঘোষণা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!